তারিখ একই। ৬ মে ২০১০। পত্রিকা দুটি। কালের কণ্ঠ ও প্রথম আলো। একই বিষয়ে দুটি পত্রিকায় দুটি লেখা পড়লাম। কালের কণ্ঠে বিশেষ মন্তব্য হিসেবে প্রথম পৃষ্ঠায় বক্স করে ছাপা হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের লেখা 'বহুত দিন হোয়ে' এবং প্রথম আলোর বৃহস্পতিবারের ক্রোড়পত্রে মশিউল আলমের 'সাংস্কৃতিক পণ্য_ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি নিষেধাজ্ঞা' শিরোনামে। দুটি লেখার প্রতিপাদ্য বিষয় একই : ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানির সূচনা হতে হতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তা থেমে যাওয়ায় মর্মান্তিক আহাজারি। এবার বর্তমান প্রেক্ষাপটে আসা যাক। এই কিছুদিন আগ পর্যন্ত বাংলাদেশি ছায়াছবিতে অশ্লীলতার জোয়ার বয়ে যাচ্ছিল। যেনতেনভাবে কিছু শুটিং করে রিলের পর রিল ভরে তার সঙ্গে লাগিয়ে দেওয়া হতো নীল ছবির বিকৃত যৌনমিলনের খণ্ড খণ্ড দৃশ্য। এসব তৈরির জন্য কোনো মেধাবী পরিচালকের কিংবা কুশলী নির্মাতার প্রয়োজন হতো না, প্রয়োজন হতো না কোনো সু-অভিনেতা-অভিনেত্রীর। ফলে খরচ ছিল অনেক কম। কম টাকায় এসব ছবি নিয়ে হল মালিকরা চুটিয়ে ব্যবসা করতেন। অনেক সময় তাঁরা নিজেরাই ব্লুফিল্মের রগরগে দৃশ্যের কাটপিস রাখতেন। যে ছবিই চালাতেন, তার সঙ্গে লাগিয়ে দিতেন ওইসব কাটপিস। সৎ চলচ্চিত্র নির্মাতারা অনেক প্রতিবাদ, আন্দোলন, সংগ্রাম করে অশুভ চক্রের ওই চক্রান্ত রোধ করতে পারছিলেন না। তখন কিন্তু বর্তমান দুই লেখকের কেউ এর বিরুদ্ধে কলম ধরেননি। তাঁরা চলচ্চিত্রশিল্প নিয়ে কলম ধরলেন কখন? যখন বর্তমান সরকার শক্ত হাতে অশ্লীল ছবি নির্মাণ বন্ধ করল, ভিডিও পাইরেসি রোধ করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিল, যখন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ভালো ছবি নির্মাণের জন্য অনুদানের অর্থ বাড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিলেন, পুরস্কারের অর্থ মূল্য বাড়িয়ে দিলেন এবং উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বললেন, আপনারা জাতিকে ভালো ছবি উপহার দিন, আমি আপনাদের জন্য সব কিছু করব। সে আহ্বান শোনে চলচ্চিত্র মহলে সুস্থ বিনোদনের ছবি, শিল্পমানের ছবি বানানোর উৎসাহ সঞ্চারিত হলো তখন। একই দিনে দুটি বহুল প্রচারিত পত্রিকায় একই বিষয়ে এই দুই লেখাকে কাকতালীয় বলে ভাববার কোনো কারণ নেই। দুটি লেখাই এ দেশের চলচ্চিত্রবিরোধী চক্রের দ্বারা বিশেষ মূল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা, এমনটি বিশ্বাস করা যুক্তিবহির্ভূত নয়। মশিউল আলম সম্পর্কে আমার কিছু বলার নেই, কারণ তিনি চলচ্চিত্রের মানুষ নন। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ তো চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সদস্য এবং নিজেও বেশ কয়েকটি ছবি বানিয়েছেন। সেগুলো কৌতুক-নাটকজাতীয় হলেও যেহেতু সিনেমা হলে চালানো হয়েছে এবং ছবিগুলো স্থিরচিত্র নয়, তাই তাকে চলচ্চিত্র বলেই ভেবে নিতে হবে। বাণিজ্যিক ছবির মতো ৫০ থেকে ৬০টি প্রিন্ট তিনি করেন না। অল্প টাকার ছবি, পাঁচ-সাতটি প্রিন্ট করে কয়েকটি হলে চালিয়ে টাকা তুলে নেন। তাঁর বাণিজ্যবুদ্ধিও অত্যন্ত প্রখর। প্রয়োজন হলে ছবি বানানো ছেড়ে দিয়ে হয়তো ভারতীয় ছবির পরিবেশক হয়ে যাবেন। তাঁর প্রটেকশনের কী প্রয়োজন? কিন্তু বাংলাদেশি ছায়াছবির জন্য প্রটেকশনের প্রয়োজন আছে। এই বাস্তবতা অনুভব করেছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু প্রটেকশনের ব্যবস্থা করেছিলেন।
তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সুদূরপ্রসারী প্রেক্ষাপটকে কোনো রম্য লেখকের পক্ষে অনুধাবন করতে না পারাই স্বাভাবিক। তিনি লিখেছেন, ১৯৬৫ সালের আগ পর্যন্ত ভারতীয় ও পাকিস্তানি ছবির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ঢাকায় নির্মিত ছবি চলত। '৬৫-পূর্ব সময়ে তাঁর বয়স কত ছিল? তিনি কি জানেন, তখন প্রতিবছর এফডিসিতে কয়টি ছবি তৈরি হতো? দুই-তিন বা চারটির বেশি নয়। এ দেশের বাঙালি শিল্পী-কলাকুশলীর ছবি বলে মানুষ কৌতূহলবশে, আবার উৎসাহ দেওয়ার জন্য হলেও ছবিগুলো দেখতে যেতেন। তবে কোনো ছবিই রমরমা ব্যবসা করত না। ঢাকার চলচ্চিত্র তখনো ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে গড়ে ওঠেনি। ভারতীয় চলচ্চিত্র বন্ধ হওয়ার পরই মূলত চলচ্চিত্রাঙ্গন ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। এই সত্য উপলব্ধি করতে বঙ্গবন্ধুর একটুও দেরি হয়নি। তাই স্বাধীনতার পর তাঁর দেশপ্রেমই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে দেশীয় চলচ্চিত্রের সংরক্ষণে আইন প্রণয়ন করতে। তিনি দেখেছেন_জহির রায়হান, কাজী জহির, খান আতাউর রহমান, এহ্তেশামুর রহমান, মুস্তাফিজ, নারায়ণ ঘোষ, মিতা, কামাল আহমেদ প্রমুখের উত্থান ঘটেছে ভারতীয় ছবি বন্ধ হওয়ার পর। হুমায়ূন আহমেদ মানুষের হলবিমুখতার কথা বলেছেন। শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা সত্যিই সিনেমাবিমুখ হয়েছেন। তবে তা ছবির নিম্ন মানের জন্য নয়, অর্থনৈতিক কারণে। আগে নির্ধারিত আয়ের চাকরিজীবী প্রতি মাসে অন্তত একবার সপরিবারে ছবি দেখতে যেতেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থায় যখন দ্রব্যমূল্য হু হু করে বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়ে যেতে থাকল, তখন কোনো মধ্যবিত্তের পক্ষেই আর প্রতি মাসে কেন, বছরে এক দিনও সপরিবারে সিনেমা হলমুখী হওয়া সম্ভব ছিল না। সেই সময়ে রিকশাচালকসহ দৈনিক রোজগেরে মানুষই বিনোদনের আশায় সিনেমা হলে যেতেন প্রায় প্রতিদিন। সেই বিনোদন দেওয়ার লক্ষ্যে সিনেমার রূপ বদলে যেতে থাকে। দর্শক-রুচি উন্নত করার চেষ্টাও যে কোনো কোনো নির্মাতা করেননি, তাও কিন্তু নয়। এসব বাস্তবতার গভীরে দৃষ্টি না দিয়ে চলচ্চিত্রকে ঢালাও দোষারোপ করার প্রবণতা সন্দেহাতীতভাবেই বিশেষ উদ্দেশ্যে। সেই উদ্দেশ্য থেকেই তিনি ঢাকার সিনেমাকে 'রসগোল্লা' বলেছেন। হুমায়ূন আহমেদ, রসগোল্লার ছানায় ভেজাল থাকলেও সেটা খাওয়া যায়; কিন্তু তার ওপর তেলাপোকা বা টিকটিকি পড়লে তা আর খাওয়ার যোগ্যই থাকে না। নাটক-মার্কা সিনেমার মতো অখাদ্য হয়ে যায়। 'বহুত দিন হোয়ে'_যদিও এর উচ্চারণ হবে 'বহুত দিন হুয়ে'; লেখাটার মধ্যে সার্ভাইভাল অব দ্য ফিটেস্টের থিওরি কপচানো হয়েছে। ফিটেস্টদের উৎপাত আমরা বিশ্বজুড়ে দেখেছি_ভিয়েতনাম, চিলি, কোরিয়া, ফিলিস্তিন, ইরাক ও আফগানিস্তানে দেখেই চলেছি। ভারতীয় ছবি আমদানি ফিটেস্টের ব্যাপার নয়, আগ্রাসনের ব্যাপার। ভারত একটি বিশাল দেশ। সেখানে ছবির বাজারও বিশাল। তাই তারা ১০০, ২০০, ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একেকটা ছবি নির্মাণ করতে পারে। বাংলাদেশে ছবির বাজেট এক কোটিতে উঠলেই প্রযোজকের নাভিশ্বাস উঠে যায়। তার পরও বোম্বাইয়া ছবি আর ঢাকার ছবির মধ্যে গুণগত পার্থক্য তেমন কিছু নেই। পার্থক্য ওই টাকার অঙ্কে।
বিশাল ব্যয়ে যে চাকচিক্য এবং প্রযুক্তিগত চমক সৃষ্টি করা যায়, তার সঙ্গে স্বল্পব্যয়ে নির্মিত ছবির প্রতিযোগিতা আমেরিকার ইরাক দখলের মতোই। এ দেশটি ছোট। এর বাজারও ছোট। শত কোটি টাকা দিয়ে ছবি বানালে শতবর্ষেও তা ঘরে আনা যাবে না। প্রসঙ্গত আরেকটি কথায় আসা যায়, আমার বাড়ি যশোর হওয়ায় সীমান্তবর্তী এলাকার কিছু খবর আমি রাখি।
সীমান্তের ওপাশ ঘেঁষা ভারতীয়রা টেলিভিশনে বাংলা অনুষ্ঠান দেখতে হলে এ দেশের টিভি চ্যানেলই দেখেন। যথেষ্ট জনপ্রিয়তা আছে এ দেশের টিভি চ্যানেলের। কিন্তু পারবেন কী পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে বাধ্য করতে, যাতে তারা এ দেশি টিভি চ্যানেলগুলোকে তাদের দেশে চলার অনুমতি দেয়? পারবেন না। কারণ তারা তাদের বাংলা চ্যানেলগুলোকে 'প্রটেকশন' দেয়। এটা তাদের দেশপ্রেমেরই প্রকাশ। এ দেশপ্রেম থেকেই বঙ্গবন্ধু ভারতীয় ছবি আমদানি নিষিদ্ধ করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তাই করেছেন। আপনারা কোন প্রেম থেকে হা-হুতাশ করছেন, তা অনুমান করতে পারি। এমনিতেই হিন্দি চ্যানেলগুলোর উৎপাতে এ দেশের একটি শ্রেণী উচ্ছন্নে যাচ্ছে_তার সঙ্গে হিন্দি সিনেমার আমদানি ঘটানো হলে ষোলোকলা পূর্ণ হবে। ভালো প্রতিদান দেওয়া হবে ভাষাশহীদদের রক্তের!
হুমায়ূন আহমেদ, আপনার 'মহানগর' দেখতে না পারার আফসোসের একটি সান্ত্বনা দিয়েই শেষ করব। একটি ছবি, এক দিনের জন্য একটি সিনেমা হলে চললে ওই রকমই ভিড় হয়। এই সত্যজিৎ রায়েরই আরো ভালো ছবি 'অপুর সংসার' '৬৫-পরবর্তী সময়ে এ দেশে মুক্তি পেয়েছিল। তিন দিন পর দর্শকের অভাবে ছবিটি হল থেকে নামিয়ে দিতে হয়। শুধু ঢাকায় নয়, এ দেশের সব জেলা শহরেও। আপনি পেশায় একজন অধ্যাপক। জ্ঞানী ব্যক্তি। আসুন, পরামর্শ দিন, কী করলে 'রসগোল্লা'কে রাজভোগ বানানো যায়। তাতেই আপনার দেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যাবে।
সুত্রঃ দৈনিক কালের কন্ঠ
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুন, ২০১০ বিকাল ৩:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



