somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুসলমানদের বিরুদ্ধে যা বলেছিলেন বরুণ গান্ধী

২১ শে মার্চ, ২০০৯ দুপুর ১:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মুসলমানদের বিরুদ্ধে যা বলেছিলেন বরুণ গান্ধী

আহমদ হাসান ইমরান ভারত

ভারতের নেহরু পরিবারের সদস্য সঞ্জয় গান্ধী ও মেনকা গান্ধীর তরুণ পুত্র বিজেপি নেতা বরুণ গান্ধী নিজেকে ‘দ্বিতীয় নরেন্দ্র মোদি’ প্রমাণ করার জন্য বদ্ধপরিকর। গান্ধী পরিবারের এই সন্তান বিজেপিতে যোগ দেয়ার পর আরএসএস’র শিক্ষানুযায়ী সংখ্যালঘুদের প্রতি শুধু ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ নয়, বরং কথায় কথায় তাদের অপমান এমনকি হত্যা করার প্রকাশ্য হুমকি দিতে শুরু করেছেন। উত্তর প্রদেশের পিলিভিট কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী ২৯ বছর বয়স্ক বরুণ গান্ধীর বিদ্বেষ-অভিযান ধরা পড়ে যাওয়ার কারণ হচ্ছে­ আসন্ন লোকসভা নির্বাচন। কারণ, এই সময় সাম্প্রদায়িক কিংবা কোনো জাতি-গোষ্ঠীকে আক্রমণ করে ভাষণ দিলে তা নির্বাচনী বিধির আওতায় আসে। অবশ্য বরুণের এই হত্যার হুমকি ও মুসলিমবিদ্বেষ ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৫৩ ধারার আওতায় এমনিতেই চলে আসে, যার শাস্তি কমপক্ষে তিন বছরের জেল। আর অভিযোগ প্রমাণিত হলে নির্বাচন আচার-সংহিতানুযায়ী বরুণ গান্ধী বিজয়ী হলেও তার নির্বাচন বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা। ইতোমধ্যেই অবশ্য নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে উত্তর প্রদেশের পুলিশ বরুণ গান্ধীর বিরুদ্ধে একটি ক্রিমিনাল কেস দায়ের করেছে।
নিজের মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যে বিজেপি’র এই দ্বিতীয় নরেন্দ্র মোদি তার অশালীন ও সাম্প্রদায়িক বক্তব্যে বলেন­ ‘আপনারা ফিরে যান নিজের গ্রামে, সেখানে গিয়ে শোরগোল করা শুরু করুন, হিন্দুরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাও। এই এলাকাকে পাকিস্তান হওয়ার হাত থেকে বাঁচাও, হিন্দু ঐক্যবদ্ধ হও।’
এরপর নিজের হাত দেখিয়ে বরুণ গান্ধী বলেন, ‘এটা (কংগ্রেসের প্রতীক) হাত নয়, এটা হচ্ছে (বিজেপি’র) পদ্মের হাত। এই হাত নির্বাচনের পর কাটুয়াদের (মুসলমানদের খতনা দেয়া সম্পর্কে এক অশ্লীল মন্তব্য) গলাকেই কেটে ফেলবে। জয় শ্রীরাম! রামজি কি জয়! বরুণ গান্ধী কাট্‌ ডালে গা, কাট দেঙ্গে উস হাত কো, কাট দেঙ্গে, কাট ডালেঙ্গে!’
এ কথা কি সত্যি নয়, যদি একজন নারীকে জিজ্ঞেস করা হয় আপনার নাম কী, আর ওই মহিলা যদি বলেন, বিমলাদেবী তা হলে তাকে বলা হয়, আমরা দেখব, সরকারি সাহায্য দেয়ার ব্যাপারে চিন্তা করব। আগে ৫ হাজার টাকা দাও। কিন্তু যদি তার নাম হয় সায়রাবানু কিংবা অন্য নাম, যেমন হুকুম বেগম... তাদের নামগুলো হয় খুব ভয়ঙ্কর, করিমুল্লাহ... মজহারউল্লা...। তাদের যদি রাতেও কখনো দেখতে পান, তাহলে আপনি আঁতকে উঠবেন...।’
আমার এক বোন রয়েছে...। একটি লিফলেটে সব প্রতিদ্বন্দ্বীর ছবি রয়েছে, আমার বোন বলে... ভাইয়্যা, আমার তো জানা ছিল না যে আপনার কেন্দ্র থেকে ওসামা বিন লাদেনও ভোটে দাঁড়িয়েছে। আমি তাকে বললাম, আমেরিকা ওসামা বিন লাদেনকে ধরতে পারেনি। কিন্তু নির্বাচনের পর বরুণ গান্ধী এই ধরনের অনেক ওসামা বিন লাদেনকে পাকড়াও করবে।
‘যদি কোনো ব্যক্তি যদি অশুভ চক্রের কোনো ব্যক্তি হিন্দুর ওপর হাত ওঠায়, তাহলে আমি গীতার কসম খেয়ে বলছি, আমি ওই হাতকে পুরোপুরি কেটে ফেলব।’
এই ধরনের আরো অনেক উক্তি করেছেন ‘মোদি নম্বর টু’। তবে পার্থক্য হচ্ছে, মোদি কথা বলেছেন কম। আর প্র্যাকটিক্যালি তাই করেছেন যা করার হুমকি জওহরলাল নেহরুর প্রপৌত্র এবং ইন্দিরা গান্ধীর নাতি দিয়ে চলেছেন। তবে বরুণ গান্ধী বারবার বলেছেন, নির্বাচনের পর ক্ষমতায় এলে তিনি কী করবেন। কোনো উন্নয়নের কাজ নয়, দেশ গড়ার কাজ নয়, তিনি নাকি শুধু কাটুয়াদের গলা কাটবেন। পিলিভিটে যে কেন্দ্রটি থেকে বরুণ গান্ধী বিজেপি প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন, সেটি থেকে তার মা মেনকা গান্ধী বেশ কয়েকবার জয়ী হয়ে সংসদে আসেন। পুত্রের রাজনীতির পথ সুগম করার জন্য মেনকা এবার কেন্দ্রটি বরুণ গান্ধীকে ছেড়ে দিয়েছেন। মেনকা গান্ধী প্রথমে দিল্লির বিউটি কুইন, পরে সঞ্জয়ের স্ত্রী, ইন্দিরার পুত্রবধূ এবং সবশেষে পশুপ্রেমিক হিসেবে খ্যাতি পান। জানোয়ারের অধিকার রক্ষার জন্য তার সংগ্রাম সবার দৃষ্টি কেড়েছে। অনেককেই তিনি প্রাণী হত্যা না করে নিরামিষ খেতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। বহু পাখিওয়ালা, ভালুক নাচানেওয়ালা, কিংবা বাঁদরওয়ালার রুজি-রোজগার কেড়ে ওই পশুপাখিগুলোকে বনে ছাড়তে বাধ্য করেছেন। কারণ, অন্যথায় নাকি জানোয়ারের কষ্ট হয়। সার্কাসগুলোও তার আন্দোলনের ফলে জানোয়ারের খেলা দেখানো নিয়ে তটস্থ হয়ে রয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, জানোয়ারের অধিকার নিয়ে লড়লেও পুত্র বরুণ গান্ধীকে তিনি মানুষের অধিকার সম্পর্কে সবক দিতে পারেননি। তার পুত্র মুসলমানদের গলা কাটার হুমকি দিচ্ছেন এবং অন্যদেরও মুসলমানদের কেটে ফেলার জন্য প্ররোচনা দিচ্ছেন।
টিভি চ্যানেলগুলো বরুণ গান্ধীর ভাষণের ভিডিও সম্প্রচার করার পর বরুণ এবং তার দল বিজেপি হকচকিত হয়ে পড়ে। প্রথমে আমতা-আমতা করে বরুণ বলেছিলেন, বেশ কিছু কথা জালিয়াতি করে তার মুখে বসানো হয়েছে, আর কিছু কথা তিনি বলেছেন বর্তমান পরিস্থিতিতে হিন্দুদের মনে আত্মবিশ্বাস জাগানোর জন্য। হিন্দুরা আক্রান্ত হচ্ছে, এই এলাকায় হিন্দু মেয়েরা ধর্ষিতা হচ্ছে ইত্যাদি। পরে অবশ্য বরুণ এক বিবৃতিতে ক্ষমা চাওয়ার চেষ্টা করেন। বলেন, তিনি যেসব কথা বলেছেন বলে প্রচার করা হচ্ছে তা শুনে ও দেখে যদি কেউ আঘাত পেয়ে থাকেন তাহলে তিনি দুঃখিত। পরে অবস্থা বুঝে বরুণ আবার পাল্টি খেয়েছেন। বরুণ বলেন, আমি একজন গর্বিত হিন্দু, যে কথা বলেছি তা থেকে পিছু হটব না। তবে আমার বক্তব্যের সিডিতে খানিকটা জালিয়াতি করা হয়েছে।
এ দিকে সাংবাদিকরা তদন্ত করে দেখেছেন, বরুণ গান্ধী হিন্দু নারীদের মুসলিমদের দ্বারা ধর্ষিতা হওয়ার যে ইঙ্গিত দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। সাংবাদিক মনীশ সাহু ওই অঞ্চলে তদন্ত করে দেখেন, ধর্ষণের যে ক’টি মামলা কিংবা অভিযোগ রয়েছে, তার সবের আসামি হচ্ছে হিন্দু্‌ আর তার মধ্যেও কয়েকটি মামলা করা হয়েছিল ব্যক্তিগত দুশমনির জন্য। পরে ধর্ষণের অভিযোগ ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত হচ্ছেন হিন্দু। বরুণ গান্ধীর বিরুদ্ধে পিলিভিট এলাকায় দু’টি মামলা অপেক্ষমাণ রয়েছে।
মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা বরুণ গান্ধীর নিন্দা করলেও শিবসেনা এবং বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের সংশ্লিষ্ট কিছু নেতা ও বুদ্ধিজীবী বরুণ গান্ধীর পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। টিভিতে সাক্ষাৎকার দিয়ে তারা বলেছেন, বরুণ গান্ধীর বক্তব্যে তারা নাকি গর্বিত।
বরুণ গান্ধী এখন দিল্লি হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন হাসিল করেছেন। তবে নির্বাচন কমিশন বলেছে, ভিডিও প্রদর্শিত বক্তব্য যে বরুণ গান্ধীর নয়, তা প্রমাণের দায়িত্ব বরুণ গান্ধীর। বর্তমানে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং লিপ-রিডাররা খুব সহজেই ভিডিও পরীক্ষা করে বলে দিতে পারবেন বক্তব্য জাল করা হয়েছে কি না। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংও বরুণ গান্ধীর বক্তব্যের নিন্দা করেছেন।
তবে শেষ পর্যন্ত বরুণ গান্ধী তার ওই ঘৃণা ছড়ানো এবং ‘কাটুয়াদের কেটে ফেলার’ ঘোষিত পরিকল্পনার জন্য শাস্তি পাবেন কি না­ সে সম্পর্কে অবশ্য যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। কারণ, অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, এর আগেও ভারতে এই ধরনের কয়েকজন রাজনীতিবিদ সহজেই মামলা থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে গেছেন

সূত্রঃ নয়া দিগন্ত- ২১.০৩.০৯
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×