somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: রক্ত।

২৫ শে জানুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১০:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সিগারেটে টান দিল জেরিন। তারপর ধোঁওয়া ছেড়ে জিজ্ঞেস করল, জাফর ভাই জানে? ওর কন্ঠস্বরটা গম্ভীর।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল বৃষ্টি । সংক্ষেপে বলল-মেইল করে জানিয়েছি।
রি-অ্যাকশন?
রি-অ্যাকশন আর কী। সামান্য কাঁধ ঝাঁকালো বৃষ্টি। সহজ ভাবেই নিয়েছে। এখন নাকি ফিরতে পারবে না। তা ছাড়া, জানিসই তো ওর তিন বোন। বোনদের বিয়ে না দিয়ে নিজে বিয়ে করবে না। ওদিকে ওখানে চাকরিবাকরির অবস্থাও ভালো না; ওর মাস তিনেক ধরে চাকরি নাই, চাকরি খুঁজছে। জার্মানিতে এখন অর্থনৈতিক মন্দা চলছে-জানিসই তো। বৃষ্টি ম্লান স্বরে বলল।
জেরিন হাসল। হাসিটা ক্রর। বলল, মার্কসকে অবজ্ঞা করল ওরা -এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
মানে? বৃষ্টি অবাক। দু’জনই অর্থনীতির ছাত্রী ছিল। তবে বিষয়টি নিয়ে গভীরচিন্তাভাবনা না করেই পাস করে গেছে বৃষ্টি । জেরিন অবশ্য অন্যরকম। এখন বলল, কিছু না রে সই, কিছু না। তোর পাশে জাফর ভাইকে বেশ মানাত রে। জেরিনের কন্ঠস্বর এখনও গম্ভীর । বেইলি রোডের থিয়েটার পাড়ায় সেই বিকেলগুলির কথা তোর মনে আছে রে?
হুঁ। বৃষ্টি কেঁপে উঠল।
সেই দিনগুলির কথা মনে পড়লে আমার কেমন যেন লাগে রে বৃষ্টি। নরম স্বরে বলল জেরিন। একবার সন্ধ্যায় কী ঝুম বৃষ্টি- তোর মনে নাই?
মনে আবার নাই? বৃষ্টি মনে মনে বলে।
আমরা চারজন অনেকক্ষণ ভিজলাম -আদিত্যকে কেমন ভেজা কাকের মতন দেখাচ্ছিল। জাফর ভাই কে সে কথা বলতেই কী যেন বললেন। আর এখন? এখন জাফর ভাই কতদূরে -একা একা, হয় তো এখন বৃষ্টি ঝরছে শুরু করেছে স্টুটগার্টে । ভিজছে। একা। সো স্যাড। বলে বৃষ্টির কাঁধে আলতো করে হাত রাখল জেরিন। চোখের জল আড়াল করতেই বৃষ্টি যেন চোখ ফিরিয়ে জানালার দিকে তাকালো। জানালায় সোনালি উজ্জ্বল রোদ। জেরিনদের এই পুরনো আমলের বাড়িটি দোতলা। দোতলার ড্রইং রুমটার দুটি বড় বড় জানালা- জানালা দুটি দিয়ে মধ্য এপ্রিলের অফুরান ঝাঁঝালো রোদ ঢুকেছে। জানালার ওপাশে একটি ঝাঁকড়া কামরাঙা গাছ। সে গাছের ধুলোমলিন সবজে পাতায় সোনালি রোদের ঝিকিমিকি। পাতার আড়ালে বসে অনেক ক্ষণ ধরে একটা কাক ডাকছিল। এখন প্রায় বেলা বারোটার মতন বাজে। নিচের গলিতে রিক্সার টুং টাং। বৃষ্টি কান পাতে। অসুস্থ্য বাবার কথা মনে পড়ল ওর। ক্ষীণ উদ্বেগ বোধ করে বৃষ্টি। পোড়া তামাকের গন্ধ পেল বৃষ্টি। জেরিন আরেকটা সিগারেট ধরাল । জেরিনের মুখোমুখি কার্পেটের ওপর বসে আছে বৃষ্টি । আজ ছাই ছাই সুতির একটা শাড়ি পরেছে বলেই পা গুটিয়ে বসেছে বৃষ্টি; জেরিন বসেছে পা ছড়িয়ে- জেরিন আজ জিন্স আর হাতা-কাটা কালো পাঞ্জাবি পরেছে। ওর বাঁ পাশে ওর চশমাটা পড়ে আছে। চশমা ছাড়া একদমই অন্যরকম লাগে জেরিনকে। তবে ওর গম্ভীর ফরসা মুখটিতে পড়াশোনার গভীর ছাপ। কত যে বই পড়েছে জেরিন, ওর রেজাল্টও ভালো -ও অনেককিছু জানে; যা বৃষ্টি জানে না। যখনই সমস্যায় পড়ে বৃষ্টি -জেরিনকে খুলে বলে। দুর্দান্ত স্মার্ট জেরিন, অ্যাক্টিভিষ্ট। জেরিনের পরামর্শ যে সব সময়ই কাজে দেয় তা নয়-তবে পরিস্থিতির ভালো বিশে¬ষন করেতে পারে জেরিন। এম এ পাস করে জেরিন এখন থিসিস করছে। বৃষ্টি পড়াচ্ছে ওদেরই পাড়ার একটা শিশুদের স্কুলে ।
জেরিনের সঙ্গে আজ অনেকদিন পর দেখা বৃষ্টির। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষার পর আর দেখা হয়নি। অনেক দিন পর আজ এ বাড়িতে এল বৃষ্টি । বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অবশ্য এ বাড়িতে অনেকবার এসেছিল বৃষ্টি। তার পর আর আসা হয়নি। জেরিনের মা লুৎফা আন্টি। বৃষ্টিকে ‘রুপসী বাংলা’ বলে ডাকেন লুৎফা আন্টি। তার কারণও আছে। ঘন কালো চুল আর মাঝারি গড়নের বৃষ্টির শ্যামলা মতন
চেহারাটি ভারি মিষ্টি। দেখা হলেই থুতনি নেড়ে দিয়ে লুৎফা আন্টি বলেন, রুপসী বাংলার কি খবর? কথাটা শুনে মিষ্টি করে হাসত বৃষ্টি। ঝকঝকে সুন্দর দাঁত বৃষ্টির। হাসার সময় গালে টোল পড়ে। আজ অনেকদিন পর বৃষ্টিকে দেখে কী খুশি লুৎফা আন্টি। দুপুরে খেয়ে যাবে। বললেন।
আজ না আন্টি, অন্যদিন। তখন বলেছিল বৃষ্টি।
তোমার কোনও কথাই আমি শুনব না মেয়ে। বলে লুৎফা আন্টি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান। সম্ভবত রান্না ঘরের দিকেই গেলেন। বাড়িটা ফাঁকা। পুরনো দিনের মতন জেরিন আর বৃষ্টি বসে ড্রইং রুমের মেঝেতে।
সোফার ওপর কতগুলো সাদা খাম পড়ে ছিল। একটা খাম তুলে একটা কার্ড বার করল জেরিন। চোখ বোলাল। সর্বনাশ!
কী! বৃষ্টি চমকে উঠল।
তোর হবু শ্বশুড় খান মোহাম্মদ ঈসমাইল? জেরিনের কন্ঠস্বর তীক্ষ্ম।
হ্যাঁ, তো? বৃষ্টি থতমত খায়।
লোকটা তো চরম ফান্ডামেন্টালিস্ট! যুদ্ধাপরাদের অভিযোগ আছে। ইস্, একটা মৌলবাদী ফ্যামিলিতে তোর বিয়ে হবে! কথাটা ভাবতেই আমার কী রকম খারাপ লাগছে। এরা এখনও মুগল ঐতিহ্য ধরে রেখেছে রে বৃষ্টি। বদলায়নি। তোকে কালো কাপড়ে ঢেকে ফেলবে। দেখবি।
কথাগুলি সেভাবে ভাবেনি বৃষ্টি। ও শুধু জানে ওর হবু শ্বশুড় ডাক সাইটে সংসদ সদস্য। চট্টগ্রামের বনেদি বংশ। বিয়েটা হচ্ছে খুব শিগগির-এ মাসের শেষেই। বাবার রিসেন্টলি একবার স্টোক হয়ে গিয়েছে। তা ছাড়া বৃষ্টিদের পরিবারের অবস্থাও ভালো না। বাবা দেরি করতে চান না। পাত্ররা ধনী -তার ওপর অভিজাত-এও একটা কারণ। পাত্র খান মোহাম্মদ সোহরাব গাজীপুরের আই আই ইউটিতে পড়ত। আয়ারল্যান্ড থেকে স্টিলের (ইস্পাত) ওপর থিসিস করে এসেছে। ঢাকার ওয়ারিতে দশ কাঠার ওপর পুরনো আমলের বিশাল বাড়ি। বাড়ির নাম রাখা হয়েছে পাকিস্তানের স্থপতি কায়েদ দে আযম-এর সম্মানে। মেন গেটের বাইরে শ্বেতপাথরে লেখা-‘আযম ভিলা।’ খান মোহাম্মদ ঈসমাইলের পিতা মোহাম্মদ সুলতান আলী বেগ; তিনিই পাকিস্তান আমলে তুলেছিলেন আযম ভিলা। সুলতান আলী বেগ মুসলিম লীগ করতেন । দেশের বাড়ি চট্টগ্রামের চকোরিয়া । কাঠের একচেটিয়া ব্যবসা ছিল বেগ পরিবারের। সুলতান আলী বেগ-এর বাবার নাম শাহ্ জাহাঙ্গীরির। চকোরিয়ার বিশিষ্ট পীর ছিলেন। মুগল আমলে চকোরিয়ার এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন শাহ্ জাহাঙ্গীরির পূর্ব পুরুষ।
এসবই বাবার মুখে শুনেছে বৃষ্টি।
বৃষ্টির বিয়ের কার্ডের ওপর চোখ বুলিয়ে জেরিন বলল, ছেলের নাম খান মোহাম্মদ সোহরাব।
বৃষ্টি মাথা ঝাঁকালো।
তো ছেলের ডাক নাম কি রে বৃষ্টি? জানিস? জেরিন জিজ্ঞেস করে।
সজল। বৃষ্টি বলল।
সজল? জেরিন মুখ তুলে তাকাল।
হ্যাঁ, সজল।
হি, হি। জেরিন হেসে উঠল।
কী রে-হাসিস কেন? বৃষ্টি অবাক।
মুগলদের ছেলের নাম সজল। খান মোহাম্মদ সোহরাব মুগল নাম নয় তো কি। বাহ্, বেশ। বাংলা এখানেই লড়াই করছে। ওরা বুঝতেও পারছে না।
মুগলদের ছেলে মানে? ওরা তো টিচাগাঙের! বৃষ্টি অবাক।
তুই এসব বুঝবি না সই। বলে ঝুঁকে বৃষ্টির কপালে চুমু খায় জেরিন । ফিসফিস করে বলে, বাংলা সত্যিই দুঃখিনি রে বৃষ্টি। ইওরোপও এক সময় তাই ছিল। মধ্যযুগে। যখন মনে করা হত খ্রিস্টীয় মতবাদই সব। বাংলাও এখন ডুবে আছে ঘোর অন্ধকারে ...বাদ দে।



দরজার কাছে শব্দ। বৃষ্টি মুখ তুলল। লুৎফা আন্টি। কিচেন থেকে এলেন? আঁচলে কপাল মুছছেন। ভারি স্নিগ্ধ দেখতে লুৎফা আন্টি। মাঝবয়েসী, সামান্য পৃথুলা, শ্যামলা, কোঁকড়া চুল, গোল্ড রিমের চশমা। জেরিন ওর মায়ের মত হয়নি। জেরিন ফর্সা। কাঁধ অব্দি ছাঁটা স্ট্রেইট চুল। আজ সাদা শাড়ি পরেছেন লুৎফা আন্টি। লুৎফা আন্টি কী স্মার্ট। টিভির টক শো তে যখন নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে অকাট্য যুক্তি উপস্থাপন করেন লুৎফা আন্টি- বৃষ্টি তখন মুগ্ধ হয়ে শোনে । তা ছাড়া লেখার চমৎকার হাত লুৎফা আন্টির-‘সমকালে’ নিয়মিত কলাম লেখেন। ফরিদা আখতারের কী রকম যেন আত্মীয় হন।
তুমি শুঁটকি মাছ খাও তো বৃষ্টি?
খাই আন্টি।
উলটো দিকে সোফায় বসতে বসতে লুৎফা আন্টি বললেন, আজ বেগুন দিয়ে শুঁটকি মাছ রেঁধেছি। রোমেল গত সপ্তায় টেকনাফ গিয়েছিল-ওখানে ওর বন্ধুরা মিলে একটা মোটেল করছে। চাকরি করবে না ঠিক করেছে। ওখান থেকেই পাঁচ কেজির মতো নিয়ে এসেছে।
বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে জেরিন বলল, জানিস বৃষ্টি-রোমেল না বান্দরবানের একটা ম্রো মেয়ের প্রেমে পড়েছে।
তাই?
হ্যাঁ। মা বিয়েতে রাজী। বলে গোল্ড লিফের প্যাকেটটা টেনে একটা সিগারেট বার করল জেরিন। ধরাবে। বৃষ্টি জানে- জেরিন ওর মায়ের সামনেই সিগারেট খায়। জেরিনদের পরিবারটা ভীষন প্রৌগ্রেসিভ । যে কারণে রক্ত সইতে পারে না, দুর্গন্ধও সহ্য করতে পারে না। জেরিনদের পুরো পরিবার কক্সবাজার চলে যায় কুরবানী ঈদের ঠিক আগে আগে। কর্পোরেশনের লোকেরা অবোধ প্রাণির রক্ত ধুয়ে সাফ করলে তারপর ঢাকায় ফিরে আসে।
রোমেল-মানে জেরিনের ভাই একটা আদিবাসী মেয়েকে বিয়ে করবে? বৃষ্টি ক্ষাণিকটা অবাক হয়ে লুৎফা আন্টির দিকে তাকাল। লুৎফা আন্টি বললেন, ম্রো রা তো কনজারভেটিভ। বিয়েটা হবে কিনা বলতে পারি না। তবে দিন বদলাচ্ছে। ওরা যদি রাজি হয় তো আমার ওদের মেয়েকে ঘরে তুলতে আপত্তি নেই। তা, তুমিও আমাদের সঙ্গে চল না বৃষ্টি।
কই?
নেকস্ট উইকে আমরা খাগড়াছড়ি যাচ্ছি। মানে, খাগড়াছড়ির কয়েক কিলোমিটার উত্তরে সাজেক। ওখানে একটা জার্মান সংস্থা আদিবাসী উৎসবের অর্গানাইজ করছে। তিন দিন ধরে চলবে মেলা। যাবে?
জেরিন বলল, ও যাবে কি মা-বৃষ্টির তো মা বিয়ে ঠিক। কন্ঠে মৃদু শ্লেষ টের পেল বৃষ্টি।
লুৎফা আন্টি চুপসে যান।ওহ্, তা হলে তো তোমার পায়ে বেড়ি পড়েই গেল। দেখি, কার্ডটা দেখি। ছেলে কি করে? লুৎফা আন্টি বললেন।
জেরিন ঝুঁকে কার্ডটা ওর মাকে দিতে দিতে গম্ভীর স্বরে বলল, পাত্রপক্ষকে তুমি চেন মা।
কে? কার্ডটা নিতে নিতে লুৎফা আন্টি থমকে যান।
খান মোহাম্মদ ঈসমাইল। তার মেজ ছেলে। জেরিনের কন্ঠস্বরটা কেমন গম্ভীর। বৃষ্টির বুকের ভিতরটা মুহূর্তেই শীতল হয়ে ওঠে।
কী! ও। লুৎফা আন্টির মুখটা কালো হয়ে উঠল।
কী হল আন্টি? বৃষ্টির বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে।
কিছু না মা।
না, বলেন, আপনি কিছু জানেন? বৃষ্টি কেমন মরিয়া হয়ে উঠল। ও সিধে হয়ে বসল।
জেরিনের দিকে তাকালেন লুৎফা আন্টি। জেরিন বলল, মা, তুমি বলেই দাও। লুকিয়ে কী লাভ। একদিন তো বৃষ্টি সবই জেনে যাবে।
আমি কী জেনে যাব? বৃষ্টির বুকের ভিতরে কনকনের ঝড়ো হাওয়ার উথালপাথাল নাচ।
লুৎফা আন্টি বললেন, জান তো খান মোহাম্মদ ঈসমাইলরা চট্টগ্রামের চকোরিয়ার প্রভাবশালী অভিজাত পরিবার।
জানি আন্টি।
একাত্তরের যুদ্ধের সময় ... মানে খান মোহাম্মদ ঈসমাইলরা আর তার বাবা মোহাম্মদ সুলতান আলী বেগ ...মানে তারা মিলে ওখানকার ...মানে ...চকোরিয়ার অসংখ্য বাঙালি হত্যা করেছে।
ওহ!
হ্যাঁ।
পাকিস্তান ভেঙ্গে যাক- তারা তা চায়নি। পাকিস্তান নাকি আল্লার ঘর। মোহাম্মদ সুলতান আলী বেগ এ নিয়ে উর্দুতে একটা বইও লিখেছিলেন। সেই বই পড়ে আমার বাবা তো হাসতে হাসতে শেষ। আমার বাবা আবুল ফজলের ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন-শওকত ওসমানকেও চিনতেন বাবা। যাক। চকোরিয়ায় নিহতদের মধ্যে সংখ্যালঘুই ছিল বেশি। সংখ্যালঘুদের ওপর মোহাম্মদ সুলতান আলী বেগ এর ছিল ভীষন রাগ -হয়তো তারা মুসলমান হয়ে যায়নি বলে। তার চোখে অমুসলিম মানেই বিপথগামী, অশুদ্ধ, বেদ্বীন-লোকটা ছিল এমনই মূর্খ! মোহাম্মদ সুলতান আলী বেগ এর নির্দেশেই তার লোকেরা বৌদ্ধ গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে দিত-পাকিস্তানি সৈন্যদের কাছে তালিকা তুলে দিত-কাকে কাকে মেরে ফেলতে হবে । কত বৌদ্ধ মঠ যে পুড়িয়ে দিয়েছে-বুদ্ধের একটা কুড়ি ফুট উচুঁ মূর্তি ছিল চকোরিয়ার ডুলাহাজারায়-সেটি গলিয়ে টিক্কা খানকে উপহার দিয়েছে । খুন-ধর্ষনেও মোহাম্মদ সুলতান আলী বেগ এর লোকেরা কম যায়নি।
বৃষ্টি শিউড়ে ওঠে।
আমার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় বাড়িও ওখানেই, মানে চকোরিয়ার বড়ুইতলীতে। লোকমান চাচা কাঠের ব্যবসা করতেন। ব্যবসা করলে কী হবে- তরুণ বয়েস থেকেই রবীন্দ্রনাথের ভারি ভক্ত ছিলেন লোকমান চাচা; সে একই কারণেই লোকমান চাচা ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুরও ভক্ত- তাই বঙ্গবন্ধুকে কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছিলেন লোকমান চাচা । বাঙালির শ্রেষ্ট কবিকে ভালোবাসলে বাঙালির রাজনৈতিক নেতাকেও ভালো না বেসে যে উপায় নেই। লোকমান চাচা তাঁর চকোরিয়ার বড়ুইতলীর
বাড়ির এক তলার বসার ঘরে রবীন্দ্রনাথের ছবির পাশে বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙ্গিয়ে ছিলেন । তাঁর অপরাধ এইটুকুই- মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সৈন্যরা লোকমান চাচার ‘নিরালা কুটির’ তছনছ করে। তোমার হবু শ্বশুড়, মানে- খান মোহাম্মদ ঈসমাইলের বাবা সুলতান আলী বেগ লোকমান চাচাকে ধরে নিয়ে যায়। চকোরিয়া সদরে তাদের বাড়ির নিচে ছিল জল্লাদখানা। জবাই করে খুন করেছে আমার লোকমান চাচাকে। বলতে বলতে ফুঁপিয়ে ওঠেন লুৎফা আন্টি।
বৃষ্টি চমকে ওঠে। কী করবে বুঝবে পারে না।
এ বিয়ে আমি করব না আন্টি! বৃষ্টি ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল। ইষৎ কাঁপছে।
দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন লুৎফা আন্টি। নরম সুরে বললেন, না করে কি উপায় তোমার মা? শুনেছি তোমার বাবার একবার স্ট্রোক হয়ে গেছে। বাইপাস করাতে হবে। এই অবস্থায়-
কিন্তু, তাই বলে খুনির সঙ্গে ঘর করা! বৃষ্টির শান্ত সুন্দর মুখটা এখন কী রকম বিপর্যস্ত দেখাচ্ছে।
এদেশের মানুষ কি খুনখারাপি বোঝে মা? লুৎফা আন্টি বললেন। খুনখারাপি বুঝলে একাত্তরের খুনিরা এদেশে মন্ত্রী হয় কী করে বল? খান মোহাম্মদ ঈসমাইল ৪ দলীয় জোট সরকারের সময় প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের অনুমতি পেলেন। খুনি হলে কি অনুমতি পেতেন? তুমিই বল? বলে উঠে দাঁড়ালেন লুৎফা আন্টি। তোমরা কথা বল। আমি যাই-দেখি রান্নার কী হল।
লুৎফা আন্টি চলে যেতেই জেরিন আরেকটা সিগারেট ধরাল।
তারপর বৃষ্টির কানে কানে ফিসফিস করে কথাটা বলল ।



রাত বারোটার দিকে বাসর ঘরটা ফাঁকা হয়ে গেল। তারপর বৃষ্টির শ্বশুর খান মোহাম্মদ ঈসমাইল বাসর ঘরে এলেন। বৃষ্টির তখন বুক কাঁপে-ও মুখ তুলে তাকায়। এই লোকটা খুনি! খান মোহাম্মদ ঈসমাইলের বয়স অনেকদিন আগেই ষাট পেরিয়ে গেছে; এখনও বেশ শক্তসমর্থই আছেন। ধবধবে সাদা দীর্ঘ শরীরটি বলিষ্ট। মাথায় তুর্কি ফেজ টুপি, টুপির রংটি লাল। লাল রঙের ফেজ টুপি পরায় খান মোহাম্মদ ঈসমাইলকে অবিকল অটোমান সুলতানদের মতো মনে হচ্ছিল। খান মোহাম্মদ ঈসমাইলের থুতনির কাছে পাকা ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি আর হাতে একটা ছড়ি। সাদা পায়জামা আর ঘিয়ে রঙের শেরওয়ানি পরেছেন খান মোহাম্মদ ঈসমাইল। সব মিলিয়ে খান মোহাম্মদ ঈসমাইলকে মনে হচ্ছিল যেন মুগল রাজপুরুষ-মুগল চিত্রকলা থেকে নেমে এসেছেন । খালি তরোয়ালটি কোমরে গুঁজতে ভুলে গেছেন। বৃষ্টি আড়চোখে ওর শ্বশুরের দিকে তাকাল। জেরিন থাকলে নিশ্চয়ই বলত-মুগল রেলিক!
সামান্য খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে এসে লোকটা বিছানার এককোণে বসলেন। তীব্র আতরের গন্ধ পেল বৃষ্টি। ওর মাথা টলে ওঠে। এই লোকটাই লুৎফা আন্টির আত্মীয়কে জবাই করে খুন করেছিল! বৃষ্টির গা হাত পা কেমন অবশ হয়ে আসে। লাল বেনারশী আর একগাদা গয়না পরে বিছানার এককোণে বসেছিল। এই ঘরটা শীততাপ নিয়ন্ত্রিত- তারপরও ঘামছিল বৃষ্টি। চার চারটে টিউব লাইটের তীব্র আলো। কেন যেন তেমন ফুল ছড়ায়নি এরা-কেবল তীব্র আতরের গন্ধ পেল বৃষ্টি। ও ওর বরের দিকে তাকালো। আকবরের কোর্টে মুগল সুবেদারের মতন খান মোহাম্মদ সোহরাব বিনীত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।
খান মোহাম্মদ ঈসমাইল কেশে গলা পরিস্কার করলেন। তারপর বললেন - শোন, জান্নাতুল ফেরদৌসী। তোমারে কয়েকটা কথা বলার আছে। মেয়েমানুষ হইল কবুতরের মতন। কবুতরের বাকুম বাকুম বেশি দূর হইতে শোনা গেলে কিন্তু বিড়ালে খাইব। মনে রাখবা- স্বামীরে কখনও ‘তুমি’, ‘তুমি’ কইরা বলবা না। ‘আপনি’, ‘আপনি’ কইরা বলবা । স্বামী হইল স্বামী, আর স্ত্রী হইল স্ত্রী । তুমি ইনভারসিটিতে পড়ছ। শুনছি ইনভারসিটিতে শিখায় স্বামী-স্ত্রী হইল বন্ধু। আসতাগফিরুল্লা। এইটা কোনও কথা হইল? আর শুন- টেলিভিশন দেখবা না। নামাজ পড়বা। সোহরাবের মায়ের সঙ্গে বোরখা পইরা টাইম মতন পার্টি অফিসে যাবা। ঘরের মধ্যেও বোরখা পইড়া থাকবা। তোমার জন্য করাচি থেইকে এক ডরজন বুরখার আসতেছে। আমিই অর্ডার দিসি। কালো কালার। বাদামী কালার। ঘরের মধ্যেও বোরখা পইরা থাকবা। কী পরবা না?
বৃষ্টি মাথা নাড়ে। ও আর কী বলবে। ওর গলায় আটার দলা। ওর গরম লাগে। টার্কিশ আতরের বিচ্ছিরি দুর্গন্ধ পায়। আতরের গন্ধ ওর বমির উদ্রেক করে। ও জানে এই মুহূর্তে জেরিন এখানে থাকলে খান মোহাম্মদ ঈসমাইলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। তারপর খালি হাতেই খুন করত।
খান মোহাম্মদ ঈসমাইল বলতে থাকেন-আমরা আমাগো কওমের জন্য কালা মেয়ে কখনও নেই নাই-তোমার বাবার তরিকার কথা চিন্তা কইরা নিলাম। কথাটা মনে রাইখ।
বৃষ্টির দু’কানে কারা যেন জোর করে গরম সীসা ঢেলে দিল। অথচ ... অথচ ... লুৎফা আন্টি আমাকে বলত-‘রুপসী বাংলা।’ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে এক প্রবল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সম্ভাবনা টের পেয়ে এই মুহূর্তে শিউরে উঠল বৃষ্টি । সেই যুদ্ধই কি দ্বিতীয় একাত্তর?
খান মোহাম্মদ ঈসমাইল বলতে থাকেন-তুমি মহিলা মাদরাসায় পড়ো নাই জান্নাতুল ফেরদৌসী। তোমার আব্বা আবদুর রহিম সরকার তোমারে ইনভারসিটিতে পড়ায়ছে। তারপরও তোমায় আনলাম তোমার বাবার তরিকার কথা চিন্তা কইরা । তোমার বাবা আমার ইনকাম ট্যাক্সের কাগজপত্র বছরভর যতœ নিয়া গুছায়া রাখে কি না। বলেই কেন যেন হেসে উঠল লোকটা।
খান মোহাম্মদ ঈসমাইলের কথা মনে হয় শেষ। তিনি এবার ছেলের দিকে তাকালেন। খান মোহাম্মদ সোহরাব চোখের নিমেষে ঘুরে দাঁড়িয়ে ওপাশের দেওয়াল আলমীরার পাল্লাটা খুলে ফেলল। তারপর একটা চাদর বার করল। চাদরের রংটা সাদা। বৃষ্টির বুকটা ধক করে ওঠে। সহসা বৃষ্টির শরীর হিম হয়ে আসে। নির্দেশ সম্ভবত আগেই দেওয়া হয়েছিল। বৃষ্টি সামান্য সরে বসল। সাদা চাদরটা বিছানার ওপর বিছিয়ে সিদে হয়ে দাঁড়াল খান মোহাম্মদ সোহরাব । বেড কাভারের রং সবুজ। সাদা কাপড় বিছানোর পর একটা স্পস্ট কনট্রাস্ট তৈরি হল। ছিঃ। কী এরা! ছিঃ।
চাদর বিছানোর পর সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়লেন খান মোহাম্মদ ঈসমাইল। উঠে দাঁড়ালেন। তার আগে ছেলের দিকে অর্থপূর্ন চোখে তাকিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। লোকটা চলে যাওয়ার পর খান মোহাম্মদ সোহরাব দরজা লক করে দিল। তারপর বিছানার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। বৃষ্টি জানে- কেন এরা বিছানায় সাদা কাপড় পেতেছে? তারপরও খসখসে গলায় বৃষ্টি জিজ্ঞেস করল-সাদা ... সাদা কাপড় কেন?
পরনের শেরওয়ানিটা খুলতে খুলতে খান মোহাম্মদ সোহরাব বলল, আমাগো কওমের নিয়ম। বিশ মিনিট পরে বুঝবা।
আশ্চর্য! এভাবে কথা বলছে কেন সোহরাব। সেদিন কত মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বলছিল বকশীবাজারে ওর খালার বাড়িতে। ঘরে বাইরে এদের আচরন এত আলাদা কেন? খান মোহাম্মদ ঈসমাইল পার্লামেন্টে ইংরেজীতে কথা বলেন। এদের আচরনে এত অস্বাভাবিকতা কেন? সহসা জেরিনের কথা মনে পড়ল। জেরিন বলেছিল: খান ঈসমাইলরা আজও মুগল ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
বৃষ্টি জিজ্ঞেস করল, কী পরে বুঝব?
ততক্ষনে খান মোহাম্মদ সোহরাব প্রায় নগ্ন হয়ে পড়েছে। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, আহ্,কথা কম। আগে এইদিকে আস।
বৃষ্টি থমকে যায়। এখুনি? তার আগে কথা বলে নিলে হত না? মধুচন্দ্রিমা কোথায় হবে -তা নিয়ে। বৃষ্টির ভালো লাগে পাহাড়। তা হলে বান্দরবান। জেরিন সেদিন বলছিল- এরা বাঙালি না বৃষ্টি, এরা মুগলচেঙ্গিসের বংশধর। এরা কি মধুচন্দ্রিমা বোঝে?
এই দিকে আস। বিছানার পাশে দাঁড়ানো, নগ্ন, খান মোহাম্মদ সোহরাবের কন্ঠটা সহসা কর্কস হয়ে উঠল।
বৃষ্টি নড়ে ওঠে। মুখ তুলে স্বামীর দিকে তাকায়। কী সুন্দর মুখ। এখন অবশ্য চশমা ছাড়া বলেই অন্যরকম লাগছে। তারপরও কী সুন্দর; তবে এমনি এমনিই সুন্দর, যে সুন্দরের কোনও মানে নেই। যেমন-পাকিস্তান। এমনি-এমনিই একটা দেশ-যে দেশের কোনওই মানে নেই!
খান মোহাম্মদ সোহরাব সামান্য ঝুঁকল; হাত বাড়ায় বৃষ্টির চুলের মুঠি ধরে। বৃষ্টি ব্যথা টের পায়। তারপর বাধ্য হয়ে কতকটা হামাগুঁড়ির ভঙ্গিতে যায়। আমি তো বিক্রি হয়ে গেছি-তা হলে আর লজ্জ্বা করে কী লাভ। খান মোহাম্মদ সোহরাব বৃষ্টির চুলের মুঠি ধরে টানতে থাকে। ক্ষাণিক বাদে বৃষ্টি ঠিকই বোঝে-খান মোহাম্মদ সোহরাব আসলে একটা সুন্দর খোলশমাত্র- যে খোলশের ভিতরে অত্যন্ত লোভী একটা পশুর বাস। প্রবল এক ঘৃনাবোধ হয় বৃষ্টির। তথাপি ও ব্যস্ত বলেই দীর্ঘশ্বাস পড়ে না-কেবল নাসারন্ধ্রের কাছে ক্ষীণ আগুনের তাত তিরতির করে কাঁপে। ওর নিজেকে মনে হল ১৯৭১ সালের চকোরিয়ার কোনও এক বৌদ্ধ কিশোরী। খান মোহাম্মদ ঈসমাইলের বাবা সুলতান আলী বেগ-এর নির্দেশে কিশোরীর পরিবারের সবাইকে খুন করে কিশোরীকে চকোরিয়া সদরের বাইরে একটা ‘স’ মিলে তুলে এনেছে। কয়েকজন আর্মি অফিসার বেঞ্চির ওপর বসে মদ খাচ্ছিল। একটু পর অফিসাররা পালা করে মেয়েটিকে ধর্ষনের পর করাতের নিচে ফেলে টুকরো টুকরো করে কাটবে। মাস কয়েক হল আর্মি অফিসারের কুত্তাগুলি...
তারপর, প্রায় বিধস্ত হতে হতে জাফরের মুখটাও মনে পড়ল বৃষ্টির। জাফরও ওর নগ্নদেহটি ছেনে ছেনে প্রায় উন্মাদ হয়ে উঠেছিল গত বছর এপ্রিল মাসে এলিফ্যান্ট রোডে জাফরেরই এক বন্ধুর ফাঁকা ফ্ল্যাটের একটা বদ্ধ ঘরে। তবে, জাফরের সেই উম্মাদনায় মায়ামমতা মিশে ছিল। জাফর ছিল নাটকপাগল-সেলিম আর দীনের একনিষ্ট ভক্ত। কাজেই, তার উন্মাদনায় বিবেচনাবোধ ছিল। আর এই পেশল দীর্ঘ বলিষ্ট দেহের সোহরাব একটা দক্ষ ধষর্ক! তারপরও শরীর বলে কথা- বৃষ্টির শরীরও সাড়া দেয় কয়েক মিনিট পর- কথা কথা বলে ওঠে। চরম মুহূর্তে এসে বৃষ্টি ঠিক কী করবে বুঝতে পারে না। জেরিনের মুখটা আবছা মনে পড়ল ওর। জেরিন বলেছিল, সাবধান। শীৎকার করবি না। অহসায় ভাবে এখন বৃষ্টি ভাবল-আমি না হয় চুপ করে থাকলাম। কিন্তু, এখন যদি সাদা চাদরের ওপর রক্তও না ঝরে- তো!



সেদিন লুৎফা আন্টি রান্নাঘরে চলে যেতেই বৃষ্টির কানে কানে ফিসফিস করে কথাটা বলেছিল জেরিন।
কী! বৃষ্টি হতভম্ভ।
হ্যাঁ। জেরিন বলল। মুখ বুঁজে থাকবি। শব্দ করবি না।
তা ... তা কি ভাবে সম্ভব। বৃষ্টি ভীষন অবাক হয়ে যায়। গত বছর এপ্রিলে জাফরের সঙ্গে ঘনিষ্ট হয়েছিল বৃষ্টি। এলিফেন্ট রোডে -জাফরের এক বন্ধুর বাসায়। তখন ...তখন ...ফাঁকা ফ্ল্যাটে খুব শব্দ করেছিল বৃষ্টির। প্রথম প্রথম বলে বেশ খানিকটা রক্তও-
জেরিন বলল, বিয়েটা টেকাতে হলে তোকে মুখ বন্ধ রাখতেই হবে। খালুর যখন শরীর ভালো না বললি-তখন বিয়েটা হয়ে যাক। যদিও একটা রিলিজিয়াস ফান্ডামেন্টালিস্ট পরিবারে তোর বিয়ে হচ্ছে- এটা আমি কিছুতেই টলারেট করতে পারছি না।
রিলিজিয়াস ফান্ডামেন্টালিস্ট- এই কথায় কী ছিল। বৃষ্টির বুকটা ধক করে ওঠে। ওর শ্যামবর্ণ পায়ের কাছে কিছু জঙ্গি রোদ মুখ থুবড়ে পড়ে ছিল। জানালায় এপ্রিল মাসের ফ্যাকাশে আকাশের কিছু অংশ। কামরাঙা গাছের পাতার আড়ালে একটা কাক ডাকছিল। ডাকটা কর্কস। কাকটা পাতার আড়ালে লুকিয়ে আছে কেন? কী অলুক্ষুনে।
জেরিন বলল, তোর হবু শ্বশুর খান মোহাম্মদ ঈসমাইল স্বাধীনতাবিরোধী। ফান্ডামেন্টালিস্ট। ঘন ঘন সৌদি আরব যায় পাকিস্তান যায়। ফেরার সময় বুরখা নিয়ে আসে। পরিবারের মেয়েদের বুরখার তলায় রাখে । মেয়েদের সম্বন্ধে এদের ধারনা এখনও মধ্যযুগীয়। শীৎকার করা মেয়েদের ওরা নষ্ট মেয়ে মনে করে। বিয়ের রাতে তুই শব্দ,-মানে শীৎকার করবি না বৃষ্টি। শব্দ করলে খান মোহাম্মদ ঈসমাইলের কানে যাবেই। বিকৃত রুচির লোকজন সব-দেখবি তোর বরই বলে দেবে। তুই শব্দ করলে খান মোহাম্মদ ঈসমাইল ভাববে তুই একটা খারাপ মেয়ে। পরদিনই তালাক করিয়ে বিয়ে ভেঙ্গে দেবে।
জেরিনের কথা অস্বীকার করে কী করে বৃষ্টি? দুর্দান্ত স্মার্ট জেরিন অ্যাক্টিভিষ্ট। জেরিন অনেককিছু জানে যা বৃষ্টি জানে না।
জেরিন বলল, সবচে ভালো হয় চুপ করে থাকলে। বিয়েটা টেকাতে হলে শীৎকার করবি না। শীৎকার করা মেয়েদের ওরা মনে করে নষ্ট মেয়ে । ওদের এক বউ শীৎকার করেছিল। পরের দিনই খান মোহাম্মদ ঈসমাইল ঘাড় ধরে বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল মেয়েটাকে।
বৃষ্টির মাথার ভিতরটা রীতিমতো টলে ওঠে । ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, শব্দ, মানে শীৎকার তো স্বাভাবিক।
ওরা বুঝলে তো? বলে জেরিন ধীরেসুস্থে একটা গোল্ডলিফ ধরাল। তারপর একমুখ ধোঁওয়া ছেড়ে বলল, ফান্ডামেন্টালিস্টদের কাছে সেক্স হচ্ছে বাচ্চা পয়দা করার প্রসেস। জেরিনের কন্ঠস্বরে তিক্ততা।
কথাটা শুনে বৃষ্টির গা গুলিয়ে ওঠে। সোহরাবের মুখটা মনে পড়ে যায় ওর। দিন কয়েক আগে বকশীবাজারে সোহরাবের এক খালার বাড়িতে সোহরাবের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল বৃষ্টির। ব্যাপারটা অবশ্য খান মোহাম্মদ ঈসমাইল জানতেন না। কী সুন্দর চেহারা সোহরাবের। ক্লিন সেভড। লম্বা, ফরসা। চোখে ছোট্ট চৌকোন কালো ফ্রেমের চশমা। অনেকটা মডেল ফায়সালের মতন দেখতে। আর কী অমায়িক ব্যাবহার। মিষ্টি করে বলেছিল, আমি কিন্তু। ক্রিকেটের দারুন ভক্ত। পাকিস্তানই আমার ফেরারিট। তারপর নোনতা বিসকিট আর চা খেতে খেতে কত কথা হল। বৃষ্টি সেসব কথা মনে করে বলল, কই, ছেলেকে দেখে আমার তো সেরকম কনজারভেটিভ মনে হলো না। মুখে দাড়িও নাই। ক্লিন সেভড।
দেখবি সব এক রকম। জেরিনের কন্ঠস্বরটা তিক্ত। দেখবি বিয়ের রাতেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমরা বাঙালিরা বিয়ের রাতকে বলি ‘বাসর রাত’। রাত জাগা, কবিতা পড়া কিংবা নতুন মানুষটার সঙ্গে গল্প করা -এসবই বাঙালি মেয়ের স্বপ্ন ...মানে বুঝতেই পারছিস । ঈসমাইল পরিবারের লোকেরা ওরকম না। মানে একদমই রোম্যান্টিক না।
রোম্যান্টিক না? কেন?
কারণ, মুগল চেঙ্গিসরা রোম্যান্টিক ছিল না। তোর কপাল খারাপ বৃষ্টি। খান মোহাম্মদ ঈসমাইলরা নিষ্ঠুর খুনি চেঙ্গিসমুগলদের বংশধর। সে জন্যই তারা রোম্যান্টিক না। সাতশ বছর আগে পশ্চিম থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে বাংলায় এসেছে চেঙ্গিসমুগলদের বংশধর । বাংলায় ঢোকার মুখে বিহারে মানবতাবাদী অহিংস বৌদ্ধদের হত্যা করেছে। সংখ্যালঘু বৌদ্ধদের ওপর ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজীর
ছিল ভীষন রাগ -হয়তো তারা মুসলমান হয়ে যায়নি বলে! তার চোখে অমুসলিম মানেই বিপথগামী, অশুদ্ধ, বেদ্বীন-লোকটা ছিল এমনই মূর্খ! তার নির্দেশেই তার লোকেরা বৌদ্ধ গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে দিত- কত বৌদ্ধ মঠ যে পুড়িয়ে দিয়েছে-বর্বরতার সেই শুরু। সেই বর্বরতার সূত্র ধরেই ১৯৭১ সালে চকোরিয়ার ডুলাহাজারায় বুদ্ধের সেই কুড়ি ফুট উচুঁ মূর্তিটি গলিয়ে খুনি টিক্কা খানকে উপহার দিয়েছিল খান মোহাম্মদ ঈসমাইলের বাবা মোহাম্মদ সুলতান আলী বেগ। বৌদ্ধ মেয়েদের খুন-ধর্ষনও করেছিল মোহাম্মদ সুলতান আলী বেগ এর পেটোয়া পোষ্যরা।
তারপর জেরিন যে কত কথা বলে।
সে সব রক্তাক্ত ইতিহাস শুনতে শুনতে শিউরে উঠছিল বৃষ্টি।
জেরিন বলছিল, একমাত্র অনুভূতিশীল প্রেমময় রোম্যান্টিক দৃষ্টিভঙ্গিই পারে পৃথিবীকে অহেতুক সংঘাতের হাত থেকে রক্ষা করতে। বুদ্ধ ছিলেন পরম রোম্যান্টিক। আর বাংলা গত আড়াই হাজার বছর ধরেই বুদ্ধপ্রভাবিত। দুঃখ এই-রোম্যানিটক বৌদ্ধ বাংলা বর্বর মুগল হানাদারদের কখনও প্রেমময় অনুভূতিশীল করে তুলতে পারল না; কারণ, তিনটি আব্রাহামিক ধর্মই পুরোদস্তুর অ্যানটাই-রোম্যান্টিক। যে কারণে আজও মুগল-জঙ্গিরা রক্ত ঝরাচ্ছে-রমনা বটমূলে, ময়মনসিংহের সিনেমা হলে, পল্টনে সিপিবির মিটিং-এ। রমনা বটমূলের রবীন্দ্রনাথ, সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র আর সমাজতন্ত্র নতুন এক পৃথিবীর পথ দেখায়-যা মধ্যযুগীয় অন্ধকার জগতের বিপরীতে। কাজেই, মুগলজঙ্গিরা বা বলা যায় অটোমানজঙ্গিরা আরও রক্ত ঝরাবে-বাংলায় ও পৃথিবীময়। এই দুঃখ।
এখন বৃষ্টির নগ্ন পিঠের নিচে, নগ্ন কোমড়ের নিচে সাদা রঙের চাদরটার খসখসে অনুভূতি । ওর শরীরের ওপর একটা পাহাড় সমান বোঝা- খান মোহাম্মদ সোহরাব; শক্তসমর্থ এক মুগল যুবক- যে এ মুহূর্তে ধর্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। ‘আজও ওরা রক্ত ঝরাচ্ছে। রক্ত তারা আরও ঝরাবে। এই দুঃখ।’ জেরিনের কথাগুলি বিস্ফোরণের মত ফেটে যায় বৃষ্টির বাসর ঘরটির চার দেওয়ালের মাঝখানে -যেহেতু জেরিনের কথায় আগুন আছে। জেরিনরা প্রৌগ্রেসিভ । যে কারণে ওর ভাইয়ের সঙ্গে বান্দরবানের একটি ম্রো মেয়ের বিয়ে হতে পারে। জেরিনরা প্রৌগ্রেসিভ। যে কারণে -এমনকী প্রাণির রক্ত সইতে পারে না ওরা, দুর্গন্ধ সহ্য করতে পারে না। জেরিনদের পুরো পরিবার কক্সবাজার চলে যায় কুরবানী ঈদের আগে। কর্পোরেশনের লোকেরা ঢাকার রাস্তার গলির প্রাণিরক্ত ধুয়ে সাফ করলে ফিরে আসে।

সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ৮:২৪
৩১টি মন্তব্য ৩০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×