যুগান্তর রিপোর্ট
বিডিআর সদর দফতর পিলখানায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞে অংশগ্রহণকারী ১২ বিডিআর সদস্যকে শনাক্ত করেছে র্যাপিড একশন ব্যাটালিয়ন-র্যাব। ‘অপারেশন রিবেল হান্ট’ এর আওতায় গ্রেফতার হওয়া ২ শতাধিক বিডিআর সদস্যের মধ্য থেকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করা হয়। র্যাবের পক্ষ থেকে এসব সদস্যকে বুধবার দুপুরে র্যাব সদর দফতরে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়। এরা হচ্ছে- ২৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সুবেদার গোফরান মল্লিক, ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের হাবিলদার রেজাউল করিম, ১৩ রাইফেল ব্যাটালিয়নের ল্যান্স নায়েক মোহাম্মদ গাউসুল আজম, ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের ল্যান্স নায়েক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী, ১০ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহি জয়ন্ত কুমার সরকার, ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহি জমির আলী, ৩৭ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহি আবদুল লতিফ, ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহি সোহরাব হোসেন, ৩৯ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহি সোহরাব হোসেন, ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহি শরিফুল ইসলাম, ৩৬ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহি রফিকুল ইসলাম ও ১৩ রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহি মাসুদুর রহমান।
এদিকে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ৪৮নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী তোরাব আলীকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। বুধবার তোরাব আলীকে হাজারীবাগ থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, র্যাব সদস্যরা তোরাব আলীকে হাজারীবাগ এলাকা থেকে আটক করে। গতকাল বিকালে তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। ওই এলাকার প্রভাবশালী লেদার লিটনের পিতা তোরাব আলী। লিটন একাধিক মামলায় দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে ছিল। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, তোরাব আলী বিডিআরের অবসরপ্রাপ্ত সুবেদার। এছাড়াও তিনি বিডিআর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি। তার বাসা বিডিআর ৫ নম্বর গেটের সামনে। তোরাব আলীর জামাতা রেজাউল করিম রাজু দীর্ঘদিন ধরে বিডিআর সদর দফতর পিলখানায় ঠিকাদারি করেন। পারিবারিকভাবে বিডিআরের সঙ্গে তোরাব আলীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক জানান, র্যাব সদস্যরা বুধবার বিকালে তোরাব আলীকে থানায় সোপর্দ করেছে। বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। পিলখানার ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গতকাল ব্রিফিংকালে র্যাব মহাপরিচালক হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত নারকীয় হত্যাকাণ্ডে এবং অন্যান্য জঘন্য অপরাধে প্রাথমিক তদন্তে ১২ জন বিডিআর সদস্যের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানায় হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং নারী নির্যাতনসহ অন্তত ২০টি ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। র্যাব, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা মূলত সিআইডিকে সহযোগিতা করছে। এরই অংশ হিসেবে অপারেশন রিবেল হান্টে যেসব বিডিআর সদস্য গ্রেফতার হয় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কোন না কোন অপরাধের সঙ্গে এ ১২ জন বিডিআরের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য লালবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
অপরদিকে এর আগে রিমান্ডে নেয়া ডিএডি তৌহিদসহ ৬ জনকে বুধবার আরও ৩ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। তাছাড়া সিআইডি কর্তৃপক্ষ আরও ৫২ জন বিডিআর সদস্যকে লালবাগ থানার মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছে। এ নিয়ে এ ঘটনায় মোট ২২১ জনকে গ্রেফতার দেখানো হল।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির সিনিয়র এএসপি আবদুল কাহ্হার আকন্দ যুগান্তরকে বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইর পরামর্শ অনুযায়ী বুধবার বিকালে পিলখানা থেকে আরও বেশকিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে তদন্তকালে গতকালও বিডিআর সদস্যদের ব্যারাক থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
সিআইডি পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ৪ সদস্য বুধবার সকালে ঢাকা পৌঁছে মালিবাগের সিআইডি সদর দফতরে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলিত হন। এ সময় ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কাছে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন সিআইডির প্রধান জাবেদ পাটোয়ারী। সিআইডি কর্তৃক সংগৃহীত আলামত, তথ্য-উপাত্ত ও ভিডিও ফুটেজ তাদের দেখান হয়। এরপর সিআইডির একটি টিম ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের নিয়ে পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরে যান। তারা পুরো এলাকায় এবং ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত তাণ্ডবের চিহ্ন পরিদর্শন করেন। এ সময় তাদের পরামর্শে সিআইডি পুলিশ আরও কিছু আলামত সংগ্রহ করে। ব্রিটিশ গোয়েন্দা দলটি ঢাকার একটি হোটেল স্যুটে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের ২ সদস্যের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন।
আমাদের কোর্ট রিপোর্টার জানান, বুধবার ডিএডি তৌহিদ, ডিএডি আবদুর রহিম, হাবিলদার আজাদ আলী, নায়েক ফিরোজ ও সিপাহি জাকির হোসেনের ৭ দিন এবং বাবুর্চি আমিরুল ইসলামের ৫ দিনের রিমান্ড শেষে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করেন সিআইডির সিনিয়র পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আকন্দ। প্রত্যেককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচদিনের আবেদন করলে মহানগর হাকিম মুহাম্মদ আবদুর রহিম তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বুধবারই প্রথম আদালতে ডিএডি তৌহিদের পক্ষে আইনজীবীরা জামিনের আবেদন করলে হাকিম ওই আবেদন নাকচ করে দেন।
অভিযুক্তদের মাথায় হেলমেট, গায়ে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো হয়েছিল। পরে তাদের মহানগর হাকিম মুহাম্মদ আবদুর রহিমের আদালতে লোহার বেষ্টনীর মধ্যে ঢোকানো হয়। এ সময় আদালতে আসামিদের বিপুল সংখ্যক পুলিশ ঘিরে রাখে। আদালতে উপস্থিত সাংবাদিকদের এ সময় আসামিদের কাছে ভিড়তে দেয়নি পুলিশ। হাকিম তার এজলাসে আসন গ্রহণ করলে ডিএডি তৌহিদুল আলমের পক্ষে কয়েকজন নবীন আইনজীবী আদালতে তার পক্ষে মামলা পরিচালনা করার জন্য ওকালতনামায় তৌহিদের স্বাক্ষর নেয়ার জন্য হাকিমের কাছে অনুমতি চান।
হাকিম আবদুর রহিম ওকালতনামায় স্বাক্ষরের অনুমতি দিলে আইনজীবীরা লোহার বেষ্টনীর ভেতরেই ডিএডি তৌহিদকে ওকালতনামা ফরম ও কলম সরবরাহ করলে তৌহিদ দু’হাতে হাতকড়া পরা অবস্থায়ই ওকালতনামায় স্বাক্ষর করেন। তৌহিদের ছেলে সৈয়দ তৌফিক মুহাম্মদ সিফাত ওকালতনামায় মামলার তদবিরকারক হিসেবে স্বাক্ষর করেন।
পুলিশের রিমান্ড প্রতিবেদনে যা বলা হয়
অভিযুক্তদের রিমান্ড শেষে আদালতে পাঠিয়ে নতুনভাবে আবার রিমান্ড চেয়ে প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল কাহ্হার আকন্দ উল্লেখ করেন, অভিযুক্তদের রিমান্ডে নিয়ে বিডিআর হত্যাযজ্ঞের অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। রিমান্ডে থাকাকালীন তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই বিভিন্ন জায়গা থেকে বেশকিছু বিডিআর সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া অন্যদের শনাক্ত করারও চেষ্টা চলছে। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই বিডিআরের অস্ত্রাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র এবং লুণ্ঠিত অন্যান্য কিছু মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। তাই এ ঘটনায় জড়িত অন্যান্য বিডিআর সদস্যকে গ্রেফতার করার জন্য এবং লুণ্ঠিত গোলাবারুদ ও অন্যান্য মালামাল উদ্ধারের জন্য অভিযুক্তদের আবার রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে রিমান্ড প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আদালতে আইনজীবীদের আবেদন
বুধবার আদালতে ডিএডি তৌহিদের পক্ষে কয়েকজন নবীন আইনজীবী ওকালতনামা দাখিল করেন তার পক্ষে মামলা পরিচালনা করার জন্য। অন্য অভিযুক্তদের পক্ষে কেউ ওকালতনামা দাখিল না করলেও বেশকিছু নবীন আইনজীবীকে স্বেচ্ছায় ওইসব অভিযুক্তের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য মামলার খোঁজখবর নিতে দেখা গেছে। ডিএডি তৌহিদের পক্ষে অ্যাডভোকেট আফানুর রহমান, অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন আহমেদ মামলা পরিচালনা করেন। রাষ্ট্রপক্ষে কোর্ট পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ আলী এবং জিআরও খন্দকার এখলাসুর রহমান জামিনের বিরোধিতা করে রিমান্ডের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। আইনজীবীরা তৌহিদের রিমান্ড বাতিল করে জামিন আবেদনে বলেন, ডিএডি তৌহিদ যদি দোষী হতেন তবে তিনি পালিয়ে যেতেন। পিলখানায় অবস্থান করতেন না। তারা আরও বলেন, অভিযুক্তরা সাতদিনের ক্রমাগত রিমান্ডে থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার চিকিৎসা দরকার। তাই এ পর্যায়ে তাকে জামিন দিয়ে আপাতত রিমান্ড শুনানি মুলতবি রাখা হোক। আইনজীবীরা আরও বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ আইন ভঙ্গ করে রিমান্ড শুনানির সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কেইস ডকেট (সিডি) আদালতে উপস্থাপন করেননি। হাকিম উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে জামিনের আবেদন নাকচ করে তিনদিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


