সময়: বিকাল ৩:০০-৩:২০
স্থান: এসপ্লানেড ও সর্দার রোড
ড্রাইভারকে একটা বিশ রুপীর নোট ধরিয়ে দিয়ে ট্যাক্সি থেকে নেমে গেল দীপক। এই হাঙ্গামা সহজে থামার নয়, সামনের সর্দার রোডে ঢুকে রিক্সা-টেম্পু কিছু একটা নিতে হবে। ঋতুকে একটা ফোন করা উচিত হবে নাকি সেটা নিয়ে একটা দ্বিধায় আছে ও। এখন ফোন করলেই মেয়েটা অবুঝের মত অনুযোগ শুরু করবে, রাগারাগি করবে। সত্যি কথা বলতে কি, ঋতুরই এতক্ষণে ওকে কল দেয়ার কথা ছিল। কেন দেয়নি সেটা ভেবে চিন্তা হলো দীপকের... মোবাইলে চার্জ নেই? নাকি সাথে আনতে ভুলে গেছে? আবার কোন সমস্যা হলো না তো? নাকি এত বেশী রাগ হয়েছে যে ফোন করারো প্রয়োজন বোধ করছে না!
সর্দার রোডে খানিক্ষণ হেঁটে একটা গলিতে ঢুকে রিক্সা নিয়ে নিল ও... এই গলি সোজা গিয়ে মোহাম্মদ ইসহাক রোডে ঠেকবে। সেখান থেকে বাস বা ট্যাক্সি নিয়ে একটানা মেমোরিয়াল। তবে সমস্যা হচ্ছে মেইন রোডে জ্যাম দেখে সবাই গলিতেই ঢুকেছে। সামনে রিক্সা-মানুষের লাইন পড়ে গেছে।
এক হাতে দিদির লেহেঙ্গা সামলে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ঋতুর নাম্বার ডায়াল করলো দীপক, কখন মেমোরিয়াল পৌঁছাতে পারবে সেটা ভেবে এখন আসলেই দুঃশিন্তা হচ্ছে। তিনবার রিং হবার পর লাইনটা কেটে গেল। নাকি কেটে দিল ঋতু? আবার কল করে অপারেটরের গলা শুনে অবিশ্বাস নিয়ে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকলো দীপক - ঋতু ফোন বন্ধ করে দিয়েছে! রগচটা দীপক বুঝতে পারলো ওর মথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে। রক্তলাল চোখে মোবাইলের দিকে তাকিয়েই থাকলো ও - এত রাগ তোমার মেয়ে? এত রাগ?
***
৭ ফেব্রুয়ারী, ২০০৭
সময়: বিকাল ৩:৪৫-৪:১০
স্থান: ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল
রাজীব হঠাৎ আহাওয়ার পরিবর্তনটা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে। একটু আগে পর্যন্ত ও একাই মেলট্রেনের কথা বলে যাচ্ছিল, এখন ঋতুই যা বলার বলছে। বাংলাদেশ বেতার রূপান্তরীত হয়েছে কলকাতা রেডিওতে।
ইতিমধ্যে ওর জানা হয়ে গেছে ঋতু প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থ বিঞানে পড়ছে, দ্বিতীয় বর্ষ। কলকাতার নিউ জেনারেশন স্রোতের বিপরীতে গিয়ে ও বাংলা বই পড়ে, গান শোনে। ওর বন্ধু-বান্ধবীরা কেউ পদার্থ বিঞানের নয়, কারন ক্রমাগত ভালো ফলাফলের কারনে ওর বিভাগের ছেলে-মেয়েরা ওকে একটু ঈর্ষার চোখেই দেখে। আরও জেনেছে ওর কোন ভাই-বোন নেই, বাবা সরকারী চাকরি করেন আর মা প্রাইমারী স্কুলে পড়ান। তবে সচেতন বা অবচেতন ভাবেই হোক, ঋতু এখনও বলেনি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে ও কার সাথে দেখা করতে এসেছিল।
রাজীব সম্পর্কে যে কাউকে জিঞাস করলে সে বলবে, শান্ত ছেলে, কিন্তু সময়ে সময়ে ঘাড় ত্যাড়া! একবার রেগে গেলে ওর হিতাহিত ঞান থাকে না। ওর ইচ্ছে হচ্ছিল ওই পুচকে চারটে ছেলেকে পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে দেয়। কিন্তু ঋতু মেয়েটা হাত ধরে ফেলল, এমন ভাবে "না" বলল যে আর কিছু করা গেল না। সমারসেট মমই না বলেছিলেন, "...too young to say NO to a young woman?"
মেয়েটার হাত নেড়ে কথা বলার ভঙ্গিটা মজার। যা বলে তারই বাকিটা শুনতে ইচ্ছা করে, নিজের কিছু বলতে ইচ্ছা করে না। রাজীব বুঝতে পারছে কোনো এক বিচিত্র কারনে মেয়েটা ওকে অসম্ভব পছন্দ করেছে। এখন পছন্দটা কোন ধরনের সেটাই দেখার বিষয়।
মেয়েঘেঁষা হিসেবে একটা বদনাম ওর আছে, এই করতে গিয়েই বি.বি.এ.র প্রায় বারোটা বাজিয়েছিল ও। কোন মতে টেনেটুনে পার হয়েছে। সেই দৃষ্টিতে দেখলে ঋতু ওর মনে বিন্দু মাত্র আকর্ষণ জাগানোর কথা না। আকাশী-সাদা সালোয়ার-কামিজ পড়া ছিপছিপে দেহ, গলা পর্যন্ত চুল। লম্বায় হয়তো সাড়ে পাঁচ। কোন গহনা নেই। ভালো ছাত্রী টাইপ মায়া কাড়া মুখ। মেয়েটার ঘরোয়া চেহারা একটা আপন ভাব নিয়ে আসে, রাজীবেরও তাই হচ্ছে, এর বাহুল্য কিছু নয়। স্পষ্ট বলে দেয়া যায় এই মেয়ে কখনও টাকিলা গ্লাসে চো চুমুক দিয়ে লবন খুঁজবে না, প্রেমিক সিগারেট ধরালেই মুখ ভার করে থাকবে, পার্টি বললে বুঝবে বন্ধু-বান্ধবদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো, রাজীব উত্তর মেরু বললে সে বুঝবে দক্ষিণ!
***
ঋতু বুঝতে পারছে না ওর মধ্যে কি হচ্ছে। এই একটা বিদেশী ছেলে... যাকে আগে কখনও দেখেনি যার সম্পর্কে ও কিচ্ছু জানেনা, ওর মুখে "ঋতু" ডাক শুনে কেন মন এমন করছে! এমন কোন অনুভূতি যে থাকে, থাকতে পারে সেটাই ওর ধারনায় ছিল না।
ওর মনে হচ্ছে রাজীব নামের ছেলেটা একবার ওর চোখের দিকে তাকালেই সব বুঝে যাবে। সে ভয়ে ও মুখ তুলেই তাকাতে পারছে না। হঠাৎ চোখে চোখ পড়লেই লজ্জ্বায় মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে ওর, সেই লজ্জ্বা ঢাকতে আবোল তাবোল বলতে হচ্ছে। ঋতুর মনেপ্রানে চাইছে ছেলেটা যেন হুট করে জানতে না চায় ও মেমোরিয়ালে কেন এসেছে! কেন জানেনা, কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তরটা ও সরাসরি রাজীবকে দিতে পারবে না।
নিজের উপর ঘেন্না হয় ওর, "এত খারাপ মেয়ে আমি!" নিজেকে নিজেই জিঞেস করে, "তুই না দীপকের সাথে দেখা করতে এসেছিস?" সেই প্রশ্ন নিজের মধ্যেই ঘুরপাক খেতে খেতে মারা যায়, ঋতু অবাক হয়ে দেখে ও প্রার্থনা করছে, "ভগবান, আজ যেন দীপক না আসে!"
***
৭ ফেব্রুয়ারী, ২০০৭
সময়: বিকাল ৪:০৫-৪:১৫
স্থান: ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল
মেমোরিয়ালে ট্যাক্সি থেকে নেমেই দৌড়ে একটা টিকেট নিয়ে নিল দীপক। সারাটা রাস্তা ঠিক করতে করতে এসেছে ঋতুকে কি বলা হবে। এত্তো বড় সাহস মেয়ের, ফোন বন্ধ করে দেয়!
তবে ঋতু এখনও পার্কে আছে নাকি সেটাই দেখার বিষয়, হয়তো বাড়ি চলে গেছে। সেক্ষেত্রে কাল সরাসরি প্রেসিডেন্সি যেতে হবে। আজ আর ওকে ফোন করা হবে না, ঋতু ফোন করলেও ধরবে না। কিছু কথা আছে যা সামনা সামনি বলতে হয়। ঋতু কাঁদবে - ও দেখবে, তবেই উপযুক্ত শাস্তি। পরে ঋতুর রাগটাও ওরই ভাঙাতে হবে, সে ঠিক আছে, কিন্তু ঋতুকে বোঝানো জরুরী যে কাজটা ও ঠিক করেনি।
পার্কে ঢুকেই জোর কদমে বাম দিকের সরোবরের দিকে ছুটলো ও। ঋতু সবসময় ওই দিকেই অপেক্ষা করে।
***
বেঞ্চে বসে দীপককে গেট দিয়ে ঢুকতে দেখে রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেল ঋতুর। এখন কী হবে! ও স্বস্তি নিয়ে দেখলো দীপক কোন দিকে না তাকিয়ে উদ্ধশ্বাসে সরোবরের দিকে ছুটলো।
এই কি শেষ? রাজীবের সাথে আর দেখা হবে না? বাংলাদেশে কবে ফেরত যাবে কিচ্ছু বলেনি ছেলেটা। এখন পর্যন্ত ওর সাথে যোগাযোগ রাখতে চাবার কোন তাগিদও দেখায় নি। ও কি নির্লজ্জ্বের মত নিজে থেকেই ওর ফোন নাম্বার দিয়ে দেবে? ঋতু বলল, "আমার যেতে হচ্ছে, আমার ফোন নাম্বারটা রাখুন..." লজ্জ্বা বলে আসলেই যদি কিছু থেকে থাকে, তবে এ মুহূর্তে তার বিন্দু মাত্র আর ওর মাঝে অবশিষ্ট নেই!
***
সরোবরের কাছে ঋতুকে পেল না দীপক। মেমোরিয়ালে এতবার আসা হয়েছে যে ও এক নজর দেখেই বলে দিতে পারে ঋতু আছে নাকি নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা গোল্ডফ্লেক ধরালো ও। মেয়েটার ভাগ্য ভালো, চরম একটা বকা থেকে বেঁচে গেল আজ।
ফেরার পথে বেঞ্চ গুলোর দিকে তাকিয়েই ঋতুকে দেখতে পেল ও। একটা লম্বা মত ছেলের সাথে বসে আছে। ওদের কলেজের কেউ? ভালই হয়েছে, মেয়েটার একা বসে থাকতে হয়নি, পরিচিত কাউকে পেয়ে গেছে। এখানেও ঋতুর ভাগ্য, অন্য কারো সামনে বকা-ঝকা করা যাবে না।
গম্ভীর মুখে ওদের দিকে হেঁটে যাবার সময় মুখ ফিরিয়েই ওকে দেখে ফেলল ঋতু। ওর দৃষ্টি দেখে হতভম্ব হয়ে গেল দীপক - এত দিনের পরিচয়ে ঋতুকে খোলা বইয়ের মত পড়ে ফেলতে পারে ও। মেয়েটা চমকে গেছে, ওর সারা চোখে মুখে ধরা পড়ে যাবার ভয়! বিস্ময় নিয়ে ছেলেটার দিকে আবার ভালো মত তাকালো ও। কাছে যাবার আগেই ঋতু সোজা হেঁটে এসে ওর হাত ধরে ফেলল... বলল, "এখানে আর এক মুহূর্ত নয়!"
মেয়েদের এই ক্ষমতাটা থাকে - ওরা যে কোন মুহূর্তে শেষ কথাটা বলে দিতে পারে - সেই কথার পরে ছেলেদের আর কিচ্ছু বলার থাকে না, মেনে নিতে হয়। দীপক বুঝলো বকা দেয়ার জন্য খুঁজে বের করা শক্ত কথা গুলো সব বিফলে গেল, আজ আর কিছু বলা হবে না। বাধ্য ছেলের মত গেটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ছেলেটার দিকে আবার তাকালো ও - অবাক কান্ড ছেলেটা ওর দিকেই তাকিয়ে অদ্ভুত ভাবে হাসছে!
***
মেয়েটা হঠাৎ এভাবেই ওকে ফোন নাম্বার দিয়ে দিল! কোলকাতার মেয়েরা কি এমনই সাবলিল? নাম্বারটা বুঝে ওঠার আগেই ঋতু উঠে দাঁড়ালো... হেঁটে গেল একটা ধাঁরালো চেহারার পেশল ছেলের দিকে। গিয়েই হাত ধরে বলল, "এখানে আর এক মুহূর্ত নয়!"
ঋতু ছেলেটার হাত ধরতেই একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো রাজীবের। ও এই অনুভূতির সাথে অচেনা বলেই বুঝতে পারলো না, কিন্তু আমরা জানি একে বলে "ঈর্ষা"! ঋতুকে বেরিয়ে যেতে দেখে ওর মনে হলো ঋতুর নাম্বারটা মনে রাখা জরুরী, খুবই জরুরী। অচেনা ছেলেটা ওর দিকে তাকিয়ে আছে দেখে রাজীবও তাকালো, কিন্তু ওর দৃষ্টি তখন সবকিছু দেখার ক্ষমতা হারিয়েছে - ওর মাথার ভেতর কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে - শেষ দু'টো নাম্বার কি বলল মেয়েটা? ৫৮? ৬৭? নাকি অন্য কিছু?
© অমিত আহমেদ
(চলবে)
গন্দম - পর্ব ১
গন্দম - পর্ব ২
গন্দম - পর্ব ৩
গন্দম - পর্ব ৪
বি.দ্র. এখান থেকেই কাহিনী অন্য দিকে মোড় নেবে। পরবর্তী পর্ব আসতে একটু দেরি হতে পারে, আমার প্রজেক্টের কাজটা এখনও শেষ হয়নি। যাঁরা আগ্রহ (ও অনাগ্রহ) নিয়ে আমার লেখা পড়ছেন তাঁদের কাছে এজন্য করজোরে ক্ষমা চাইছি।
ধন্যবাদ!
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মে, ২০০৭ সকাল ৮:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



