বিপদ বার্তা / বার্তার বিপদ!:
সকাল ৭ টা। আমি চিফ অফিসারের সাথে জাহাজের ব্রিজে নেভিগেশন ওয়াচ করছি। আমার জাহাজের নাম এম. ভি. বঙ্গ বিরাজ। এটা এইচ. আর সি শিপিং কোম্পানির কন্টেইনার বাহী জাহাজ। জাহাজ সিঙ্গাপুর থেকে কন্টেইনার নিয়ে বাংলাদেশ যাচ্ছে। মায়ানমার থেকে বেশ কিছু দক্ষিনে আমাদের জাহাজ।
আর এক দিন পর বাংলাদেশে পৌছে যাব- ভাবতেই মনটা খুসিতে ভরে গেল! কতদিন পর দেশে ফিরছি!
আমি জাহাজের জুনিয়র অফিসার, আমি চিফ অফিসারের আসিস্টান্ট। তাই ওনার সাথে ডিউটি করতে হয়। আমি দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ওয়াচ করছি আর চিফ অফিসার রাডার-এর দিকে তাকিয়ে আছেন। এমন সময় জাহাজের ক্যাপ্টেন এফ. আর চৌধুরী স্যার ব্রিজে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলেন। আমরা দুজনই স্যারের দিকে তাকালাম।
স্যার বললেন-জামান(চিফ অফিসারের নাম), অফিস থেকে ফোন এসেছে , আমাদের কোম্পানির বঙ্গ বার্তা জাহাজটা নাকি গলফ অফ ইরাওয়ার্দি (ঠিক মায়ানমারের দক্ষিনে) -তে নষ্ট হয়ে আছে। ওই জাহাজের ইঞ্জিনিয়াররা বলতেছে ওরা ইঞ্জিন ঠিক করতে পারতেছেন। অফিস থেকে অর্ডার আসছে আমরা যেন আমাদের জাহাজ নিয়ে এখনি যাই। ওখানে যাওয়ার পর বাকি ইনস্ট্রাকশন দেবে।
চিফ অফিসার আমাকে বললেন- রিয়াজ, টেক দ্যা হুইল ইন হ্যান্ড।
আমি জাহাজের স্টিয়ারিং অটো থেকে হ্যান্ডে নিলাম। ভাবছি কাল দেশে যাওয়ার কথা আর এখন একটা ঝামেলা এসে পড়ল । মনে মনে গালি দিয়ে বঙ্গ বার্তা জাহাজের ইঞ্জিনিয়ারদের গুষ্টি উদ্ধার করলাম!
চিফ অফিসার বললেন- রিডিউস দ্যা শিপ'স কোর্স 349 টু 085।
আমি বললাম- ওকে স্যার।
বিপদের উপর বিপদ!-
বিকেল ৫ টায় বঙ্গ বদরের পিছনে নোঙ্গর করলাম আমরা। দুই জাহাজের দুরত্ব ৩০০ মিটার। মায়ানমার থেকে ৬৫ নটিক্যাল মাইল দক্ষিনে। সাগরের মেজাজ মর্জি ভালো না । সাগরে বিশাল বিশাল ঢেউ আকাশ কিন্তু পরিস্কার। আকাশে থেকে থেকে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে যাচ্ছে।
আসেপাসে অন্য কোনো জাহাজ নেই। দুরে কতগুলো বার্মিজ ফিশিং বোট মাছ ধরছ। আমাদের ধরে কাছে কেউ আসছে না।
আসল কাহিনী হলো বার্তা জাহাজের মেইন ইঞ্জিনের ক্রেন্ক শ্যাফট ভেঙ্গে গেছে। এটা জাহাজের জন্য বিশাল এক দুর্ঘটন। এখন এই জাহাজ ঠিক করাতে হলে ড্রাই ডকে নিতে হবে। অফিস থেকে আমাদের ক্যাপ্টেন স্যারের নিকট ম্যাসেজ আসলো যেন আমাদের চিফ ইন্জিনার কে রাতের মাঝেই ওই জাহাজে লাইফ বোট দিয়ে পাঠানো হয়। আমাদের চিফ ইঞ্জিনিয়ার ওই জাহাজের ইঞ্জিন দেখে ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়ার পর বাকি সিধান্ত নেওয়া হবে।
কিন্তু আমাদের ক্যাপ্টেন বললেন- এখন সাগরের কন্ডিশন ভালো না, সাগর শান্ত হলে তারপর লাইফ বোট নামানো হবে।
আমাদের চিফ ইঞ্জিনিয়ার স্যারের নাম লুত্ফর রহমান, বয়স ৫৭, খুব নামকরা মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। উনি অফিসের কথা শুনে মুখ কালো করে বললেন- এই বয়সে জাহাজে এসে কি বিপদে পড়লাম! সাগরের যে অবস্থা তাতে যদি লাইফ বোট নামানো হয় তবে জীবন নিয়ে ফিরতে পারব কিনা সন্দেহ!
উদ্ধার টিম-
উদ্ধার টিম গঠন করা হবে মানে লাইফ বোটে করে কে কে বার্তা জাহাজে যাবে ত়া ঠিক করা হবে। সব অফিসার এবং ক্রু অফিসার্স মেস রুমে মিটিঙে বসলো।
ক্যাপ্টেন স্যার বললেন- আমি যে টিম ঠিক করেছি সেখানে আজ রাতে সাগর শান্ত হলে লাইফ বোটে করে টোটাল ৬ জন বার্তায় যাবে। ডেক সাইড থেকে ৩ জন আর ইঞ্জিন থেকে ৩ জন। টিম ইনচার্জ চিফ অফিসার জামান, স্টিয়ারিং করবে থার্ড অফিসার জাকির, সাপোর্টে থাকবে ডেক ওয়েল্ডার হাবিব, আর ইঞ্জিন থেকে চিফ ইঞ্জিনিয়ার, লাইফ বোট ইঞ্জিন মেন্টেন করার জন্য থার্ড ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ার আর সাপোর্টের জন্য ইঞ্জিন ফিটার মোকাররম। কারো কোনো আপত্তি আছে?
আমাদের চিফ অফিসারের বলল- স্যার, আমার একটু প্রবলেম আছে, আমি যেতে পারবনা. স্যরি...।
আমি বুঝতে পারলাম- চিফ অফিসারের কি প্রবলেম! ওনার বয়স ৪০ হয়ে যাচ্চে কিন্তু এখনো বিয়ে করেননি!! তাই ভয়ে যেতে চাচ্ছেন না!!
ক্যাপ্টেন স্যার বললেন ঠিক আছে, অন্য কেউ কি যেতে চাও?
আমি হাত তুলে বললাম স্যার আমি যেতে চাই।
ক্যাপ্টেন বললেন- তোমার বয়স কম।আর তুমি মাত্র শিক্ষানবিশ। তোমাকে যেতে দেওয়া ঠিক হবে না। তবু যখন যেতে চাইছ, ঠিক আছে তুমি যাও। আর তাহলে টিম ইনচার্জে হবে থার্ড অফিসার জাকির। এখন যে যার কেবিনে গিয়ে শুধু অপেক্ষা কর, যখন সাগর শান্ত হবে তোমাদের দেকে দেওয়া হবে।
ভয়!-
রাত ৮ টা সাগর মোটামুটি শান্ত। আমরা ৬ জন লাইফ জেকেট পরে রেডি হয়ে লাইফ বোটের সামনে দাড়িয়ে আছি। আমার মন খুব ভালো যে ক্যারিয়ারের শুরুতে এত বড় একটা ওভিযান চলে আসবে এটা ভাবতেই পারিনি!
একটু যে ভয় লাগছে না ত়া কিন্তু নয়, নানা ধরনের উল্টা পাল্টা চিন্তা মাথায় আসছে- যদি মাঝ পথে লাইফ বোটের ইঞ্জিন নষ্ট হয় যায়, কিনবা ঢেউ এর সাথে যদি এতটুকু লাইফ বোট উল্টে যায়! আরো কত কি!!
তবে আশার কথা কিছু দুরেই মায়ানমার আর এই দিকের সাগরে হাঙ্গর নেই!
থার্ড স্যার জাকির এর বয়স কম, মাত্র ২৬ বছর তাই তার সাথে আমার সম্পর্ক খুব ভালো। উনি বললেন কি রিয়াজ- ভয় লাগছে? আরে ভয়ের কিছু নাই।
আমি বললাম স্যার আপনার তো বউ বাচ্চা আছে, আপনার ভয় লাগছে না?
উনি বললেন- হেই ম্যান, ভয় পেলেই ভয়, এর তোমার তো গার্ল ফ্রেন্ড আছে!
আমি বললাম স্যার- মনে মনে গার্ল ফ্রেন্ড এবং বাবা মায়ের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি!
স্যার হেসে বললেন- ধুর বোকা!
আমার চন্দ্রাভিযান!-
একটু পর বোট নামানো হবে। অন্য ক্রুরা লাইফ বোটে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উঠাচ্ছে যেমন- ম্যাগনেটিক কম্পাস, অতিরিক্ত ডিজেল, খাবার পানি, শুকনা খাবার ইত্যাদি। এগুলো নেওয়া হলো কারণ যদি মাঝ পথে লাইফ বোটের ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায় তাহলে যেন আমরা সারভাইভ করতে পারি।
একটা 22 mm এর বিশাল রশির এক প্রান্ত দেওয়া হলো বোটে যার এক প্রান্ত থাকবে আমাদের জাহাজে এর অন্য প্রান্ত আমরা লাইফ বোটে করে বার্তায় নিয়ে যাব, যদি টোয়িং করা লাগে!
ক্যাপ্টেন প্রয়োজনীয় কথা বার্তা শেষ করার পর অবশেষে আমরা সবাই লাইফ বোটে উঠলাম। আমাদের জাহাজের সব মানুষ ডেকে দাড়িয়ে আমাদের উত্সাহ দিচ্ছে।
লাইফ বোট থাকে জাহাজের উপরে । ওটাকে হাইড্রলিক মটর দিয়ে আস্তে আস্তে নামানো হচ্ছে । আমরা সবাই শক্ত হাতে বোট ধরে আছি ।
লাইফ বোটের তলা যখন সাগরের সাথে স্পর্শ করলো তখন লাইফ বোট হঠাত করে ঝাকি খেল ।আমি সাথে সাথে হাইড্রলিক মটরের সাথে লাইফ বোটের সংযোগ অয়ার রিলিজ করে দিলাম। সাথে সাথে থার্ড ইঞ্জিনিয়ার লাইফ বোট ইঞ্জিন স্টার্ট দিলেন । সাথে সাথে লাইফ বোট চলতে শুরু করলো ।
আমি মোটা রশির এক প্রান্ত বোটের একটা শক্ত পয়েন্টে বেধে নিলাম । বোট যত সামনের দিকে যাচ্ছে আমাদের জাহাজ থেকে রশি ছাড়ছে । বোটের সাথে সাথে চলতে শুরু করলো রশি ।
সাগরে নেমে বুঝলাম সাগর এখনো পুরোপুরি শান্ত হয়নি । ঢেউ আসছে বড় বড় । এক একবার লাইফ বোট ঢেউ এর উপর থেকে নিচে আছড়ে পরছে । এর আছড়ে পরার সাথে সাথে সাগরের লোনা পানি সবাইকে ভিজিয়ে দিচ্ছে !
শক্ত হাতে বোটের স্টিয়ারিং ধরে আছেন জাকির স্যার । তবু কেন যেন লাইফ বোট পোর্ট সাইডে (বাম দিকে) কাত হয়ে যাচ্ছে ! লাইফ বোটের ইঞ্জিনের শব্দে কানে তালা লেগে যাওয়ার যোগাড়!
আমি চিত্কার দিয়ে জাকির স্যারকে বললাম- স্যার! রশির জন্য বোট কাত হয়ে যাচ্ছে! সাগরের স্রোত রশি টেনে নিয়ে যাচ্ছে!!!
জাকির স্যার চিত্কার দিয়ে বললেন- রশি খুলে ফেল তাড়াতাড়ি!
বোট কাত হয়ে যাচ্ছে, আমি রশি খুলতে চেষ্টা করলাম। অন্ধকারে রশির গিট্টু বুঝা যাচ্ছে না । এদিকে বোট কাত হয়ে যাচ্ছে- সেই সাথে বোট ঢেউ এর উপর থেকে আছড়ে পরছে!
সব মিলিয়ে আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। কি করব বুঝতে পারছি না। মনে হলো আজ আমাদের সবার সলিল সমাধি হবে । বাবা মায়ের কথা খুব মনে পড়ে গেল তখন ।
হটাথ মনে হলো আমার পকেটে একটা সি ম্যান নাইফ আছে !! সাথে সাথে ওই নাইফটা দিয়ে মত রশি টা কেটে দিলাম!! সাথে সাথে বোট সোজা হয়ে গেল!!
এতক্ষণ আমাদের জাহাজের লোকজন আমাদের অবস্থা দেখে চিত্কার করছিল কিন্তু বোট সোজা হতে দেখে সাথে সাথে আমাদের জাহাজের লোকজন উল্লাসে চিত্কার করে উঠলো ।
আমি আনন্দে কেদে ফেললাম!
তারপর সুধু ঢেউ এর সাথে যুদ্ধ-ওটা জাকির স্যারের টেনশন । তবে উনি খুব ভালই স্টিয়ারিং করছেন । আমরা এতক্ষণে মাত্র ২৫ মিটারের মত সামনে এগিয়েচি! এখন এর কোনো সমসসা হচ্ছে না। শুধু বড় বড় ঢেউ আসছে অবিরামভাবে..
আমি শক্ত করে লাইফ বোট ধরে আছি এমন সময় আমি দেখলাম আমার জীবনের সবচাইতে সুন্দর দৃশ্য! পূব আকাশে চাঁদ উঠছে!! ঠিক সাগরের পানির সমতলে! হলুদ থালার মত বিশাল এক চাঁদ!! আমাদের বোটের হেডিং ঠিক চাঁদের দিকে! আমার মনে হচ্ছে আমরা এই রাতের বেলা সমুদ্র দিয়ে চন্দ্র বিজয়ে যাচ্ছি..
ঢেউ এর আছড়ে পড়া পানিতে আমি ভিজে যাচ্ছি, চোখ জালা করছে তবু আমি অপলক নয়নে তাকিয়ে আছি চাঁদের দিকে!!
অভিযানের সমাপ্তি-
অবশেষে বার্তায় নিরাপদে গেলাম। ওই জাহাজের ক্যাপ্টেন এর নাম ক্যাপ্টেন কাজী নওশের উজ জামান । উনি সহ বার্তার সব অফিসার ক্রু সবাই ডেকে এসে দাড়িয়ে আছে । আমাদের সবাইকে নিয়ে আনন্দ মিছিল হলো!
জাহাজে উঠার পর চিফ ইঞ্জিনিয়ার স্যার, থার্ড ইঞ্জিনিয়ার স্যার, মোকাররম, হাবিব ইঞ্জিন রুমে ফল্ট সার্ভে করতে চলে গেলেন।
আমি এর জাকির স্যার দুজন দুই কেবিনে ঢুকে ঘুম!
চিফ ইঞ্জিনিয়ার ফল্ট সার্ভে করে বললেন- এই ফল্ট সরাতে হলে ড্রাই ডক করা ছাড়া উপায় নাই । বার্তাকে চট্ট্রগ্রাম নিতে হবে ।
অফিস বলল - তাহলে বিরাজ যেন বার্তা কে টোয়িং করে দেশে নিয়ে আসে ।
পরদিন দুপুরে আমরা লাইফ বোট নিয়ে আমাদের জাহাজে ফেরত আসলাম। সাগর মোটামুটি শান্ত ছিল, কোনো সমসসা হয় নি।
এইবার আর ভুল করি নাই! যে রশিটা বার্তা থেকে বিরাজে নিয়ে এসেছি ওটা খুব চিকন ছিল, তাই আর সমসসা হয় নাই। তারপর বার্তা কে টোয়িং করার এরেন্জমেন্ট করতে করতে রাত হয়ে গেল। তারপর জাহাজ ছাড়তে ছাড়তে রাত ৩ টা বেজে গেল।
আমাদের জাহাজ বঙ্গ বার্তার পিছনে নোঙ্গর করেছে।
অভিযানের পরদিন দুপুরে আমরা বঙ্গ বার্তা থেকে আমাদের জাহাজে ফেরত আসছি।
অভিযানের পরদিন দুপুরে আমরা বঙ্গ বার্তা থেকে আমাদের জাহাজে ফেরত আসছি।
আর ভুল করিনি! এইবার চিকন রশি!!
মাঝ সমুদ্রে বঙ্গ বার্তাকে আমাদের জাহাজ বঙ্গ বিরাজ টেনে নিয়ে যাচ্চে!
চট্ট্রগ্রাম বহি: নোঙ্গরে আমরা বার্তাকে ছেড়ে দিয়ে বন্দরের দিকে চলে যাচ্ছি।
সবাইকে ধন্যবাদ ।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০১১ বিকাল ৫:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



