বারমুডায় থেকে অনেক শরীর ও মন দুদিক থেকেই উন্নতি হলো মার্ক টোয়েনের । প্রায় রোজই চিঠি লিখছিলেন তিনি, তবে আর হাতে লিখছিলেন না । সেসময়কার চিঠিগুলো মি. অ্যালেনের মেয়ে হেলেনের হাতের লেখা । এ সময়কার চিঠিগুলোতে বুকের ব্যাথার কোনো উল্লেখ নেই । ১৯১০ সালের মার্চ মাসে তিনি আলবার্ট পেইনকে লিখলেন যে তিনি ভাল হয়ে উঠছেন এবং এ জায়গায় "মরার কোনো ইচ্ছা নেই তাঁর" ।
কিন্তু এক সপ্তাহ পরে মি. অ্যালেন নিজেই চিঠি লিখে মি. পেইনকে বললেন টোয়েন গুরুতর অসুস্থ । জিন ও ওসিপকে টেলিগ্রাম করে নিউ ইয়র্ক থেকে বারমুডার উদ্দেশ্যে পরদিন জাহাজে চাপলেন পেইন । কিন্তু বারমুডায় কিছু লিখলেন না পেইন । পেইন দেখে খুব অবাক হলেন টোয়েন ।
হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন 'তুমি আসবে লেখো নি তো?'
'আপনার গত কয়েকটা চিঠি পড়ে চিন্তায় পড়ে গেছিলাম ।'
'আমি তো বলেছি আমার কিছু হয় নি ।'
সে যাহোক পেইনকে দেখে আসলে খুশিই হয়েছিলেন মার্ক টোয়েন । ওজন কমে গিয়ে চোখ জ্বলজ্বল করছিল তাঁর । নানান ইঞ্জেকশন দেয়া হচ্ছিল টোয়েন কে । যেহেতু আগে কখনো ইঞ্জেকশন নেননি, খুব অভিনব অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাঁর । 'হাইপোডার্মিক' আর 'সাবকিউটেনিয়াস' ইঞ্জেকশানের পার্থক্য পেইনকে খুব জমিয়ে বললেন তিনি । তবে মি. ও মিসেস অ্যালেনের কাছ থেকে পেইন শুনলেন খুব অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন টোয়েন । আসলে ইঞ্জেকশানগুলো বেদনানাশক ছাড়া আর কিছু ছিল না ।
আলবার্ট পেইনের সাথে বিকালে বেড়াতে বের হলেন তিনি । অসুখের কোনো চিহ্নই দেখা গেল ক্লিমেন্সের আচরণে । জিনের একটা খামার ছিল, সেটা বেচে ছ'হাজার ডলার পেয়েছেন পেইন । রেডিংএ ইতিমধ্যেই একটা লাইব্রেরি খুলতে সাহায্য করেছেন টোয়েন, পেইনকে সেখানেই এই টাকা খরচ করতে বললেন তিনি ।
কিন্তু আবার বুকের ব্যাথাটা ফিরে এল কয় দিন পরে । তারপরেও ১২ তারিখে দেশে ফেরার জন্য জাহাজে চাপলেন টোয়েন । জাহাজে আবার এতোটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন টোয়েন যে প্রাণ নিয়ে দেশে ফিরতে পারবেন কি না সন্দেহ দেখা দিয়েছিল । কিন্তু সেসময়ে ও স্বভাবসুলভ রসিকতা ছাড়েননি তিনি । একবার তিনি আলবার্ট পেইনকে বলে ছিলেন,
'আমি খুব দুঃখিত পেইন, আমি চেষ্টা করেও তাড়াতাড়ি মরতে পারছি না ।'
'বুঝলে আলবার্ট, খুব রহস্যজনক এই মৃত্যু ব্যাপারটা ।'
ডাক্তার, আত্বীয়স্বজন, রিপোর্টার সবাই ডকে ভীড় করেছিল মার্ক টোয়েনের জন্য । ঠান্ডা আবহাওয়াতে কিছুটা সুস্থ বোধ করে কয়েকঘন্টা ঘুমালেন তিনি । রেডিংএ যাওয়ার জন্য একটা বিশেষ ট্রেনের কামরা ভাড়া করা হলো । চিকিৎসক পরিবৃত হয়ে রেডিংএ পৌঁছালেন তিনি । ট্রেনে বা ঘোড়ার গাড়িতে চড়তে বিশেষ অসুবিধা হলো না টোয়েনের । বাড়ির সামনের রাস্তায় এসে আলবার্ট পেইনকে জিগ্যেস করলেন,
'আমার নতুন বিলিয়ার্ড রুমটা কোথায় বানিয়েছ?'
গাছের ফাঁক দিয়ে দূরে নতুন বানানো স্টাডির একটা অংশ দেখা যাচ্ছিল, দেখানো হলো তাঁকে ।
'সুন্দর হয়েছে,' মন্তব্য করলেন টোয়েন ।
বাড়িতে এসে কারো সাহায্য সাহায্য ছাড়াই গাড়ি থেকে নামলেন টোয়েন । সেখানে বাড়ির সব কাজের লোকের সাথে হাত মেলালেন সবার সাথে । তারপরে একটা ক্যানভাসের চেয়ারে বসিয়ে ধরাধরি করে দোতলায় নিজের কামরায় নিয়ে যাওয়া হলো তাঁকে । সেখানে জানালা দিয়ে সুর্যাস্তের আলোতে ধোয়া দূরের পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছিল ।
দিনটা ছিল ১৪ ই এপ্রিল, বৃহষ্পতিবার, ১৯১০ সাল ।
******
পরের সপ্তাহে কখনো ভাল, কখনো খারাপ হতে লাগল টোয়েনের অবস্থা । সুস্থ থাকার সময়ে কার্লাইল আর সুটেনিয়াস পড়েছেন তিনি । রবিবারে মেয়ে-জামাই, ক্লারা আর ওসিপ গাভ্রিলোভিচ হন্ত দন্ত হয়ে এলো প্যারিস থেকে । মার্ক টোয়েনকে সুস্থই মনে হয়েছিল তখন । কিন্তু বুধবার থেকে আবার শরীর খারাপ হতে শুরু করল তাঁর ।
ব্যাপারটা কাকতালীয় হতে পারে, কিন্তু বুধবার, ২০ এ এপ্রিল, ১৯১০ সালে উত্তর গোলার্ধের আকাশে হ্যালির ধুমকেতু প্রথম দেখা গিয়েছিল !
পরদিন একটু সুস্থ হলে মার্ক টোয়েন পেইনকে বললেন দুটো অসমাপ্ত পান্ডুলিপি "ছুঁড়ে" ফেলে দিতে । পেইন বললেন সেটা তিনি করবেন, সেক্রেটারির হাত চেপে ধরলেন মার্ক টোয়েন, এবং সেটাই পৃথিবীতে তাঁর শেষ কথা । বিকেলের দিকে গভীর ঘুমে ঢলে পড়লেন তিনি, এবং সে ঘুম আর কখনো ভাঙ্গবে না । সাড়ে ছ'টার দিকে, সুর্যাস্তের সময় ড. কুইন্টার্ড দেখলেন মার্ক টোয়েনের শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমশঃ শ্লথ হয়ে আসছে.....
কিছুক্ষণ পরে মাথাটা একদিকে কাত হয়ে গেল এবং স্যামুয়েল ল্যাংহর্ন ক্লিমেন্স / মার্ক টোয়েন তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ।
*******
নিউ ইয়র্কের ব্রিক চার্চে শেষকৃত্যের পর পরদিন এলমিরাতে নিয়ে যাওয়া হলো মার্ক টোয়েনের অবশেষ । ল্যাংডন, লিভি, সুজি, জিনের পাশে আরেকটা কবর খোঁড়া হলো, স্যাম ক্লিমেন্সের জন্য।
মিসিসিপি নদীর তীরে দাপিয়ে বেড়ানো হ্যানিবালের সেই ভবঘুরে বালক, মাটির পৃথিবীতে; তাঁর শেষ ঠিকানায় পৌঁছে গেছেন ।
শেষ:

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

