somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সংস্কারকৃত (শেষাংশ)

২৮ শে অক্টোবর, ২০০৭ বিকাল ৩:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হঠাত করে খবর পেয়েছিলাম যৌথ বাহিনীর ডান্ডার ঘায়ে শয্যাশায়ী হয়েছেন আমার বাল্য স্মৃতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে থাকা নিত্য স্যার। ৭১এ রাজাকারদের হাতে পরিবারের সব সদস্যকে হারিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা শত্রু সম্পত্তি হিসেবে দখল করেছিলেন তার ভিটাবাড়ী। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে যারা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন তাদের একজন নিত্য স্যার। সবার বাড়ি গিয়ে গিয়ে বলে বেড়াচ্ছিলেন যে এবার ভালো একটা কিছু হবে। দূর্নীতিবাজরা সব ধরা পড়ে যাচ্ছে। তার এই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। গত বিশ বছর ধরে তিনি যে চায়ের দোকানটাতে দিনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় পার করেন, চা খান, স্মৃতিচারণ করেন, সেই চায়ের দোকানটা উচ্ছেদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি তার অভ্যেসমত একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলেন। আইনের রক্ষকরা বাড়াবাড়ি পছন্দ করেন না। তারাও তাই করেছেন যা তাদের করা উচিত। নিত্য স্যারকে নিয়ে এ গল্পটা লেখা শুরু হয়েছিলো। এটা শেষাংশ)

৭১ সালে থানা শান্তি কমিটির সভাপতি রহমতউল্লাহ সরদার ছিলেন নিত্য বাবুর বাল্যবন্ধু। যখন খবর পাওয়া গেল পাকিস্তান আর্মি থানা সদরে ক্যাম্প করছে তখনো রহমতউল্লাহ তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তার ভয়ের কিছু নেই। তখন রীতিমত যুদ্ধ চলছে। রহমতউল্লাহ তার পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের মুসলিম লীগার। লেখাপড়া জানা লোক। তার বাবা এল এম এফ পাস মুকসেদ ডাক্তার ছিলেন মুসলিম লীগের জেলা পর্যায়ের নামকরা নেতা। ৭১ এর ডামাডোলের আগেই তিনি প্রাণত্যাগ করেন। রহমতউল্লাহ বাপের যোগ্য উত্তরসুরি। মুসলমান জ্যাত্যাভিমানের ধারণা তার রক্তেই ছিলো। রহমতউল্লাহ’র সাথে সম্পর্ক রেখে চলতে আত্মপীড়ন অনুভুত হলেও আর্মি ক্যাম্প স্থাপনের খবর পেয়ে পূত্রহীন নিত্য বাবু দু’ কন্যার নিরাপত্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে ফের দেখা করেছিলেন তার সাথে। অধিকাংশ হিন্দু পরিবার সীমান্ত পেরিয়ে চলে গেলেও নিত্যরঞ্জনের মনে হত, মারা যাওয়া আর জানের ভয়ে দেশত্যাগ করায় তফাত কি? কিন্তু পরিস্থিতি যা দাড়াল তাতে সেমতে অটল থাকাটা দুস্কর! সে রাতে রহমতউল্লাহর সাথে তার কথোপকথন ছিল গতানুগতিক। তাকে দেখেই যেন রহমতউল্লাহর জোশ বৃদ্ধি পেল।
সে বললো, শালার হিন্দুস্তান! মুসলমানদের হিস্যা মেরেও শালাগো খাই মিটে নাই। এখন পাকিস্তান না ভাঙ্গলে শান্তি হচ্ছে না। পাকিস্তান ভাঙ্গা এত সহজ না। একটা মুসলমানের গায়ে একফোঁটা রক্ত থাকতেও পাকিস্তান ভাঙ্গবে না। একটু থেমে খানিকটা চোখ বাকা করে আবারো বললো, তুমি কি অস্বীকার করতে পার নিত্য, সবই হিন্দুস্তানের কুচক্র?
নিত্যরঞ্জন কোন উত্তর দিলেন না।
তোমার আর কি? পাকিস্তান ভাঙ্গলেই তো তোমার আরাম। হিন্দুরা কি আর মুসলমানের ভাল বুঝবে?
তুমি ভাল করেই জানো যে ব্যাপারটা এত সরল না। এ পরিস্থিতি একদিনে হয়নি। উত্তর দিতে শুরু করলেন তিনি। এরকমটাই সাধারণত হয়। ভাবেন যে কিছুই বলবেন না কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুখ খোলেন। যারা পাকিস্তান ভাঙ্গতে জানপাত করে দিচ্ছে তাদের মধ্যে কয়জন হিন্দু? মুসলমানইতো বেশি।
মনটা শক্ত কর রহমত, তোমাদের এত সাধের লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান আর টেকে না। আরো কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন নিত্য রঞ্জন। কিন্তু রহমতের ক্রুদ্ধ পাকানো চোখ দেখে থেমে গেলেন। প্রসঙ্গ বদলিয়ে বললেন, মনুর মেয়েটারে ক্যাম্পে দিয়ে এসেছে তোমার লোকজন, কতবার কোলে নিছি মেয়েটারে, বুকের মধ্যে খুব মোচড়ায়।
মালাউনের বাচ্চা মালাউন, ইয়া নফসী ইয়া নফসী কর! ইয়া নফসী বুঝিস? নিজে বাঁচলে বাপের নাম। গলায় বিষ ঢেলে দিয়ে হিসহিস করে উঠেছিল রহমতউল্লাহ।

সেই রাতে প্রায় সাতশ হিন্দু নারী-পুরুষ-শিশুর একটি বহর বর্ডার পেরোনোর জন্য রওনা হয়েছিল যাদের মধ্যে নিত্যরঞ্জনের শ্যালক, স্ত্রী ও দু মেয়ে ছিল। বাগেরহাটের কুখ্যাত রাজাকার রজ্জব আলী ফকিরের নেতৃত্বে বিষ্ণুখালী নদীর তীরে ডাকরা বাজার নামক একটি জায়গায় রাজাকার বাহিনীর হাতে আটক হয় তারা। রজ্জব আলী বাহিনীর কাছে সে রাতে খরচ করার মত পর্যাপ্ত গুলি ছিল না। যে কারনে রামদা, ছুরি, বল্লম জাতীয় অস্ত্র দিয়ে এতগুলি মানুষকে মারতে প্রায় সারারাত লেগে গিয়েছিল। রে যে ঘোরতর অন্ধকার ছিল, নয়তো দু’একজন প্রত্যদর্শী এমন জুটে যেত যারা রসিয়ে রসিয়ে বর্ণনা করতে পারত যে কোন এক গর্ভবতী তরুনীর পেট বরাবর রামদার কোপ বসানোর পরে ঠিক কি দৃশ্যের অবতারনা হয়েছিল। তবে কয়েক মাইল জুড়ে বিষ্ণুখালী নদীর পানি লাল টুকটুকে হয়ে গিয়েছিল- দিনের আলোতে এ দৃশ্য দেখেছিল হাজার হাজার মানুষ।

খবরটা শুনে ভগবান বলে একটা হাক দিয়ে বসে পড়েছিলেন নিত্যরঞ্জন। কোনকালেই ভগবানে বিশ্বাস না থাকলেও সেই মুহুর্তে তার কেন ভগবানের নাম মনে পড়লো তা একটা গুরুতর প্রশ্ন। বউ আর মেয়েদুটি শেষ মুহুর্তে এমনভাবে তাকে বিদায় দিয়েছিল যেন ফাঁসির আসামীকে বিদায় দিচ্ছে। তিনি নিজেও ভেবেছিলেন, যাক! এদের বাঁচানো গেল। নিজে বেঁচে থাকবেন এমন কোন আশাই করেননি। সে মুহুর্তে বাঁচা বা মরা কোনটা নিয়েই তার কোন ইতর বিশেষ ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে রহমতউল্লাহর সাথে দেখা হলে মন্দ হয় না, দু’একবার ভেবেছেন তিনি। তবে সেটা যে সম্ভব হবে তা আশা করেননি।
কিন্তু ঘটনা ঘটলো কি? বিশ্বাসের গোড়া ধরে এরকম প্রবল নাড়া লাগলে অনেক সময় চরম ধার্মিক লোককেও দেখা যায় আল্লাহ-ভগবানের নাম ধরে শাপ শাপান্ত করছে। এ কারণেই হয়তো অবিশ্বাসী নিত্যরঞ্জন ভগবানের নাম ধরে হেকে উঠলেন। কয়েকদিন অপ্রকৃতস্থের মত ঘোরাঘুরি করলেন তিনি। পাক আর্মির ক্যাম্পের আশেপাশেই বেশি দেখা যেতে লাগলো তাকে। যথারীতি ধরাও পড়লেন। ঘটনাচক্রে রহমতউল্লাহ তখন ক্যাম্পেই ছিল। সে কমান্ডারকে জানালো, লোকটা পাগল, আগে থেকেই পাগল ছিল। হিন্দু হলেও গোমাংশ ভণ করে এবং ঠাকুর দেবতায় এর কোন বিশ্বাস নেই। কমান্ডার এ কথা শুনে মজা পেলেন। হিন্দু কিন্তু দেবতা মানে না এমনকি গোমাংশ খায়- বিষয়টি কৌতুককর মনে হল তার কাছে। তিনি একে ছেড়ে দেয়ার জন্য বললেন। কিন্তু নিত্যরঞ্জন ক্যাম্প ছেড়ে গেলেন না। আশেপাশেই ঘুরঘুর করতে লাগলেন। দু’দিনের মধ্যেই দেখা গেল ক্যাম্পের সাধারণ জওয়ানরাও চেনে তাকে এবং দেখামাত্রই হাসিমুখে জানতে চায়, পাগল গোমাংশ খাবে কি না? তারপর হো হো করে হেসে ওঠে অনেকগুলি কন্ঠ। আর এভাবেই মরা হয় না নিত্যরঞ্জনের, তিনি বেচেই থাকলেন। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে রহমতউল্লাহর সাথে দেখা হওয়ার শখ পূরণ হল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই রহমতউল্লাহ খতম হয়ে যায়। এত রাজাকার বেচে গেল, কাসেম মাস্টার, সিরাজ চেয়ারম্যান; নিজের হাতেই যারা অগণিত মানুষ মেরেছে। কিন্তু রহমতউল্লাহ বাচলো না, এটা ভেবে মাঝেমধ্যে মন খারাপ হয় তার।

একা মানুষ তায় মাথার ঠিক নেই, এ কারনে প্রায় বছর দুই ছোট বোনের আশ্রয়ে তার শশ্বুর বাড়ীতে কাটিয়ে তিনি আবারো ফিরলেন চুপনগর, সম্পূর্ণ সুস্থ্য অবস্থায়। কিন্তু ভিটে ফেরত পেলেন না। কারণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুজ্জ্বল রাখার দ্বায়িত্ব যাদের ওপর অর্পিত ছিল তারাতো নিরেট নিরামিষভোজী নয়। তাছাড়া প্রায় এতগুলো দিন বাড়ীটা দেখাশুনার গুরুদায়িত্ব যে নিয়েছিল তারতো এমনিতেই একটা স্বত্ত তৈরি হয়। তদুপরি হিন্দুর বাড়ী। ইন্ডিয়া গিয়েছিল যেসব হিন্দু পরিবার, তারা সবাই ভিটে হারাল এমন নয়। তবে তাদের অনেক কায়দা কানুন করতে হয়েছিল। নিত্যরঞ্জন কোন কায়দা করলেন না। এটা তিনি জানতেনও না। স্কুলের চাকরিটা যে ফেরত পেলেন তাতেই সন্তুষ্ট ছিলেন তিনি।

ভুতপূর্ব রহমতউল্লাহ ছিলেন আমার বড় মামা। সে হিসেবে আমি মুসলিম লীগার মুকসেদ ডাক্তারের অর্থাত আমার নানার পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আমার মাথায় কি যেন গড়বড় হয়ে গেল। হলে আমার সিনিয়র এক বড় ভাইয়ের হাতে মগজ ধোলাই হয়ে আমি একটি ঐতিহ্যবাহী বামপন্থী ছাত্র সংগঠনে যোগ দিলাম। বিজ্ঞানমনস্কতা, অসা¤প্রদায়িকতার সাথে সাথে রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীদের ঘৃণা করার দীক্ষা পেলাম সমানতালে। আমার এই পতনের খবর এবং আচার আচরণ আমার পরিবারের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দারুণ একটা গোলযোগ তৈরি করল। আমাদের বিরাট পরিবারের অধিকাংশ লোকই বিএনপি বা জামাতের রাজনীতির সাথে যুক্ত। আগে পরে যাই হোক না কেন বর্তমানে তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব নিয়ে খুব চিন্তিত থাকে। আমি যেই ছাত্র সংগঠনে যোগ দিয়েছি সেটি সম্পর্কে তাদের ধারণা- এরা ভারতের পয়সা খায় আর মুসলমানদের ঈমান-আকিদা নষ্ট করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে, এইসব নানান কাহিনী। প্রথমে হুমকি-ধামকি, তারপরে পয়সা বন্ধ করার ভয় দিয়ে তারা আমাকে নিরস্ত করার চেষ্টা করল। আমি আমার মতই চলতে থাকলাম, অন্যসবও ঠিকমতই চললো।

২০০১ সালের মতার পট পরিবর্তিত হয়ে বিএনপি-জামাত জোট সরকার মতায় আসার পর সারাদেশ জুড়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছিলো। আমার নিজের এলাকাও বাদ পড়লো না। ক্যাম্পাসে থেকেই খবর পেলাম, আমার আত্মীয়-পরিজনরাই সামনে থেকে এ অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জানতাম যে তেমন কিছু করার নেই, তারপরেও ক্যাম্পাস থেকে বাড়ী চলে আসলাম। আওয়ামী লীগের নেতারা সবাই এলাকাছাড়া। তাতে তাদের কোন অসুবিধা নেই কারণ আগের পাঁচ বছরে তারা যা কামিয়ে নিয়েছে, দিব্যি কয়েক বছর হেসেখেলে পার করে দিতে পারবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের তো শাখের করাত। হিন্দু হলে তো কথাই নেই। পরিবারের যার কাছেই জানতে চাইলাম সেই বিষয়টা উড়িয়ে দিয়ে বলল, আরে, কোথায় কিসের সংখ্যালঘু নির্যাতন? এ সবই ইন্ডিয়া ও তার দালালদের অপপ্রচারণা। পরিচিতদের মধ্যে শুধু নিত্য স্যারকেই প্রকাশ্যে দেখতে পেলাম। তাকে কেউ কোন ঝামেলা করেনি কারণ তিনি আওয়ামী লীগ পছন্দ করেন না এটা সবাই জানত। আমি বাড়ীতে থাকাকালেই হুড়কা গ্রামে জনৈকা ছবি রানী বিশ্বাস বিএনপি ক্যাডারদের হাতে ন্যাক্কারজনকভাবে লাঞ্ছিত হল। যথারীতি কেউ কোন প্রতিবাদ করলো না এবং বিএনপি- জামাত এ ঘটনাকে মনগড়া বলে উড়িয়ে দিল। একা একা বেশকিছু সময় উদ্ভ্রান্তের মত ঘোরাঘুরি করে একটা মাইক ভাড়া করলাম এবং বাজারের মোড়ে একাই সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সমাবেশ শুরু করলাম। সামনে কোন লোক জড়ো হলো না তবে বাজারে অবস্থানরত লোকজন কান খাড়া করে শুনছিলো, আমি কি বলি। আমার পরিবারের কয়েকজন ক্রুদ্ধ চেহারায় উত্তেজিতভাবে আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছিল। আমি যখন বলছিলাম, ছবি রানীর লাঞ্ছনাকারীদের গ্রেফতার করতে হবে তখন এ ঘটনায় জড়িতদের কয়েকজন কাছেই ছিল। তারা পুরো ব্যাপারটিকে আমোদের বিষয় হিসেবে নিল। ভাবখানা এমন, তাদের সামনে কোন জোকার হাস্যরস প্রদর্শন করছে। এক পর্যায়ে দেখলাম, ছাতা মাথায় এক বৃদ্ধ মনযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছে। তিনি আর কেউ নন, নিত্যরঞ্জন শিউলি। বক্তব্য পর্ব শেষ হলে তিনি হাত ধরে টানতে টানতে আমাকে বাজারের মধ্যে নিয়ে গেলেন, এক হাতে শক্ত করে আমার হাত ধরে অন্য হাতে থাকা ছাতা দিয়ে আমাকে দেখিয়ে চিৎকার করে চারিদিক ঘুরে ঘুরে বলতে লাগলেন, ’মানুষ হয়েছে রে! এই ব্যাটা মানুষ হয়েছে! দ্যাখ সবাই, দিনরাত তো শুধু গরু, ছাগল আর ভেড়া দেখিস, এই দ্যাখ, একটা মানুষ। আমার ছাত্র মানুষ হয়েছে। এমনিতেই আমার কর্মকান্ডকে পাগলামী হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। তার ওপর এরকম আরেকটি নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় অনেকেই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করতে লাগল। তবে আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল অন্য জিনিস। মানুষ কি হয়েছি? যদি নাও হই তবে হতেই হবে। মানুষ হতে হবে।

সংস্কার এবং সংস্কৃতি নিয়ে নিত্য স্যারের উতসাহী হয়ে ওঠার পেছনে ভিন্ন একটি পটভুমি রয়েছে। পূর্বোক্ত ঘটনার নৈরাশ্যজনক অভিজ্ঞতায় আমি বুঝলাম, এলাকায় শক্তিশালী রাজনৈতিক ভূমিকা রাখতে হলে সংগঠন গড়ে তোলা দরকার। সে অনুযায়ী কিছু কাজ ও শুরু করে দিলাম। বেশ কয়েকজন ছাত্রের সাথে যোগাযোগ হল। ভাবছিলাম একটি রাজনৈতিক প্রশিণের কথা। সে সময় পার্টির কাজে খুলনা এসেছিলেন পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ-বুদ্ধিজীবি অধ্যাপক যতীন সরকার। যতীন সরকার অসাধারণ বক্তা। আমি খুলনায় তার সাথে দেখা করে তাকে একদিন আমার এলাকায় সময় দেয়ার অনুরোধ জানালে তিনি আনন্দের সাথেই রাজী হলেন। ছোট একটা ঘরে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। কিছু ছাত্র ও স্থানীয় স্কুল কলেজের কয়েকজন শিকের পাশাপাশি আলোচনা সভায় হাজির ছিলেন নিত্য স্যার। সবার বোধগম্য করে সংস্কৃতি নিয়ে দারুন একটা আলোচনা করলেন যতীন সরকার। ’ মানুষ হচ্ছে একমাত্র প্রাণী যে নিজের সংস্কার করতে পারে, এ কারণে মানুষ অনন্যসাধারণ। সংস্কার করে ক্রমাগত নিজের উৎকর্ষতা অর্জনের পথে মানুষ যা যা অর্জন করে তার সবই হচ্ছে সংস্কৃতি।’ মোটা দাগে এরকমই ছিল আলোচনা। আলোচনা সভা শেষ হলে নিত্য স্যার আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ’তুই আমার ছাত্র ছিলি বলেই আজ এরকম একজন বিদ্বান লোকের সাক্ষাত পেলাম।’

এরপর থেকে নিত্যরঞ্জন সংস্কার ম্যানিয়ায় আক্রান্ত হলেন। সংস্কার, সংস্কৃতি নিয়ে তিনি কিসব কান্ডকারখানা করছেন, ঢাকায় বসেই তার বিস্তারিত খবরাখবর পেতাম। বাজারে হাটতে হাটতে সবজি বিক্রেতা জোবেদ আলীকে হয়তো বলতে শুরু করলেন, ’৪০ বছর ধরে একই কাজ করছিস, এবার একটু ান্ত দে। নিজের কিছু সংস্কার কর। তুই তো মানুষ, গরু-ছাগল না! গরু ছাগলের সংস্কৃতি নেই, ওরা নিজের সংস্কার করতে পারে না। কিন্তু তোতে আর গরু-ছাগলে ফারাকটা কি আছে? ওরা বছরের পর বছর ঘাস খেয়ে যায়, আর তুই সবজি বেঁচে যাস!’ এ কথা শুনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া জোবেদ আলীর আর কিছু করণীয় ছিল না তা বেশ বোঝা যায়।

একদিন স্থানীয় হরলাল সাংস্কৃতিক একাডেমীতে গিয়েও নাকি খুব হম্বিতম্বি করেছেন। বলেছেন, ’গাড়লের দল! গান বাজনা করেই ভাব খুব সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড হচ্ছে। ছ্যা! এর নাম সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড? অত সোজা না রে, অত সোজা না। আগে বোঝ ব্যাটারা ভাল করে, সাংস্কৃতিক কাকে বলে, ইত্যাদি ইত্যাদি। স্থানীয় লোকেরা ব্যাপারটাকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। নিত্যরঞ্জন শিউলীর পাগলামীর সাথে তারা আগে থেকেই পরিচিত।

গত বছরের ১১ জানুয়ারি আমাদের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে, বলা ভাল মতা কেন্দ্রে একটা বড়সড় পরিবর্তন আসলো। কেন এ পরিস্থিতি হল সে প্রোপট সবাই জানেন, খামোখা কথা বাড়ানোর দরকার নেই। এ পরিবর্তনের পর কিছু নতুন ঘটনাপ্রবাহ দৃশ্যমান হল মানুষের সামনে। বড় বড় দূর্নীতবাজ যারা রাজার হালে এতকাল কাটিয়ে দিয়েছে, তারা ধরা পড়ে বিচারের আওতায় আসা শুরু হল। রাজনৈতিক সংস্কারের কথাবার্তা আলোচনা হতে লাগল বেশ জোরেসোরে। এর মধ্যে আমার ব্যক্তিগত জীবনে বিভিন্ন ধরণের সংস্কার ঘটে গেছে। ছাত্রজীবন শেষ করেছি, সেই সাথে রাজনৈতিক জীবনের ডামাডোলের কালও। যথারীতি রুটি-রুজির ধান্ধায় নানারকম ব্যস্ততা তৈরি হয়েছে। নামকাওয়াস্তে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ আছে কিন্তু তেমন কোন কাজকর্মে অংশ নিই না। প্রতিদিনই ঘুমোনোর আগে একবার ভাবি, নাহ, পার্টির কাজকর্ম জোরদারভাবে শুরু করা দরকার, কিন্তু ঐ পর্যন্তই! এর মধ্যে হঠাৎ একটা ফোন পেলাম। গমগমে গলায় একজন বলল, বিল্লাহ, চিনতে পারছিস, আমি তোর নিত্য স্যার,সংস্কার তো শুরু হয়ে গেছে রে ব্যাটা! এবার তো ঘটনা ঘটে যাবে।’ বলা বাহুল্য, আমি তার মত অত উৎসাহী ছিলাম না, বরং সংস্কারের আড়ালের ঘাপচিকগুলো নিয়েই বেশি ভাবছিলাম। আমার ভাবনা তাকে গুছিয়ে বলার চেষ্টা করলাম। বললাম অনির্বাচিত সরকার বেশিদিন থাকার ঝুকিগুলো কি রকম, বিদেশীরা এ ধরণের সরকার দিয়ে কিভাবে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে। এসব কথায় তিনি ততটা পাত্তা দিলেন, উল্টো আমাকে দোষারোপ করলেন এই বলে, ’তোরা বেশি বুজতে গিয়ে কোন কিছুই পরিবর্তন করতে পারিস না।’ আমি মনে মনে কামনা করল
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×