সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল
কবি নির্মলেন্দু গুণকে আমি গুন্ডা (Goon Da) বলে ডাকি। আমার গুন্ডা মেইল করে জানালেন, তিনি তাঁর ক্লাশমেট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসবেন; সেখান থেকে কানাডায় আসতে চান। বললাম, ওয়েলকাম। চলে আসুন। তারপর ২/৩ বার ফোনে কথা হলো। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তহীনতা!
গুন্ডার কাছেই জানতে পারলাম, তিন কবি প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়েছেন। অন্য দু’জন হলেন: কবি মহাদেব সাহা এবং বন্ধুবর মুহম্মদ সামাদ। পত্রপত্রিকা মারফত আরো বিস্তারিত জানা গেলো, ১০১ জন (প্রকৃতপক্ষে ১০৩ জন) সর্বকালের বৃহৎ বিশাল বহর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের ৬৫তম অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন।
এ নিয়ে ঢাকার একটি মিডিয়া বিগত সরকারসহ বর্তমান সরকার প্রধানের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। সমালোচকরা বলেছেন, এটা হাসিনার ভ্রমণবিলাস। এ পর্যন্ত রাষ্ট্র প্রধানদের বিদেশ ভ্রমণের মধ্যে এটিই সর্ববৃহৎ বাহিনী।
মনে পড়ছে নব্বই দশকের প্রথম দিকে সাপ্তাহিক যায় যায় দিনের একটি প্রচ্ছদ কাহিনীর কথা, ‘দুই নেত্রীর বিদেশ সফর!’ তখন খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী। তার সফরের নানান চিত্র নিয়ে লিখেছিলাম। যদ্দূর মনে পড়ে প্রথমতঃ বিমানের সকল যাত্রী নামিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সেই বিমান নিয়ে যাত্রা করেন। দ্বিতীয়তঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সাথে এজেন্সির মাধ্যমে দেখা করে তা মিথ্যে প্রচার করে। তৃতীয়তঃ ফেরার পথে লন্ডনের হোটেলের বিল বাকী ছিলো, যা দূতাবাসও দেয়নি এবং দলীয়ভাবে পরিশোধ করা হয়নি ইত্যাদি। আর তৎকালীন বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিলো অন্য এক প্রতিবেদন।
প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে যায় যায় দিনে তীর্যক লেখার কারণে আমার সরকারি চাকরি প্রায় যায় যায় অবস্থা। তখন স্বরাষ্ট্রসচিব ছিলেন মনযূর-উল-করিম ওরফে কবি ইমরান নূর। তার দুর্ব্যবহার এখনো মনে পড়ে। সে পর্বে রেহাই পাই শফিক রেহমান এবং গাজি শাহাবুদ্দিন অর্থাৎ মনু ভাইয়ের হস্তক্ষেপে।
তারও আগে ঢাকা-নারিতা রুটে বাংলাদেশ বিমান চালুর সময় তৎকালীন ফার্ষ্টলেডি রওশন এরশাদ ‘এক বিমান সফরসঙ্গী’ নিয়ে গিয়েছিলেন। কথিত আছে, অধিকাংশ সফর সঙ্গীরাই ছিলো ‘আদম’।
এবারও ঢাকা-নিউইয়র্ক রোডে বাংলাদেশ বিমান পুনরায় চালু হবার জন্য সেই উদ্বোধনী ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রীর আসার কথা ছিল। কিন্তু জেএফকে লেন্ডিং পারমিশন না দেওয়ায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয় নি। ফলে বিভিন্ন ফ্লাইটে সফরসঙ্গীরা যাত্রা করছেন। নিউইয়র্ক প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি বাংলাদেশ বিমান চালুর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাও হলো না। প্রথম পদক্ষেপেই এই সফরে কিছু ব্যর্থতা থাকলেও অনেক সাফল্য রয়েছে।
যেমন-
ক. ৫০% শিশু মৃত্যু হ্রাসের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ জাতিসংঘের এমডিজি ২০১০ পুরস্কার অর্জন,
খ. পরিবেশ বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৫ সেপ্টেম্বর সভাপতিত্ব,
গ. প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে বৈঠক ও নৈশভোজে যোগদান এবং বাংলাদেশের এমডিজি অর্জনের অগ্রগতিতে প্রশংসা প্রাপ্তি
ঘ. দারিদ্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশের সাফল্যের প্রশংসা করেছেন জাতিসংঘের মহসচিব বান কী মুন।
ঙ. নিউইয়র্ক ম্যানহাটনের ডিপ্লোমেট সেন্টারের ৫ তলায় ২২ হাজার ৭২৬ বর্গফুটের বাংলাদেশ মিশনের নিজস্ব অফিস উদ্বোধন ইত্যাদি।
ইতোপূর্বে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছিলেন। এখন বাংলা ভাষার সূত্র ধরে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ। তাই জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষাগুলোর মধ্যে যেনো বাংলা স্থান পায় সেই প্রস্তাবটি রয়েছে। তা যদি এবার বাস্তবায়ন হয়, তাহলে তাও হবে একটি সম্মানজনক অর্জন।
এবারের অধিবেশনে ৩০ জন রাষ্ট্রপ্রধান অংশ নিচ্ছেন। তাঁর মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। ক’দিন আাগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় এবং বহুল প্রচারিত টাইম ম্যাগাজিনের জরিপে তিনি বিশ্বের ১০ নারীনেত্রীর মধ্যে ৬ষ্ঠ স্থানে অবস্থান করছেন। যা এ অধিবেশেও কিছুটা প্রভাব ফেলবে।
তবে তাঁর এই সফরসঙ্গীর বিশাল বাহিনী মন্ত্রী পরিষদ, পরিবারের সদস্যবর্গ, নিরাপত্তাকর্মী, রাজনৈতিককর্মী, আমলা-কামলাসহ যাদের মধ্যে ৭১জন গিয়েছেন সরকারী খরচে। (সূত্র : আমাদের সময়, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১০) এই বিষয়টি কিছুটা হলেও বিতর্কের সৃষ্টি করবে। সবাইকে খুশী করার জন্য ১০৩ ব্যক্তির সফর তাই ‘ভ্রমণ বিলাস’ হিসেবেই আখ্যা করেছে অভিজ্ঞমহল। এজন্য কতটাকার বাজেট তা হিসেব করলে মোটা অংকের একটা অর্থ ‘অপচয়’ বলে মনে হবে।
এই অপচয়ে ছোট একটা প্রতীকী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিন কবি। গত ১৭ সেপ্টেম্বর মানবজমিন জানিয়েছে, তারা বিজনেস ক্লাসের ভাড়া (প্রায় ১৩ লাখ) ফেরত দিয়ে সাধারণ যাত্রী হিসাবে ইকোনমি ক্লাশে এসেছেন। এ নিয়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০১০-এ প্রথম আলোতে আনিসুল হক ‘কবিরা যখন শিরোনাম’ শীর্ষক লেখায় সরকারি অর্থ অপচয় এবং তিন কবির চমৎকার মূল্যায়ন করেছেন। গুন্ডা, মহাদেব দা এবং সামাদকে অভিনন্দন।
অপরদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর। এবার তিনি আকাশে বসে জন্মদিন যাপন করবেন। তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।
মূল লেখাসহ আরও চমকপ্রদ রিপোর্ট পড়তে এখানে ক্লিক করুন-
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ৩:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




