প্রচারমাধ্যমের সত্য
আ ব দুল হ ক
আজকের মানুষ ঘুম থেকে জেগেই যা খোঁজে, তা পত্রিকা। দ্বন্দ্বময় সময় মানুষের কৌতূহল উসকে দিয়েছে। কী জানি ঘুমের সময়টায় কী ঘটে গেছে! আশা-উৎকণ্ঠার ঘনঘটায় দোলায়িত জীবন। চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি। পুরো পৃথিবী একবার দেখতে কয়েক মিনিট লাগে জাস্ট ক্লিক। ই-মেইলে নিউজ অ্যালার্ট দিয়ে রাখুন, খবরের জোয়ারে ইনবক্স উপচে উঠবে। খোঁজাখুঁজি করতে হবে না।
এক দিন আমেরিকার লোকজন ভোরবেলায় পত্রিকা খুলেই দেখল, কাগজের ভাঁজের ভেতরে সিডি, ‘অবসেশন’, কোটি কোটি মানুষের কাছে একই দিনে পৌঁছে গেল কোটি কোটি সিডি। প্রচ্ছদে পাঞ্জাবি-টুপি পরা মুসলমান, হাতে উদ্যত অস্ত্র। ভেতরে যে চলচ্চিত্র, তাতে বোঝানো হলো ইসলাম ভয়াবহ একটা ব্যাপার, মুসলমানরা পৃথিবীর শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। খ্রিষ্টানরা ধর্ম নিয়ে যারা খুব একটা মাথা ঘামায় না, আর তার ‘ফুরসৎও নেই’ দেখে প্রমাদ গুনল; ভাবলো, মুসলমানদের থেকে আরো সতর্ক হতে হবে। উৎসাহী ও উদ্দেশ্যবাদীরা মুখর হলো, ছড়াল, যেন এ এক দলিল। মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হলো। সারা পশ্চিমজুড়ে শুরু হয়ে গেল তুমুল তর্ক।
এ হলো প্রচারমাধ্যমের শক্তি। রয়টার্স-বিবিসি-সিএনএন-টাইম হলো সত্যের মাপকাঠি। আপনি মানুন আর না-ই মানুন। পরমাণু বোমা ফাটিয়ে একটা দেশকে ছাই করে ফেলা যেতে পারে, তবে মানুষকে এটা বিশ্বাস করানো যাবে না যে, দেশটাকে পুড়িয়ে ফেলাই উচিত। কিন্তু মিডিয়া দিয়েও তা সম্ভব। এভাবে বৈধ হচ্ছে আমেরিকার আগ্রাসন, মুসলিম বিশ্বের দেশে দেশে স্থাপিত হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের আধুনিক উপনিবেশ। শান্তির আদর্শ ইসলামকে বিকৃতভাবে প্রচার করা হচ্ছে। এদিকে, কোণঠাসা হয়ে পড়ছে মুসলমান। তাদের কানের কাছে বাজছে যে লাউডস্পিকার, তার মাইক্রোফোন ইহুদিবাদীদের হাতে। মজলুম মুসলমানের আর্তচিৎকার তাই শুধুই অরণ্যে রোদন।
প্রচারমাধ্যমের ওপর ইহুদিদের এই একচেটিয়া আধিপত্য দীর্ঘ পরিকল্পনার ফল। এককালের উদ্বাস্তু জাতির ধ্বংসাবশেষ গুটিকয় ইহুদির কাছে সারা পৃথিবী আজ জিম্মি। তাদের বানানো খবরগুলো আমরা কিনে এনে নিজেদের পত্রিকা-টিভিতে প্রচার করছি। এই প্রেক্ষাপট সামনে রেখে সিদ্ধান্তে আসা যায় যত দিন মুসলমানরা আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারছে, তত দিন তাদের দুর্গতির কোনো প্রতিকার নেই।
ক্ষুদ্র বৃত্তে মুসলমানদের যে কয়টি পত্রিকা আর টিভি আছে, সেগুলো আশাহীনভাবে বিচ্ছিন্ন। পরস্পর কোনো যোগাযোগ নেই। অথচ ডেনমার্কের পত্রিকায় যখন রাসূল সাঃ’কে নিয়ে আপত্তিকর কার্টুন ছাপা হয়, আমরা বিস্ময়ের সাথে দেখলাম প্রবল প্রতিবাদের মুখেও ওই কার্টুনটি ইউরোপের প্রায় সব পত্রিকায় পুনর্মুদ্রিত হলো। ইসলামবিদ্বেষে ওরা সবাই কী নির্লজ্জের মতো এক হতে পারে, এটি তার একটি দৃষ্টান্ত মাত্র। এর বিপরীতে মুসলিম মালিকানাধীন মিডিয়াগুলোকে তেমন উচ্চকণ্ঠ হতে দেখা যায়নি। বিচ্ছিন্নতার সাথে সাথে এটি হীনম্মন্যতার প্রমাণও বটে।
ষাট বছরের বেশি সময় ধরে যে ফিলিস্তিন নির্মêম সন্ত্রাসের শিকার, বোমার ধোঁয়ার ভেতরে শ্বাস নিয়ে যারা মরতে মরতেও বেঁচে আছে কোনোমতে, তাদেরকেই আজ বলা হচ্ছে ‘সন্ত্রাসী’। এর চেয়ে অমানবিক ব্যাপার আর কী হতে পারে? সত্যকে আড়াল করার জন্যে প্রতিনিয়ত মিডিয়াকর্মীদের দিয়ে নানা ইস্যু তৈরি করাচ্ছে ওরা। জনমত গড়ছে এসব ইস্যুর পেছনে। রাজনীতিকরা এসব ইস্যুর পেছনেই কাজ করছে। কারণ, কাজ করতে বাধ্য; মিডিয়ার কাছে তারা অসহায়। এভাবেই মিডিয়া আজ বিশ্বরাজনীতির প্রধান নিয়ন্তা।
আধুনিক সভ্যতার অন্ধকার দিক হলো, দুনিয়াজুড়ে সাম্রাজ্যবাদের কর্তৃত্ব। পত্রপত্রিকায় উন্নয়নশীল দেশগুলো নিয়ে রোজই আমেরিকার নানা পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়। এ অধিকার তাকে কে দিল? মিডিয়া প্রচার করছে, আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অথচ যারা এটা ছড়াচ্ছেন, সেই সাংবাদিকরা ভালো করেই জানেন, আমেরিকা এটা কখনোই চাইবে না। নির্জলা ভণ্ডামি! মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের শাসকরা সাম্রাজ্যবাদের বশংবদ। আমেরিকা চায়, যাতে তেলের খনিতে পুঁজিবাদের শেকড় নিশ্চিন্ত নিরাপত্তায় ছড়াতে পারে। কাজেই মুসলিম দেশগুলোয় আমেরিকার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রচারমাধ্যমের সত্য, বাস্তবতা নয়।
জীবনের সব ক্ষেত্রের যুক্তিপূর্ণ নির্দেশক ও সতত সম্প্রসারণশীল জীবনব্যবস্থা ইসলামের প্রতি পাশ্চাত্য কখনোই সহনশীল ছিল না। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র সরকার মুসলমানদের ওপর যত খড়গহস্ত হচ্ছে, সে দেশের নাগরিকদের ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা ততই বাড়ছে। সব চক্রান্ত নস্যাৎ করে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সাঙ্ঘাতিক ক্ষেপে যায়, গণমাধ্যমে প্রবলভাবে শুরু হয় ইসলাম-আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়ার কাজ। শত শত কলামিস্ট আর বুদ্ধিজীবী নিয়োগ করা হলো মুসলিম বিশ্বে আমেরিকার সামরিক আগ্রাসনের প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য। অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ তার কাভারিং ইসলাম বইয়ে বিস্তর তথ্য দিয়েছেন। ক্যাম্পডেভিড চুক্তির পর মধ্যপ্রাচ্যের সাথে আমেরিকার সম্পর্কে ফাটল সৃষ্টি হলে সাঈদকে তা সারানোর দায়িত্ব দেন প্রেসিডেন্ট কার্টার। এ কাজ করতে গিয়েই সাঈদ মুসলমানদের বিরুদ্ধে আমেরিকার ষড়যন্ত্রের অনেক নাড়ির খবর জেনে ফেলেন।
গণমাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ এশিয়ায় এ ছাড়াও আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে ভারত। বাংলাদেশে সত্যনিষ্ঠ সংবাদকর্মীর পাশাপাশি কিছু আত্মবিক্রীত ব্যক্তির উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে, যারা ট্রানজিটসহ নানা বিষয়ে ভারতস্বার্থের পক্ষে সোচ্চার। একটি সামাজিক আন্দোলন দরকার, এদের চিহ্নিত করে জাতিকে সতর্ক করা যায়। আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার মোকাবেলায় মুসলমানদের উচিত ইসলামের সত্যিকার আদর্শ ও শুদ্ধতম চেতনাকে বহুমাত্রিক উপায়ে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা। কয়েকটি বহুভাষিক টিভি ও রেডিও চ্যানেল প্রয়োজন, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও কুরআন-সুন্নাহ্র সঠিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি রাসূল সা. ও সাহাবা কিরাম রাঃ-এর সুন্দর জীবনের ওপর যেগুলো আলোচনা, কথিকা, সেমিনার, বিশেষ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার এবং ইসলামের গৌরবময় ইতিহাসের ওপর নাটক ও চলচ্চিত্র প্রচার করবে। দু-একটি দেশের কালচারাল সেন্টার ও বেতারের কাজকে এ ক্ষেত্রে শ্রদ্ধার সাথে স্বীকার করছি। তবে বহু কোলাহলের ভেতর এই কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে আছে। প্রচারযুদ্ধে কোণঠাসা মুসলিম দেশগুলোর আর ঘুমিয়ে থাকার সময় নেই। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।
লেখকঃ শিক্ষক, শাহবাগ জামিয়া মাদানিয়া,
জকিগঞ্জ, সিলেট
সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ০৭.০৪.০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



