গত রোববার আইনমন্ত্রী ব্যরিস্টার শফিকুর রহমান কানাডাস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের বরাত দিয়ে বলেছেন বঙ্গবন্ধুর খুনী নূর চৌধুরীর পাসপোর্ট কানাডয়া জব্দ করা হয়েছে। এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এমনকি এই সংবাদটি মিডিয়ায় ফলাও করে প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আবার অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সাহারা খাতুন আইনমন্ত্রী এ কথা প্রসংগে সাংবাদিকদের বলেছেন, যারা পালিয়ে আছে তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। তারা দ্রুত স্থান বদলের কৌশল নিয়েছে।
অনুসন্ধানে এবং বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামী লে: কর্ণেল (অবঃ) নূর চৌধুরী দীর্ঘদিন যাবত লন্ডনে বসবাস করে আসছে। ঘাতক নূর চৌধুরী পূর্ব লন্ডনেই রয়েছেন ছদ্মনামে এবং পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করছেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নূর চোধুরীর প্রকৃত অবস্থান কেউ সনাক্ত করতে পারেনি। বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ পেয়েছিল যে নূর চৌধুরী লিবিয়া অথবা আমেরিকায় আছেন।কিন্তু খোদ নূর চৌধুরীর উক্তিতেই প্রকাশ পায় যে, দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে তিনি লন্ডনে বসবাস করছেন। পূর্ব লন্ডনের বাঙালী অধ্যুষিত এলাকার ডকল্যান্ডের ওয়েস্টফেরী এলাকায় তার ভাতিজীর সাথে বসবাস করছেন বলে জানা যায়। ব্রিকলেনে তাকে প্রায়ই প্রতি শুক্রবার দেখা যেত। এমনকি প্রায়শ জোহরের নামাজ পড়তো ব্রিকলেন মসজিদে। বর্তমানে খুব খোদাভীরু নূর চৌধুরী নামাজের পর আহাজারির মাধ্যমে আল্লাহর কাছে কাকুতি মিনতি করে তাকে বিপদমুক্ত করার জন্য সবসময় প্রার্থনা জানিয়ে থাকে বলে তার এক প্রতিবেশী জানান। তিনি এখনো ছিমছাম এবং পরিপাটিভাবে চলাচল করলেও তার শরীরে পড়েছে বয়সের চাপ। অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার হিসেবে এখনও নিয়মিত ব্যায়াম করছেন স্থানীয় উইভার্স ফিল্ড মাঠে। এমনকি নূর চৌধুরী চলাফেরা এবং কথাভঙ্গিতে এখনো সামরিক স্টাইল লক্ষ্য করা যায় বলে জানান স্থানীয় একটি পত্রিকার সম্পাদক রহমত আলী। তিনি প্রায় বছর তিনেক ধরে তার সাথে চলাফেরার প্রতি পর্যবেক্ষণ করে আসছেন।
ব্রিকলেনের মুনসুন রেষ্টেরেন্টের মালিক শামস উদ্দিন ইউকেবিডিনিউজকে জানান, একদিন ভ্যালেন্স রোডে নূর চৌধুরীর সাথে দেখা। তখন হঠাৎ করেই কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমিই নূর চৌধুরী এবং বঙ্গবন্ধুকে আমি নিজ হাতেই খুন করেছি।’ অপ্রস্তুত হয়ে এই কথা বলার পর তিনি চলে যান। একথা শুনার পর শামস উদ্দিন নিজেই চমকে উঠেন। এরপর শামস উদ্দিন এই ঘটনা বিভিন্ন মহলে জানালেও কোন সাড়া পড়েনি। এমনকি তিনি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সাথে এ ব্যাপারে কথা বললেও তারা বলে, বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়ে অবহিত না করলে তারা কিছুই করতে পারবে না।
বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, লন্ডনে নূর চৌধুরী স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং তার ছদ্মনাম হলো ‘এখলাছুর রহমান’। এই নামে তিনি গত ২০০৬ সালের প্রথমদিকে বাংলাদেশ সফর করেছে বলে জানা যায়। ইতোমধ্যে তিনি হজ্ব করেছেন বলেও জানা যায়। এখানে তার ডাক নাম ‘হাজী’।
বাংলা টাউনে পার্শ্ববর্তী একটি ফ্রিহোল্ড ফ্ল্যাটে থাকতেন তিনি। অনেকের মতে লন্ডনে আসার পর থেকে তিনি এই ফ্ল্যাটেই থাকছেন। তার পাশ্ববর্তী ফ্ল্যাটের বাসিন্দা জানান তিনি এই ফ্ল্যাটে ২০ বছর ধরে তাকে দেখছেন। তবে বর্তমানে তিনি ডকল্যান্ড এর ওয়েস্টফেরী রোডের একটি বাড়িতে থাকে বলে জানা যায়। সর্বশেষ তথ্যমতে, এই ফ্ল্যাটটি তিনি বিক্রি করতে চাচ্ছেন।
বঙ্গবীর ওসমানী স্মৃতি ট্রাস্ট এর সভাপতি আবুল কাশেম খান গত বৃহস্পতিবার (৩নভেম্বর) বলেন, ’ এই ব্যক্তিকে আমি প্রায়শ দেখি ভ্যালেন্স রোড দিয়ে হেটে যেতে এবং গত সপ্তাহে দেখেছি হোয়াইটচ্যাপেলস্থ পোস্ট অফিসে গিয়ে চিঠি পোস্ট করতে।
কর্ণেল নূর চৌধুরী পূর্ব লন্ডনের একটি কাপড়ের দোকানে ৩/৪ বছর কাজ করেছেন বলে জানা যায়। বর্তমানে ডকল্যান্ড বা স্ট্রাটফোর্ড এলাকার একটি সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন বলে জানা যায়।
উল্লেখ্য, বিদেশে পালিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত নূর চৌধুরীসহ পলাতক আসামির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল রেড এলার্ট জারি করেছে। গত জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ফ্রান্সে অবস্থিত ইন্টারপোলের সদর দপ্তর থেকে এ রেড এলার্ট জারি করা হয়।
নূর চৌধুরী বর্তমানে একপ্রকার খোদাভীরু হয়ে পড়েছে। তিনি নিয়মিত মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করেন। নামাজের সময় প্রায়শই আহাজারি করে আল্লাহর কাছে আকুতি মিনতি করে বিপদ থেকে রক্ষা পেতে।- এমনই তথ্য মিলে একটি মহল থেকে।
গত ১৯ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় ঘোষনার পর বঙ্গবন্ধু পরিষদ যুক্তরাজ্য শাখা ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এর যুক্তরাজ্য ইউনিট এর নেতৃবৃন্দ পূর্ব লন্ডনের আলতাফ আলী পার্কের শহীদ মিনার থেকে ব্রিকেলেনে দিয়ে আসতেই নূর চৌধুরী দেখতে পেয়ে তাড়া করলে নূর চৌধুরী ওল্ড মন্টিগিউ স্ট্রীট দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন বলে জানান স্থানীয় এক কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব। তিনি আরো বলেন, হয়তো সেদিন হত্যা মামলার রায় শোনার পর নূর চৌধুরী পাগলের মতো ছুটাছুটি করতে থাকেন। সেদিন কর্মাশিয়াল স্ট্রীট এর পুরানো বাসা থেকে নতুন বাসায় আসার পথেই এই ঘটনার শিকার হন।
এ বিষয়ে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনে যোগাযোগ করলে মো: ইকবাল হোসাইন খান ইউকেবিডিনিউজকে বলেন, 'আমরা এ বিষয়ে এখনো কোন তথ্য পাইনি। তবে, বেশ কিছুদিন আগে একটি পত্রিকায় এই ধরণের একটি সংবাদ আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছিল।'
এ ব্যাপারে বৃহস্পতিবার (৩নভেম্বর) কানাডাস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনার এ এম ইয়াকুব আলী ইউকেবিডিনিউজকে জানান, 'নূর চৌধুরীর কানাডার অবস্থান সম্পর্কে আইনমন্ত্রী যা বলেছেন- তা পুরোপুরি সত্য। এর বাইরে আমাদের বলার কিছু নেই। এবং এই পাসপোর্টটি বাংলাদেশী পাসপোর্ট।
নূর চৌধুরীর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কিনা এবং তার কোন ছবি আছে কিনা এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন 'প্রাইভেসি এ্যাক্ট এর কারণে এটা প্রকাশ করা যাচ্ছে না। আমি আর কোন কিছু বলতে চাচ্ছি না। অগ্রগতি থাকলে আমরাই আপনাকে জানাবো'।
গত মঙ্গলবার এ বিষয়ে কানাডার একটি পত্রিকার সম্পাদক এর সাথে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি আইনমন্ত্রী কানাডায় আসলেও স্থানীয় সাংবাদিকরা তার কিছুই জানে না। এমনকি এই নূর চৌধুরীর এই ঘটনা নিয়ে কানাডায় সাংবাদিকদের মধ্যেও দ্বিধাবিভক্তি লক্ষণ করা গেছে। কানাডায় বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিনিধির সাথে কথা বলে নিউজ এর ভিত্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, হাই কমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতেই তারা এ সংবাদ পরিবেশন করেছে।
নূর চৌধুরীকে কেউ কি কানাডায় দেখেছে কিনা- এ প্রশ্নের জবাবে ইউকেবিডিনিউজকে তিনি বলেন, 'আমরা খবর পেয়েছি তিনি আছেন এবং হাই কমিশন এ খবর আমাদের দিয়েছে। দেশে একই খবর প্রকাশিত হয়েছে। এটাই তো প্রমাণ করে নূর চৌধুরী কানাডায় আছেন।' আবার অপর দিকে অন্য একটি মহল বলছে, কানাডাস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনার এ এম ইয়াকুব আলী নিজ পদোন্নতির জন্য সরকারের কাছে এমন তথ্য প্রদান করেছে। একই সূত্র জানায়, হাই কমিশনার এ এম ইয়াকুব আলী বর্তমান আইনমন্ত্রীর দূর সম্পর্কে আত্মীয়। তবে এ সম্পর্কে আর বিস্তারিত বলতে তিনি অনিচ্ছুক।
৩০ বছর ধরে পলাতক নূর চৌধুরী বাংলাদেশী পাসপোর্টে কানাডায় স্থায়ী হবার বিষয়টি নিয়েও নানা জল্পনা কল্পনা সৃষ্টি হয়েছে। এতো দীর্ঘকাল সময়ে যে কোন দেশে বসবাস করলে সে দেশের নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। এ সত্ত্বেও নূর চৌধুরী কেনই বা বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে কানাডায় স্থায়ী হবার আবেদন জানাবো - এমনই মন্তব্য করেন রহমত আলী।
বিভিন্ন মহল মনে করে, কানাডা হাই কমিশনের কাছে যদি পাসপোর্ট জব্দ করা মানেই এ নয় যে নূর চৌধুরী কানাডায় রয়েছে। আর যদি কানাডায় থেকে তাকে তবে হাইকমিশন নূর চৌধুরী কোন ছবি কেন প্রকাশ করে নি। এক ধরণের বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে সরকার।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



