০১. ছেলেটা স্বপ্ন দেখেছিলো একটা সুন্দর জীবনের। কাঁটা বিছানো পথ মাড়িয়ে ছেলেটি হেঁটে যাচ্ছিল ক্রমশই। মনের ভিতর পুষত টুকটুকে একটা লাল স্বপ্নের। বাসনা ছিল ঘরে ফিরে প্রিয়তমাষূর হাতের নরম পরশে কতক্ষণ ডুবে রবে মাতালসময়। ভুলে যাবে সারাদিনের ক্লান্তিসকল। আদরে আদরে ডুব সাঁতারও হবে অনুক্ষণ। আহা স্বপ্ন! কোথায় গেলো সেই স্বপ্ন। মানুষের সব স্বপ্নই একজীবনে পূর্ণ হয়না হয়তো...
০২. নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটা চাকরিও জোগার করেছিল ছেলেটি। কথা দিয়েছিল একটু সময় করে তোলে আনবে তার স্বপ্নের মেয়েটিকে। তার ততদিনে দাঁড়ানো হয়ে যাবে নিজের পায়ে। মেয়েটিও বলেছিলো "আমি অপেক্ষা করবো, আমি অপেক্ষা করবো ঠিক ততদিন, যতদিন না তুমি ফিরে আসো।"
"চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছো
এখন আর কেউ আটকাতে পারবে না।"
০৩. অপেক্ষা করতে করতে দিন যায়। ছেলেটি প্রাণান্তকর চেষ্টায় ততদিনে নিজের একটা জায়গা করে নিতে পেরেছে মাত্র। মেয়েটি অপেক্ষা করে একটা স্বপ্নময় সুন্দর জীবনের। একটা কাঙ্খিত জীবন হবে তাদের! এই তো আর মাত্র কয়েকটা দিন ব্যাস...
০৪. প্রাণপণ লড়াই করে ছেলেটি সবে মাত্র দাঁড়াতে পেরে নিজের ভিতর পোষণ করে এক অদ্ভুত অহং। কি যে ভালো লাগা সে ক্ষণটুকু। তার স্বপ্নের মানুষ আসবে তার জীবনে। এতদিনের অধরা মানবী তার। আজকে থেকে সে আর দূরের কেউ হয়ে রবে না। চাইলেই সে স্পর্শ করতে পারবে তার প্রিয়তমাষুর হাত-পা-শরীর। কি যে সুখ লাগে তার। একটু স্পর্শের জন্য কতদিন উতলা বাতাস বয়েছে বুকের ভিতরে। কতদিন অপেক্ষা...
"আর কিছুদিন তারপর বেলা মুক্তি"
০৫. অত:পর একদিন আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মেয়েটিকে ফোনে নিশ্চিত করে ছেলেটি। এবং আরো নিশ্চিত করে কিভাবে কখন তাকে তোলে আনবে। মেয়েটি অপেক্ষা করে তিরতিরে সুখের, আর ছেলেটি উত্তেজনাময় দিনের...
০৬. মেয়েটির বাবা সব ঘটনা জেনে যায় কিভাবে যেনো। যেদিন পালাতে যাবে মেয়েটি সেই রাত্রে পুলিশে খবর দিয়ে পাহারায় রাখে মেয়েটির বাবা। পুলিশ যথারীতি ধরে ফেলে দুজনকে। এবং যা হবার তাই হয়... একটা সাজানো মামলায় যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয় বেচারা প্রেমিকের।
০৭. মেয়েটি এখন সুখেই আছে। তার বাবার পছন্দ করা পাত্রকে বিয়ে করে দামী গাড়ী হাঁকিয়ে বেড়ায় প্রেমিকা মেয়েটি...দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না এ মেয়ে প্রেম করত একদিন এক ছোকরার সঙ্গে, যে এখন জেল জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।...
০৮. জগৎ সংসার বড় কঠিন জিনিস। কেই বা মনে রাখ কার কথা। কিংবা কার স্মৃতিই বা কে বহন করে অনন্তকাল। মেয়েটি তো ভুলে গেছে আগেই। ছেলেটিও ভুলে যেতে থাকে আস্তে আস্তে মেয়েটিকে জেলের বন্দী জীবনের ঘর-গেরাস্থলিতে।
০৯. অনেকদিন জেলে বসে থেকে অবশ হতে থাকে ছেলেটির হাত পা। সাথে সাথে অবশ হতে থাকে তার স্মৃতিশক্তিও। মেয়েটির বাবার কথামত খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে নষ্ট করা হয় ছেলেটির স্মৃতির আধার নিউরনগুলোকে। ছেলেটি অতীত তো ভুলেই, ভুলতে বসে তার ভবিষ্যত এবং তার নিজেকেই।
১০. অনেকদিন পরে গাড়ী চালাতে গিয়ে মেয়েটি দেখতে পায় এক ভিক্ষুককে, যে ভিক্ষার বদলে প্রেম প্রেম করে চেঁচাচ্ছিল। মেয়েটিকে কি বুঝেছিল এই তার প্রেমিক যার জন্য জীবনকে বাজি ধরেছিল সে। ভুলে যেতে চেয়েছিল নিজের অতীত, সুখ, সাম্রাজ্য...
১১. এভাবে চলছিলো। মেয়েটি স্মৃতি তর্পণে মাঝে মাঝে ক্ষণিক একটু ভাবত ছেলেটিকে। আর ছেলেটি তো ভাবতে ভাবতে ভাবনাহীন জগতে চলে গিয়েছে, পরিণতিতে ছেলেটি আজ পাগল সেজে ঘুরে বেড়ায় রাস্তায়, ফুটপাতে, অলিতে-গলিতে...
১২. কোন এক অনাকাঙ্খিত ঘটনায় মেয়েটিও একদিন স্মৃতি হারিয়ে ফেলে। অনেক চেষ্টা তদবির, বিদেশী ডাক্তার এবং দামী ঔষধের বদৌলতেও ভালো করে তোলা যায়নি মেয়েটিকে। ওর বাবা সহ্য করতে না পেরে অথবা আশাহত হয়ে মেয়েটিকে রেখে আসেন পাগলা গারদে, যেখানে ছেলেটিও অনেকদিন থেকে চিকিৎসাধীন আছে।
১৩. পাগলটা কাউকেই সহ্য করতে পারে না, কেবল পাগলিটাকে দেখলে ধীর-স্থির শান্ত-সুবোধ বালক সেজে বসে থাকে। আর পাগলিটাও কেমন আচ্ছন্নতায় ডুবে থাকে পাগলটাকে দেখে...
১৪. বিধাতার কি লীলা। কখনো কখনো কাউকে কাউকে কিভাবে কিভাবে যেনো মিলিয়ে দেন এক অদ্ভুত রকম খেলায়। অথবা কাউকে জিতিয়ে কিংবা পরাজিত করে এক অদ্ভুত হাসি হাসেন...
--------------------------------------------------------------------
ছবিটা পাবলো পিকাসোর আঁকা
The Blue and Rose periods
1901-1906

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




