বিদ্যুৎ উৎপাদন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কারিগরি ত্রুটির কারণে একের পর ইউনিট বন্ধ হতে শুরু করেছে। কয়েক দিন আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া মেঘনাঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ইউনিটটি এখনো চালু করা যায়নি। এর মধ্যে গতকাল বন্ধ হয়েছে ঘোড়াশাল কেন্দ্রের ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ষষ্ঠ ইউনিট ও বাঘাবাড়ীতে বেসরকারি খাতের ওয়েস্টমন্ট পাওয়ার কোম্পানির ৪৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিট।
এ অবস্থায় পাঁচটি সার কারখানা বন্ধ করে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৯০ কোটি ঘনফুট বা তারও বেশি গ্যাস সরবরাহের মতো অবস্থা সৃষ্টি করা গেলেও এখন বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস নিতে পারছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনও চার হাজার মেগাওয়াট থেকে কমে আবার তিন হাজার ৮০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি চলে এসেছে।
পিডিবির হিসাবে গতকাল দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল পাঁচ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। আর সর্বোচ্চ উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল তিন হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট। ফলে গত দুই দিনে চার হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের তুলনায় গতকাল সারা দেশে লোডশেডিং বেশি হয়েছে।
লোডশেডিং নিয়ে তেলেসমাতি: দীর্ঘদিন লোডশেডিং চলে আসছিল একটি বিতরণ লাইনে (ফিডার) টানা এক ঘণ্টা করে। মাত্র এক সপ্তাহ আগে তা পরিবর্তন করে টানা দুই ঘণ্টা করা হয়। গতকাল থেকে আবার তা পরিবর্তন করা হয়েছে।
গত রাত থেকে নতুন যে নিয়ম চালু করা হয়েছে, তাতে প্রতিদিন রাত ১২টা থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত এক ঘণ্টা করে এবং সকাল সাতটার পর থেকে রাত ১২টার আগ পর্যন্ত টানা দুই ঘণ্টা করে লোডশেডিং চলবে।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউল মাসুদ প্রথম আলোকে বলেন, টানা দুই ঘণ্টা করে লোডশেডিংয়ে রাতে মানুষের ঘুমের কষ্ট হচ্ছিল। আবার দুই ঘণ্টা করে লোডশেডিং করার কিছু সুবিধাও আছে। তাই অনেক চিন্তা-ভাবনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি কয়েকটি সূত্র এবং কয়েকজন সাধারণ গ্রাহকের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তাঁরা সবাই বলেন, ভয়াবহ বিদ্যুৎ-সংকটের সময় এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে সরকার মানুষের বিরক্তি বাড়াচ্ছে। এসব বন্ধ করে মানুষকে স্বস্তি দেওয়া উচিত।
উৎপাদন ঝুঁকিতে: সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সূত্র জানায়, এমনিতেই গরমে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা কমে। তার ওপর দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র অতি পুরোনো হওয়ায় এবং সেগুলো সারাক্ষণ চালিয়ে রাখায় নানা রকম কারিগরি সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ফলে আরও কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান এস এম আলমগীর কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ক্ষমতা থাকতে হয় অন্তত ২০ শতাংশ বেশি। কিন্তু আমাদের উৎপাদন ক্ষমতা চাহিদার তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম। ফলে উৎপাদন কেন্দ্রের যন্ত্রপাতির ওপর অস্বাভাবিক চাপ পড়ে কারিগরি সমস্যা দেখা দেয়।’
মেঘনাঘাট কেন্দ্রের মালিক পেন্ডেকার এনার্জির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সল মোবিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বন্ধ হওয়া ইউনিটটি কবে নাগাদ চালু করা যাবে এবং বন্ধের কারণ কী, তা আজ-কালের মধ্যে জানা যাবে। এ ব্যাপারে কাজ করতে বিদেশি বিশেষজ্ঞ এসেছেন।
পিডিবির সূত্র জানায়, ঘোড়াশালের ষষ্ঠ ইউনিট বন্ধ হয়েছে এর বয়লারে ছিদ্র হয়ে পানি বের হওয়ার কারণে। এটি মেরামতে অন্তত তিন দিন লাগবে। ওয়েস্টমন্টের বাঘাবাড়ী কেন্দ্রের ইউনিটটি বন্ধ হয়েছে কম্প্রেসারে ত্রুটির কারণে। এটি চালু হতেও সময় লাগবে।
ঘোড়াশালে আগুন: ভৈরব থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, নরসিংদীর ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে গতকাল দুপুরে আগুন লেগে যায়। কেন্দ্রের প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানায়, দুপুর দুইটার দিকে ২৩০ কেভি ক্ষমতাসম্পন্ন গ্রিড লাইনে একটি পাখি বসলে বিকট শব্দ হয়ে আগুন ধরে যায়। খবর পেয়ে কেন্দ্রের নিজস্ব ও পলাশ ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। আধা ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুনে কেন্দ্রের নিরাপত্তাকর্মী সোলাইমান মিয়া দগ্ধ হয়েছেন। তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ওই কেন্দ্রের ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ষষ্ঠ ইউনিটে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী তমাল চক্রবর্তী বলেন, ষষ্ঠ ইউনিট বন্ধ হওয়ার আগে এই কেন্দ্র থেকে মোট ৫৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছিল। এখন হচ্ছে ৪১৫ মেগাওয়াট।
বাঘাবাড়ীতে কম্প্রেসারে ত্রুটি: সিরাজগঞ্জ থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, সেখানে ওয়েস্টমন্ট পাওয়ারের ৯০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট (৪৫ মেগাওয়াট) কারিগরি ত্রুটির কারণে সোমবার দুপুরে বন্ধ হয়ে যায়। পিডিবি ও ওয়েস্টমন্ট সূত্র জানায়, এই ইউনিটটি জাতীয় গ্রিডে ৩৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল। মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে।
পাঁচটি সার কারখানা বন্ধ: বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে পাঁচটি সার কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে চিটাগাং ইউরিয়া, যমুনা, ঘোড়াশাল, পলাশ ও কর্ণফুলী সার কারখানা বা কাফকো। শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এই কারখানাগুলো শতভাগ ক্ষমতায় চললে মোট গ্যাস দরকার হয় ৩০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু গ্যাস-সংকটের কারণে বেশ কিছুদিন ধরে সরবরাহ করা হচ্ছিল মোট ২৫ থেকে ২৬ কোটি ঘনফুট। বন্ধ করার পরও কারখানাগুলোর অত্যাবশ্যকীয় কিছু কাজে মোট প্রায় ছয় কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। বাকি প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প সংস্থা (বিসিআইসি) সূত্র জানায়, ওই পাঁচটি সার কারখানা বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ছয় হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন বন্ধ থাকবে। তবে দেশে এখন ইউরিয়ার মজুদ সন্তোষজনক। তাই এতে ইউরিয়া সরবরাহ ব্যাহত হবে না। কিন্তু সার কারখানা বন্ধ রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা পর্যালোচনার জন্য কয়েক দিন পর আন্তমন্ত্রণালয় সভা হবে।
পিডিবি নিতে পারছে না: কয়েকটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং আগে থেকেই আরও কয়েকটি ইউনিট বন্ধ থাকায় পিডিবি এখন বাড়তি গ্যাস কাজে লাগাতে পারছে না। পেট্রোবাংলার সূত্র জানায়, সার কারখানা বন্ধ করার পর বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৯০ কোটি ঘনফুটেরও বেশি গ্যাস দেওয়া সম্ভব।
পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ ৭৭ কোটি থেকে ৮২ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত বেড়েছিল। কিন্তু মেঘনাঘাট, ঘোড়াশাল, ওয়েস্টমন্ট প্রভৃতি কেন্দ্রের একটি করে ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন আর বেশি গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না। গত রোববার পিডিবি গ্যাস নিয়েছে ৭৯ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট। গতকাল ঘোড়াশাল ষষ্ঠ ইউনিট এবং ওয়েস্টমন্টের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পিডিবি গ্যাস নিতে পেরেছে আরও কম।
তবে চট্টগ্রামে আরও বেশি গ্যাস নেওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু সেখানে পেট্রোবাংলা বেশি গ্যাস দিতে পারছে না। সঞ্চালনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে সিলেট কিংবা কেন্দ্রীয় অঞ্চলের গ্যাসও চট্টগ্রামে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
উল্লেখ্য, গ্যাসভিত্তিক দেশের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালালে পিডিবির মোট গ্যাস দরকার হয় প্রায় ৯৬ কোটি ঘনফুট।
গ্যাস উৎপাদন কমেছে: গত বছরের তুলনায় দেশে গ্যাসের মোট উৎপাদন কমেছে। পেট্রোবাংলার সূত্র জানায়, গত বছর এ সময়ে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ২০০ কোটি ঘনফুট ছুঁয়েছিল। এ বছর তা ১৯০ কোটি ঘনফুটের আশপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ১২ নম্বর কূপটি কারিগরি সমস্যার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। আর ৪ নম্বর কূপটি সংস্কারকাজের জন্য বন্ধ করা হয়েছে। গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ এটি। ৪ নম্বর কূপটি বর্তমান সংকট পরিস্থিতি পার করেও বন্ধ করা যেত দাবি করে একটি সূত্র বলছে, স্বল্প সময়ে দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর যেসব সুযোগ আছে, তা ব্যবহারের যথাযথ উদ্যোগ এখন পর্যন্ত সরকারের নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



