somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ : গ্যাম্বলারস আইটেমে লাভ বেশি!

২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০১০ সকাল ৭:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমার এক ছাত্র, নাম ফজলু। সে শেয়ারবাজারে নেমেছে মাত্র ১০ লাখ টাকা নিয়ে। বছর দুয়েকের মধ্যে এখন তার পুঁজি এক কোটি টাকা। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি এত তাড়াতাড়ি ধনী হলে কী করে? সে বলল, আমি আপনাদের কথিত মৌল ভিত্তির শেয়ারের ধারেকাছেও যেতাম না, দেখে দেখে শুধু নিম্নমূল্যের শেয়ার কিনেছিলাম। মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ওইসব শেয়ারের মূল্য দ্বিগুণ হয়ে গেছে, আর আমি এখন এ জন্যই লাভবান।

আসলে সব লোক যেখানে নজর দেয়, সেখানে অত সহজে কোনো লাভ করা যায় না। আমি অমনোযোগের শেয়ারে বিনিয়োগ করেছি এবং ভালো করেছি। ফজলুকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার তো ওই কথিত নিম্নমূল্যের শেয়ারগুলো রেগুলেটর এখন 'জেড' গ্রুপ থেকে তাড়িয়ে ওটিসি মার্কেটে পাঠিয়ে দিয়েছে, যেখানে কোনো বেচাকেনা নেই। সে বলল, ওটিসিতে যাওয়ার আগেই বের হয়ে এসেছে, মাত্র একটি শেয়ার ছাড়া; যেখানে তার বিনিয়োগ ছিল অতি সামান্য। আমি বললাম, তোমার এ চালাকির হেতু কী? সে বলল, আসলে লোকজন শেয়ারবাজারে যখন প্রথম আসে তখন বোকা থাকে। আর কম মূল্যের শেয়ারের পেছনে দৌড়ায়। আপনি কি লক্ষ করেননি তাদের একটি প্রশ্ন? সে প্রশ্ন হলো, এখন কম মূল্যে কোন শেয়ার পাওয়া যায়? আমি তাদের অজ্ঞতাকে আমার পক্ষে সফলভাবে ব্যবহার করেছি এবং জয়ী হয়েছি।

ফজলু আরো বলল, বাজারে মূল্যসূচক বেড়েছে গত দুই বছরে দ্বিগুণ, আর আমার মতো কারো কারো জেতার সূচক বেড়েছে চারগুণ। এখন আপনিই বলুন, আমি বাজারকে পরাজিত করতে পেরেছি কী না? আমি জানি, আপনি আমার যুক্তি গ্রহণ করবেন না। কিন্তু একটা কথা তো সত্য, সেটা হলো শেয়ারবাজারে তিনিই সফল, যিনি বাজারকে পেছনে ফেলে আসতে পারেন। আর আপনারা বই পড়তে পড়তে এমনভাবে নিজেদের মন-মেজাজকে গড়ে তুলেছেন, বইয়ের বাইরে কিছু চিন্তাই করতে পারেন না। সে জন্য আপনারা জেতেন পড়ে, আর আমি জিতেছি মধ্যমার অনেক ওপরে।

আমি ফজলুকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার সেই কম মূল্যের শেয়ারের দিন তো এখন শেষ, এখন তুমি কোন দিকে দৌড়াচ্ছ? সে বলল, কেন, আপনিই তো একটা লেকচারে বলেছিলেন, শেয়ারবাজারে বারবারই সুযোগ আসে। ব্যস, আমি ওইসব সুযোগের পেছনে দৌড়াচ্ছি। আমি বললাম, সেটা কেমন? সে বলল, এখন আমি গ্যাম্বলারদের, মানে জুয়াড়িদের সঙ্গে আছি। আগে চিহ্নিত করি ওই রাউন্ডে জুয়াড়িদের শেয়ার কোনটা হবে, সে হিসেবে আগেই কিনে রাখি। তারপর তারা যখন খেলতে শুরু করবে তখন হু হু করে দাম বাড়তে থাকবে, আমি তখন বিক্রি করে লাভবান হব। এভাবে আমার দিন ভালোই যাচ্ছে। ফজলু দুই বছরে যা শিখেছে, অনেকে ১০ বছরেও তা শিখতে পারেনি। এর কারণ তার মৌলিক লেখাপড়া আছে। আর শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে সে তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে ভালোভাবে কাজে লাগায়।

আমি ফজলুকে জিজ্ঞেস করি, তুমি জুয়াড়িদের আইটেমগুলো কিভাবে চিহ্নিত করো? সে বলল, কেন, জুয়াড়িরা কোনো কোনো শেয়ার কিনে এত ওপরে ওঠাবে যে আবার সে শেয়ারকে বেচতে বেচতে একেবারে ফেলে দেয়। লোভে অন্যরা ওই শেয়ারে প্রবেশ করলে তারাই বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়। আর মানবজীবনের প্রকৃতিই হলো, লোভ সংবরণ করতে না পারে। তারা দলে দলে সেই শেয়ারের পেছনে ছুটবেই। জুয়াড়িদের কাজ হলো মোমবাতিটা জ্বালিয়ে দেওয়া। তখন উইপোকা ওর আশপাশে চক্কর দেবেই। চক্কর দিলে কিন্তু সব উইপোকা মরে না। তবে মরে অনেক, আগুনের শিখা তাদের মেরে ফেলে। এ ক্ষেত্রেও অনেক কথিত সাধারণ বিনিয়োগকারী জুয়াড়িদের জ্বালিয়ে দেওয়া আগুনে পুড়ে মরে এবং তখনই গ্যাম্বলাররা শেয়ার বিক্রি করে সরে যেতে থাকে।

ফজলু এ-ও বলল, বিক্রির সময়ও জুয়াড়িরা শেয়ার কেনে, তবে বিক্রির থেকে কম। কারণ কেনার মাধ্যমে তারা বাজারকে ওপরে ধরে রাখতে চায়। মোট কথা, শেয়ারকে ওঠানোর কাজে এবং বিক্রি করে বের হওয়ার ক্ষেত্রে এরা কখনো এক মাস সময় নেয়, কখনো তারও বেশি। তবে এক সুযোগে এরা বের হতে না পারলে আবার শেয়ার ওঠানোর কাজে লেগে যায়। একদিন দেখা গেল, নতুন অনেক বিনিয়োগকারী এদের জালে ধরা দিয়েছে। তখন এরা লাভ করে সব শেয়ার বিক্রি করে বের হয়ে যায়। একবার জুয়াড়িরা বের হয়ে গেলে সেই শেয়ারের মূল্য অনেক দিন তলানিতে পড়ে থাকবে, কেউ ফিরেও তাকাবে না। তখন ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে কথিত সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ওই শেয়ার জলের মূল্যে বিক্রি করে দেবে। আর এদেরই লোকসান লাভ হিসেবে প্রবেশ করেছে জুয়াড়িদের পকেটে। এদের একজনের লোকসান হলো এক লাখ টাকা। কারণ এদের শেয়ার কেনার ক্ষমতাই কম ছিল। এরা হলো ক্ষুদে বিনিয়োগকারী, কিন্তু এদের তিন লাখ বিনিয়োগকারী যদি জুয়াড়িদের ফাঁদে পা দেয় তাহলে জুয়াড়িদের লাভ হলো কত! অনেক অনেক টাকা।

বছরে জুয়াড়িরা দুটি বা তিনটি খেলা খেলে। আর তাতেই তাদের কোটি কোটি টাকা আয় হয়। এই জুয়াড়িদের আবার ঋণ সুবিধা আছে। ব্যাংক ও লিজিং কম্পানিগুলো এদের বড় অঙ্কের ঋণ দিতে ভালোবাসে। কারণ এদের থেকে বড় অঙ্কের সুদ আয় হয়। ফজলু এ-ও বলল, গ্যাম্বলিং আইটেম চেনার অন্য উপায় হলো, ওগুলোর বাজারমূল্য যখন তুঙ্গে উঠবে তখন ওইসব শেয়ার টপ ১০-এ আসবে। কিন্তু হিসাব করলে দেখা যাবে, শেয়ারটি মৌল ভিত্তির দিক দিয়ে অনেক দুর্বল। টপ ১০-এ আসা মানে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হওয়া। কোটি কোটি টাকার লেনদেনের মধ্যে ইত্যবসরে ঢুকে পড়া কথিত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদেরও বড় অঙ্কের লেনদেন থাকে। অল্প ব্যবধানে জুয়াড়িরা যখন শেয়ার ছাড়তে থাকে তখন ক্ষুদ্ররা বুঝতেই পারে না জুয়াড়িরা বের হয়ে যাচ্ছে।

জুয়াড়িদের হাতে যেহেতু লাখ লাখ শেয়ার থাকে, তাই তাদের জন্য অল্প ব্যবধানেও অনেক লাভ হয়। আর ক্ষুদ্ররা বসে থাকে বড় ব্যবধানের জন্য, শেয়ারপ্রতি ১০০ টাকা লাভ করার জন্য। শেষ পর্যন্ত যে শেয়ারে তাদের গড়ে ২০ টাকা লাভ ছিল, সে শেয়ার তারা অনেক দিন ধরে রেখে বিক্রি করতে বাধ্য হয় প্রতি শেয়ারে ৫০ টাকা করে লোকসান দিয়ে। ফজলু এ-ও বলল, অতীতে জুয়াড়িরা জেড গ্রুপের শেয়ার নিয়ে খেলত। মাঝখানে মিউচুয়াল ফান্ড নিয়েও তারা খেলেছে। এই যে মিউচুয়াল ফান্ডের মূল্য NAV-এর চেয়ে চারগুণে বেচাকেনা হলো। ওটা ঘটেছে জুয়াড়িদের প্রবেশের কারণে। জেড গ্রুপ এবং মিউচুয়াল ফান্ডের মূল্য কম বলে মনে হবে। আর অধিকাংশ নতুন বিনিয়োগকারী এসব শেয়ারের ফান্ডের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। তারা সস্তায় কিনতে গিয়ে জুয়াড়িদের জালে ধরা পড়ে। আজকে যে মিউচুয়াল ফান্ডের মূল্য তলানিতে পেঁৗছে গেছে এর মুখ্য কারণ হলো, অনেক বিনিয়োগকারী মিউচুয়াল ফান্ডের মূল্য কত হওয়া উচিত তা বুঝে গেছে, অন্যদিকে জুয়াড়িরাও ফান্ড কেনা থেকে সরে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ঋণ বিক্রেতা ব্যাংক ও লিজিং কম্পানিগুলো এ ক্ষেত্রে ঋণ দেওয়ার বেলায়ও কড়াকড়ি আরোপ করেছে। জেড গ্রুপের অধিকাংশ শেয়ার এখন ওটিসি মার্কেটে, যেখানে কোনো বেচাকেনা হয় না। যাদের হাতে কাগুজে জেড গ্রুপের শেয়ার আছে, তারা সমূহ লোকসানের সম্মুখীন হয়েছে।

আমাদের শেয়ারবাজারে এখনো গুজব প্রকট। এ গুজব জুয়াড়িরা খুব ভালো করে ব্যবহার করে তাদের পক্ষে। অতীতে তারা রূপালী ব্যাংকের শেয়ার নিয়ে অমন জুয়াখেলায় মেতেছিল। সর্বসাধারণ বিনিয়োগকারীদের সাবধান করার জন্য ডিএসই কর্তৃপক্ষ ১৫ মিনিটের জন্য কয়েকটি প্রায় জেড গ্রুপের শেয়ারের লেনদেন বন্ধ করে দেয়। তাতেও তারা সরার কর্ণপাত করছে না। তবে এসব যুক্তিহীন দৌড় থেকে বিনিয়োগকারীদের রক্ষা করার আরেক উপায় হলো ওইসব অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিপ্রাপ্ত শেয়ারগুলোকে এক সপ্তাহের জন্য ট্রেডিং বন্ধ করে দেওয়া। তারপর কেউ মরতে চাইলে আর কী করা যাবে।

লেখক : ড. আবু আহমেদ, অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×