somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রান্না কি পুরুষের কাজ, নাকি নারীর? আপনি কী নিজেই এখন নিজের ‘কাজের লোক’?

২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ৩:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মাহাবুবুল হাসান নীরু
আমার মনে আছে একবার ঢাকায় এক তরুণীকে কথা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘রান্না কি পুরুষের কাজ, নাকি নারীর?’ তরুণীটি উত্তরে বলেছিলো, ‘সেটা তো কাজের লোকের কাজ’। বাংলাদেশে একসময় রান্নাকে গৃহিণীদের কাজ হিসেবে গণ্য করা হলেও দিনে দিনে এ দায়িত্বটা চেপেছে কাজের মেয়ে, বুয়াদের ওপর। শহরে তো বটেই; গ্রামেও আজকাল প্রসার লাভ করেছে এ কালচার। আর উচ্চবিত্তদের জন্য বাবুর্চি তো রয়েছেই। ফলে দিনে দিনে খোদ গৃহিণীদের সাথেই বেড়ে গেছে রান্না ঘরের দূরত্ব। স্বামী-ছেলে-মেয়েদের কথা আর কিইবা বলবো। রান্না তো পরের কথা, এখনও তো বাংলাদেশের অধিকাংশ স্বামী বা ছেলেমেয়েরা পারত পক্ষে হাত দিয়ে ঘরের কুটোটিও স্পর্শ করে না। আর যে ছাত্র বা ছাত্রীটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে, তার মনে বদ্ধমূল ধারণা, পড়াশোনার বাইরে তার আর কোনো কাজ নেই। অবশ্য তাদের মনে এই ধারণাটি গেঁথে দিতে অভিভাবকদের একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। অধিকাংশ অভিভাবকই আজও ভাবেন, ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার বাইের অন্যকিছু করলে বা শিখতে গেলে তাদের পড়াশোনার ক্ষতি হবে। আর অভিভাবক শ্রেণীর এই ভুল ধারণার কারণে আমাদের কিশোর ও যুব সমাজ বহুমুখি শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, এতে দেশ তো নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেই, পাশাপাশি আমাদের কিশোর এবং যুব সম্প্রদায় বেড়ে উঠছে পরনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে। শুধু তাই নয়, সারা জীবনে কাজের লোকসহ ঘর-গৃহাস্থালীর নানা কাজ-কর্মে তাদের বা অভিভাবকদের বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। একবার হিসেব কষে দেখুন তো ঢাকায় এখন যেনতেন একটা কাজের লোকেরও বেতন কতো? তেল-সাবান, কাপড়-চোপড়সহ এই কাজের লোকের পেছনে একটা পারিবারের বছরে খরচ হয় কতো? বারো বা চব্বিশ বছরে? আর সারা জীবনে? বিশাল অঙ্ক! অথচ বুয়েট বা ঢাকা বি‍শ্ববিদ্যালসহ বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপিঠগুলোর সেরা মেধাবি ছাত্র-ছাত্রীরা যারা দেশে থাকতে বারুদে ঠুকে ম্যাচের কাঠি জ্বালাতে পারতো না, কিংবা চুলা জ্বালিয়ে ডিমভাজিটি পর্যন্ত করতে পারতো না, তারাই বিদেশে এসে বনে গেছে রীতিমতো পাকা রাঁধুনী! শুধু তাই নয়, ঘর-গৃহাস্থালীর সব কাজ তারা করে থাকে নিজের হাতে, পড়াশোনার পাশাপাশি এসব কাজেও তারা ভীষণ দক্ষ হয়ে উঠছে দিনে দিনে। প্রশ্ন করতে পারেন, তবে কি বিদেশে পড়াশোনার চাপ কম? নাকি হাতে থাকে অনেক অবসর? এর কোনোটাই সত্যি নয়, বরং বিদেশে একটা মানুষের জীবন কাটে ভীষণ ব্যস্ততার মাঝে আর ছাত্রদের পড়াশোনার চাপ? সেটা যেসব ছাত্র-ছাত্রী বিদেশে পড়াশোনা করছে তারাই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। আগেই বলেছি কানাডায় আমি যে শহরটাতে থাকি সেটার নাম লন্ডন। লন্ডন মূলত বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একটি শহর। এ শহরেই বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ইউনির্ভাসিটি অব ওয়েষ্টার্ণ অন্টারিও বা ইউ.ডব্লিও.ও অবস্থিত। লন্ডনে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রায় সকলেই এ ইউনির্ভাসিটিতে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করছেন। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মেধাবী ছাত্র-শিক্ষকদের অধিকাংশই এখানে আসেন বিভিন্ন বিষয়ের ওপর মাস্টার্স অথবা পিএইচডি ডিগ্রী লাভের জন্য। প্রবাস জীবনে পড়াশোনার প্রচন্ড চাপের মাঝেও এ শহরের বাঙালীরা শুধুই যে রান্না-বান্না বা ঘর-গৃহস্থালীর কাজ, তা নয়, সামাজিক নানা আচার-আয়োজন-অনুষ্ঠানাদির মাঝে নিজেদের সম্পৃক্ত রাখেন। বিদেশের মাটিতে প্রিয় বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে লালন করেন অত্যন্ত আন্তরিকভাবে। ধর্মীয় এবং জাতীয় দিনগুলোতে বাংলাদেশী রীতিতে করে থাকেন নানা আয়োজন।
সে যা হোক, দু’হাজার আট সালের জুলাই মাসে প্রথম লন্ডনে এসে উঠছিলাম আমার স্ত্রী অর্চির বুয়েট জীবনের বন্ধু ইভা ও সুজনের বাসায়। সে সময় ওরা স্বামী-স্ত্রী দু’জনই ইউনির্ভাসিটি অব ওয়েষ্টার্ণ অন্টারিওতে পিএইচডি করছিলো। বুয়েটের সিভিল ডিপার্টমেন্টের ‘৯৪ ব্যাচে ইভা প্রথম ও সুজন দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলো। এতে করেই বোঝা যায় দু’জনেই কেমন তুখোড় মেধাবী ছাত্র। ঢাকাতে বেশ ক’বার ওরা আমার বাসায় এসেছে। ওদের আমি পড়ুয়া হিসেবেই জানতাম। দু’জনের কেউই ঘর-সংসারে কোনো কাজ করতো বলে আমার মনে হয়নি। কিন্তু কানাডায় এসে পড়াশোনার পাশাপাশি সংসার জীবনেও ওরা দক্ষতার ছাপ রেখেছে। ঘর গোছানোর কাজে একটু অনীহা ছাড়া বাজার-সওদা, যমজ বাচ্চার লালন-পালন, রান্না-বান্না সবকিছুতেই এ দম্পতির দক্ষতা দেখেছি। বিশজন লোককে দাওয়াত করে এক দেড় ঘন্টার মধ্যে ঝটপট খিচুড়ি সাথে গরু বা মুরগির মাংস রান্না করে ফেলতো ইভা। ওর হাতের রান্না করা খিচুড়ির স্বাদও হয় চমৎকার। রান্নায় সুজন ইভার মতো অতোটা দক্ষ না হলেও, সেও কিন্তু মন্দ রাঁধে না। সুজন একটা ‘ডিমের কারি’ রান্না করতে পারে যার স্বাদ চমৎকার। অবশ্য সুজন ও ইভা এখন ভ্যানকুভারে বসবাস করছে। সেখানে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুজন এখন ছাত্র পড়াচ্ছে।
লন্ডনে পড়াশোনার সুবাদে বসবাসরত বাঙ্গালীর সংখ্যা শতাধিক। শহরের উইনির্ভাসিটি সংলগ্ন প্লাটস লেন এলাকাতে প্রায় সকলের বসবাস। আর নিকট প্রতিবেশী হওয়ার কারণে এ কমিউনিটির পারস্পারিক সম্পর্কটাও চমৎকার। শুনলে বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, সামার মৌসুমটা আমাদের কাটে পরস্পরের বাসায় দাওয়াত খেতে খেতে। প্রায় প্রতিদিনই কারো না কারো বাসায় দাওয়াত থাকেই। এদের মধ্যে যেমন থাকে লন্ডনে নবাগত বা নবদম্পতিদের দাওয়াত, তেমনি থাকে ব্যাচেলারদের। লন্ডনে মূলত টোনা-টুনি পরিবারের সংখ্যাই বেশী, অবশ্য দিনে দিনে এদের কারো কারো ঘরে টুনটুনিদেরও আবির্ভাব ঘটেছে। সবকিছু সামাল দিয়ে পুরুষ-নারী নির্বিশেষে এদের অনেকেই যে কতোটা চমৎকার রান্না করে তা চেখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। কোনো কোনো ছেলেমেয়ের রান্নার স্বাদ তো মুখে লেগে থাকে। যেমন, তৌহিদুর রহমানের বিরিয়ানির প্রসংশা করে থাকে জনে জনে।
পরিশেষে একটি প্রশ্ন উঠে আসে আর তা হচ্ছে, প্রবাস জীবনে এসে প্রচন্ড ব্যস্ততা আর তীব্র পড়াশোনার চাপের মাঝেও আমাদের ছেলেমেয়েরা যা করতে পারে বা করে থাকে, দেশে থাকতে কেন সেটা পারে না বা করে না। অনেকেই হয়তো এর উত্তরে সহজ ভাবেই বলবেন, প্রবাস জীবনের বাস্তবতা অনেক কঠিন। প্রবাসে টিকে থাকতে হলে সে বাস্তবতার সাথে লড়াই করতেই হবে। এখানে ‘জুতা সেলাই থেকে চন্ডিপাঠ’ নিজের কাজ নিজেকেই করতে হয়, কেউ এসে করে দেয় না। তবে একটি কথা এখানে না বললেই নয়, আমরা প্রবাসীরাই শুধু নই, কি বড়, কি ছোট, এসব উন্নত দেশের প্রতিটি মানুষ নিজের কাজটা নিজেই করে থাকে। তার মানে তারা নিজেই নিজের ‘কাজের লোক’। তারা কারো ওপর নির্ভর করে বসে থাকে না। কোনো কাজে পারত পক্ষে কেউ কারো সাহায্য পর্যন্ত নেয় না। ব্যক্তি-নাগরিকের পরিশ্রমই বয়ে আনে দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি। মূলত এসব দেশের প্রতিটি নাগরিকের এই মানসিকতাই দিনে দিনে দেশকে এতোটা সমৃদ্ধ ও উন্নতির শিখরে নিয়ে গেছে।
বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, প্রবাসে আসার পর নিজের কাজ নিজে করতে এবং শিখতে প্রথম প্রথম আমাদের ছেলেমেয়েদের অনেক বেগ পেতে হয়। নিজেকে অসহায় মনে হয়। অনেকেই অশ্রুপাত করে ব্যাকুল হয়ে ওঠে নিজের দেশে ফেলে আসা আয়েশী জীবনে ফিরে যেতে। কিন্তু নিজের সুন্দর সমৃদ্ধ ভবিষ্যতকে পায়ে ঠেলতে চায় কে? ফলশ্রুতিতে শুরু হয় টিকে থাকার যুদ্ধ। আজ এই প্রবাস জীবনে এসব দেখে-শুনে বার বার মনে প্রশ্ন জাগে, ইস, এদের মতো বাংলাদেশের প্রতিটি ছেলেমেয়ে যদি নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার এমন যুদ্ধে অবতীর্ণ হতো, তবে নিজেরা তো বহুমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠতোই; সেই সাথে দেশে গড়ে উঠতো বহুমুখী দক্ষ জনশক্তি, দেশ ও জাতি দ্রুত এগুতো সমৃদ্ধির পথে। সেসাথে ভবিষ্যতে যারা প্রবাসে আসবে তাদেরও পড়তে হতো না বিপাকে।
লন্ডন, অন্টারিও, কানাডা।

মূল লেখাসহ আরও চমকপ্রদ রিপোর্ট পড়তে এখানে ক্লিক করুন-
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ৩:২২
১৮টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×