জীবনাচরণ ও মানবতাবাদী দর্শনের জন্য জিসি দেব হাজার বছর বেঁচে থাকবেন
বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার মধ্যাদিয়ে বিয়ানীবাজারের লাউতায় জন্ম গ্রহণকারী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবতাবাদী দার্শনিক, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. জিসি দেব নামে খ্যাত গোবিন্দচন্দ্র দেবের জন্মশতবার্ষিকী উৎসব জাতীয়ভাবে উদযাপিত হলো গত ৪ জুলাই শুক্রবার। এই মহামনিষীর জন্মশতবার্ষিকী উৎসবকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বসেছিল দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, কবি-সাহিত্যিক, দার্শনিক ও মনীষীদের মিলনমেলা। কিংবদন্তীতুল্য শিক্ষক ড. দেবের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এ অনুষ্ঠানে যেমন এসেছিলেন বয়োবৃদ্ধ দার্শনিকব্যক্তিত্ব দরদার ফজলুল করিম, তেমনি সারা দেশ থেকে এসেছিলেন দর্শনের সাবেক শিক্ষার্থী ও দর্শন অনুরাগীরা। ড. দেবের গুণমুগ্ধ অনুরাগীদের স্বতস্ফূর্ত উপস্খিতিতে বিশাল মিলনায়তন ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। সবার আলোচনা ও স্মৃতিচারণে উঠে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা এ শিক্ষকের মানবতাবাদী সমন্বয়ী দর্শন, অসাম্প্রদায়িক সহজ সরল ব্যক্তিগত জীবনাচরণ। বক্তারা বলেন, জন্মের শত বছর পরও যিনি আমাদের জন্য অনুকরণীয় ও অনুরসরণীয় তিনি আরো হাজার বছর বেঁচে থাকবেন। ক্লান্তিকালে ড. জিসি দেবের জীবন ও দর্শনের শিক্ষা মানব জাতিকে সুপথ দেখাতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দর্শন বিভাগ এলামনাই এসোসিয়েশনের ব্যবস্থাপনায় ড. জিসি দেবের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটি এই উৎসবের আয়োজন করেছিল। এ বছর সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ‘স্বাধীনতা পদক’-এ ড. দেবকে (মরণোত্তর) ভূষিত করায় তাঁর জন্মশতবার্ষিকী ভিন্ন ব্যঞ্জনায় আনন্দঘন আমেজে উদ্যাপিত হলো।
জাতীয় কমিটির আহবায়ক বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি আধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সভাপতিত্বে সকালে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. আফম ইউসুফ হায়দার। প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। দেব জন্মশতবার্ষিকীবক্তৃতা প্রদান করেন ড. দেরেব ছাত্র ও দর্শনের জনপ্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম। ড. দেবের জীবন ও কর্মের ওপর আলোচনায় অংশ নেন, খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম, প্রফেসর এমেরিটাস ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, প্রফেসর এমেরিটাস আনিসুজ্জামান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকুসদ, অধ্যাপক ড. নীরু কুমার চাকমা, অধ্যাপক ড. হাসনা বেগম, জিসি দেবের দত্তকপূত্র ড. জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত প্রমুখ। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন দর্শন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আজিজুন্নাহার ইসলাম।
অনূষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ছিল স্মৃতিচারণ। এ পর্বের সভাপতিত্ব করেন সাহিত্যিক শিক্ষাবিদ সাহিত্যিক অধ্যাপক মোস্তফা নূরউল ইসলাম। স্মৃতিচারণ করেন ড. দেবের দত্তক কন্যা রোকেয়া সুলতানা মিনা, কোলকাতা থেকে আসা ড. দেবের ভাগ্নী উমা সেন ও মীরা সেন, ড. দেবের ছাত্র অধ্যাপক কাজী নুরুল ইসলাম, কুমিল্লা থেকে আসা অধ্যাপক কুদরত ই খোদা, হোসনে আরা লীনি, ড. রওশন আরা, নারায়নগ্ঞ্জ থেকে আসা আহসানুল করীম চৌধুরী বাবুল, বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শামসুর রহমান, এম এ জহির সরকার, সিলেট থেকে আসা অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার সাহা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশনের সম্পাদক রকিবউদ্দিন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে খ্যাতিমান শিল্পী আবদুল মান্নানের আঁকা ড. দেবের প্রতিকৃতি উম্মোচন করেন প্রধান অতিথি কবীর চৌধুরী। প্রতিকৃতিতে আয়োজক ও অতিথিদের শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের মাধ্যমে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এ সময় এক দল শিল্পী সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে’ গানটি।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় কবীর চৌধুরী বলেন, ড. দেব ছিলেন উদার। তাঁর আচরণ ছিল শিশুসুলভ। কিন্তু তার জ্ঞান শিশুসুলভ ছিল না। তিনি ছিলেন শতভাগ অসাম্প্রদায়িক। তাঁর জীবন-দর্শন ছিল উদারপ্রকৃতির। সরদার ফজলুল করিম ড. দেবকে এ যুগের সক্রেটিস হিসাবে আখ্যায়িত করেন এমন মানুষ আমরা আর পাব না।
ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক আফম ইউসুফ হায়দার বলেন, ড. দেব একদিকে দার্শনিক ছিলেন, অন্যদিকে বিজ্ঞানমনষ্ক বাস্তববাদীতা ছিল তার জ্ঞানসাধনার মূলউপজীব্য। প্রাচ্য-প্রতীচ্যের জ্ঞানভান্ডার আয়ত্ব করে তা তিনি এদেশের মানবকল্যাণে ব্যবহারের উপযোগী করে সমন্বয়ী ভাববাদের জন্ম দেন। ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ড. দেবকে বাদ দিয়ে আমরা এই বিশ্ববিদ্যালয় ভাবতে পারি না। তার জীবনটাই তাঁর বাণী। তিনি এই দেশ-জাতিকে উর্বর করতে চেয়েছিলেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, তিনি যে মানবতার শিক্ষা দিয়ে গেছেন, তার অনুসরণের মাধ্যমেই তার প্রতি সত্যিকার শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে শিক্ষা দিনে দিনে বাজারি শিক্ষা হয়ে যাচ্ছে। যেখানে হাত দেই, সেখানেই আতঙ্কিত হতে হয়। ড. দেবের সারাজীবনের শিক্ষা ছিল কিভাবে মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড়ানো যায়। সৈয়দ আবুল মকুসদ বলেন, একটি স্যকুলার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ড. দেবের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশী ছিল। এটা বুঝতে পেরেই পাকিস্তানিরা প্রথম সুযোগেই তাকে হত্যা করেছে। আমার জীবনে যত খাটি মানুষ দেখেছি তার মধ্যে সবার শীর্ষে ড. জিসি দেব। অধ্যাপক ড. নীরু কুমার চাকমা ড. দেবের শিক্ষা দর্শন জাতিগঠনে সূদূরপ্রসারী অবদান রাখছে। জিসি দেবের দত্তকপূত্র ড. জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত বলেন, আমার যা কিছু অর্জন তা তার জন্যই হয়েছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাদের দু’ভাইবোনকে সম্পত্তি ও অর্থ দিয়ে গেছেন। ড. দেবের তাকে দান করে যাওয়া ধানমন্ডির বাড়িটি তিনি দেব ফাউণ্ডেশনের নামে দান করার ইচ্ছার কথা জানিয়ে তা উদ্ধারের জন্য দাবি জানান। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করবে বলে তিনি প্রত্যাশা করে বলেন, সরকারের এব্যাপারে ভূমিকা রাখার প্রয়োজন রয়েছে। দর্শন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আজিজুন্নাহার ইসলাম বলেন, ড. জিসি দেব শুধু দর্শন বিভাগের বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরব নন, তিনি সমগ্র জাতির গৌরব এবং জাতীয় অমূল্য সম্পদ।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, আমাদের অসংখ্য কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক প্রতিভা আছে কিন্তু দার্শনিক বিরল। এ ক্ষেত্রে আমরা ড. জিসি দেবের নামটিই উচ্চারণ করতে পারি।
অনুষ্ঠানটি শেষ হয় একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে। বিভাগের সাবেক ছাত্রী শাকিলা জাফর, সালমা আনজুম লতা প্রমুখ গান পরিবেশন করেন। এছাড়া বিভাগের বর্তমান ছাত্রছাত্রীরা নৃত্যও পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানে ড. প্রদীপ কুমার রায়ের সম্পাদনায় ড. দেবের জীবন ও কর্মের ওপর ভিত্তি করে একটি দৃষ্টিনন্দন স্যুভেনির প্রকাশিত হয়।
(জাতীয় পর্যায়ে ড. জিসি দেবের জন্মশতবার্ষিকী জাতীয় উদযাপন কমিটির মিডিয়া কমিটির সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলাম। তাই সবার সাথে শেয়ার করলাম। )

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

