একদিন খুব বৃষ্টি হল। সময়টা ছিল বিকেল। আমি আমাদের ছাদে উঠে আশেপাশের বৃষ্টিস্নাত ধোয়া রুপ দেখতে লাগলাম। ছাদটার সাথে ছিল সংলগ্ন টিনের চাল। সেখানে বিকেলের হালকা রোদ পড়ছিল অত্যন্ত নরমভাবে। কিছুক্ষণ পরেই আকাশ কমলা হবে জানি। কারণ বার বার দেখে এসেছি বৃষ্টির রোদেলা বিকেল একরাশ কমলা রঙ নিয়ে আসে। আগুন কমলা যাকে বলা যায়। আমি প্রথম বুদ্ধদেবের বইতে এই কমলা আলোর কথা পড়েছিলাম। সেখানে নগ্নিকা নায়িকাকে ঘরের মাঝখানে খুপড়ি দিয়ে আসা কমলা রঙের মাঝে দাড় করানো হয়। তারপর নায়ক তাকে দেবী হিসেবে প্রণাম করতে থাকে। নগ্নিকা নায়িকা নায়কের মুখে কোন কামভাব আনে না, আনে বিশুদ্ধ ভক্তি। সেটা এক সাহিত্যই ছিল বটে। আমি অবশ্য কোন নগ্নিকার জন্য অপেক্ষা করি না। আমার সেই সামর্থ্যও নেই, সত্যি বলতে গেলে আমার দৌড় খুব বেশী নয়। তাই আমি এমনি এমনিই কমলা রঙ দেখি। জানালা দিয়ে ঘরের সাদা চুনকাম করা দেয়ালে পড়া কমলা আলো, কিংবা পাশের বিল্ডিং এ পড়া কমলা আলোই আমার মনে এক স্বর্গীয় (!) অনুভূতির জন্ম দেয়। আমি একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকি। মনে হতে থাকে এই আগুন রাঙ্গানো আলো যদি কখনো না শেষ হত। আমি সেই বিকেলে কমলা রঙ ছড়ানো দেখতে ছাদে চলে গেলাম। ছাদের সাথে লাগোয়া নিম গাছটায় অনেক সবুজ পাতা মিয়ম্রাণ শেষ বিকেলের বৃষ্টিস্নাত আলোয় প্রায় নিভে যাওয়া আরতি প্রদীপের মত ঝকঝক করছে। আরতি প্রদীপের মতই গাছটার গায়ের খোলস কালটে। হঠাৎ একঝাক বৃষ্টি আমাকে ভিজিয়ে দিল। আমি ভিজতে লাগলাম। পাশের সোয়েটার কারখানাটায় তখনো শ্রমিকেরা নিরন্তন হাত মেশিন চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ ক্ষণিকের বিশ্রামের জন্য জানালার পাশে এসে দাড়িয়েছে। কমলা আলো ওদেরকেও কিছুটা মুগ্ধ করেছে বলে মনে হচ্ছিল। আমি নিমগাছে উঠে পড়লাম। একটা সুবিধামত আকৃতির ভেজা ডাল বেছে নিয়ে শুয়ে পড়লাম। আমার পরনে তখন একটা হাফপ্যান্ট, আর কিছু নেই। চিন্তা করতে লাগলাম, কিছুদিন বনে জঙ্গলে টারজানের মত কাটালে কেমন হয়। ঠিক করলাম, একদিন রাঙ্গামাটি যাব। সেখানের বনে জঙ্গলে কিছুদিন বসবাস করতে হবে। জীবনের অনেক কিছুই দেখার বাকি। অন্তত এক মাস আমার রাঙ্গামাটির জঙ্গলে কাটানো উচিত। বনে বুনো মানুষের মত বাস করা উচিত কিছুদিন। মানুষ প্রকৃতিরই অংশ। কিছুদিনের জন্য হলেও তাকে কিছু সময়ের জন্য প্রকৃতির মাঝে থাকা উচিত। এ থাকা সেই শখের বেড়ানোর থাকা নয়। এ থাকা সেই আদিম থাকা। পরিপূর্ণরুপে বন্য ভাবে থাকা, গাছের ডালে ঘুমানো, খালি পায়ে হাটা, পরনে থাকবে শুধু একটা হাফপ্যান্ট, আর কিছু না, সম্পূর্ণ উদোম শরীর। খাবার সংগ্রহও বন থেকেই করতে হবে। তবে নিরাপত্তামূলক কিছু ব্যাবস্থা নেওয়া দরকার। কারণ মানুষ বহুদিন বনবাস না করতে করতে তার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। নিরাপত্তামূলক ব্যাবস্থা হিসেবে প্রথমেই আসবে সাপের কামড় হতে বাচার জন্য এন্টিডোট। আর প্রয়োজনীয় সারঞ্জাম হবে ছুরি, দড়ি, অতিরিক্ত কিছু হাফপ্যান্ট, কেরোসিন, লাইটার। যেতে হবে দল বেধে। ভাবছিলাম বন্ধুবান্ধব কয়েকজনকে জুটিয়ে এস এস সি এর পর তিন মাসের যে ছুটিটা পাই তার এক মাস ফার্মেসীতে কাজ করে কাটাবো, এক মাস বনবাসে আর বাকী এক মাস অন্য কোন কাজে। যদিও পুরো তিন মাসই আমার ঘরে কামলা দিয়ে কেটেছে, কারখানায় হঠাৎ কিছু নির্মান কাজ শুরু হওয়ার কারণে। আর সুযোগ হয়নি কিছু করার। তা সেই কমলা রংয়ের বিকেলটা আমি নিম গাছের ডালে শুয়ে শুয়ে জীবনটা উপভোগ করছিলাম। মাঝে মাঝে গাছের একটা ডালে লাথি মেরে গাছটাকে কাপিয়ে দিচ্ছিলাম। এতে করে গাছের পাতায় লেগে থাকা পানি ঝরে পড়ছিল বৃষ্টির মত আমার উপরে। কিছুক্ষণ বহু দুরের গাছপালার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। প্রকৃতির আসলেই প্রকৃতি। আমি আসলেই প্রকৃতির সন্তান। বিকেলের আলো হালকা থেকে আরো হালকা হচ্ছিল। বৃষ্টি ততক্ষণে থেমে গিয়েছে। আমি তবুও শুয়ে রয়েছি নিম গাছটার ডালটাতে আর মাঝে মাঝে পা দিয়ে গাছটাকে ঝাকি দিয়ে বৃষ্টির পরের বৃষ্টি ঝরাচ্ছি গাছের পাতা থেকে। কমলা আলো ততক্ষনে প্রকট রুপ ধারণ করেছে। বৃষ্টি পরবর্তী বিকেলের শেষ কমলা আলো মোটামুটি একটা জীবনের উপভোগ্যতা সৃষ্টি করছে। জীবনটা আসলে উপভোগ করতে হয় অনুভব দিয়ে।কখনও এই কমলা আলো, কখনও খরতাপের দুপুরে দুরের অতি উজ্জ্বল বৃক্ষরাজি কখনো বাসে করে হাইওয়ে ধরে যাবার সময় দুপাশের বন আর আশেষ হাইওয়ের দ্রুতগতি আপনার মধ্যে জীবনবোধ এনে দেবে। কখনো কোন বড় শহরের মাঝ দিয়ে ট্যাক্সীতে করে যাবার সময় রাতের শহর আপনার মধ্যে জীবনের উপভোগ্যতা তৈরী করবে। কখনো দুপুরের শেষ থেকে সন্ধ্যা অবধি কোন খাল বা বিলের উপর দিয়ে তৈরী ছোট ব্রীজে বন্ধুদের সাথে গল্প করতে করতে যখন অন্ধকার নেমে আসবে আর একটা একটা করে বিলের পার্শ্ববর্তী লোকালয়ে আলো জ্বলে উঠবে তখন আপনি দেখতে পারবেন জীবনের মহৎ রুপটি। অথবা নিতান্তই রোজার শেষে ঈদের আগ দিয়ে রাস্তার পাশে ফুটপাতে বসা দোকানগুলোতে গার্মেন্টস কর্মীদের সস্তা লিপিষ্টিক কেনার আনন্দে আপনি দেখবেন আপনার ভিতরের অনূভুতি। তবে টিউব লাইটের সাদা আলোতে কোন জীবনবোধ নেই। কারণ ওটা নির্মানের শেষ। হলুদ আলোতে রাত দুটো অবধি খোলা থাকা চায়ের দোকানে আশপাশের বিচিত্র মানুষ , যেমন রঙ মিস্ত্রী, কাঠমিস্ত্রী অথবা নিতান্তই ভারবাহী কোন শ্রমিককের মতামত, চিন্তাধারায় আপনি সন্ধান পাবেন অন্য এক জীবনবোধের, জীবনকে উপভোগ করার এক মোক্ষম উপায় এটা। হঠাৎ মার বাবার হায়দারী ডাক শুইন্যা আমার নিমগাছে শুইয়া থাকন বাইর হইয়া গেল। কামে ডাকতাছে। আমি আপাতত ভাগি।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১১:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


