(এ বিষয়গুলো নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়ে গেছে জানি। তবুও আশা করছি, কিছুটা হলেও নতুনত্ব পাবেন। )
জাগো প্রসঙ্গঃ
বেশ কয়েকবছর আগে একবার নানাবাড়ীতে গিয়েছিলাম। একেবারে অজপাড়া গাঁ। আধুনিকতার ছোঁয়া তখনো এর গায়ে খুব একটা লাগে নি। একদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠেই পাশের বাড়ীর হইছই শুনতে পাই। ফ্রেশ হয়ে ভীড় ঠেলে গিয়ে দেখি বাড়ির কর্তা কপাল চাপড়াচ্ছেন। ঘটনা কি? ঘটনা হচ্ছে সিঁদ কেটে এক রাত্তিরেই ঘর ফাঁকা করে দিয়েছে সিঁদেল চোরের দল। হটাৎ পিছনে ধাক্কাধাক্কি অনুভব করলাম। ভীড় ঠেলে গা গলিয়ে দিলেন আর একজন। চুকচুক শব্দ করে বলতে লাগলেন, “আহারে! চোরটার আক্কেল দেখেছো? কিছুই বাকী রাখেনি দেখছি। হতভাগাটার কি হালটাই না করেছে।” শুনে আমিও খানিক চুকচুক করে দুঃখ প্রকাশ করলাম এবং তার সাথে সহমত পোষণ করে চলে এলাম। কিন্তু বাড়ী এসে যা শুনলাম, তাতে তো আমার ভিরমি খাওয়ার যোগাড়। ঐ লোকটা নাকি মদনচোরার ছেলে, চুরি ঘটনাতে যার দিকেই কিনা সবার সন্দেহের আঙ্গুল। কিছুদিন পরে জেনেছিলাম যে, এই সন্দেহ নাকি সত্যি বলে প্রমাণিতও হয়েছিলো।
এখন ভাবুন তো, আপনি যদি ঐ গৃহকর্তা হতেন, তাহলে চোরের পুতের এই সহানুভূতির বাণী আপনার কানে কেমন লাগতো?
তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর নির্বাচন নিয়ে চারদিক তখন উত্তপ্ত। বিশেষত কাস্তে মিছিল আর লগি-বৈঠার আন্দোলনে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। তখন কতিপয় রাজনৈতিক কর্মী কোনো এক হরতালের আগের রাতে আগুন ধরিয়ে দেয় এক হতভাগ্য সিএনজি চালকের গাড়িতে। অগ্নিদগ্ধ সিএনজি চালক হাসপাতালের বেডে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন দু’জনই তাকে দেখতে হাসপাতালে যান এবং সমবেদনা জানান। কিন্তু গ্রেফতার হয় নি দায়ীদের কেউ, এমনকি তাদের পরিচয়ও উদঘাটিত হয় নি, জানা যায় নি তারা প্রকৃতপক্ষে কোন দলের কর্মী এবং কার ইশারায় এত বড় অমানবিক একটা কাজ করতে তাদের হাত কাঁপলো না।(লিঙ্ক দিতে পারছি না। কিন্তু এ ঘটনা তখন পত্রিকা ও টিভিমাধ্যমে বেশ সমালোচনার ঝড় তুলেছিলো। তাই অনেকেরই মনে থাকার কথা।)
এখন, নেত্রীদের ঐ সান্ত্বনাবাণী ক্ষতিগ্রস্ত সিএনজি-চালক এবং তার পরিবারের কাছে কতটুকু সান্ত্বনার? সেটা নিশ্চয়ই ভাবনার অবকাশ রাখে?
গার্মেন্টস, শিল্পকল-কারখানাগুলোতে বেতন-বোনাস নিয়ে আন্দোলনের ঘটনাটা বাংলাদেশে এখন আর নতুন কিছু নয়। গত কয়েকবছরে এটা বেশ সাধারণ একটা ব্যাপারেই পরিণত হয়েছে। অনেকসময় রুটিরুজির এই আন্দোলন করতে গিয়ে অনেক মেহনতি মানুষ জীবন পর্যন্ত দিতে হয়। আমরা যাদের টোকাই বলি, তাদের অনেকেরই হয়তো জন্মপরিচয় পর্যন্ত নেই। আবার একটা অংশ আছে, যাদের জন্মপরিচয় আছে, কিন্তু জন্মদাতা-জন্মদাত্রীর সাধ্য নেই ভরণপোষণের। তাই তাদেরকে হাটতে শেখার সাথে সাথেই শিখতে হয় রুটিরুজির সংগ্রামও। এদের অনেকেই সমাজের বঞ্চিত মেহনতি শ্রমিকশ্রেণীর মানুষের সন্তান। আর যারা এই গার্মেন্টস, শিল্পকল-কারখানাগুলোর মালিক, তাদের সন্তান কারা? তাদের সন্তান হলো ঐ যে দামী গাড়িতে চড়া, দামী স্কুলে পড়া, ফটাফট ইংরেজীবলা ‘বেবিডল’গুলো।
যাদের বাবাদের অর্থলিপ্সার কারণে, শোষণের কারণে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ফুল বিক্রি করে পেট চালাতে হয় ফুলবানুদের, তাদের সাথে বন্ধুতা? কেমনে সম্ভব? যারা চিরকাল গাড়ীর কাচ দিয়ে ওদের দেখেছে আর নাক কুঁচকে বলেছে, “ডার্টি বিচ!”, আজ তাদের এই বুকে জড়িয়ে নেয়ার প্রবণতা দেখে কি সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে না? যে কিনা নিজের শিল্পপতি বাবাকে রাজী করাতে পারেনি তার কারখানার শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন-বোনাস দেয়ার জন্য, সে আজ রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে অন্যের গাড়িতে নক করছে টোকাইদের জন্য সাহায্য চেয়ে! এ ও সম্ভব! হুম, সম্ভব। কারণ এটা করলে সে একটা সার্টিফিকেট পাবে। যেটা দিয়ে সে খুব সহজেই এই নোংরা দেশ ছেড়ে পাড়ি জমাতে পারবে তার স্বপ্নের দেশে। এই হলুদ গেঞ্জি, এই আইডি, এই রোদে ছোটাছুটি তার কাছে একটা এডভেঞ্চার, একটা পিকনিক ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই একে মায়াকান্না ছাড়া আর কিই বা বলা যেতে পারে?
আর তাই এটা কখনোই সহানুভূতি নয়, এটা উপহাস।
(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

