somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিষন্ন আনন্দ

১৪ ই জুন, ২০০৯ রাত ১০:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সুমন বাবার সাথে ঢাকা এসেছে। ক্লাস সেভেনের ছাত্র সে। তার বাবা ঢাকার বিভিন্ন দোকানে মাল সাপ্লাই দেয়। দেশের অবস্থা অবনতির দিকে। তার বাবার মাল সাপ্লাই অনেক কমে গেছে। অভাব দেখা দিচ্ছে সংসারে একটু একটু করে। দিনে দিনে ব্যাংকে জমা টাকা কমে আসছে। বসে বসে খেলে রাজার ভান্ডারও ফুরিয়ে যায়। বাবার সাথে বাসে করে বাবার কোলে বসে এসেছে সুমন। তার লজ্জা লাগছিল। কারন সুমনের ধারনা সে অনেকটা বড় হয়ে গেছে। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। সুমনের জন্য অতিরিক্ত একটা বাসের সিটের ভাড়া দেওয়া মানে একদিনের সংসার খরচ জলে ফেলা। সুমন ছোট হলেও সংসারের অভাব বোঝে। তাই সে একটিবারও বাবাকে বলেনি, বাবা আমি আরেকটা সিটে বসব। সুমনের বাবা একাই আসত, কিন্তু সুমনকে নিয়ে এসেছে একটা বিশেষ কারনে। আই ডি বিতে কম্পিউটার মেলা হচ্ছে। ছেলেকে সেখানে ঘুরতে নিয়ে যাবে সুমনের বাবা। ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তি মনস্ক হওয়া দরকার বলে তার বাবা মনে করেন। গত বছর সুমন একটা কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিল। সেখানে মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, এক্সেলের কাজ শেখায়। টাকার অভাবে মাঝপথে কোর্স ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। সুমনের অনেক ইচ্ছা তার নিজের একটা কম্পিউটার থাকবে। কিন্তু সুমন জানে এত শীঘ্রই সেটা হবে না। বাস্তবতার সাথে তার ভালই পরিচয় আছে। সুমনের বাবা সুমনকে নিয়ে প্রথমে তার মাল সাপ্লাইয়ের দোকানগুলিতে গেলেন। পাওনা টাকা যদি কিছু আদায় হয়। টাকা না থাকায় বাবা ছেলে হেটে হেটে সব দোকানগুলোতে গেল। প্রখর রৌদ্রের খরতাপ তাদের দমাতে পারেনি। বরং সুমন উপভোগ করছিল সেই রোদ। একসময় তারা ভিকারুন্নিসার সামনে দিয়ে হেটে যেতে লাগল। সুমনের বাবা সুমনকে বললেন এটা অনেক নামী দামী একটা স্কুল। এর নাম ভিকারুন্নিসা। স্কুলের রুপ দেখে সুমনের যতটা না ভাবান্তর হল তার থেকে বেশী ভাবান্তর হল সুবেশী মেয়েগুলোকে, দাঁড়িয়ে থাকা পাজারোগুলোকে দেখে। সে দেখলে এই মেয়েরা কত উন্নত, তাদের বাহন কত উন্নত। তার স্কুলের সাথে সে কোন মতেই মেলাতে পারল না। ফ্রয়েডীয় থিওরীও কাজ করল এখানে। সে আরো ভাবল সে কি কখনো এই মেয়েগুলোর যোগ্য হতে পারবে। মনে হয় না। এরা অনেক উচুতে। সুমনের পায়ে একজোড়া স্যান্ডেল। হেটে হেটে ধূলো ময়লায় মলিন হয়ে গেছে তার পায়ের উপর নীচ। ফিতা ছিড়ে যাওয়ায় নতুন একটা ফিতা লাগালে হয়েছে একটা স্যান্ডেলে। দুই ফিতা যে দুই কোম্পানীর তা একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়। আর ওদের পায়ে দামী জুতো।হঠাৎ সে নিজের মধ্যে কোন হতাশা বা ক্ষোভ অনুভব করল না। অনুভব করল একধরনের জেদ। বড় হওয়ার জেদ। সারা ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় বাবা ছেলে হেটে হেটে ঘুরছে দোকানে দোকানে। হাতে দুটো বাজারের ব্যাগ। তাতে কিছু নতুন মাল। যদি কোন দোকানদার রাখে সেই আশায় বয়ে নিয়ে আসা। সুমন দেখল জীবনের সংগ্রাম ঢাকার রাস্তায় রাস্তায়। সে উপভোগ করতে লাগল সংগ্রামকে। তার কোন কষ্ট লাগছিল না। সে আনন্দ পাচ্ছিল এই ভেবে যে সে বাবার সাথে আজ রাস্তায় ঘোরার, দোকানে যেয়ে প্রত্যাখ্যাত হবার, পাওনা টাকা না পাবার, সর্বপরি পৃথিবীর পথে নামার যোগ্যতা অর্জন করেছে। কষ্ট তার কাছে অনন্দময় হয়ে ধরা দিল। সারা দিন গেল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হল। কিশোর প্রাণ একটুকুও দুর্বল হয় নি। কিন্তু তার বাবা বলল খুব ক্ষুধা লেগেছে। সুমন বলল বাবা তুমি খাও আমি কিছু খাব না। বাবা বললেন চল দেখি কি করা যায়। বাবা ছেলে আবহমানকাল ধরে উপস্থিত ঢাকার এক গলির এক টং দোকানে গিয়ে বসল। বাবা এক কাপ চা আর দুটো বিস্কুট নিলেন। একটা বিস্কুট সুমনকে দিতে গেলে সুমন তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করে বিস্কুট ফেরত দিল। সুমন জানে এক টাকারই এখন অনেক মূল্য। সুমনের বাবা বিস্কুটটা ডিব্বায় ফেরত রেখে দিলেন। নিজে একটা বিস্কুট আর এক কাপ চা খেয়ে কি ক্ষুধা শান্তি করলেন তা দুর্বোধ্য নয়। ছেলেকে নিয়ে এবার রওনা দিলেন আই ডিবির দিকে। হেটে হেটে পৌছে গেলেন প্রযুক্তি মেলায়। ছাত্রদের প্রবেশ বিনামূল্যে। কিন্তু বাকীদের টিকিটের দাম ৫ টাকা। সুমন বলল বাবা চল বাড়ী চলে যাই। আজকে মেলা দেখার দরকার নাই। কিন্তু এবার বাবা তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করলেন। ছেলেকে একা ছেড়ে দিতে পারেন না তিনি মেলায়। পাচ টাকায় একটা টিকিট কিনলেন তিনি, যিনি একটাকার বিস্কুট ফেরত রেখেছিলেন। বাবা ছেলে প্রবেশ করল এক নতুন জগতে। সুমন শুধু দেখছে আর দেখছে। প্রশ্ন করছে ষ্টলে উপস্থিতদের , এটা কি? ওটা কি? সুমনের বাবা প্রশ্ন করছে দাম কত? সুমনকে বলছেন তোকে একটা শীঘ্রই কিনে দেব। সুমন অবুঝ ছেলের মত মুখ করে বলছে আচ্ছা। সে তার বাবাকে বুঝতে দিতে চাচ্ছে না যে সে জানে এটা একটা নিঃফল আশ্বাস। সুমনকে খালি হাতে বাসায় আসতে হয়নি। সারা মেলা ঘুরে সুমন একগাদা রঙ্গিন কাগজ সংগ্রহ করল। তাতে বিভিন্ন কম্পিউটারের কনফিগারেশান এবং দাম লেখা। বাসায় এসে সে খুব যত্ন করে রাখল কাগজগুলোকে। চকমকে কাগজগুলোতে সেলেরন, পেন্টিয়াম থ্রী কিংবা দৈত্যাকার দাম সম্পন্ন পেন্টিয়াম ফোর সব আছে। সুমন কল্পনায় দেখে তার একটা ল্যাব আছে। সেখানে সব ১,২গিগা পেন্টিয়াম ফোর, ১২৮ এমবি র‌্যমওয়ালা কম্পিউটার। আবার সে ভাবে সবচেয়ে কম দামে কিভাবে একটা ভাল কম্পিউটার কেনা যায়। কাগজের লেখাগুলো বিশ্লেষন করে এক কিশোর। বিশ্লেষন করে সে গভীর অনন্দ পায়। না পাওয়ার বিষন্নতা কল্পনার আনন্দে ঢাকা পড়ে যায় খুব সহজেই।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১১:২৭
১২টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×