(লেখাটি গত ২৬ আগষ্ট ২০০৭ তারিখে প্রকাশিত সাপ্তাহিক একতায় মুদ্রিত হয়। ব্লগের পাঠকদের জন্য আবারো এটি প্রকাশ করা হল।)
কোনোরকম বাছবিচার ছাড়াই বিদেশি পণ্যের জন্য বাজার উন্মুক্ত করে দিয়ে দেশের কৃষি ও শিল্পকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দেয়া হয়েছে। উৎপাদকের ব্যয় বাড়িয়ে কমানো হয়েছে আমদানিকারদের। ফলে দেশে হু হু করে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম, অন্যদিকে স্থবির হয়ে পড়েছে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার শর্ত পূরণ করতে গিয়ে নব্বই দশকের মধ্যভাগ থেকে বাংলাদেশ বিদেশি পণ্যর জন্য বাজার উন্মুক্ত করতে শুরু করে। একে একে সব রকম পণ্য আমদানিতে নির্ধারিত শুল্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়। দেশে বিকাশমান বিভিন্ন খাতকে প্রণোদনা দিতে যে সময় ওইসব পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ করার কথা সে সময়েই বিদেশি পণ্যর জন্য সব রকম সুবিধা প্রদান করা হয়। কৃষি উৎপাদনের সহায়ক পণ্যের বিপনন ব্যবস্থা ছেড়ে দেয়া হয় ব্যক্তিখাতে। ফলে হু হু করে বাড়তে থাকে এসব পণ্যের দাম এবং উৎপাদন ব্যয়।
আমদানি শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহার, ব্যাংক ঋণের সুদ কমানো, ঋণপত্র খোলার প্রক্রিয়া সহজীকরণসহ নানাভাবে আমদানি বাণিজ্যকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এর বিপরীতে দফায় দফায় গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির দাম বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণ সংকোচন, কৃষি ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি এবং যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য উৎপাদন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখাকে কঠিন করে তোলা হচ্ছে। সরকারের একের পর এক পদেেপ দেশের কৃষি ও শিল্প খাতে উৎপাদন খরচ বাড়লেও কমে যাচ্ছে বিদেশি পণ্যের আমদানি ও বিপণন ব্যয়। এতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে দেশীয় পণ্য। ক্রমশ বিদেশি পণ্যের অবাধ বাজারে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ। আমদানি উদারীকরণের যুক্তি হিসেবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে সামনে আনা হলেও এ পর্যন্ত সরকারের কোনও সিদ্ধান্তের ফলাফলই সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে ওঠেনি। উল্টো আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে হু হু করে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম।
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)’র চাপে গত এক দশক ধরে দেশে ধারাবাহিকভাবে বাণিজ্য উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা হ্রাসের পদপে অনুসরণ করা হয়েছে। সব রকম পণ্য আমদানির েেত্র তুলে দেওয়া হয়েছে শুল্ক ও অশুল্কজনিত সব রকম বাধা। উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা এবং সাধারণ জনগণের দুর্ভোগ সত্ত্বেও স্বল্পোন্নত দেশ হয়েও বাংলাদেশ অর্থনীতিতে ব্যাপক হারে উদারীকরণ করেছে। অথচ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও)’র বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের ওপর কোনও পণ্যের শুল্ক হ্রাসের বাধ্যবাধকতা নেই।
২০০৭-২০১০ সাল মেয়াদী আমদানি নীতিতে বিদেশি পণ্য আমদানির সব রকম বাধা তুলে দেওয়া হয়েছে। অথচ এর আগে দেশীয় শিল্প খাত রার জন্য দেশে উৎপাদিত ৫৫ ভোগ্যপণ্য আমদানিরেত ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ আরোপিত ছিল। বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে পুঁজির প্রতিযোগিতায় অনেক দেশীয় কোম্পানি টিকতে না পারলেও সীমিত আমদানি নীতির কারণে এই ৫৫টি পণ্য উৎপাদনকারী শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। এসব পণ্যের এলসি মার্জিন তুলে দিয়ে আমদানি অবাধ করায় সংশ্লিষ্ট শিল্পের টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়বে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। দেশীয় শিল্প বিকাশের সর্বশেষ অবলম্বনও বন্ধ হয়ে যাবে।
সরকারের আমদানিনির্ভর নীতির সর্বশেষ প্রতিফলন ঘটেছে ব্যাংক ঋণের সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে। মাত্র এক সপ্তার মধ্যে কৃষি ব্যাংকের ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি এবং ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার হ্রাসের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বন্যার আঘাতে বিপর্যস্ত কৃষি খাতের পুনর্বাসনে বিনা সুদে ঋণ বিতরণের প্রয়োজন থাকলেও এক লাফে ঋণের সুদ ৪ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে কৃষি ব্যাংক। অবশ্য বিভিন্ন মহলের সমালোচনার পর বন্যার কারণে বর্ধিত এ সুদ স্থগিত রেখেছে তারা। দু’এক মাসের মধ্যেই এ স্থগিতাবস্থা তুলে নিয়ে নতুন সুদের হার কার্যকর করা হবে। অন্যদিকে আমদানি ক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার ৪ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, কৃষি ঋণের সুদের হার বৃদ্ধির ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ আরেক দফা বাড়বে। ফলে দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এতে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে আমদানিকারকরা।
রোজার মাসকে সামনে রেখে নিত্য প্রয়োজনীয় ১০টি পণ্য আমদানীর ক্ষেত্রে এলসির ঋণের সুদের হার ১২ শতাংশে বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে ব্যাংক ভেদে এ সুদের হার ছিল ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে আমদানি ক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার বাড়াতে নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা রোধের যুক্তি দেখানো হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, ঋণের সুদ কমানোর কারণে দ্রব্যমূল্য কমবে না। এর আগে মূল্য কমানোর কৌশল হিসেবে বেশ কয়েকটি পণ্যের আমদানি শুল্ক তুলে দেওয়া হলেও বাজারে এর ন্যূনতম প্রভাব পড়েনি। উল্টো প্রতি সপ্তায়ই বাড়ছে সব রকম ভোগ্যপণ্যের দাম। ফলে শুল্ক কমানোর ফলে সরকারের রাজস্ব আয় কমলেও দেশের মানুষ কোনও উপকার পাচ্ছে না। মাঝখানে সুবিধা ভোগ করছে পণ্য আমদানিকারকরা।
আমদানি পণ্যের ঋণের সুদের হার কমানো হলেও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি প্রয়োগ করে দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণের প্রবাহ হ্রাস করে দিয়েছে বাংলাদেশ। মূলত আইএমএফ’র চাপে গত তিন বছর ধরে এ ধরনের মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করছে সরকার। সম্প্রতি আইএমএফ অর্থ উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়ে আরও বাণিজ্য উদারীকরণের নির্দেশ দেয় এবং দেশীয় পণ্যকে সুরা দিতে ‘সেফগার্ড বডি’ গঠনের বিরোধিতা করে।
শুধু শুল্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রেই নয়Ñ শিল্প ও কৃষি খাত বিকাশের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বিভিন্ন পরিষেবার মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমেও দেশীয় খাতকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। গত ৫ বছরে জ্বালানি তেলের দাম ৮ দফা বৃদ্ধির ফলে কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। দেশে ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির এটি একটি বড় কারণ। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি কৃষি ও শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অতীতের প্রভাব বিবেচনা না করেই জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী দু’এক মাসের মধ্যেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হবে। এবার একইসঙ্গে সারের দামও বাড়ানো হবে। ফলে আশংকা করা হচ্ছে, কৃষি ক্ষেত্রে এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রতিটি উপকরণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় ফসল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য হারে ব্যয় বাড়বে। ফলে দেশে উৎপাদিত সব পণ্যের দাম বাড়বে।
এর আগে ২০০৭-০৮ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে আমদানি শুল্ক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে দেশীয় শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়েছে। অথচ কমানো হয়েছে বিদেশি পণ্যের শুল্ক। প্রস্তুতকৃত পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক হার ২৫ শতাংশে বহাল রেখে কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের ওপর শুল্কহার বাড়িয়ে যথাক্রমে ১০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। অথচ সমজাতীয় বিদেশি পণ্যের আমদানি ব্যয় কমে গেছে। এতে একদিকে দেশের বাজারে স্থানীয় পণ্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে, অন্যদিকে সংকুচিত হচ্ছে রফতানি সুযোগ।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দেশের শিল্প ও কৃষির উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে বিদেশি পণ্য আমদানি সহজ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে দেশ পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে উঠবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য আমদানি করলে তা অবশ্যই দেশের মানুষকে বেশি দামে কিনতে হবে।
তাদের মতে, আমদানি নির্ভরতা কমাতে না পারলে কোনও পদপেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী হবে না। দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার একমাত্র উপায় দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি। এজন্য কৃষকের কাছে স্বল্পমূল্যে কৃষি উপকরণ ও সহজশর্তে কৃষি ঋণ পৌঁছে দেওয়া জরুরি। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং উৎপাদন বাড়বে। অন্যদিকে স্থানীয় শিল্পকে গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন পরিষেবায় ভর্তুকি প্রদান, স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান এবং কাঁচামাল আমদানির ব্যয় হ্রাস করতে পারলে শিল্প পণ্যের ক্ষেত্রেও উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এজন্য আমদানিকারকদের সুবিধা না দিয়ে কৃষক ও শিল্প উদ্যোক্তাদের দিকে তাকানো উচিত। দেশে উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বাড়লেও দেশে এর প্রভাব পড়বে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

