somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইতিকাহিনী - ইব্রাহীম খাঁ

০৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ২:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইব্রাহীম খাঁর লেখা "ইতিকাহিনী" বইটা কিনি ক্লাস এইট বা নাইনে পড়ার সময়, পল্টন থেকে। পুরান বই, দাম ছিল পনের টাকা। কিন্তু এই বইটা আমার কাছে অমূল্য একটা বই। বইটা হাতে নিলেই চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে আসে। যতবার পড়ি ততবার কাদি। আমার আবেগে সরাসরি আঘাত করে বলেই হয়তো এমন হয়। এ নিয়ে আমার কোন লজ্জা নেই।

ইতিকাহিনীর একটা গল্প সরাসরি তুলে দিলাম। এটা হয়তো অন্যায়, কিন্তু এ অন্যায়টুকু আমি করলাম।

""দুইটি মানুষ""

|| এক ||

১৯৪৬ সাল। কলিকাতা। হিন্দু মুসলমানে তুমুল দাঙ্গা। সে দাঙ্গার প্রমত্ত আহবানে মানুষের ভিতরের সুপ্ত শয়তান অকস্মাৎ জাগিয়া উঠিয়াছে। কোনদিন কোন পরিচয় নাই, কোনকালে কলহের কোন কারণ ঘটে নাই, উভয়েই মানুষ, শুধু বাহিরের একটি চিহ্ন - একটি টুপি কিংবা একটি টিকি, কেবল ইহারই জন্য আজ একে অন্যের বুকে নির্মমভাবে ছুরি বসাইতেছে। অথবা হয়তো পরিচয় আছে, হয়তো গত দশ বছর যাবৎ ইহারা এক পথে চলে, এক বাজারে খরিদ করে, এক হোটেলে বসিয়া চা খায়, গল্প করে, হাসি তামাশায় মাতিয়া উঠে, সেই দীর্ঘ-পরিচিত অন্তরঙ্গ তাহারাই আজ সহসা শয়তানের ইশারায় একে অন্যের গলা কাটে, বাড়িতে আগুন দেয়, নিরপরাধ দুধের বাচ্চাকে পর্যন্ত মায়ের বুক হইতে ছিন্ন করিয়া আনিয়া স্পষ্ট দিবালোকে প্রকাশ্যে রাজপথে হত্যা করে।

রক্ত, ভষ্ম, মৃত্যু রাজধানীর পথে পথে হাহাকার করিয়া বেড়ায়।

একটি মধ্যবয়সী মুসলমান- মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি, পরনে লুঙ্গি। কয়েকজন হিন্দু দিনের বেলায় তাহাকে রাস্তায় ধরিয়া বাড়ীতে আনিয়া লুকাইয়া রাখে, সন্ধার পর অন্ধকারে আত্মগোপন করিয়া তাহাকে এক মন্দিরে লইয়া যায়। পুরোহিতকে ডাকিয়া বলে, "ঠাকুর বলির জন্য এনেছি, তার ব্যাবস্থা করুন।"

ঠাকুর নীরবে বলির জীবকে দেখেন; তাহার পর স্থিরকন্ঠে আগন্তকদিগকে বলেনঃ " তোমরা বেশ করেছ; একটা শত্রু বিনাশও হবে; মা কালীর পূজাও হবে। আচ্ছা, ভাই, তোমরা এখন ওকে রেখে যাও, নইলে কে তোমাদেরকে কোথা হতে দেখে ফেলবে। পাঁজিপুথি দেখে শুভলগ্নে আমি ওর যথাযোগ্য বলির ব্যবস্থা করে নিব।"

আগন্তুকরা তুষ্ট হইয়া চলিয়া গেল; বন্দী মন্দিরের এক কোণে বসিয়া কাঁপে আর মনে মনে 'আল্লাহ আল্লাহ' করে।

সময় যায়। রাত্রী গভীর হইতে গভীরতর হইয়া আসে। মন্দির প্রাঙ্গণ হইতে একে একে পূজারীরা নিজ নিজ ঘরে যায়। পুরোহিত বাহিরে আসিয়া এদিক ওদিক লক্ষ্য করেন; দেখেন কোথাও কেহ নাই। তখন তিনি মুখ তুলিয়া আকাশের পানে চান - বিষ্ময়ে ভাবেন, এ কি! আজ তারাদের চোখে এত জল! তাঁহার আত্মা হাহাকার করিয়া উঠে; আর্তস্বরে জিজ্ঞাসা করেঃ "কেন? কেন? কেন?"

পুরোহিত বন্দীর আছে আসেন। বলেন, "এস প্রস্তুত হও।" বন্দী শিহরিয়া ওঠে; ভাবে, তার জীবনের চরম মুহূর্ত বুঝি উপস্থিত। আভিভূতের মত পুরোহিতের সাথে সাথে চলে।

খানিক দূর আসিয়া মন্দিরের দেয়ালের একটা ভাঙ্গা অংশ দেখাইয়া পুরোহিত বলেন - "ওঠ, ঐখান দিয়ে পালিয়ে যাও।" বন্দী পুরোহিতের দিকে অপার বিস্ময়ে চায় - তাহার চোখ ছলছলিয়ে ওঠে; বলে "অনেক উঁচু যে!" পুরোহিত বলেন, "আমার কাঁধে পা দিয়ে ওঠ।" বন্দী ইতস্তত করে। পুরোহিত আদেশের সুরে বলেন- "জলদি কর, ভাই, এক মুহূর্তও আর দেরী করতে পারবে না।"

বন্দী পুরোহিতের কাঁধে চড়ে; তাহার ভারে পুরোহিতের ক্ষীণ দেহ কাঁপে; কিন্তু তাহার বুকে উৎসারিত হইয়া উঠে অমানুষিক বল; তিনি ঠিক দাড়াইয়া থাকেন।

কিন্তু হায়! ইহাতেও যে দেয়ালের ফাটল নাগালের বাহিরেই থাকিয়া যায়। পুরোহিত ভাবেন, তবে কি ব্রাহ্মণের এই তপস্যা আজ ব্যর্থ হইবে?

সহসা পুরোহিতের নজরে পড়ে মন্দিরের কালী-মূর্তি। তিনি তাহাই টানিয়া আনিয়া দেয়ালে হেলান দিয়া দাঁড় করান ; বন্দীকে বলেন, " মূর্তি আমার চেয়ে উঁচু, এরই মাথায় পা দিয়ে পালিয়া যাও।"

"কিন্তু এ যে তোমাদের দেবতার মূর্তি!" - বন্দী বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করে। "আমি মরব, তবু তোমার দেবতার মাথায় পা দিতে পারব না" - বন্দী কাঁদিয়া ফেলে।

ঠাকুর চাপা কন্ঠে বলেন, " হ্যাঁ , এ সত্যি আমার দেবতার মূর্তি। কিন্তু ভাই, ছোটবেলায় মা কখনো তোমাকে কোলে কাখেঁ মাথায় তোলে নাই? আজ যদি মা কালী তা না পারেন তবে তিনি কিসের মা?"

বন্দী পুরোহিতকে জড়াইয়া ধরে। পুরোহিত বন্দীকে বুকে জড়াইয়া ধরেন ; উভয়ের বুক ভাসিয়া যায়। এক দেশের সন্তান - এক স্রষ্টার সৃষ্টি।

খস- খস--ধপ--বাহিরে শব্দ হয়। বন্দী ফাটল-পথে ওপাশে নামিয়া চলিয়া যায়।

পুরোহিত আসিয়া মন্দিরের দুয়ার খোলেনঃ বাহির হইতে স্নিগ্ধ হাওয়া ভাসিয়া আসে; তাহার দেহ মন জড়াইয়া যায়। তিনি মুখ তুলিয়া আকাশের পানে চান ; দেখেন, তারাদের চোখে তৃপ্তির হাসি।

পুরোহিত মন্দিরের দুয়ারে অর্গল দিয়া ভিতরে আসেন। চোখে পড়ে সেদিনের স্তুপীকৃত ফুল। তাহার মনে হয় সমস্ত ফুল মিলিয়া হইয়াছে একটা বিরাট সুন্দর তোড়া ; সেই তোড়া উৎসর্গীকৃত বিশ্ববিধাতার উদ্দেশ্যে আর তোড়ার ফুলের প্রতি দলের বুকে জাগিয়া উঠিয়াছে নিশীথের সেই মুক্ত বন্দীর স্মিত মুখচ্ছবি।


সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১১:৪২
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×