
পুলিশের কাছে এক সপ্তাহ আগেও তিনি হত্যা মামলায় ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত ফেরারি আসামি হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। কিশোরগঞ্জ সদর, কটিয়াদী ও বাজিতপুরের সরারচর বাজারের তিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ডাকাতি এবং আট খুনের মামলার আসামি তিনি। বাজিতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ হালিমপুর ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে তাঁকেই সংবর্ধনা দিল!
দীর্ঘ আট বছর ফেরারি থাকার পর ওই দিনই তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। ঢুলিরচর গ্রামের এ ব্যক্তির নাম মইনুদ্দীন আহমেদ (৫৯)। তিনি হালিমপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও একই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। তাঁর ফাঁসির দণ্ড হাইকোর্ট সম্প্রতি মওকুফ করেন ।
সংবর্ধনা সভায় কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মো. আফজাল হোসেন প্রধান অতিথি এবং বাজিতপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শেখ নূরুন্নবী বাদল বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাজিতপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আলহাজ মিজবাহউদ্দিন আহম্মদ। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য আফজাল বলেন, 'আমি আমার জীবনে তাঁর (মইনুদ্দীন আহমেদ) মতো এমন সৎ ও আদর্শবান নেতা দেখিনি।' তিনি মইনুদ্দীনকে 'ত্যাগী ও সাহসী' নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
হালিমপুরের ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুল কাদির বলেন, 'মইনুদ্দীন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তার মতো লোকের সংবর্ধনায় আমরা যেতে পারি না।' ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষক শাহজাহান সিরাজ কানন বলেন, 'তিনি আমাদের মুরুবি্ব ও দলের নেতা ঠিক আছে। কিন্তু তিনি নানা কর্মকাণ্ডে বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন। তাই তাঁর সংবর্ধনা সভা দলের প্রায় সব নেতা-কর্মীই বয়কট করেছেন।' ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুল আলম বলেন, 'এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে দলের পক্ষ থেকে এভাবে সংবর্ধনা দেওয়া ঠিক হয়নি।'
হালিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি কাজল ভুঁইয়া বলেন, 'মইনুদ্দীন চেয়ারম্যান থাকাকালীন এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পায়। হত্যা মামলায় ফেরারি হওয়ার আগ পর্যন্ত সে চিহ্নিত চোর-ডাকাতদের প্রধান আশ্রয়দাতা ছিল। সে ফিরে আসায় অপরাধীরা আবার বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। '
মইনুদ্দীন আহমেদ জানান, দুটি হত্যা ও ডাকাতি মামলা থেকে তিনি খালাস পেয়েছেন। একটি মামলার নিম্ন আদালতের ফাঁসির আদেশ হাইকোর্ট দুই সপ্তাহ আগে মওকুফ করেন দাবি করে তিনি জানান, ওই সব খুনসহ ডাকাতির ঘটনায় তিনি জড়িত ছিলেন না। একটি মহল ষড়যন্ত্র করে তাঁকে ফাঁসিয়েছিল। তবে মহলটি সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত বলতে রাজি হননি। তাঁর সংবর্ধনা নিয়ে বিতর্ক এবং দলের একাংশের বয়কটের কারণ জানতে চাইলে তিনি নিরুত্তর থাকেন। আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি চেয়ারম্যান প্রার্থী হবেন বলেও জানান। বাজিতপুর থানার ওসি মো. আকতারুজ্জামান জানান, দুটি মামলায় মইনুদ্দীনের খালাস পাওয়ার কাগজপত্র থানায় এসেছে।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মো. আফজাল হোসেন বলেন, 'তিনি (মইনুদ্দীন) মামলার আসামি ছিলেন। একটি মামলায় তাঁর ফাঁসিও হয়েছিল। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত তাঁকে খালাস দিয়েছেন। তাঁকে একজন ভালো মানুষ হিসেবেই জানি। আট বছর পর তিনি বাড়ি ফিরেছেন। তাই তাঁর সংবর্ধনা সভায় গিয়েছি। এ ছাড়া সংবর্ধনায় যাওয়ার আর কোনো কারণ নেই। পরে তিনি যদি কোনো ঘটনায় জড়ান, তখন নিশ্চয়ই আমি তাঁর পক্ষে থাকব না'।
বাজিতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শেখ নূরুন্নবী বাদল সংবর্ধনা সম্পর্কে বলেন, 'মইনুদ্দীন মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং একটি মামলায় ফাঁসিও হয়েছিল, এটা সত্য। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত থেকে তিনি খালাস পেয়েছেন। নাগরিক সংবর্ধনা কমিটি আমাদের অতিথি করায় আমরা সেখানে গিয়েছি, আর কিছু নয়।'
কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এম এ আফজালের বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল ফোনে (০১৭১১-৬২০০০৩) সোমবার বারবার কথা বলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ফোন বন্ধ পাওয়ায় সংবর্ধনা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
প্রসঙ্গত, বাজিতপুর থানার পুরনো 'ক্রিমিনাল রেকর্ড বোর্ড'-এ মইনুদ্দীনের ছবি প্রায় ১৫ বছর সাঁটানো ছিল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


