somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমরা তো এভাবে শিরোনাম হতে চাইনি!

০৫ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১০:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভেবেছিলাম যা হবার হতে দিব, কিন্তু আর চুপ থাকত পারলাম না, যখন দেখলাম মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীদের জোড়পূর্বক রাস্তায় মানব বন্ধনের জন্য রোদের মধ্যে দাড় করিয়ে রাখা হয়েছে। দুঃখের নিষয় এই যে, এসব কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা কিছু অস্বাভাবিক্ রাজনীতির বলি হচ্ছে। একটা ছাত্র বা ছাত্রীর শিক্ষা জীবন শুরু করার আগেই শিখতে হয় রাজনীতি কি? আর দুর্নীতি কি করে করা হয়। যাই হোক, আমি আসল কথায় আসি। কয়েক দিন ধরে সবাই মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজের খবর পড়তে পড়তে হয়তো বিরক্ত হয়ে উঠজেছেন। পত্রিকা টিভি চ্যানেলগুলো ভিন্ন ভিন্ন সংবাদ প্রচার করছে। স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে আমি বা আমরা অনেক কিছুই জানি, আমার মনে হয় মানুষকে সত্যটা জানানো দরকার।স্মপ্রতি আমরা সবাই দেখেছি যে স্কুলের ভর্তি ফি নিয়ে এক নারী সাংবাদিক খবর সংগ্রহ করতে গেলে তিনি লাঞ্ছিত হন। যেটার সাথে আমাদের এম পি কামাল মজুমদার জড়িত ছিলেন।
তাহলে একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক, ১৯৯৭ সাল, আমি ভর্তি পরীক্ষায় টিকে যাই, ভর্তি হই মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে। তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন শেখ সবদার আলী। অনেকেই তাঁকে চেনেন। খুবই কড়া শিক্ষক! একজন টিপিকাল প্রধান শিক্ষক যেমন হন, তিনি ছিলেন তেমনই। কয়েকটা উদাহরন দিলেই জানতে পারবেন। আমাদের তখন একটা ভবনেই ক্লাস হতো, যেটা এখন বালিকা শাখা মূল স্কুল। আমাদের ক্লাস শুরু হতো ১২ টায়(দুপুর)। মেয়েদের শুরু হতো সকাল ৭ টায়। মেয়েদের ছুটি হলে আমরা প্রবেশ করতাম। তার আগে স্যারেরা দাড়িয়ে দেখতেন কেঊ মেয়েদের কোন কমেন্টস করছে কিনা। সৌভাগ্যের বিষয় এ ঘটোনা কখোনোও ঘটে নাই। এরপর ক্লাস করতাম মাঝখানে বিরতি ছিলো ৩০ মিনিট, এ সময় গেট খুলে দেয়া হতো, যাদের বাসা স্কুলের কাছে ছিলো তারা দৌড়ে বাসা থেকে খেয়ে আসতো। আর সবার(মুসলিম) নামায বাধ্যতা মূলক ছিলো।ক্লাস শুরুর আগে এসেম্বলি হতো, আমাদের প্রধান শিক্ষক বেত হাতে ঘুরে ঘুরে দেখতেন পোশাক আশাক, সব ঠিক আছে কিনা। আমাদের তখন রাগ হতো কিন্তু এখন বুঝি এই ডিসিপ্লিন জীবনে কত কাজে লাগছে। নামায না পড়লে শাস্তির বিধান ছিলো, যাক সে কথা। এগুলো আমি বললাম, সবদার আলী স্যারের আমলে ডিসিপ্লিনটা কেমন সেটা বোঝানোর জন্য। তার মধ্যে রেজাল্ট খারাপ করলে গার্ডিয়ানকে তো আসতে হতই। কৈফিয়ত চাওয়া হতো খারাপ রেজাল্টের। মোটকথা এতোসব ডিসিপ্লিনের কারনে স্যার সারা বাংলাদেশে পুরস্কার পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে।
১৯৬৯ সালে স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। হাজী নূর মোহাম্মদ নামের একজন ব্যাক্তি জায়গাটা দান করেন স্কুলকে। আমরাও জানতাম তিনি আমাদের প্রতিষ্ঠাতা। সাথে স্থানীয় লোকজনের সহায়তাও ছিলো। এভাবেই স্কুল গড়ে উঠে। সবদার আলী স্যারের সাথে স্থানীয় এবং প্রতিষ্ঠাতা যিনি তার ছেলেমেয়েদের সাথেও বা আত্নীয়দের সাথেও স্যারের ইন্টারাকশনো ভালো ছিল। সব অনুষ্টানে তারা আসতো স্কুলে। হাজী নূর মোহাম্মদ মারা যান, তার কবরটি স্কুলের পাশেই জরাজীর্ন ভাবে পড়ে আছে। এখনকার ছাত্ররা সেটার উপরে ক্রিকেট ফুটবল খেলে এখন। তারা জানেনা কবরটা কার।
আমি ২০০৫ সালে পাশ করে বের হই। তখনোও সবদার আলী প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিছু দিন পরে শুনতে পাই, স্যারকে দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত করা হয়, তার বদলে সিনিয়র শিক্ষক বেলায়েত হোসেন দায়িত্ব নেন। পরে কোন দুর্নীতি খুজে বের হয়নাই। স্যারের অপরাধ ছিলো তিনি স্কুলের টাকা ব্যাংকে জমা করে রেখেছিলেন, কোন উন্নয়ন স্কুলের করেননি। এর কিছুদিন পর আহাদ আলী নামের এক ভদ্রলোক স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়ীত্ব নেন। যাই হোক পরে শুনতে পারি তিনি বালিকা স্কুলের ৬ তলাকে নিজের বাসা বানিয়েছিলেন। আমিও রাস্তা থেকে দেখতে পেতাম স্যারের লুঙ্গি গামছা স্কুলের বারান্দায় ঝুওলছে।পরে তিনিও কোন কারনে পদত্যাগ করেন এরমধ্যে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসে। কামাল মজুমদার সাংসদ হন মিরপুর এলাকার। এরপরই শুরু হতে থাকে স্কুলের অনেক গল্প। তিনি এসে স্কুলের অনেক উন্নয়ন করেন, ব্রাঞ্চ ১, ২, ৩ হয়। এমন সুরম্য অট্যালিকা তৈরী করেছেন উনি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যাল ও হার মানে। ফরহাদ হোসেন স্যার প্রধান শিক্ষক হন। এর মধ্যে স্কুল পরিনত হয় কলেজে। তিনি হয়ে যান শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ। তাও আবার রাতারাতি! এতো উন্নয়ন হয় স্কুলের, রেজাল্টো ভালো হয়, স্কুল সারা বাংলাদেশে ১ম স্থান অধিকার করে। কিন্তু কিছু প্রশ্ন আমার মনে সৃষ্টি হয়, আমি নিচে সেগুলো বলছিঃ
শ্রদ্ধেয় ফরহাদ স্যার, আমি যখন ছাত্র ছিলাম এই স্কুলের, আমি তখন স্কুলের গলিতে দেখতাম না, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শার্ট পরা কোন ছাত্র রাস্তায় দাঁড়িয়ে ধূমপান করছে, এখন যেভাবে করে। আমি কখোণো দেখতাম না স্কুলের ইউনিফর্ম পরা কোন ছাত্র ছাত্রীকে এক সাথে রিক্সায় বসে বোতানিক্যাল গার্ডেনে যেতে। আমাদের সময় টিফিন টাইমে ৩০ মিনিটের জন্য গেট খুলে দেয়া হতো, আমরা সবাই নামায পড়ে, খেয়ে ঠিক সে সসময়ের মাঝে ক্লাসে উপস্থিত হতাম। আপনি কি পারবেন এখন এভাবে গেট খুলে দিয়ে ৩০ মিনিটের মধ্যে সবকয়টা ছাত্রকে আবার ক্লাসে বসাতে? আমাদের সময় নামাজ ক্যাপ্টেন নামক একটা জিনিস ছিলো যার দায়িত্ব ছিল ক্লাসে কেকে নামায পড়ে নাই তাদেরকে ইনলিস্ট করা, এখনকার ছাত্র রা কি জানে৪ নামাজ ক্যাপ্টেন জিনিসটা কি? শুধু ২টা ঘটনা দিয়ে আমি আমার লেখা শেষ করবোঃ
ঘটনা-১ঃ আমি মতিঝিলে গিয়েছি একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে, আমি তখন ৫ম শ্রেনীর ছাত্র। আমাকে এক লোক প্রশ্ন করলেন তুমি কোন স্কুলে পড়ো বাবা? আমি বললাম মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়। তিনি বললেন,ও এটাতো খুব ভালো স্কুল, তোমাদের প্রধান শিক্ষক তো শেখ সবদার আলী তাইনা? আমি বললাম জ্বী। জনাব ফরহাদ হোসেন স্যার, কয়জন জানে আপনার নাম? বলবেন কি? আমি সেইদিন স্কুলের এক ছাত্রকে প্রশ্ন করলাম, তোমাদের প্রধান শিক্ষক কে? সে শুধু ঠোঁট বাকাঁলো। আমি অবাক।
ঘটনাঃ২ আমরা ছাত্র থাকাকালীন সবাই জানতাম, আমাদের স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা জনাব নূর মোহাম্মদ সাহেব। আমি সেইদিন আমার ভাগ্নী যে কিনা এই স্কুলের ১ম শ্রেনীতে পড়ে, তাকে প্রশ্ন করলাম, তোমাদের স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা কে? সে বললো, মিস্ত্রী। আমি এতোই অবাক হলাম, যে কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম। জনাব কামাল মজুমদার ব্রাঞ্চ-৩ এর সামনে আপনার একটা প্রতিকৃতি আছে, কই, কেউ তো আপনার নাম বলতে পারলো না। আমাদের সময় তো নূর মোহাম্মদ সাহেবের কোন ছবি ছিল না।
স্যার, আপন হয়তো বলতে পারেন যে আপনি প্রধান শিক্ষক হবার পর এর অনেক উন্নতি সাধন হয়েছে, অনেক এ প্লাস পেয়েছে, কিন্তু আমি এ প্লাস চাইনা, আমি চাই আমার স্কুল থেকে ছেলেরা বের হয়ে একজন যোগ্য নাগরিক হয়েছে, যে ফলাফলই হোক না কেনো। আমি চাইনা স্কুলের ড্রেস পড়ে কেউ সিগারেট খাক, কেউ পার্কে যাক, তাও আবার ক্লাস চলাকালীন, ছেলেরা মেয়েদের স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকুক। সবদার আলী স্যারের প্রতি ব্যাক্তিগত ভাবে আমার কোন টান নেই। আমি এগুলো বলেছি, বর্তমানে স্কুলের সার্বিক একটা ধারতনা দেয়ার জন্য। স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে আমি এটাকে আমার দায়িত্ব মনে করেছি। দয়া করে এভাবে যেনো স্কুলটা আর খবরের শিরোনাম না হয়, আপিনাদের কাছে এটা আমার অনুরোধ। ১০ বছর স্কুলের সাথে একটা টান ছিলো, যেটা জীবিনে কেউ ভুলতে পারে না, সেই স্মৃতি খুবই নিষ্পাপ। সত্যিই, আমরা তো এভাবে শিরোনাম হতে চাইনি। আমি দেখতে চেয়েছিলাম, সব শিক্ষার্থী ভি চিহ্ন দেখিয়ে বিজোয়োল্লাস করছে। এটাকি খুব বড় চাওয়া?

সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১০:১৬
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×