দুই মেয়ে ও এক ছেলের পিতা ৪০ বছর বয়সী মোবারক আলী।ঢাকার একটি ট্রাভেল এজেন্সীর দালালের মিথ্যাচারের স্বীকার হয়ে ধানের জমি ,ঘরের ভিটা বন্ধক রেখে ১০০০টাকায় টাকায় মাসে ১০০টাকা সুদের ওপর ৪০হাজার টাকা নিয়ে সর্বমোট ২লাখ ৩০হাজার টাকা বিভিন্ন কিস্তিতে দালালের হাতে তুলে দেয় মোবারক আলী ।মোবারক আলীকে জানানো হয় হাউস ড্রাইভারের ভিসা ।মোবারক আলীর কাজ হচ্ছে সকালে মালিকের ছেলে মেয়েদের স্কুলে দিয়ে আসা দুপুরের সময় গিয়ে নিয়ে আসা।মাঝে মাঝে আছরের পর মালিকের বউ এবং সন্তানদের শফিং সেন্টারে সামনে নামিয়ে দেওয়া আবার ফোন করলে নিয়ে আসা।বেতন ১০০০রিয়াল বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ১৮০০০(বর্তমান মুদ্রার বিক্রয় হিসেবে) টাকা।থাকা খাওয়া ,কাপড় চোপড়,আকামা,দুই ঈদে বোনাস,মেডিকেল খরচ,প্রতি ২বছর পর পর ৩মাসের ছুটি এবং ছুটিতে আসার আসা যাওয়ার বিমান টিকেট সবই মালিক বহন করবে।দালাল মোবারক আলীকে স্বপ্ন দেখায় কয়েক বছরেই সব ধার দেনা শোধ করে লাখপতি হয়ে যাওয়ার।দালালের মিথ্যাচারে হরেকরকম স্বপ্নের ঝাল বুনে সহজ সরল মোবারক আলী ২লাখ ৩০হাজার টাকা তুলে দেয় দালালের হাতে আরো ৫হাজার টাকা খরচ করে ড্রাইভিং শিখে ।
২লাখ ৩০হাজার টাকা তুলে দেওয়ার পর ২মাস ১৭দিন পর সৌদি আরব আসে মোবারক আলী।আসার ১দিন পরই মোবারক আলীর স্বপ্ন ভংগের শুরু।সৌদি আরবের সরকারী -বেসরকারী প্রাইমারী স্কুল এবং হাইস্কুলগুলো সকাল সাড়ে ৬টা থেকে শুরু হয় শেষ হয় দুপুর ১টার দিকে।ভোর ৫টায় উঠে মোবারক আলীকে রেডী থাকতে হয় ।৬টার আগে মালিকের ৬ছেলে মেয়েকে ৩টি স্কুলে নামিয়ে দিয়ে এসে মালিকের শখের সবজি ক্ষেতে কয়েক ঘন্টা কাজ করতে হয় ।তারপর বাড়ির চারপাশের গাছে পাইপ দিয়ে পানি দেওয়া একটু পরপর দোকানে যাওয়া সব মিলিয়ে দুপর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হয় ।সকালের নাস্তা খেয়েছে কিনা এই কথাও কেউ জানতে চায়না মোবারক আলীর কাছে।স্কুল থেকে ছেলে মেয়েদের নিয়ে আসার পর কখনো দুপুর ২টায় কখনো দুপুর ৩টায় খাবার আসে মোবারক আলীর।কখনো মেশিনে পোড়ানো পোড়া মুরগী আর চাউল কখনো ২-৩টা রুটি মসলা বিহীন সবজি কিংবা মিষ্টি জাতীয় কিছু।মাগরিবের পর থেকে কখনো রাত এগারটা কখনো রাত বারটা পর্যন্ত মালিকের এস্তেরায় (তাবু দিয়ে প্রস্তুতকৃত আড্ডা খানা ) চা খাওয়ানো,বাসা থেকে ডাক পড়লেই দোকানে যাওয়া,মালিকের বউকে নিয়ে শপিংয়ে যাওয়া।একটি মাস পার হওয়ার পরও বেতন পায়না মোবারক আলী ।তিনমাস পর মোবারক আলী বেতন পায় ।মালিক বেতন ধার্য্য করে ৬০০রিয়াল।সকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত পরিশ্রম করেও যে বেতনে এসেছে সে বেতনতো পাচ্ছেই না যতটা পাচ্ছে তাও প্রতি মাসে পাচ্ছেনা ।মাস শেষ হলেউ বাড়ি থেকে ফোন কিংবা চিঠি টাকা পাঠানোর তাগিদ।প্রতারিত হওয়ার যন্ত্রনা,ভাষা না বোঝার কারণে সামান্য ভুল হলেই বকাঝকা,বাড়ি থেকে টাকা পাঠানোর তাগিদ সব কিছুর আড়ালে হারিয়ে যায় ছেলেকে লেখাপড়া করানোর স্বপ্ন,কিশেীরী থেকে তরুনী হওয়া মেয়েদের ভালো ঘরে বিয়ে দেওয়ায় স্বপ্ন।
সুদের টাকা পরিশোধ করবে নাকি ভিটার বন্ধকের টাকা শোধ করবে?নাকি পরিবারের খাওয়া দাওয়ার খরচ মেঠাবে?ভাবনাগুলো দীর্ঘশ্বাস হয়ে বের হয় আর মনে মনে অসহায়ের জন্য আল্লাহ আছে এই বলে মনকে সান্তনা দেয় কিংবা দুনিয়াতে না হউক আখেরাতে হলেও বিচার পাবে এমন আশায় গত ৭বছর ধরে সৌদি আরব আছে মোবারক আলী।সুদের টাকা পরিশোধ হয়েছে বন্ধকি ধানের জমি আর ঘরের ভিটাও মুক্ত করেছে।কিন্তু গত ৭বছরে মোবারক আলী একবারও দেশে যেতে পারিনি।দেশ থেকে কয়েকমাস পরপর পাঠানো বউ,ছেলে মেয়ের ছবিগুলো মোবারক আলীর কষ্টের রঙ কে আরো তীব্র করা ছাড়া কোন অভাইব মেঠাতে পারেনি।
বিভিন্ন সূত্রমতে বৈধ অবৈধ মিলিয়ে প্রায় ২০লক্ষ বাংলাদেশী নারী পুরুষ শ্রমিক সৌদি আরবে কর্মরত।ঠিক কতলক্ষ বাংলাদেশী শ্রমিক সৌদি আরবে অবস্থান করছে এর আগে একটি জাতীয় দৈনিকের জন্য প্রতিবেদন করতে গিয়ে বারবার যোগাযোগ করেও কোন রকম তথ্য পায়নি সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসে।৯১ পরবর্তী প্রতিটি গনতান্ত্রিক সরকারগুলোর ক্ষমতার পালাবদল যতবার হয়েছে সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের ক্লিনারও পরিবর্তিত হয়েছে ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে।৯১পরবতী প্রতিটি সরকারই দলীয় বিবেচনায় রাষ্ট্রদূত থেকে ক্লিনার পর্যন্ত নিয়োগ দিয়েছে ।পরিণামে প্রবাসী শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানের চাইতে রাজনৈতিক মিটিং, কোন নেতা ওমরাহ করতে আসল এইসব নিয়েই বেশী ব্যস্ত থাকেন দূতাবাসের কর্তাবাবুরা।অথচ শ্রমিকদের সমস্যার সমাধান,নিরাপওা নিশ্চিত করার জন্য সজাগ দৃষ্টি রাখা,দুটি রাষ্ট্রের সম্পর্ক জোরদার করার জন্যই দূতাবাস।কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে এইসবের চাইতে বিলাসী জীবন যাপন আর রাজনৈতিক নেতাদের খুশি করার দিকেই বেশী ব্যস্ত দূতাবাসের কর্মরতরা।যে দল ক্ষমতায় থাকে সে দলের সমর্থক,তাদের আত্মীয় স্বজনদের পাসপোর্ট রেনু করার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁিড়য়ে থাকতে হয়না।দলীয়করনের নিয়োগ প্রাপ্তদের পাশাপাশি নিয়োগ প্রাপ্তদের দালালও আছে দূতাবাসের ওয়েটিং রুমে।১০০/২০০/৩০০ রিয়ালের বিনিময়ে ১ঘন্টায় কাজ শেষ করে দিবে ।আর না দিলে লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থাকতে হয়।লাইন সামনের দিকে এগোয় না কারণ,দালালরা যাদের যাদের কাজ নিয়েছে তাদের কাজ করতেই ব্যস্ত কর্তাবাবুরা।
রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের নোংরা দলীয়করনের রাজনীতির কারণেই সৌদি আরবসহ মধ্যে প্রাচ্যর দেশগুলোতে বাংলাদেশী শ্রমিকদের বেহাল দশা।ছোট্র একটি উদাহরন,বিগত চারদলীয় জোট সরকারে ক্ষমতায় আসার পর ‘ম ’ আদ্যক্ষরের একজনকে সরিয়ে ‘র’ আদ্যক্ষরের একজনকে একটি গুরুত্বপূর্ন পদ দেয় আর বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ‘র’ আদ্যক্ষরকে সরিয়ে সে যায়গায় এমন একজনকে নিয়োগ দেয় যার রাজনীতিক পরিচয় আর রাজনৈতিক নোংরা জ্ঞান ছাড়া আর কোন যোগ্যতাই নেই।যারা রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ প্রাপ্ত হচ্ছে তারা রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ত থাকবে এমনটাই স্বাভাবিক।বিপরীতে ভারত,পাকিস্তান ,ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিনি দূতাবাসগুলো তাদের শ্রমিকদের প্রতি ব্যাপারে এতই আন্তরিক যে সম্মান আর ন্যায্য অধিকার নিয়েই মাথা উঁচু করে কাজ করে যাচ্ছে সেসব দেশের শ্রমিকেরা।
--------------------------
আসুন মহান রমজান মাসে অন্তত একজন অসহায়কে সাহায্য করি। অর্থ কিংবা খাবার দিয়ে নয়, তার বিপদের পাশে দাড়িয়ে, হতে পারে তার চাকরি বাঁচাতে, কিংবা এলাকার জালিমদের হাত থেকে তার ছেলে মেয়েকে রক্ষা করে, কিংবা কেহ ধুকা খাচ্ছে এবং সেই ধুকা থেকে রক্ষা করে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


