somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভারতকে মেহমানদারী করার জন্য ৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিল বাংলাদেশ: কঠিন শর্তে ও উচ্চ সুদে

০৭ ই আগস্ট, ২০১০ রাত ৮:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



উচ্চহারে সুদ এবং বিভিন্ন কঠিন শর্ত মেনে ভারত থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণগ্রহণের চুক্তি হলো আজ। ভারতের একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে এ ঋণ নেয়ার ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিশেষজ্ঞরা আপত্তি জানিয়েছিলেন। অর্থনীতিবিদরা এ চুক্তিকে অন্যায্য, অসম এবং একতরফা বলে মন্তব্য করেছেন। তারা মনে করেন, এর চেয়ে সহজ শর্তে অভ্যন্তরীণ খাত বা অন্য কোনো ঋণদানকারী সংস্থা থেকেই এ অর্থের জোগান দেয়া যেত।

আবার এ ঋণ ব্যবহৃত হবে ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার সুবিধার্থে বাংলাদেশের সড়ক ও রেলপথ উন্নয়নের জন্য। এছাড়া ঋণের টাকায় প্রকল্পে ব্যবহৃত মেশিনারিজ ও উপকরণ ভারতের কাছ থেকেই কিনতে হবে। ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে সুদ, কমিটমেন্ট ফি নামে অতিরিক্ত সুদ এবং খেলাপি হলে আরও ২ শতাংশ হারে জরিমানা দিতে হবে। ২০ বছর মেয়াদি এ ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশ সরকার ব্যর্থ হলে সুদের দ্বিগুণ জরিমানা গুনতে হবে। এছাড়া শর্ত অনুযায়ী ১৪ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে বার্ষিক ফির অতিরিক্ত দশমিক ৫০ শতাংশ জরিমানাও গুনতে হবে। এছাড়া প্রস্তাবিত চুক্তিতে সব ধরনের পণ্য ও সেবা ভারত থেকে সরবরাহের কথা বলা হয়েছে। অর্থাত্ এ চুক্তির আওতায় সব পার্চেজ, কন্ট্রাক্ট ভারতীয়রাই করবে। ৮৫ শতাংশ পণ্য কেনাকাটা পরামর্শক ও সেবা নেয়া হবে ভারত থেকে। আর ১৫ শতাংশ নেয়া হবে বাংলাদেশ থেকে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (ইআরডি) এক কর্মকর্তা জানান, অতীতে বাংলাদেশ কখনও এ ধরনের কঠিন শর্তে কোনো ঋণ নেয়নি। এ ধরনের একতরফা ভারতের অনুকূলে সব সুবিধা রেখে চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এরই মধ্যে রেলওয়ে, রোড অ্যান্ড হাইওয়ে এবং শিপিংসহ ১৪টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে ঢাকা। ১ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১৪ প্রকল্পের জন্য প্রাক্কলিত অর্থের অতিরিক্ত অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হবে—এখন তার বিভিন্ন প্রস্তাবনা নিয়ে কাজ চলছে। এক্ষেত্রে ভবিষ্যতে ভারতের প্রয়োজনে আশুগঞ্জ বন্দর ব্যবহার হতে পারে—এ চিন্তা থেকে নদী খনন এবং আশুগঞ্জ বন্দর সংস্কার ও উন্নয়ন এবং ভারত থেকে রেল কোচ আমদানি প্রকল্পের কথা ভাবা হচ্ছে।

শর্ত কড়া সুদ বেশি : ভারতকে ট্রানজিট দেয়ার কাজে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য এ ঋণে সুদের হার সাধারণ ঋণের সুদের চেয়ে অনেক বেশি। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট (জটিল ঋণ) বলা হয়। সরবরাহকারী সংস্থার শর্ত অনুযায়ী এ ঋণের অর্থ ব্যবহার করতে হয়। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে যেসব ঋণ দেয় তার জন্য সার্ভিস চার্জ ছাড়া আলাদা কোনো সুদ দিতে হয় না। সার্ভিস চার্জ বাবদ দিতে হয় দশমিক ৭৫ শতাংশ। সাধারণত ৩৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে এসব ঋণ পরিশোধ করতে হয়। উপরন্তু রেয়াতি সময় পাওয়া যায় আরও অন্তত ১০ বছর। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ১ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে। এ ধরনের সার্ভিস চার্জের ভিত্তিতে পাওয়া বিশ্বব্যাংকের ১৭৯ কোটি ডলারসহ এডিবি, আইএমএফসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার দেয়া প্রায় ৪০০ কোটি টাকা এখনও অব্যবহৃত পড়ে আছে। গত সেপ্টেম্বরে আইএমএফ থেকে ৭০০ মিলিয়ন ডলার সহজ শর্তে ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ মাত্র দশমিক ২৫ শতাংশ সুদে। এ অবস্থায় ভারতের কাছ থেকে কঠিন শর্ত এবং অস্বাভাবিক উচ্চসুদে ঋণ নেয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া ঋণ পরিশোধের মেয়াদও এক্ষেত্রে ২৫ বছর। অথচ এডিবি বা বিশ্বব্যাংকের ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ৪০ বছর।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আপত্তি : ঋণ প্রদানে ভারতের শর্ত নিয়ে গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ভারতের চুক্তিপত্রটির নানা অসঙ্গতি ও একপেশে শর্তগুলোর তীব্র বিরোধিতা করেন বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ, পরিকল্পনা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সুদের হার ও কমিটমেন্ট ফি বেশি বলে মত দিয়েছে। একই সঙ্গে যথাসময়ে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতায় নিয়মিত সুদ ছাড়া অতিরিক্ত সুদ আরোপের ব্যাপারেও আপত্তি জানায় তারা।

পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ ভারতের কাছ থেকে সব পণ্য ও সেবা ক্রয়ের শর্তটিকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেছে। একই সঙ্গে ঋণখেলাপের সুদ বেশি বলে আপত্তি করে তারা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভারত থেকে শুল্ক কর ও ভ্যাট পরিশোধ করেই পণ্য ছাড় করতে হবে বলে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে।

এ অবস্থায় চুক্তিটি চূড়ান্ত করার আগে ঋণে সুদের হার কমানো, কমিটমেন্ট ফি কমিয়ে দশমিক ২৫ শতাংশ করা, ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ২০ বছর থেকে বাড়িয়ে (রেয়াতি সময় ৭ বছর) ২৫ বছর করা, ঋণের ৭০ শতাংশ দিয়ে ভারতের পণ্য ও সেবা ক্রয়, বাকি ৩০ শতাংশ দিয়ে বাংলাদেশ এবং অন্য দেশ থেকে পণ্য ও সেবা ক্রয়ের ব্যাপারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোর দাবি জানানো হয়। তবে এসব দাবির কোনোটিই আমলে নেয়নি ভারত।

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী এমকে আনোয়ার ভারত থেকে কঠিন শর্তে ঋণ নেয়ার সমালোচনা করে বাংলাদেশের স্বার্থের বিপক্ষে এ চুক্তি করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তিনি চুক্তিটি করা হলে বাংলাদেশের ওপর ঋণের বোঝা আরও বাড়বে বলে মন্তব্য করেন। বিবিসির এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে ভারতের একটি আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের কারণেই সম্ভবত তারা এ ধরনের স্বার্থবিরোধী চুক্তিতে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, ট্রানজিট বা যে কোনো কারণেই হোক, প্রকল্পগুলোর সুবিধা যদি ভারতের পক্ষে যায়, তবে কোনো কঠিন শর্ত ছাড়াই তা হওয়া উচিত। আর প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া দাম বেশি হলেও তাদের কাছ থেকেই পণ্য কেনার শর্তটি অত্যন্ত অন্যায্য। তিনি বলেন, প্রকল্পগুলোর সুবিধা যেহেতু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের অনুকূলে, তাই ঋণের কোনো সুদই থাকা উচিত নয়। এ প্রসঙ্গে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এ অর্থের সঠিক ব্যবহার। ঋণের শর্ত সম্পর্কে তিনি বলেন, ভারতের শর্তের বিষয়ে এখনও আলোচনার সুযোগ আছে। যেমন ১৪টি প্রকল্পে ব্যবহৃত মেশিনারিজ এবং উপকরণ ভারতের কাছ থেকে কেনার শর্ত আছে। এক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে আন্তর্জাতিক বাজার দর থেকে তা বেশি কিনা।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই আগস্ট, ২০১০ রাত ৮:৫৫
২৩টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:০০

ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা....

বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ যে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি, তা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘ দুই দশকের দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থপাচার এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত আর্থিক অব্যবস্থাপনার ফল আজ রাষ্ট্রকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

"টেকসই অর্থনীতির: সহজ সমাধান"

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০১ লা জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:০৭



দেশ এখন অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত। ব্যাংকে তারল্য সংকট, টাকার অবমূল্যায়ন, অর্থ পাচারসহ নানা বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন। ইউনূস সরকার দেশীয় ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিয়ে কোনোভাবে জোড়াতালি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

দু-দণ্ড শান্তির পরেও যে তৃষ্ণা থাকে : বনলতা সেন - সিনেমা [স্পয়লার এলার্ট]

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ০১ লা জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪


সিনেমা হলের আলো নিভলে একটা চুক্তি হয়। পরিচালক বলেন; আমাকে বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে কোথাও নিয়ে যাব। দর্শক রাজি হয়ে চোখ মেলে বসে থাকেন। মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের বনলতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি অন্যায় করছেন, ওমর খাইয়াম!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০১ লা জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৪

আপনি সামুতে দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন। এই ব্লগে আপনার অনেক অবদান। সেই অধিকারে, যে কোন ব্লগারের লেখাকে আপনি সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু, কারো নাম নিয়ে কটাক্ষ করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?... ...বাকিটুকু পড়ুন

এমপির কাজ কি মানববন্ধন করা ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা জুন, ২০২৬ রাত ২:২০


ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটা সিনেমা দেখানো হবে। পারিবারিক সিনেমা। সেন্সর বোর্ড থেকে পাস করা। নাম "বনলতা এক্সপ্রেস।" ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি ঈদের আনন্দে মানুষকে একটু সিনেমা দেখাতে চাইল। এতটুকুই ছিল ঘটনা ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×