somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পলিগ্রাফের ইতিবৃত্ত

২৯ শে আগস্ট, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভারতীয় জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান ‘সাচ কা সামনা’র খুব সাধারণ একটি ব্যাপার। সেলিব্রেটিদের ধরে এনে একান্ত ব্যক্তিগত Polygraph প্রশ্ন করা হয় সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানটিতে। পেছনে কাড়ি কাড়ি রুপির হাতছানি। লোভে পড়ে এসে মান-ইজ্জতটুকু খোয়ানোর যোগাড় হয়। মিথ্যে বলার জো নেই। আছে লাই ডিটেক্টর, ‘পলিগ্রাফ’। অঙ্ক কষে ঠিক বলে দেবে ‘তুমি মিথ্যেবাদি’। অনুষ্ঠান তর্ক-বিতর্ক রেখে আপাতত নজর দেয়া যাক মূল হোতা পলিগ্রাফের দিকে।

বহু আগের পশ্চিম আফ্রিকার মিথ্যে ধরার আনুষ্ঠিকতা অনেকটা এমন। বেশ কতগুলো লোক সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়াত। এক পর্যায়ে তাদের হাতে দেয়া হত পাখির ডিম। সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়ানো সবাই একে একে হাত বদল করত। যার হাতে ডিমটি ভাঙত সেই মিথ্যেবাদী। অন্যদিকে আদি চীনে মিথ্যুক ডিটেক্টর হিসেবে ব্যবহার হতো একমুঠো চাল। সন্দেহভাজনদের তা চিবোতে দেয়া হতো। যার মুখের চাল শুকনো থাকতো সেই নাকি মিথ্যেবাদী।

প্রাচীনকালের এই মিথ্যে ধরার তরিকাগুলো কি পুরোপুরি ভিত্তিহীন? আধুনিক বিজ্ঞান অবশ্য তা পুরোপুরি মানতে নারাজ। ডিম ভেঙে ফেলা বা চাল চিবোতে না পারা, দুটোই কিন্তু হচ্ছে মিথ্যেবাদীর মানসিক অস্থিরতার জন্য। Polygraph-এ
মিথ্যে বলা চাট্টি খানি কথা নয়। একটি মিথ্যে হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাসের সাধারণ ছন্দকে পাল্টে দেয়। এমন সূক্ষ্ম পরিবর্তনের দেখা মেলে ত্বকের পরিবহন ব্যবস্থায়ও। তাই মিথ্যে ধরার সবচে বড় হাতিয়ার খোদ মিথ্যাবাদীর শরীর। আধুনিক যুগের মিথ্যে ধরার যন্ত্র পলিগ্রাফও দাঁড়িয়ে এর ভিত্তিতে। যা নিয়ে চুম্বকের মতো দর্শক টানছে ‘সাচ কা সামনা’ বা সত্যের মুখোমুখি অনুষ্ঠানটি। আসলেই কি কাজ করে এটি? করলে কিভাবেই বা করে? জানতে প্রথমেই উঁকি দেয়া যাক পলিগ্রাফের ইতিহাসে।

পলিগ্রাফের পূর্বপুরুষ বলতে হয় ১৮৮৪ সালে আবিষ্কৃত রক্তচাপ মাপার যন্ত্রকে। ১৯২১ সালে আরো একটি লাই ডিটেক্টর তৈরি করা হয় যা রক্তচাপের পাশাপাশি ত্বকের তথ্য আদান-প্রদানের বৈদ্যুতিক পরিবহন ব্যবস্থার হেরফের ও সনাক্ত করতে পারত। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি যন্ত্রটি সেসময় ব্যবহার হয়েছিল বার্কলে পুলিশ স্টেশনে। এরপর আসা-যাওয়া চলতে থাকে আরো বহু পদের পলিগ্রাফের। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৯৩৬ সালে সি ডি লি’র তৈরি যন্ত্রটি। প্রথমবারের মতো প্রেসার -পালস-রেস্পিরেশন রেকর্ড সহকারে তৈরি করেন লাই ডিটেক্টরটি।

শেষমেশ মানসিক স্বাস্থ্যের আরো কতগুলো মাপন যন্ত্র নিয়ে আবির্ভাব ঘটল আধুনিক পলিগ্রাফের। বিভিন্ন সাইকোলজিক্যাল রেসপন্স বা মানসিক অবস্থার প্রেক্ষিতে কাজ করে যন্ত্রটি। রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাসের তালে হেরফের মাপ-জোখ করে সনাক্ত করে মিথ্যেবাদীকে। মার্কিন ফেডারেল গভর্নমেন্ট একে সাইকোফিজিওলজিক্যাল ডিটেকশন অফ ডিসেপশন (পিডিডি) বলে।

এরই মধ্যে বেশ কাজ করেছে পলিগ্রাফ। ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৯টি প্রদেশের ফেডারেল কোর্টের ট্রায়ালে, ইউরোপের বিচার ব্যাবস্থায়ও চলে গেছে পলিগ্রাফ। যদিও ইউরোপের পুলিশেরা একে অতটা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করে না। তবে এটি কানাডার বিচার বিভাগের আস্থা অর্জন করেছে, ১৯৮৭ সালে কোর্টে প্রমাণ হিসেবে একে স্বীকৃত ব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণ করা না হলেও ফরেনসিক টুল হিসেবে এর ব্যবহার বাড়ছেই। তবে অস্ট্রেলিয়া ও ইসরায়েলের মতো দেশে যন্ত্রটি অতটা সুবিধে করতে পারে নি। তবে সম্প্রতি পড়শি দেশ ভারতের পুলিশ বিভাগেও কাজ করেছে পলিগ্রাফ। নিজের বাগদত্তাকে খুন করে এক নারী। স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় যন্ত্রটির মাধ্যমেই।
এতো গেল পলিগ্রাফের গুনগান। এর উল্টোদিকও কম ভোগায়নি মার্কিন মুল্লুকের এফবিআইকে। সোভিয়েত ইউনিয়নের হয়ে গোয়েন্দাগিরি করছিলেন অলরিল্ড নামের একজন এজেন্ট। অথচ দু’বারই পলিগ্রাফ টেস্টে উতরে গিয়েছিলেন তিনি। পলিগ্রাফের চোখে ভালো মানুষ হতে পেরেছিলেন আরো তিন জন স্পাই। কিভাবে হারালেন যন্ত্রটিকে? উত্তরে অলরিল্ড বলেন, ‘রাতে খুব ভালো একটি ঘুম, রিল্যাক্স মুডে প্রশ্নের

জবাব দেয়া, ব্যাস! ’ কাটিয়ে গেলেন যন্ত্রটিকে।
তাহলে কতটা গ্রহনযোগ্য পলিগ্রাফ? গবেষণা বলছে প্রায় ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য এটি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেয়াদি গবেষণার পর অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ একে কখনো ৮০ শতাংশের কম নির্ভরযোগ্য বলে মনে করেননি। তবু এর উপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছেন না সমালোচকরা। এছাড়া ১৯৯৭ সালের একটি জরিপে ৪২১ জন মনোবিজ্ঞানী পলিগ্রাফকে ৬১ শতাংশ নির্ভরযোগ্য বলে মনে করেছে। তবে পলিগ্রাফের জন্য সবচে বড় ধাক্কা ছিল ২০০৩ সাল ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সের রিপোর্ট। পলিগ্রাফের ৮০ টি ফলাফলের ৫৭টিকেই তারা ‘অবৈজ্ঞানিক’, ‘অবিশ্বাসযোগ্য’ বলে আখ্যায়িত করেছে। তাই পলিগ্রাফের কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্কটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।


সূত্র : সংগৃহীত



৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×