somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ক্ষেপানি

২৮ শে ডিসেম্বর, ২০১০ দুপুর ১২:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বন্ধুত্বের একটা অন্যতম অংশ হল ক্ষেপানি অথবা পচানি। ঘনিষ্ট বন্ধু অথচ একজন আরেকজনকে ক্ষেপায় না, এটা খুব কম ক্ষেত্রেই ঘটে।

একবার স্কুলে থাকতে আমার এক বন্ধুকে বললাম, "আমি তোরে শারীরিকভাবে ষ্পর্শ না করে, খালি কথা কইয়া তোরে মাইরা ফালাইতে পারুম"। ও কথাটা না মেনে বলল, "পারবিনা, কেমনে মারবি তুই?" আমি লললাম, "আমি এমন কথা কমু যে তুই আমারে মারার জন্য পিছে পিছে দৌড়াইবি। আমি হুন্ডার পিছে বৈয়া কথা কইতে থাকুম আর তুই আমারে ধরার জন্য পাগলের মত দৌড়াইবি, কোন হুশ থাকব না। এমনে অস্বাভাবিক দৌড়ানির কারনে তুই হার্টফেল কইরা মরবি।" ও বলল, "জীবনেও পারবিনা"। আমি অললাম,"চেলেঞ্জ লাগবি, আমি পারি কিনা?" ও বলল, "হ চেলেঞ্জ"। আমি বললাম, "ওকে ঠিক আছে। তুই খালি আমারে একটা হুন্ডা যোগার কইরা দে।" ও বলল,"হুন্ডা লাগব না, খালি আমারে তোর পিছনে দৌড়াইয়া দেহা, তাইলেই হইব"। আমি বললাম, "ঠিক আছে"।

এরপরে সেইখানেই শুরু করলাম অন্য বন্ধুদের সামনে,"আচ্ছা একটা গোপন কথা কই তোগরে, কাউরে কইস না, আমাগো মুন্নুর যে এইডস হইছে, সেইটা কি তোরা কেউ জানস?" আমার আলোচ্য বন্ধুর নাম মুন্নু। মুন্নু এই কথা শুনে বলল,"ক তুই কত কবি ক, আমি কিছুই করুম না। এই কথা দিয়া তুই আমারে ক্ষেপাবি। এহ!" আমি বলতে লাগলাম,"মুন্নুর যে এইডস হৈছে এইটা ধরা পড়ছে গত এক সপ্তাহ আগে, ও কাউরে বলে নাই। আমি নিজেও জানলাম মাত্র কাইলকা। কাইলকা ওগোর বাড়িতে গেছিলাম। মুন্নুর টেবিলে একটা বইয়ের নীচে দেহি কি একটা ডাক্তারী প্রেসক্রিশন, আরো কি কি জানি কাগজ। আমি এমনেই কি মনে কইরা ঐগুলা দেহার জন্য হাত বাড়াইতে না বাড়াইতেই ও খপ কইরা কাগজগুলা ছিনাইয়া নিয়া গেল। আমি তো বেক্কল হৈয়া গেলাম। ওরে জিগাইলাম, কি এডি। ও কয়, কিছু জিনিস, দেহানি যাইবোনা। আমি কই, প্রেমপত্র লেখছস নাকি? ও কয়, হ। আমি কই দেহি কি লেখছস। ও কয়, না দেহানি যাইব না। আমার তহনি সন্দেহ হৈল, হালায় এইরকম উড়ামুড়া করতাছে কিল্লাইগা। প্রেমপত্রের মত জিনিস বন্ধুগোরে দেহানি কোন ব্যাপার হৈল নাকি। আমি চাপাচাপি করতেই ও ঐগুলা নিয়া ঘর থিকা বাইরাইয়া দৌড় লাগাইল। আমিও ওর পিছে পিছে কতক্ষণ দৌড়াইয়া ওরে ধৈরা জোর কোইরা কাগজগুলি হাত থিকা ছুটাইয়া নিলাম। হালায় এমন জোরে ধৈরা লাগছিল যে কতডি কাগজ ছিড়া ওর হাতের মধ্যে রৈয়া গেল। কুনমতে কাগজের ভাজ খুইলা ভিত্রের লেহা পৈড়াই বুঝলাম ঘটনা কি! ঘটনা পুরাই দুর্ঘটনা হৈয়া গেছে। পরে মুন্নু দেহি কানতাছে। আমারে কৈল, দোস্ত আমি তো আর বাচুম না। আমার কি হৈব। আর মাত্র কয়দিন, এরপরেই তোগোরে ছাইড়া চইলা যাইতে হইব। আমি ওরে অনেক্ষণ সান্তনা টান্তনা দিলাম। পরে ও কইল, এই খবর আমি যেন তোগোরে না কই। আমি কৈলাম ঠিক আছে। পরে ও সব কিছু খুইলা কইল। হালায় যে এত বর বজ্জাত তা আমরা জানতাম না। আকাম কইরা যে এহন এই কাম বাজাইছে, এক্কেকে ডান্ডি ফট্টাস।"

আমার সাথের বাকী সবাই বেশ মজা পেল। তারা মজা পেয়ে আরো মজা পাওয়ার জন্য, তারা নিজেরাও আমার সাথে যোগ দিল। কেউ কেউ বলতে লাগল, ছি মুন্নু ছি! তুই এই কাম করতে পারলি? তোরে আমরা কত ভাল জানতাম, একাতা ভদ্র পুলা জানতাম। শেষ পর্যন্ত তুই এই কাজ করলি। এক্কেরে ঠিক হৈছে। এইবার মজা বুঝ। কেউ কেউ বলতে লাগল, নাহ দেখ, যা হবার হইছে, এখন একজন মৃত্যুপথযাত্রীর সাথে আমাদের খারাপ ব্যবহার করাটা ঠিক না। আর মাত্র কয়টা দিন, এরপরেই এই দুনিয়ার মায়া ছাইড়া চইলা যাইব। শেষ বেলায় অন্তত আমরা বন্ধুরা যদি ওর পাশে না থাহি, ওর বিদায়ের মূহুর্তটা যদি এইরকম কষ্টদায়ক হয়, তাহলে জিনিসটা খারাপ হৈয়া যায়। আমি মানবিকতার দলে যোগ দিলাম। এরপরে বললাম, "ঠিক ঠিক। জীবনের এই বাকী কয়টা দিন অন্তত আনন্দের মধ্য দিয়ে ওর পার করা উচিত। এ উপলক্ষ্যে আমরা সবাই মিলে "এইডস রোগী মৃত্যুপথযাত্রী মুন্নুর জন্য বিনোদন অনুষ্ঠান" নামে একটা অনুষ্ঠান আয়োজন করলে কেমন হয়? সবাই আমার কথায় সমর্থন দিল। মুন্নু বলল, "ক, আরো কি কইতে পারস ক। দেহি তুই আমারে কেমনে ক্ষেপাস। আমি ক্ষেপুম না, তুই আমারে কেমনে ক্ষেপাবি দেহি"। উল্লেখ্য মুন্নু তখন যেভাবে কথাগুলি বলতে ছিল, আমি বুঝলাম যে কাজ হচ্ছে। আমি বললাম, "আমি তাহলে বাকী সবার সাথে যোগাযোগ করি, অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কি করা যায় দেখি"। এরপরে ওদের সবাইকে রেখে ক্লাসের দিকে হাটা দিলাম। ক্লাসে যেয়ে যাদেরই পেলাম, তাদের কাছে মুন্নুর এইডস বৃত্তান্ত বর্ণনা করলাম। এইভাবে কিছুক্ষণ বর্ণনা কার্যক্রম চালনা করার পর, পুলাপান মুন্নুকে খোজা আরম্ভ করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিষয়টা মুন্নুর জন্য বেশ বিব্রতকর হয়ে দাড়াল। ছেলেরা সবাই যতটা না সমবেদনা, তার থেকে বেশী কৌতুহল দেখাতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে মুন্নু উল্টো আমার নামে, উল্টা আমারই যে এইডস হয়েছে সেইটা বলে ঘটনার মোড় অন্য দিকে ঘুরিয়ে উল্টা আমাকেই ক্ষেপানোর চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু তাতে বেশী কাজ হল না। আমি বলতে লাগলাম, "আসলে ওর যে এইডস হইছে এইটা আমারে অলতে নিষেধ করছিল। হাজার হইলেও ঘটনাডা একটু অন্যরকম। আমি ফাস কইরা দেওয়াতে ও এহন এইরসব কইয়া ঘটনা লুকাইতে চেষ্টা করতাছে।" ইতিমধ্যে আরেকজন বলল, "ঐ তোরা মুন্নুর থিকা দুরে গিয়ে দাড়া, কে জানে কহন আবার ওর গা থিকা এইডস আমাগোর শইলেও আইয়া পড়ে কিনা।" সবাই বেশ মজা পেয়ে মুন্নুর কাছ থেকে দুরে দাড়িয়ে নিজেদের বাচানর অভিনয় করতে লাগল। ঘটনা কিছুক্ষণের মধ্যেও মুন্নুর জন্য যথেষ্ট অসহনীয় হয়ে উঠল, যখন আমি ওর সামনে দাড়িয়েই, আরেকজনকে ডেকে এনে এই কাহিনী ওর সামনেই তার কাছে বলতে লাগলাম। ঘটনা বেশ মজাদার হয়ে উঠতে লাগল। হঠাত করে মুন্নু বলল, "দেখ দোস্ত অনেক হইছে, তুই আর এডি কাউরে কইস না, এইবার থাম"। আমি উল্টো মুন্নুকে বললাম, "দেখ দোস্ত স্যারদের মনে হয় খবরটা দেয়া উচিত। তোর এখন বিশ্রাম দরকার। তোর যে ছুটি দরকার এই নিয়া একটা এপ্লিকেশন লেইখা হেডস্যারের কাছে দিয়া আহি, কি কস?"

মুন্নু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।

**** ** আইজকা তোর এপ্লিকেশন তোর ** ** *** হারামি তুমি ***** *** আইজকা তোরে আমি........................

...................................
...................................

আরেকবার আমার এক খালাতো ছোট বোন কিছুদিনের জন্য আমাদের বাড়ীতে বেড়াতে এসছে। কিছুদিন বেশ ভালই কেটেছে। আমার ছোট বোনের সাথে খায় দায় ঘুমায়, খাজুরা আলাপ করে। কিছুদিন পরে দুজনের মধ্যে কি নিয়ে যেন বেশ ঝগড়া করল। ঝগড়ার এক পর্যায়ে আমার ছোট বোন ওকে ছাগল বলল। ও আরো ক্ষেপে গেল। এরপরে ও বেশ দার্শনিক দার্শনিক ভাব ধরে বলল, ওর বাবা মানে আমার খালু নাকি বলেছে, "কারো সাথে তুমি যদি অনেকদিন একসাথে থাক, তবে একদিন না একদিন তার সাথে তোমার ঝগড়া হবেই"। এটা বলে ও চুপ মেরে গেল। কারো সাথে কথা বলে না। মানে, রাগ করেছে আর কি! কেউ কিছু বললেও জবার দেয় না। আমি তখন একটা দড়ি এনে ওর সামনে ধরে বললাম, "বাংলা বিহার উড়িষ্যার মহান অধিপতি নবাব সিরাজুদ্দৌলা তার ছাগলের জন্য একটা পচা দড়ি কিনিয়া আনিল"। (বেশ সুর দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে) বেচারী ফিক করে হেসে দিল। ক্ষেপানি উল্টা হাস্যরসে পরিণত হল।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১২:২৯
১৯টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×