যেদিন যাব সেদিন সকালে মুষলধারে বৃষ্টি । আমি কোনভাবে বাসা থেকে বের হলাম কিন্তু প্যাঁচ লাগলো রনির বাসায় । আংকেল এই বৃষ্টির মধ্যে কোনভাবেই আমাদের যেতে দিবেন না । যাইহোক ৮ টার সময় রওনা দেওয়ার কথা থাকলেও বৃষ্টি ১০ টার দিকে কমে এলে তড়িঘড়ি করে বের হয়ে গেলাম । ১১টায় বাসে উঠলাম মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে । ঢাকা থেকে বিরিশিরি সরাসরি বাস সার্ভিস আছে মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে । টিকিট ১২০ থেকে ১৮০ টাকা । বিরিশিরি(যদিও আসল বিরিশিরি আরও অনেক দূর বাকী) গিয়ে পৌছালাম তখন বাজে প্রায় ৩ টা । বাস থেকে নামার পর দৌড়ে একটা দোকানের নিচে গিয়ে দাড়ালাম । বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি । ওখানে ভাত খেয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম । বৃষ্টি ছেড়ে গেল । পড়ে একটা টেম্পুতে করে একটা ভাঙা ব্রীজ পর্যন্ত এলাম । এই ব্রীজের খুঁটি আছে কিন্তু মাঝে কোন রাস্তা নেই । লোকজন বলল এইটা কাদের সিদ্দিকীর বানানো ব্রীজ । অর্ধেক বানিয়ে টাকা নিয়ে চলে গেছে
তারপর ওখানে গিয়ে একটা ডাবল বেডের রুম নিলাম ১৮০টাকায় । আমরা মানুষ পাঁচজন । রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে সন্ধ্যায় এলাকা ঘুরতে বের হলাম । মানুষ খুব কম । মোটামুটি নির্জনই বলতে হবে । একটা বাজার আছে । প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া যায় । সোমেশ্বরী নদীও দেখলাম । বর্ষায় নদী তার যৌবন ফিরে পেয়েছে যেন ।
রাতে পার করে পরের দিন ঘুরতে বের হলাম সকাল ১০টার দিকে। এবারের লক্ষ্য গারো পাহাড় , চিনামাটির পাহাড়, নীল পানি, রাণীখং মিশন । সকাল বেলা বের হলাম বৃষ্টি সঙ্গী করে ।
যা যা দেখবো সবই সোমেশ্বরী নদীর ওপারে (যেদিক দিয়ে এসেছি ওই দিকে নয় কিন্তু) । তাই নদীর ঘাটে গিয়ে নৌকার জন্য অপেক্ষা । নদী পার হয়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য আমাদের হাতে দুইটা অপশন ছিল । রিকশা অথবা মটরসাইকেল । একটা মোটরসাইকেল সাধারণত চালকসহ ৩ জন বহন করে । কিন্তু বৃষ্টির দিনে রাস্তার ভয়াবহতা চিন্তা করে মটরসাইকেলের চিন্তা থেকে সরে আসলাম । রিকশা ঠিক করা হল ৩টা । ওই বৃষ্টি কাদার মধ্যে কোন রিকশাচালকই রিকশায় ৩ জন বহন করতে রাজি না । ভাড়া ঠিক করলাম রিকশা প্রতি ২৫০টাকা । কর্দমাক্ত রাস্তা ঠেলে রিকশা নিয়ে অনেক ঝক্কি পার হয়ে দুপুরে ১ টার দিকে পৌছালাম চিনামাটির পাহাড় ।
ওখান থেকে কাছেই (হাটা দূরত্বে) নীল পানি । কিন্তু বর্ষাকাল বিধায় নীল পানি পুরো ঘোলা অবস্থায় ছিল । শীতকালে ওই পানি গাঢ় নীল থাকে ।
ঘুরে দেখতে দেখতে প্রায় আড়াইটা । আমাদের সময় কম । সন্ধ্যার আগেই আবার ময়মনসিংহ শহরে ফিরে যাব । তাই গারো পাহাড় ও রাণীখং মিশন দেখা হয় নি । ফেরত চলে আসলাম । তাই যারা যাবেন ভবিষ্যতে তারা একদিন পুরোটা বিরিশিরি থাকার প্ল্যান করেই আসবেন ।
তাহলে সবগুলো জায়গা কাভার দিয়ে রাতে সোমেশ্বরী নদীর পাড়ে আউটিং করতে পারবেন । ফেরার পথে বিকাল হয়ে গেল । রুমে গিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে টেম্পুতে করে ঘাটে নৌকা পার হয়ে বাসস্ট্যান্ড আসতে আসতে রাত হয়ে গেল । সর্বনাশা ব্যাপার হল ময়মনসিংহ শহরের শেষ বাসটাও মিস করেছি । আবার রাত ক্রমশ বাড়ছে । কিছু ক্ষণ পর হয়ত বিরিশিরি ফেরত যাওয়ার নৌকাও পাব না । শেষ পর্যন্ত ৪০০ টাকা গচ্চা দিয়ে একটা টেম্পু ভাড়া করলাম ময়মনসিংহ সদর পর্যন্ত ।
ময়মনসিংহে কি কি দেখলাম তা আরেকদিন বলব । আজকে এটুকুই । লেখাটা একটু বড় হয়ে গিয়েছে । প্রথম ভ্রমণকাহিনী লিখছি হয়ত একারনেই । এবার কিছু জানার জিনিস জানায়ে দেই ।
১। রিকশা যদি নেন তবে ভাড়ার ব্যাপারটা খুব ভাল করে মিটিয়ে নেবেন । কারন ফিরে আসার পর ওরা বকশিশ চাইবে এবং ৪-৫ হলে ওরা খুব সহজেই আপনাদের কোনঠাসা করে ফেলবে । ওখানকার লোকজনও রিকশাওয়ালাদেরই সাপোর্ট করবে । তাই যদি হাঁটার অভ্যাস থাকে ৮-১০কিলোমিটার তাহলে রিকশা না নেওয়াই ভাল । রিকশা নিলে রিকশাওয়ালারাই ঘুরিয়ে দেখাবে । আপনাদের খুঁজে বের করতে কষ্ট কম হবে ।
২ । যদি বিরিশিরি যান তবে অবশ্যই ২ দিন ২ রাত হাতে নিয়ে যাবেন । তা না হলে পুরোটা না দেখে অসম্পূর্ণ অবস্থায়ই ফিরে আসতে হবে ।
৩ । যদি ঢাকা থেকে মটরসাইকেল নিয়ে যেতে পারেন তবে সবচেয়ে ভাল হয় । প্রাইভেট কার নিয়ে যাওয়ার চিন্তাও করবেন না ।
৪। রাত্রে বেলা ময়মনসিংহ ফেরার বাস কিন্তু সন্ধ্যার সাথে সাথেই ছেড়ে চলে যায় । এটা মাথায় রাখতে হবে ।
৫। কেবল বিরিশিরি যাওয়ার ২ দিনের ট্যুর হলে জনপ্রতি দেড় হাজারের ভেতর অনায়াসে হয়ে যাবে (৫ -৬জনের হিসাবে) । দল যত ভারী হবে খরচ কমবে তবে সামান্য ।
৬। সোমেশ্বরী নদীর পাড়ে রাতে বারবিকিউ অথবা ক্যাম্পিং করতে চাইলে সব ব্যবস্থা সাথে নিয়ে যেতে হবে । ওখানে গিয়ে অ্যারেঞ্জ করার সুযোগ নেই ।
ভ্রমণের ছবিব্লগ দেখুন বিরিশিরি ও মুক্তাগাছা ভ্রমণ
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ডিসেম্বর, ২০১০ রাত ১:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


