পিলখানার সেই নৃশংসতা এবং লামিয়াদের গল্প
মোস্তফা কামাল
বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার নিশ্চিত করে বর্তমান সরকার যেমন জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছে, তেমনিভাবে পিলখানার নারকীয় হত্যাযজ্ঞসহ সব হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। কারণ এর সঙ্গে পিতৃহারা লামিয়াদের দুঃখকষ্টই শুধু নয়, এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। তাছাড়া যে সময়টাকে ষড়যন্ত্রকারীরা বেছে নিয়েছিল সেটা যদি সফল হতো তাহলে সরকারের টিকে থাকাও কঠিন হতো। পিলখানার নৃশংসতার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাও এক সময় হুমকির মুখে দাঁড়াতে পারে। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। আর আইনকেও তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। আইনের শাসনের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই
ছোট্ট মেয়ে লামিয়া। বয়স আট বছর। বাসায় টেলিফোনের রিং বাজলেই সে দৌড়ে যায় টেলিফোন ধরতে। টেলিফোন ধরেই সে বলে, 'বাবা, তুমি কখন আসবে? তুমি আসছো না কেন? আমি তোমার অপেক্ষায় রাত জেগে আছি। তুমি না আসা পর্যন্ত আমি ঘুমাতে যাব না।'
বাবার টেলিফোনের প্রতীক্ষায় আছে লামিয়া। সে কল্পনায় তার বাবাকে দেখে। এই বুঝি তার বাবা তাকে টেলিফোন করে বলছেন, 'মামণি, আমি এখনই আসছি।' এই বুঝি তার বাবা বাসায় ফিরে লামিয়াকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করছেন। বাবার জন্য প্রতীক্ষা করতে করতেই লামিয়ার দিন কাটে।
কর্নেল গুলজার আহম্মেদের মেয়ে লামিয়া। গুলজার আহম্মেদ ছিলেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের অত্যন্ত দক্ষ সেনা অফিসার। কিন্তু ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি (২০০৯) বিডিআর সদর দপ্তরে এক মর্মান্তিক ও বর্বরোচিত ঘটনায় নিখোঁজ হন তিনি। সেই থেকে আজও লামিয়া বাবার প্রতীক্ষায় আছে। কিন্তু লামিয়ার প্রতীক্ষা শেষ হয় না। ইতিমধ্যেই একটা বছর কেটে গেছে। আজকের এই দিনে লামিয়ার কপালে চুমো দিয়ে অফিসে গিয়েছিলেন কর্নেল গুলজার। বাবার সেই আদর আজও তার কপালে লেগে আছে। প্রতি রাতে সে বাবাকে 'গুডনাইট' বলে ঘুমাতে যেত। বাবা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সে বাবাকে খোঁজে। ঘুমের ঘোরে সে বাবাকে দেখে। সে চোখে চোখে দেখে, তার বাবা বাসায় ফিরে এসেছেন। তাকে আদর দিচ্ছেন, ভালোবাসা দিচ্ছেন। চোখ খুলেই দেখে, বাবা নেই। আর অমনি হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে লামিয়া। দুই হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলে, মা, আমার বাবা কোথায়! বাবা এখনো কেন আসছে না! বাবা কখন আসবে! বাবার কখন কাজ শেষ হবে! বল না মা! বাবা কখন আসবে!
ছোট্ট শিশু লামিয়াকে কী বলে সান্ত্বনা দেবেন তার মা! মেয়েকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো ভাষা নেই তাঁর কাছে। তারপরও কিছু একটা বলে সান্ত্বনা দেয়া আর কী! তিনি বলেন, 'তোর বাবা আল্লাহর কাছে চলে গেছে মা!'
ছোট্ট মেয়ে লামিয়া আবারও জানতে চায়, 'আল্লাহ কোথায় থাকে মা?'
'আল্লাহ আসমানে থাকে।'
'আমাকে একটা উড়োজাহাজ কিনে দাও। আমি উড়োজাহাজে করে বাবার কাছে চলে যাই!'
আবারও মেয়েকে বুকের মধ্যে চেপে ধরেন মা জেসমিন আহম্মেদ। তিনি আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না।
লামিয়ার মতো আরো অনেক লামিয়া বাবার জন্য প্রতীক্ষায় আছে। কিন্তু সেই প্রতীক্ষা শেষ হয় না। শেষ হবেও না কোনোদিন...।
শোকাবহ সেই দিন...
২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯। সকালে প্রেসক্লাবের লাইব্রেরিতে পত্রিকা পড়ছিলাম। হঠাৎ একজন এসে খবর দিল, বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় ব্যাপক গোলাগুলি হচ্ছে। একের পর এক গুলির শব্দ আসছে। কী ঘটছে সেখানে! কেউ ভালো করে বলতে পারেন না। আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বিডিআরের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড ট্রেনিং) কর্নেল আনিসুজ্জামানকে মোবাইলে ফোন করলাম। পেশাগত কারণেই তিনি বিশেষভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। সেই ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরেই তাঁকে ফোন করি। তখন বেলা ১১টা। কয়েকবার রিং বাজার পর তিনি ফোন ধরে শুধু বললেন, 'আমরা ভালো আছি। আপাতত কোনো অসুবিধা নেই। কিছুক্ষণ পর আবার কথা হবে।'
সেই যে ফোন রাখলেন তারপর আর তাঁকে পাওয়া গেল না। পুরো বিষয়টা জানতেও পারলাম না। উদ্বেগ আরো বাড়ল। তাহলে কী তাঁদের কোনো সমস্যা হয়েছে! নানা ভাবনা মনের মধ্যে ঘুরপাক খায়। আমি এবার বিডিআর মহাপরিচালক শাকিল আহমেদকে ফোন করলাম। তাঁর সঙ্গে ওই ঘটনার কিছুদিন আগে একটা বিশেষ অনুষ্ঠানে দেখা। তিনি তাঁর স্ত্রীর সঙ্গেও তখন পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর অফিসেও যেতে বললেন। কিন্তু তাঁর মোবাইল ফোনটি বন্ধ পেলাম। হতাশা নিয়েই মেয়ের স্কুলের দিকে রওনা হলাম। সানিডেল স্কুলটির একটি শাখা আবাহনী মাঠের উল্টো দিকে। প্রেসক্লাব থেকে যেতে হলে বিডিআর গেট পার হয়ে যেতে হবে। এখন উপায় কী!
নিজেই গাড়ি নিয়ে বের হলাম। গাড়ি সায়েন্স ল্যাবরেটরি পর্যন্ত যাওয়ার পর গুলির শব্দ কানে আসতে থাকল। মোড়ে আসার পর সেনাবাহিনীর দুই-একটা গাড়ি দেখতে পেলাম। এদিকে থেমে থেমে গুলির শব্দ কানে আসছিল। আতঙ্ক নিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করছিলাম। সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, সিটি কলেজের সামনের রাস্তাটি বন্ধ। খোলা আছে মিরপুর রোড। আতঙ্কিত মানুষরা এই রোডটিকেই বেছে নিয়েছেন। মাঝে মধ্যে গুলির শব্দ এত বেশি কানে আসছিল যে, এই বুঝি গাড়ির ছাদটা উড়ে গেল। এ রকম একটা কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। সবাই আতঙ্কে একেবারে ফেটে পড়ছিল। আমিও সেই আতঙ্ক থেকে মুক্ত নই। ওই পরিস্থিতিতে গাড়ি ড্রাইভ করা তো দূরের কথা, মাথা ঠিক রাখাই কঠিন। তারপরও গাড়ি চালিয়ে মেয়ের স্কুল পর্যন্ত গেলাম। সেখানে যখন পেঁৗছলাম তখন অল্প কয়েক ছাত্র-ছাত্রী স্কুলে অপেক্ষা করছিল।
মেয়েকে নিয়ে অনেকটা পথ ঘুরে আজিমপুরের বাসায় পেঁৗছলাম। তখন বিকেল। আজিমপুরে আসার পরও গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। এদিকে এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার জন্য মাইকিং করার কিছুক্ষণ পরই শত শত মানুষ এলাকা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছিলেন। আমাদেরও বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়েছিল। রাতেই বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে বিডিআরের ঘটনার খবর আসছিল। তাতে বার বারই বলা হচ্ছিল, বিডিআর সদর দপ্তরে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছে। 'ডালভাত' কর্মসূচি বাস্তবায়নের নামে দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। আর তাতে জওয়ানদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে বিদ্রোহ। কোনো কোনো জওয়ান মুখে কালো কাপড় বেঁধে টিভি সাংবাদিকদের কাছে দুর্নীতির ফিরিস্তি দিচ্ছিলেন। আর বলছিলেন, 'বিডিআর মহাপরিচালককে আটকে রাখা হয়েছে। তিনি নিরাপদ আছেন।'
আমার কাছে বিষয়টা বিস্ময়কর লাগছিল। কারণ একটা সুশৃঙ্খল বাহিনীতে এত বড় উচ্ছৃঙ্খল ঘটনা ঘটতে পারে, ভাবতেই পারিনি। যা হোক আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা, আসল ঘটনাটা জানতে হবে। এত গোলাগুলি হলো তারপরও সবাই নিরাপদে আছেন_এটা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কর্নেল আনিসুজ্জামানকে আবারও ফোনে চেষ্টা করলাম। কিন্তু তাঁকে পাওয়া গেল না। পরে আমার পরিচিত আরেক সেনা অফিসার মেজর শাহনেওয়াজকে ধরার চেষ্টা করলাম। তাঁকেও পেলাম না।
মেজর শাহনেওয়াজ সম্পর্কে কিছু কথা বলে নিতে চাই। তিনি এক সময় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্রাটেজিক স্টাডিজে (বিস) ছিলেন। সেখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়। তিনি অত্যন্ত হাসিখুশি মানুষ ছিলেন। দ্রুত মানুষের সঙ্গে মিশতে পারতেন। তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয় ২০০৫ সালে। আমরা একসঙ্গে পাকিস্তান সফরে গিয়েছিলাম। পনের দিনের সেই সফরটি আমাদের খুবই আনন্দদায়ক ছিল। তারপর অনেক দিন তিনি বিদেশে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে ছিলেন। তিনি দেশে ফেরার পর বিডিআরে যোগ দেন। আকস্মিকভাবেই তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি আমাকে দেখে বুকে টেনে নিয়ে উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে বলেছিলেন, 'ভাই, আপনার কথা খুব মনে হয়। আমি বিডিআরে যোগ দিয়েছি। একদিন আমার অফিসে আসেন।'
বিডিআরের নৃশংস ঘটনার মাত্র কয়েকদিন আগে আমি মেজর শাহনেওয়াজের অফিসে গিয়েছিলাম। কিন্তু শাকিল আহমেদ ও আনিসুজ্জামানের অফিসে যাওয়া হয়নি। যা হোক, তাঁরা যেহেতু আমার ভালো পরিচিত তাই তাঁদের কাছ থেকেই ঘটনাটা জানার চেষ্টা করছিলাম। পরে টিভির খবরে জানতে পারলাম শাকিল আহমেদ, কর্নেল আনিসুজ্জামান এবং মেজর শাহনেওয়াজ আর বেঁচে নেই। তখন সত্যিই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে দর দর করে পানি পড়ছিল।
এখনো তাঁদের সেই সুন্দর হাসিমাখা মুখখানা আমার চোখের সামনে ভাসে। তাঁরা বেঁচে নেই! এটা বিশ্বাস করতে এখনো আমার খুব কষ্ট হয়।
নারকীয় সেই ঘটনায় আমরা ৫৭ জন সেনা অফিসারকে হারিয়েছি। বিডিআর মহাপরিচালক শাকিল আহমেদের স্ত্রীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। সেদিন কোনো কোনো সেনা অফিসার জওয়ানদের কাছে হাতজোড় করে প্রাণভিক্ষা চাইলেও রেহাই পাননি। অনেককে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়েছে। তারপর টুকরো টুকরো করে ফেলে দেওয়া হয় ম্যানহোলে। অসহায় নারীদের সম্ভ্রমহানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ আছে। কী অপরাধ ছিল তাঁদের!
দোষীদের সুষ্ঠু বিচার চাই
পিলখানায় যে নারকীয় ঘটনা ঘটানো হয়েছিল তার কোনো ক্ষমা নেই, ক্ষমা করা যায় না। সত্যিকারের দোষীরা যদি পার পেয়ে যায়, কিংবা বিনা দোষে যদি কাউকে সাজা ভোগ করতে হয় তাহলে রাষ্ট্র দায়ী থাকবে। আর জাতির কাছে কলঙ্কের বোঝা হয়ে থাকবে পিলখানার সেই নৃশংসতার ঘটনাটি। আমরা সেই কলঙ্কের বোঝা বইব না। আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীর সুষ্ঠু বিচার। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেন প্রকৃত অপরাধীর সুষ্ঠু বিচার হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার বারই বলে এসেছেন, তিনি বিডিআর ঘটনার উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করবেন। শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন শেখ রেহানাও মা-বাবা, ভাইবোন সবাইকে হারিয়েছেন। সেই পনের আগস্টের রাতেও ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল নরপশুরা। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার নিশ্চিত করে বর্তমান সরকার যেমন জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছে, তেমনিভাবে পিলখানার নারকীয় হত্যাযজ্ঞসহ সব হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। কারণ এর সঙ্গে পিতৃহারা লামিয়াদের দুঃখকষ্টই শুধু নয়, এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। তাছাড়া যে সময়টাকে ষড়যন্ত্রকারীরা বেছে নিয়েছিল সেটা যদি সফল হতো তাহলে সরকারের টিকে থাকাও কঠিন হতো। পিলখানার নৃশংসতার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাও এক সময় হুমকির মুখে দাঁড়াতে পারে। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। আর আইনকেও তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। আইনের শাসনের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
[email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

