চিনে হুনান নামে একটি প্রদেশ রয়েছে। সেই হুনান প্রদেশেই রয়েছে শাওশান গ্রাম। ১৮৯৩। ২৬ ডিসেম্বর। মাও সে তুং-এর জন্ম সেই শাওশান গ্রামেই। পরিবারও ছিল স্বচ্ছল। ভালো স্কুলে পড়েছেন। বাবা ছিলেন কনফুসিয়াসপন্থি। মা ছিলেন একনিষ্ট বৌদ্ধ। কাজেই ছেলেবেলায় এ দুটি মতে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন।
হুনান প্রদেশের রাজধানীর নাম চাঙশা। ১৯১১। মাও চাঙশা-য় চলে এলেন পড়তে। ভর্তি হলেন হুনান টির্চাস কলেজে । এখানেই প্রথম পাশ্চাত্য দর্শন সম্বন্ধে জানতে পারেন। তা হলে বুদ্ধ ও কনফুসিয়াস সব কথা বলে যাননি?
যাক। সে সময়টায় চিনে চলছিল কিঙ রাজতন্ত্রের দুঃশাসন। তার বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদীদের তীব্র গনআন্দোলন হচ্ছিল। সান ইয়াত সেন ছিলেন জাতীয়তাবাদীদের নেতা। তিনি রাজতন্ত্র ভেঙ্গে গঠন করতে চান প্রজাতন্ত্র। তার ডাকে মাও উদ্ধুদ্ধ হলেন। যোগ দিলেন প্রজাতন্ত্রের সৈন্যবিভাগে । রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনে সান ইয়াত সেন জয়ী হলেন। জয়ী হয়ে কউমিঙটাঙ (জাতীয়তাবাদী) দল গঠন করলেন। করে দলের প্রধান হলেন সান ইয়াত সেন।
১৯১৮। হুনান টির্চাস কলেজে থেকে পাস করে চাকরির খোঁজে বেজিং পৌঁছলেন মাও। কাজ জুটল। বেজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে। অখন্ড অবসর। পাঠ করতে লাগলেন সভ্যতার বিস্ময়কর এক তত্ত্ব: মাকর্সবাদ। বুঝলেন মায়ের বুদ্ধবাদ ও বাবার কনফুসিয়বাদ কাজের জিনিষ না। এসব ব্যাক্তিদর্শন চিনের সামাজিক সমস্যা সমাধানে অক্ষম। এবং এসব বালখিল্য দর্শন চিনকে পিছিয়ে রেখেছে। চিনের প্রয়োজন প্রবল আধুনিকায়ন, তথা পাশ্চাত্যকরণ।
১৯১৯। তখন চিনকে আধুনিকায়ন করার লক্ষে চিনের বুদ্ধিজীবিদের তরফ থেকে একটি আন্দোলন চলছিল। আন্দোলনে মাও যোগ দিলেন। তবে লিখে। সে লেখায় তীব্র সমালোচনা করলেন কনফুসিয়াসের। সেই সঙ্গে ঐতিহ্যবিরোধী আরও সব অনলবর্ষী লেখা লিখলেন মাও।
১৯২০। চাঙশায় ফিরে এলেন মাও। হুনান প্রদেশে গনতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য উদ্যোগী হলেন । ব্যর্থ হলেন।
১৯২১। সাঙহাই এলেন। সে সময় চিনের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হচ্ছিল ওখানে। সেই গোপন মিটিং-এ উপস্থিত হলেন মাও। তারপর হুনান ফিরে এসে হুনানে কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক শাখা খুললেন। কী ভাবে ধর্মঘট করতে হয়- শ্রমিকদের তাই শেখালেন।
ঠিক ঐ সময়টায় যুদ্ধরত গোষ্ঠীগুলো উত্তর চিন দখলে রেখেছিল। জাতীয়তাবাদী কউমিঙটাঙ দলের প্রধান সান ইয়াত সেন তাদের দমনে সচেষ্ট হলেন। ১৯২৩ সালে কমিউনিষ্টরা জাতীয়তাবাদী কউমিঙটাঙ দলের সঙ্গে গঠন করে জোট। মাও কউমিঙটাঙএ যোগ দিলেন। হলেন সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য।
১৯২৫। জন্মগ্রাম শাওশানে কৃষক সংগঠন গড়ে তোলেন মাও।
১৯২৭। কৃষক আন্দোলন নিয়ে লিখলেন। ইতিহাসের চাকাকে ঘুরিয়ে দিলেন। কেননা মাও লিখলেন যে, বিপ্লবে কৃষকরাই মূল চালিকা শক্তি, শ্রমিকরা নয়। মার্কসবাদবিরোধী বক্তব্য। কাজেই নিজের দলে হইচই পড়ে গেল।
১৯২৭ সালে জাতীয়তাবাদী কউমিঙটাঙ দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। কউমিঙটাঙ দলের নেতা তখন চিয়াং কাই সেক। তিনি কট্টর প্রতিক্রিয়াশীল হওয়ায় প্রবল কমিউনিষ্টবিরোধী দমননীতি অনুসরন করলেন।
সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নিয়ে আরেকবার ইতিহাসের চাকাকে ঘুরিয়ে দিলেন মাও। হুনান প্রদেশের কৃষকদের নিয়ে সৈন্যবাহিনী গঠন করলেন মাও।
অবশ্য পরাজিত হলেন।
দক্ষিণে পার্বত্য এলাকায় সরে এলেন। জায়গাটার নাম জিয়াংজি প্রদেশ। এখানে তিনি গ্রামীন ভূমি সংস্কারে উদ্যোগী হলেন। ওদিকে অসংখ্য তরুণরা দলে দলে মাও নিয়ন্ত্রিত কমিউনিষ্ট পার্টিতে যোগ দিচ্ছিল। মাও তাদের সংগঠিত করেন। ইতিহাসে এই সশস্ত্র দলটি রেড আর্মি। এদের লক্ষ একটাই-কৃষকের মুক্তি। আর সে লক্ষ অর্জনে অভিনব গেরিলা যুদ্ধের পথ অনুসরণ করে আরেকবার ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দিলেন মাও।
১৯৩৪। চিয়াং কাই সেক জিয়াংজি প্রদেশ ঘিরে ফেলল।
(বাংলাদেশে মাওবাদীরা "আর এ বি" দ্বারা নিহত হলেও) এক বিস্ময়কর ও অপ্রতিরোধ্য গতিবেগে সে বেড়াজাল ছিন্ন করে রেড আর্মিকে নিয়ে বেড়িয়ে এলেন মাও।
অতপর?
অতপর আরেকবার ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দিলেন কৃষকের বন্ধু।
কী করলেন তিনি। তিনি আরম্ভ করলেন এক দীর্ঘ পদযাত্রা। যা ইতিহাসে লং মার্চ হিসেবে পরিচিত।
রেড আর্মির সঙ্গে ৬ হাজার মাইল দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
গন্তব্য?
উত্তরের ইয়ানান প্রদেশ।
হাঁটতে হাঁটতে অগনন কৃষকের সমর্থন পেলেন মাও; পেলেন অগনন কৃষানীর ভালোবাসা ।
হাঁটতে হাঁটতে লক্ষ্যে পৌঁছে গেলেন মাও ।
ক্রমশ বদলে দিলেন চিনের হাজার বছরের পুরনো রুগ্ন কৃষিকাঠামো।
অপরকেও বদলে দিতে উদ্বুদ্ধ করলেন।
যে কারণে আজও নেপাল থেকে লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী তরুণেরা পার্বত্য এলাকায় কাটাচ্ছে নিঘূর্ম রাত ...এমন কী বাংলাদেশেও।
মনে থাকার কথা। কউমিঙটাঙ দলের নেতা তখন চিয়াং কাই সেক। তিনি কট্টর প্রতিক্রিয়াশীল হওয়ায় প্রবল কমিউনিষ্টবিরোধী দমননীতি অনুসরন করলেন।
চিয়াং কাই সেক এর ভূমিকা নিয়েছে চার দলীয় জোট সরকার (এরা জোদদার শ্রেণির হওয়ায়)। মাওবাদী দমনে তারা গঠন করেছে কালো পোষাকের "আর এ বি।"
যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এখন দেখা যাক কারা জেতে!
২
বাংলাদেশেও রয়েছে দূর্বল কৃষিকাঠামো। এর দূর্বলতা কাটাতো প্রয়োজন আমূল ভূমিসংস্কারের। গ্রামীন কৃষি-অর্থনীতির আমূল পরিবর্তের সাহস কেউই করে না যেহেতু কেউই বিপ্লবী নয়। এ দেশে ভূমিসংস্কারের কথা কেউ তোলে না।
আমরা কি রুঢ় বাস্তবতা এড়িয়ে চলেছি?
কেন?
অথচ আমরা একটি উন্নত রাষ্ট্রের অধিকারী হতে চাই। তাই যদি হয়-তা হলে আমাদের পড়ে দেখতে হবে মাও সে তুং কী লিখে গেছেন।
অবশ্য সে ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা অন্তরায়। এদেশের রাজনীতি শহরভিত্তিক। তার নানা চকচকে জৌলুষ। পাকিস্থান আমল থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতি ধনী জোদদার পরিবার নিয়ন্ত্রিত। কাজেই বাংলাদেশে কৃষির মূল সমস্যা এড়িয়ে সমস্যা নিরসনে আজও দেওয়া হচ্ছে টোটকা অষুধ।
৩
একদিন হয়তো চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙ্গে দেখব কাস্তেহাতুড়ি নিয়ে শহরের উপান্তে পৌঁছে গেছে চেয়ারম্যান মাওয়ে বিশ্বাসী কৃষকেরা।
হয়তো, হাসিনা সরকার ব্যর্থ হওয়ার পর।
কাজেই-মানে, ঐ ভূমি সংস্কারের বিষয়টি ...
তথ্যসূত্র:
Rogaski, Ruth. "Mao Zedong." Microsoft® Student 2008 [DVD]. Redmond, WA: Microsoft Corporation, 2007. Microsoft ® Encarta ® 2008. © 1993-2007 Microsoft Corporation. All rights reserved.
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


