দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত সংবাদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট বাংলো ভেঙে ও তার পাশে অবস্থিত কর্মচারীদের বস্তি উচ্ছেদ করে হলের মাঠে গড়ে তোলা হবে ১১ তলা ছাত্রী হল। শহীদুল্লাহ হলের ঐতিহ্য ও ছাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা না করেই গ্রহণ করা এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট, আবাসিক শিক্ষক, ছাত্র ও কর্মচারীরা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্ত পূনর্বিবেচনা করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। অন্যত্থায় আন্দোলনে নামবেন হলের সাধারণ ছাত্ররা। এই সিদ্ধান্ত বিবেচনার সুযোগ নেই উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবারিত স্থান না থাকায়, এই স্থানেই ছাত্রী হল নির্মাণ করা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন হলগুলোর মধ্যে অন্যতম বিজ্ঞান পাড়ায় অবস্থিত শহীদুল্লাহ হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ও দেশের ইতিহাসে হলটির ঐতিহ্যগত বিভিন্ন প্রেক্ষাপট রয়েছে। আয়তনে অনেক বড় অংশ জুড়েই গড়ে তোলা হয় এই হল। হলের মূল ভবন ছাড়াও দুটি এক্সটেনশন ভবন রয়েছে। এই তিন ভবনের মাঝেই রয়েছে ছাত্রদের খেলার জন্য ছোট একটি মাঠ। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই খোলা মাঠ, হল প্রভোস্টের বাংলো ও কর্মচারীদের বস্তি উচ্ছেদ করে ছাত্রীদের জন্য একটি হল নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১ হাজার ছাত্রীর জন্য নির্মিত ১১ তলা এই হলটির এক পাশে থাকবে শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক শিক্ষকদের ভবন, আরেকদিকে তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ৮নম্বর ভবন, পিছনে থাকবে ১ হাজার ২০০ ছাত্রের শহীদুল্লাহ হল, সামনে আনন্দ বাজার, যক্ষ্মা নিরাময় কেন্দ্র এবং একটি মাজার। আনন্দ বাজারে ও চাঁনখার পুলে ছাত্রদের সাথে কোন না কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে থাকে। এই অবস্থা সেখানে একটি ছাত্রী হল নির্মাণ করা হলে স্বাভাবিক ও বিশেষ বিশেষ দিবসগুলোতে ছাত্রীদের নিরাপত্তা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে অনেকে মনে করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আবাসন সমস্যা সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি নতুন ছাত্রী হল নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রথমে এই হল নির্মাণের স্থান নির্বাচন করা হয় জগন্নাথ হলের ৭ ও ৮ নম্বর বাংলোর পাশে। কিন্তু জগন্নাথ হল কর্তৃপক্ষ, শিক্ষার্থী ও অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের বাঁধার মুখে নতুন স্থান নির্বাচনের জন্য সভা আহ্বান করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ৯ জানুয়ারি নতুন স্থান নির্বাচন কমিটির সভায় জগন্নাথ হলের ওই স্থানের পরিবর্তে নতুন করে শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট বাংলো ও কর্মচারীদের বস্তি উচ্ছেদ করে ও এর সামনের খোলা স্থানে প্রয়োজনীয় স্থান নিয়ে ছাত্রী হল নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
গত ১৪ জানুয়ারি হল নির্মাণের এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে বলা হয়, পূর্বের স্থানের পরিবর্তে শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট বাংলো ভেঙে ও তৎসংলগ্ন বস্তি উচ্ছেদ করে এবং প্রভোস্ট বাংলোর সামনে খালি স্থানে ১১ তলা ছাত্রী হল নির্মাণ করা হবে। সিন্ডিকেটের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরপরই প্রতিবাদ জানিয়েছে শহীদুল্লাহ হলের প্রভোস্ট, আবাসিক শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ুব্ধ শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন আন্দোলনের।
ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত পূনর্বিবেচনার জন্য ভিসির কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছে হল প্রভোস্ট ও হলের কর্মচারীরা। গত ১৪ জানুয়ারি সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর ১৭ জানুয়ারি হলের প্রভোস্ট প্রফেসর ড. মোঃ আজিজুর রহমান হলের হাউস টিউটরদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সাথে সাক্ষাত করেন। এসময় তারা শহীদুল্লাহ হলের ভেতরে ছাত্রী হলের স্থান নির্বাচনের সিদ্ধান্ত পূনর্বিবেচনা করার আনুরোধ জানিয়ে স্মারকলিপি প্রদান করে এবং ওই স্থানে ছাত্রী হল নির্মাণ হলে সম্ভাব্য বিভিন্ন অসুবিধার কথা তুলে ধরেন।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, শহীদুল্লাহ হল ঐতিহ্যগতভাবে এবং আকার-আয়তনে সুবিশাল হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনাকাল থেকেই যে কয়টি হল ছিল এটি তার অন্যতম। এতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রভোস্ট বাংলোর স্থানে নূতন যে ছাত্রী হল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তা কোন অবস্থাতেই সমীচীন নয়। এটি বাস্তবায়িত হলে ঐতিহ্যবাহী এই হলটি ুদ্র ও সংকীর্ণ গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়বে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মানচিত্রে সর্বাধিক ছাত্র অধ্যূষিত এই হলটিতে একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। যা সামগ্রিক প্রশাসনের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। কৌশলগত কারণেও ওই স্থানে ছাত্রীদের হল নির্মাণ যৌক্তিক নয়। এখানে ছাত্রী হল নির্মাণ হলে একদিকে যেমন শহীদুল্লাহ হলের স্বকীয়তা এবং এর ঐতিহ্যগত আকৃতির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করবে। তাছাড়া বছরের বিশেষ দিনগুলোতে বিশেষ করে থার্টি ফার্স্ট নাইট, পহেলা ফাল্গুন, পহেলা বৈশাখসহ বিশেষ দিনগুলোতে ছাত্রীদের নিরাপত্তা দেওয়া আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে। এছাড়াও ওই স্থানে হল নির্মাণের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক নয় উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নিকট একটি স্মারকলিপি দিয়েছে হল কর্তৃপক্ষ।
বস্তি উচ্ছেদ করে হল নির্মাণের খবর হলের কর্মচারীরা জানার পরপরই তারা এর প্রতিবাদ জানায়। ১৮ জানুয়ারি তারা হলের প্রভোস্টকে অবরুদ্ধ করে রাখে এবং ওই স্থানে হল নির্মাণের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানায়। এছাড়া ওই দিনই কর্মচারীদের যেসকল টিনসেড উচ্ছেদ করে হল নির্মাণের কথা বলা হয়েছে সেসব কর্মচারীরা এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে এবং সিদ্ধান্ত পূনর্বিবেচনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে।
এ বিষয়ে হল প্রভোস্ট প্রফেসর ড. মোঃ আজিজুর রহমান বলেন, শহীদুল্লাহ হলের ঐতিহ্য ও এই স্থানে ছাত্রী হল নির্মাণ হলে এর সম্ভাব্য পরিবেশ বিবেচনা করেই ওই স্থানে হল নির্মাণ সমীচীন হবে না। তিনি বলেন, ওই স্থানে কোন ভবন নির্মাণ করা হলে তা করতে হবে শহীদুল্লাহ হলের ভবন। একটি ছাত্র হলের ভেতরে ছাত্রী হল নির্মাণ কোনভাবেই হতে পারে না। এতে এই এলাকার পরিবেশ দুর্বিসহ হয়ে পড়বে বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গায় বিশ্ববিদালয়ের উন্নয়ন কাজ হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান যেহেতু অবারিত নয়, এজন্য পরিত্যক্ত ওই বাংলোতে এবং কর্মচারীদের অবৈধ দখলে থাকা স্থানে ছাত্রীদের হল নির্মাণ করা হবে। এই সিদ্ধান্ত পূনর্বিবেচনা করার কোন সুযোগ নাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ছাত্রীদের আবাসন সমস্যা এখন প্রকট। তাই তাদের হল নির্মাণ করা হবে। এছাড়া যেসকল জমি অবৈধ দখলে আছে তা উদ্ধার করে পরবর্তিতে আরও ছাত্র ও ছাত্রীদের হল নির্মাণ করা হবে। কর্মচারীদের বিরোধীতার ব্যাপারে প্রফেসর আরেফিন সিদ্দিক বলেন, কর্মচারীরা ওই স্থানটি অবৈধভাবে দখল করে আছে। তাদের স্বার্থ জড়িত থাকায় তারা এর বিরোধীতা করছে। তবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ দেখতে হবে। প্রভোস্টদের জন্য আর আলাদাভাবে বাংলোর ব্যবস্থা করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রভোস্টদের জন্য একটি এ্যাপার্টম্যান্ট করা হচ্ছে যেখাসে সব প্রভোস্টরা থাকবেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

