...লাহোরে আসিয়া যুবরাজ সালিম (জাহাঙ্গীর) আনারকলির মুজরা দেখিয়া আনারকলির প্রেমে পড়িল। বিষয়টি যুবরাজ সালিম তাহার পিতা আকবরকে জানাইল। সুন্দরী আনারকলি লাহোরের বিখ্যাত নর্তকী হইলে কী হইবে- আনারকলি ছিল নিছক দাসী, তাহার শিরায় তো অভিজাত রক্ত নাই। কাজেই বিরক্ত হইয়া বাদশা আকবর বলিলেন, আনারকলিকে বিবাহের কথা ভাবিও না। পিতার সঙ্গে সালিম অশেষ তর্ক করিল। ইহাতে আকবর ক্ষুব্দ হইয়া উঠিয়া আনারকলিকে বন্দি করিয়া লাহোরের বন্দিশালায় নিক্ষেপ করিতে নির্দেশ দিলেন। সালিম গোপনে আনারকলিকে লুকাইয়া রাখিল। তাহার পর সৈন্যসামন্ত লইয়া পিতার বিরুদ্ধে অগ্রসর হইল। আকবরও ক্রদ্ধ হইয়া পুত্রকে শায়েস্তা করিতে অগ্রসর হইলেন। প্রচন্ড যুদ্ধ বাধিল। যুদ্ধশেষে সালিম পরাজিত হইল। আকবর বলিলেন, আনারকলিকে আমার কাছে সমর্পন কর। নতুবা মৃত্যুকে বরণ কর। সালিম মৃত্যুকেই বাছিয়া লইল। আনারকলি কিছুতেই সালিমকে মরিতে দিবে না। আনারকলি গুপ্তস্থান হইতে বাহির হইয়া আকবরের নিকটে আসিয়া উপস্থিত হইল। তাহার পর কাতরস্বরে বলিল, আমি মরিলে কি যুবরাজ বাঁচিয়া থাকিব? আকবর বলিলেন, হাঁ। উত্তর শুনিয়া আনারকলি বলিল, আমি কি আমার মৃত্যুর পূর্বে আপনার কাছে একটা প্রার্থনা করিতে পারি? আকবর বলিলেন, বল। আনারকলি বলিল, আমি মাত্র একটি রাত যুবরাজের সঙ্গে কাটাইতে চাই। আকবর প্রার্থনা মঞ্জুর করিলেন। আনারকলির সেই মধুরাত্রি সমাপ্ত হইলে ডালিমের কলিতে নেশাদ্রব্য মিশাইয়া যুবরাজ সালিমকে অচেতন করিয়া অপেক্ষমান প্রহরীদের সহিত রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করিয়া (বর্তমানকালের লাহোরের আনারকলি বাজারের) নিকট বিরাট একটি গর্তের কিনারায় আসিয়া গর্তের ওপর কাঠের তক্তার ওপর দাঁড়াইল আনারকলি । সৈন্যরা দড়ি ঢিলা করিয়া তক্তা নীচে নামাইয়া দিল। আনারকলি গর্তে নামিয়া চোখ বুজিল। ইট দিয়া গর্তের মুখ বন্ধ করিয়া দেওয়া হইল ...
আজম নেওয়াজের নকিয়াটা বিজ বিজ করে বাজল। হাঁটতে হাঁটতেই প্যান্টের পকেট থেকে সেলফোনটা বার করল নেওয়াজ । নকিয়া ১১০০। সাদাকালো ডিসপ্লেতে আকবর লেখা দেখে মেজাজ খিঁচড়ে গেল তার। দোসো রুপিয়া পায় সালে। সকালেও বেশ ক’বার ফোন করেছিল আকবর। বহুত হারামী আছে আকবর। কলটা রিজেক্ট করে নকিয়াটা আবার পকেটে ভরল নেওয়াজ। থুঃ করে একদলা থুতু ফেলল রাস্তায়। সময়টা দুপুর। শীতের প্রায় শেষ। আজ দুপুরের পর থেকেই আনারকলি বাজারের অলিগলিতে ঘুরঘুর করছিল আজম নেওয়াজ। লাহোরের আনারকলি বাজারের অলিগলি বছরভরই সরগরম থাকে। ক্রেতাবিক্রেতার সমাগম। ভিড়। গুঞ্জন। মশলার গন্ধ। রাস্তার দুপাশে ইলেকট্রনিক্সের দোকান, কাঁসাপিতলের দোকান, ফল-ফুলের দোকান। দোকানের সামনে ঝোলানো হ্যাঙ্গার থেকে সার্ট প্যান্ট ঝুলছে। ঝুলছে হরেক রকম রঙের টাই, ফ্রক। দোকানের ভিতর এবং দোকানের বাইরে নানা বয়েসী খদ্দের। খদ্দেরদের ভিতর বিদেশিও রয়েছে। কেমন, উৎসব উৎসব ভাব। যার নামে বাজারের নাম, সেই মুজরানর্তকী আনারকলিকে যে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হয়েছিল-সে কথা যেন কারওই মনে নেই। বরং, রাস্তার পাশে বড় বড় তাওয়া। তাওয়ায় গরম তেল। ধোঁওয়া। তাওয়ার কিনারে গোল গোল করে ময়দা ছড়ানো । সামোসা ভাজা হচ্ছে, কিংবা গোল গাপ্পাস। রাঁধুনিগুলি সব পুরুষ। তাদের মাথায় সাদা রঙের টুপি; দেখলে কাগজের বলে ভ্রম হয়। আনারকলি বাজারের গলিপথ অল্পপরিসর হলেও মোটরসাইকেল আর চিংচি (অটোরিক্সা)-র জট। আর রয়েছে খাকি প্যান্ট আর কালো ইউনিফরম পরা পুলিশ। আনারকলি বাজারে ক্যাসেট সিডির দোকানও রয়েছে। দোকানের বাইরে বড় বড় সাউন্ড বক্স। ধিরিক ধিরিক নাকে তাকে নাকে তাকে ছন্দে বিটের ধামাকা আওয়াজ বেরোয় সাউন্ড বক্সগুলো থেকে। সঙ্গে পাঞ্জাবি ভাষায় বেসামাল ভাঙ্গরা-
Ral ke, rale ke, ral ke
Haripa!
Ral ke, rale ke, ral ke
Haripa!
হাঁটতে হাঁটতে নেওয়াজের ঢেঁকুর উঠল। বেলা দেড়টার দিকে আল্লামা ইকবাল লেইনের দাউদ মোহম্মদের ‘আবিদা’ রেস্টুরেন্টে ঢুকে নানরোটি শিশ কাবাব খেয়ে নিয়েছে সে মুফতে। এখনও ঢেঁকুর উঠছে। তবে সামান্য মন ভার তার এখন। এখনও তেমন পার্টি পায় নি । বেহুদাই ঘুরছে আনারকলি বাজারের অলিগলি। আজ পার্টির দরকার আছে। আকবর দোসো রুপিয়া পায়। তা ছাড়া তিন মাসের বাড়ি ভাড়া বাকি। আজকের মধ্যে ভাড়া শোধ না করলে লাথি দিবে বাড়িউলি নাসিমন বেওয়া । গতকাল অবশ্যি জব্বর পার্টি জুটেছিল নেওয়াজের। অস্ট্রেলিয়ান। ভালো ডলার কামাই হল কাল। তো সে ডলার হিরামন্ডিতে উড়ল- সন্ধ্যের পর। মুজরার কঠিন সমঝদার নেওয়াজ। আর, পাক সরকার মুজরা বন্ করে দিতে চায়! সালে জারদারী-গিলানীর বাচ্চে! বাইনচোত! আজম নেওয়াজ থু থু ফেলে। হিরামন্ডিতে ডলার না উড়লে আজম নেওয়াজের আটান্ন বছরের বুড়ো হাড়ে যে মউত এসে জখম করে দেবে। তখন? তো, মল রোডের এই আনারকলি বাজারে হররোজ বেশুমার ফরেন পার্টি আসে। কেনাকাটা করে। মিলিটারিতে থাকতে কাজ চালানোর মতো ইংরেজি শিখেছিল নেওয়াজ। তাদেরই কারও কারওকে ফুসলিয়ে মল রোডের আশেপাশের দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরিয়ে দেখায় আজম নেওয়াজ। আইওয়ানে ইকবাল, জাদুঘরের সামনে জমজমা কামান, বাগ এ জিন্না। আপাতত এই তার পেশা। লাহোরে আসার আগে আজম নেওয়াজ শিয়ালকোটে ছিল। মিলিটারির ট্রাক চালাত। তারপর সে চাকরি ছেড়ে শিয়ালকোটের জিন্নাহ স্টেডিয়ামের পাশে একটা ব্যাটবলের দোকান দিয়েছিল । প্রথম প্রথম ভালো চললেও সেই ব্যবসা লাটে উঠল। শিয়ালকোট শহরে গুরু নানকের দরগার কাছেই একটা খুপরি মতন ঘরে থাকত সে । ব্যাটবলের দোকান মার খেলে রেলস্টেশনের পাশে বাইসিকেলের দোকান দিল নেওয়াজ। সে ব্যবসাও লাটে উঠল। তারপর লাহোরযাত্রা। বহুত ধারদেনা হয়ে গিছল শিয়ালকোটে। আজম নেওয়াজের বউ মরেছে দশ সাল। এক ছেলে ছিল, দশ সাল হল গায়েব । এক মেয়ে আছে। মেয়ের শ্বশুরবাড়ি গুজরানওয়ালা। বছরে দু-একবার যায়, মনে পড়লে।
‘বাবর হ্যান্ডিক্র্যাফট অ্যান্ড গিফট সেন্টার’-এর সামনে আকবরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চট করে ঘুরে গেল আজম নেওয়াজ। দোসো রুপিয়া আকবরকে গতকালই দিতে পারত। তা সে ডলারে তো সন্ধ্যের পর পাখনা গজাল। সালিমের চায়ের স্টলটা কাছেই- হাতের ডাইনে সরু কাঁসাপিতলের গলিতে। চা স্টলটা প্রায় ফাঁকা। পিছনের দিকে বসল। টেবিলের ওপর পত্রিকা পড়েছিল। ডেইলি জং । শিরোনামে চোখ গেল: সালে জারদারীর বাচ্চে দুনীর্তির বিরোধী অভিযান শুরু করবে। মুচকি হাসল নেওয়াজ। সালে গিলানীর বাচ্চে হিন্দুস্তানের সঙ্গে পাঞ্জাব ইস্যু নিয়ে বসতে চায়। হাহ্। নিচের দিকে ছোট একটা খবরে চোখ আটকে গেল আজম নেওয়াজের। ডাঙায় তোলা মাছের মতন খাবি খেল সে । টের পেল শরীর ঘেমে গেছে। শরীরের ভিতর গরম পানি খলখল করে উঠল। এ শহরে এখনও বেশ শীত- অথচ, তার গরম লাগে। তার শরীরের শিরায় শিরায় নদীর গরম পানি ঢুকে গেছে। ঘন ঘন শ্বাস পড়ে আজম নেওয়াজের। কেমন দমবন্ধ দমবন্ধ লাগছে। সিগারেট ধরাল নেওয়াজ। হাতটা ভীষন কাঁপছে । ততক্ষনে চা দিয়ে গেছে সালিমের ছোটছেলে ইউসুফ। চা শেষ না করেই উঠে দাঁড়াল। মাথা সামান্য টলল। বিল মিটিয়ে রোঁস্তরার বাইরে এসে দাঁড়াল। সিগারেটা ফেলে দিল ছুঁড়ে। ভীষন অস্থির লাগছে। মুনিরার খুপরিতে যাবে কি না ভাবল একবার। এর আগে রান্ডিপাড়ায় দিনের বেলা কখনও যায়নি নেওয়াজ। কী করবে-ভাবছে সে। ঠিক তখনই গলির ওপারে আজমত গুল-এর কাঁসাপিতলের দোকানের দিকে তাকাতেই চোখ আটকে গেল।
২
আজমত গুল-এর কাঁসাপিতলের দোকানের ভিতর দাঁড়িয়ে পিতলের তৈরি একটি চিলমচি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিলেন ভিক্টোরিয়া লিলিথ। চমৎকার জিনিস। গোল। ঝকঝকে। ভিক্টোরিয়া লিলিথ আমেরিকান। আমেরিকা দেশটি টিস্যু পেপারের দেশ; সে দেশে খক খক করে কেশে চিলমচিতে কফ ফেলার রেওয়াজ নেই। তবে জিনিসটা অস্টিনের বাড়ির লিভিং রুমে রেখে দিলে চমৎকার মানাবে। লিলিথ সাংবাদিক । ‘অস্টিন আমেরিকান স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় চাকরি করে। বয়স গত নভেম্বরে তিরিশ ছাড়িয়েছে।
সালাম ম্যাম।
খানিকটা অবাক হয়ে লোকটার দিকে তাকালেন লিলিথ। বৃদ্ধই বলা যায়। তামাটে রঙের প্রশস্ত কপাল, টাক, পিছনে আধপাকা চুল, মুখে খোঁচা খোঁচা পাকা দাড়ি, গলায় লাল রঙের মাফলার, ঘিয়ে রঙের কোটটা পুরোন, ভিতরে নীল সোয়েটার, সাদ রঙের কর্ডের প্যান্ট পরেছে, কালো রঙের ময়লা কেডস। মাঝারি উচ্চতা, খানিকটা স্থূল। ভদ্রলোক বলেই তো মনে হচ্ছে। তবে কেমন যেন অস্থির মনে হল। লিলিথ কিছু বিস্মিত। চিলমচিটা আজমত গুলকে ফেরৎ দিয়ে বলল, ইয়েস?
সামান্য কেশে লোকটা বলল, মাই নেইম ইজ আজম নেওয়াজ ম্যাম। ইফ ইউ নিড এ গাইড...
ওহ্। লিলিথ দ্রুত ভাবছেন। গাইড তার দরকার ঠিকই। আজকেই একবার আনারকলির টুম-এ গেলে ভালো হয়। আনারকলির জন্যই আমেরিকা থেকে লাহোরে আসা। আজ দুপুরের পর পর আনারকলি বাজারে এসেছে লিলিথ। ঘুরে ঘুরে দেখছে বাজারটা । পশ্চিম এশিয়ার সবচে পুরনো বাজার। দুশো বছরের পুরনো তো হবেই। মশলার গন্ধ। ছায়া। গত বছর ঠিক এই সময়ে মিশরে ছিল লিলিথ। কায়রোর পুরনো বাজারের সঙ্গে কোথায় যেন মিল আনারকলি বাজারের। গলি, ছায়া, মসলার গন্ধ।
ইউ ক্যান ট্রাস্ট মি ম্যাম। আই অ্যাম এ এক্স আর্মি পার্সন। নেওয়াজ বলল।
দ্রুত ভাবছে লিলিথ। এই লোকটাকে কি ট্রাস্ট করা যায়? বৃদ্ধ। আর্মিতে ছিল বলল। তা ছাড়া সঙ্গে একজন নেটিভ থাকলে ভালোই হয়। আজ সকালেই আল্লামা ইকবাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থাই এয়ারওয়েজ থেকে নেমেছে লিলিথ। পার্ল কন্টিনেন্টালে উঠেছে, পশ হোটেল, অনেক খরচ। চিপ হোটেলে উঠলে ভালো হয়। আমেরিকার ইকোনমি ভালো না, এক ডলার বাঁচালেও লাভ। এদিকে কি সে রকম চিপ হোটেল আছে? মি: আজম নেওয়াজ কি জানেন? জানেন নিশ্চয়। স্থানীয় লোক যখন। লিলিথ কিছুটা দ্বিধান্বিত স্বরে বলল, আনারকলিস টুম?
ইয়েস, ইয়েস। আনারকলি টুম? কাম উইথ মি ম্যাম। বলে আজম নেওয়াজ ঘুরে দাঁড়াল। লিলিথ নেওয়াজকে অনুসরণ করে। লোকজন লিলিথকে দেখছিল। পায়ের গোড়ালি অবধি কালো রঙের লং স্কার্ট পরেছে লিলিথ। সাদা পুলোভারের ওপর ঘিয়ে রঙের কোট। মাথায় তেহরান থেকে কেনা কালো রঙের রুসারি জড়ানো। পাকিস্তান দেশটি আজও রক্ষণশীল। রক্ষণশীল পুরুষরা তাকাবেই। লিলিথ মুচকি হাসে।
কিছুটা দ্রুত পা ফেলে হাঁটছিল নেওয়াজ। শেষ শীতের শেষ বেলার ঝলমলে রোদ ছড়িয়েছিল। তখনও অস্থির বোধ করছিল সে। অস্থিরতা তাড়াতেই ভাবল: এই ফরেন লেডির কাছ থেকে একশ ডলার গিলা করে নিব। তিন মাসের বাড়ি ভাড়া আজ রাতেই নাসিমন বেওয়ার মুখের ওপর ছুঁড়ে মারব না? আকবরের দোসো রুপিয়াও শোধ করে দেব। এইসব স্বস্তিকর ভাবনায় নেওয়াজ অস্থিরতা কাটেনা। কারণ, ডেইলি জং লিখেছে: বাংলাদেশের নবনির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার সেভেনটি ওয়ানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে। খবরটা পড়ামাত্র তার শরীরের শিরায় শিরায় নদীর গরম পানি ঢুকে গেছিল। পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৭১। নেওয়াজের শরীরের শিরানালীতে এখনও রক্তের বদলে গরম পানির স্রোত। সে অস্থিরতা কাটাতেই নেওয়াজ বলল, আনারকলি ওয়াজ এ মুজরা ড্যান্সার ম্যাম।
লিলিথ জানে। অস্টিনের ইউনিভারসিটি অভ টেক্সাসে পড়াশোনা করেছে লিলিথ। ডিপার্টমেন্ট অভ এশিয়ান স্টাডিজে অনেকগুলি বছর কেটেছে তার । মুগল পিরিয়েড পড়াতেন অধ্যাপক সাজেদা শিরিন। তাঁর ক্লাসেই প্রথম আনারকলির ট্র্যাজিক কাহিনী জেনেছিল লিলিথ। প্রেমিক সালিমকে বাঁচাতে আনারকলি স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বেছে নিয়েছিল। সবটা শুনে মন বিষন্ন হয়ে গিয়েছিল লিলিথের। সেই সঙ্গে নানা প্রশ্নও উঁকি দিচ্ছিল। আনারকলির কাহিনীটা ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টে সবাই কমবেশি জানে। সে কাহিনীতে ব্যর্থ প্রেম আর শোকের দিকটাই প্রকট। সেই সস্তা সেন্টিমেন্ট পুঁজি করে বেশ কটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। অধ্যাপক সাজেদা শিরিন খেদের সুরে বলতেন, এখন তো ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টে আনারকলি মানে ফ্যাশন। ঢাকার শাড়ির মার্কেটের নাম আনারকলি। মুম্বাইয়ের ফ্যাশন হাউজের নাম আনারকলি। পাকিস্তানের লাহোরে আনারকলি বাজার। ভাবা যায়? লাহোরের আনারকলি বাজারে বছরভর কেমন উৎসব উৎসব ভাব। যার নামে বাজার, সেই নর্তকী আনারকলির যে এক করুণ জীবন ছিল-সেকথা কারুই মনে নেই। আনারকলির জীবন নিয়ে একটা বই লেখার কথা ভাবছিল লিলিথ। এর আগেও একটা বই লিখে হইচই ফেলে দিয়েছে লিলিথ। বইটির নাম: ‘The Naked Veil’. তেহরানের উচ্চবিত্ত শিক্ষিত নারীরা বোরখা সম্বন্ধে কী ভাবে-সে সবই বইটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বেশ কাটতি হয়েছিল বইটির । স্বয়ং অরুন্ধতি রায়, কিরণ দেশাই, অনিতা দেশাই, সালমান রুশদী বইটির প্রশংসা করেছেন। এখন আনারকলির জীবন নিয়ে একটা বই লেখার কথা ভাবছে লিলিথ। আনারকলি সম্বন্ধে ওয়েস্টের আরও বেশি জানা উচিত। র্যানডম হাউজের সঙ্গে এরই মধ্যে চুক্তি হয়েছে লিলিথের। রিসার্চের খরচ ওরাই বহন করছে।
খুব কাছেই কোথাও পিয়ানো বাজল। চমকে ওঠে দাঁড়িয়ে পড়ল লিলিথ। কোটের পকেট থেকে মটোরোলাটা বার করল। হ্যালো। ...হ্যালো। প্লিজ রাড, প্লিজ। লিভ মি অ্যালোন। প্লিজ। রাড। লিলিথ ফোন বন্ধ করে কোটের পকেটে রেখে দেয়। কালো স্কার্ফ জড়ানো লিলিথের ফরসা মুখচোখে রাগ আর স্পস্ট বিরক্তির ছোপ।
সান্ত্বনা দেওয়ার স্বরে নেওয়াজ বলল, আনারকলি অলসো ওয়াজ আনহ্যাপি ম্যাম।
লিলিথ আর কী বলবে?
আর ইউ আমেরিকান ম্যাম?
ইয়েস মি: নেওয়াজ।
নেওয়াজ খুশি খুশি স্বরে বলল, আই অ্যাম এ সাপোর্টার অভ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। আই বিলিভ হি উইল ব্রিং চেঞ্জ।
আই বিলিভ সো মি: নেওয়াজ। লিলিথ বলল। গত নভেম্বরে ভোট লিলিথ ওবামাকেই দিয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল লিলিথ। পরিবর্তন হয়তো শিঘ্রই আসবে না- হাজার বছরের জঞ্জাল- দেখা যাক কি হয়?
আনারকলির টুমটা পাঞ্জাব সিভিল সেক্রেটারিয়েটের চত্তরে। সেখানে ঢোকার আগেই নেওয়াজের নকিয়াটা বাজল। আকবর। কলটা রিজেক্ট করল নেওয়াজ। বহুত হারামী আকবর। অস্থিরতা কাটাতে নেওয়াজ বলল, ব্রিটিশরা যখন পাঞ্জাব দখল করে নিল ম্যাম । তখন তারা এই টুমটাকে খ্রিস্টান চার্চে পরিনত করেছিল ।
ওহ্। লিলিথ জানে, বিশ্বময় ব্রিটিশদের একটা কদর্য রুপ আছে। আমেরিকায় লিলিথের পূর্বপুরুষেরা ব্রিটেন থেকে এসে তিনশ বছর হল সেটল করেছে । কাজেই, বিষন্নতা টের পায় লিলিথ। আমি কতটুকু অসুন্দর? আমি রিপাবলিকান পার্টি না করলেও ইরাক যুদ্ধের দায় আমার ওপরও বর্তায়। কথাটা ভাবতেই শিউরে ওঠে লিলিথ। আনারকলি বাজারের ভিড়ে আলকায়দার সদস্য মিশে থাকতে পারে। শিউরে ওঠে লিলিথ। অফিসের কলিগরা মানা করেছিল তালিবানঘাঁটি পাকিস্তান না যেতে। আনারকলি টানছিল লিলিথকে।
চত্তরজুড়ে শেষ বেলার রোদ। অজস্র ছাই ছাই রঙের পায়রা। দর্শনার্থীদের ভিড়। ভিড়ের মধ্যে বিদেশিরাও রয়েছে। পুরনো আমলের স্মৃতিসৌধটা অকটাগোনাল। ওপরে ডোম। প্রতি কোণে অকটাগোনাল টারেট -টারেট ঘিরে আবার ছোট্ট ছোট্ট কিওক্স । লিলিথ কোটের পকেট থেকে মটোরোলাটা বার করে। 3.15 মেগা পিক্সেল-এর A3100; টুমটা ফোকাস করে ক্লিক করল।
নেওয়াজ নীচুস্বরে বলল, আগে সমাধিসৌধ ঘিরে ফুলের বাগান ছিল ম্যাম। এখন যে নেই-তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। ঢোকার মুখে দোতলা সমান উঁচু প্রবেশ দ্বার ছিল ।
লিলিথ শ্বাস টানে। বাগান ছিল? কবে? যাকে মাটি চাপা দিয়ে হত্যা করা হল-তার কবরেই আবার বাগান-সৌধ? আশ্চর্য! কে করল এসব? যুবরাজ সালিম, মানে সম্রাট জাহাঙ্গীর? সময়টা? ১৬০৫-এর পর নিশ্চয়। ততদিনে তথাকথিত নীল রক্তের ধ্বজাধারী ‘আকবর দি গ্রেট’ মৃত। অধ্যাপক সাজেদা শিরিন বলতেন, সম্রাট জাহাঙ্গীর ভীষন মদ খেতেন। খ্রিস্টানও হবেন বলে ভাবছিলেন। সবই আকবরের ওপর জেদ করে। জাহাঙ্গীর আনারকলিকে ভুলতে পারেননি। আকবরই তো আনারকলির মৃত্যুর কারণ। আনারকলির জন্য বাবার সঙ্গে তর্ক করেছে, বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন।
আনারকলির সমাধিসৌধের ভিতরে শবাধারটি পাথরের তৈরি। সেই পাথরের কফিনের দিকে তাকিয়ে লিলিথের শরীর কীরকম শিরশির করে ওঠে। ...সেই মধুরাত্রি সমাপ্ত হইলে আনারকলি ডালিমের কলিতে নেশাদ্রব্য মিশাইয়া যুবরাজকে অচেতন করিয়া অপেক্ষমান প্রহরীদের সহিত রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করিয়া বর্তমানকালের লাহোরের আনারকলি বাজারের নিকট খোঁড়া বিরাট একটি গর্তের কিনারায় আসিয়া কাঠের তক্তার ওপর দাঁড়াইল। সৈন্যরা দড়ি ঢিলা করিয়া তক্তা নীচে নামাইয়া দিল। আনারকলি গর্তে নামিয়া চোখ বুজিল। ইট দিয়া গর্তের মুখ বন্ধ করিয়া দেওয়া হইল ...
এখানেই?
লিলিথের শরীর শিরশির করে। লিলিথ র্যাডিকাল ফেমিনিস্ট। ভয়ঙ্কর এক ক্রোধ টের পায় লিলিথ-আকবর দ্য গ্রেটের ওপর।
পাথরের কফিনের ওপর ঝুঁকে আজম নেওয়াজ বলল, এই যে, দেখেন ম্যাডাম। এখানে ফার্সিতে আল্লার নিরানব্বুই নাম খোদিত আছে। বলে, আজম নেওয়াজ আবৃত্তি করে-
তা কিয়ামাত শুকুর গুয়াম কারদিগারে খিশ রা,
আহ! গার মান বাজ বিনাম রুই য়ার-ই খিশা রা।
নেওয়াজের দরাজ কন্ঠ। মানেও বলে দিল সে: পুনরুত্থানের দিবস পর্যন্ত আমি আল্লাকে শুকরিয়া জানাব যদি আমি আরেকবার আমার প্রিয়তমের মুখ যদি দেখতে পাই।
লিলিথ বিষাদ বোধ করে। অনেক অনেক দিন আগে আর্লিংটনের জেফ-এর কিশোর মুখটা মনে পড়ে গেল। চৌদ্দ বছর বয়েসে নগ্ন শরীরটি সঁপে ছিল জেফকে। একটা অ্যাক্সিডেন্টে জেফ ... পিয়ানো বাজল। হ্যালো। ...হ্যালো। প্লিজ রাড, লিভ মি অ্যালোন। প্লিজ। ফোনটা এবার অফ করেই দিল লিলিথ। পাথরের কফিনটির উত্তর দিকে যায়নেওয়াজ । এই যে এখানে লেখা রয়েছে, মাজনুন সালিম আকবর। মাজনুন মানে, ম্যাড, ম্যাম। আর, এই যে, পূর্বদিকে সাল লেখা রয়েছে... ১৫৯৯-১৬০০। আর, এই যে পশ্চিমে সাল লেখা রয়েছে, ১৬১৫-১৬ । এখানে আরেকটি লিপি ছিল ম্যাম। ফরাসী জেনারেল ভেনচুরা সেটি ধ্বংস করে ফেলেছে। পাঞ্জাবের শিখদের বিরুদ্ধে তখন লড়াই চলছিল ফরাসীদের। এই সমাধিসৌধটিতে তখন জেনারেল ভেনচুরা থাকত। ভাবলে আমার হাসি পায় ম্যাম। স্মৃতিসৌধটির মূল্য না বুঝেই কেমন বাড়ি বানিয়ে ফেলল বেকুফ জেনারেল!
ফরাসী জেনারেলের অপকীর্তির কথা শুনে লিলিথ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিকই তো- তুচ্ছ এক মুজরা নাচনেওয়ালির সমাধিসৌধের মূল্য ফরাসী লোভী পুরুষরা কি বুঝবে? ইন্দোচীনে, মানে ভিয়েতনাম-কম্বোডিয়ায় দীর্ঘদিন অবাধে শোষন আর লুটপাট করেছে ফরাসীরা । এখনও রক্ষণশীল সাম্রাজ্যবাদী সারকোজি গং ফ্রান্সের ক্ষমতায়। ইস্, ফ্রান্সের গত নির্বাচনে ফেমিনিস্টরা হেরে গেল! ইরাকি গনহত্যায় সারকোজি গং বেজন্মা বুশের জোটে ছিল!
নেওয়াজ বলল, প্রোফেসাররা বলেন, লিপিটি ছিল ফার্সি ভাষায় ম্যাম। যার, ইংরেজি করলে দাঁড়ায়: "The innocent who is murdered mercilessly and who dies after enduring much pain, is a martyr. God considers him/her a martyr".
ওহ্। লিলিথ চমকে উঠল। ‘খুন’ শব্দটি তাহলে আনারকলির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে! নিরীহ শব্দটাও। আনারকলির কবরের খুব কাছে দাঁড়িয়ে আনারকলির জন্য বেদনা বোধ করে লিলিথ। মরে যাওয়ার সময় কেমন লেগেছিল আনারকলির? আমি যখন মরে যাব তখন আমার কেমন লাগবে?
"The innocent who is murdered mercilessly and who dies after enduring much pain, is a martyr. God considers him/her a martyr".-এই কথায় আজম নেওয়াজ তার বুকের ভিতর তোলপাড় টের পেল। জীবনের অনেক কাজ করেছে আজম নেওয়াজ। ৭১’ সালে পূর্ব পাকিস্থানে ছিল সে; আর্মির ট্রাক চালাত। পোস্টিং ছিল নেত্রকোনায়। রেললাইনের পাশে কুড়িয়া বিলে ট্রাকভরতি লাশ ফেলত। ট্রাকে তুলে বধ্যভূমিতে নিয়ে যেত বাঙালিদের। তারপর ... তখন কত মেয়েকে হত্যা করেছে খান সেনারা। বাংলাদেশের নবনির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকার একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে। আমিও তো যুদ্ধাপরাধী। আমার কি বিচার হবে? তার বুকটা মুচড়ে উঠল। আমিও কি যুদ্ধাপরাধী নই?
সমাধিসৌধের ভিতরে আলো কমে আসছিল। ওরা বেরিয়ে আসে। শেষ শীতের দিনটি সন্ধ্যার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে প্রায়। পাঞ্জাব সিভিল সেক্রেটারিয়েটের প্রাঙ্গনে গাঢ় ছায়া নেমেছে । তখনও কতগুলি ছাই ছাই রঙের পায়রা ঘুরঘুর করছিল। দূর থেকে ভাঙরা গানের মৃদু আওয়াজ ভেসে আসে। ওপাশের গলিতে একটি রেঁস্তরা। বাতাসে পোড়ামাংসের গন্ধ ভাসছিল। প্রাঙ্গনের দক্ষিণপাশে একটি দেবদারু গাছ। সন্ধ্যা আসন্ন বলেই হাজার হাজার কাক ডাকছিল। সহসা আজম নেওয়াজ তার মাথার ভিতরে এক বিস্ময়কর চিন্তায় আঘাত অনুভব করে। সে ভয়ানক চমকে ওঠে। অসম্ভব ভাবিত হয়ে পড়ে সে। তার মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়ল, মাঝে মাঝে দুনিয়ার বিচার দেখলে আমি আশ্চর্য হয়ে যাই ম্যাম।
কেন? কী হল? লিলিথ অবাক।
আজম নেওয়াজ বলল, একজন আনারকলির জন্য এত কিছু। এই সমাধি সৌধ, আনারকলি বাজার। আপনি পর্যন্ত মার্কিন মুলুক থেকে লাহোর এসে শালিমার বাগে না গিয়ে প্রথমেই আনারকলি বাজরে এসেছেন। আর আর ...ইস্ট পাকিস্তানে ... ইস্ট পাকিস্তানে কত মেয়েকে খুন করল...তার জন্য? ...তার জন্য? বলতে বলতে আজম নেওয়াজের কন্ঠস্বর বাস্পরুদ্ধ হয়ে আসে ।
লিলিথ সচেতন হয়ে ওঠে। সেভেনটি ওয়ানে কী ঘটেছিল সে সব লিলিথের অজানা নয়। লিলিথের চোখ সরু হয়ে যায়। ওয়্যার ইউ দেয়ার অ্যাট দ্যাট টাইম?
ইয়েস ম্যাম। আই ড্রোভ মিলিটারি ট্রাক। তখন ... তখন কত মেয়েকে যে ...হায় আল্লা ... আর একজন আনারকলির জন্য ...। কী আশ্চর্য! ম্যাম। এই দুনিয়ার বিচার?
সহসা যেন লিলিথ সব বুঝতে পারে। টেক্সাসের একটা হিউম্যানিস্ট গ্রুপ বছর কয়েক আগে ‘যুদ্ধ ও নারী’ বিষয়ক একটা সেমিনারের আয়োজন করেছিল অস্টিনে । প্রায় দশ লক্ষ নারী লাঞ্ছিত হয়েছিল একাত্তরে। সেসব ভয়াবহ নির্যাতনের কাহিনী শুনে হলভরতি নারীপুরুষ স্তব্ধ। নির্বাক। সেমিনারে স্লাইড শোর ব্যবস্থা ছিল। হঠাৎ একজন তরুণী কাঁদতে কাঁদতে স্টেজে উঠে চিৎকার করে বলল: আমরা কিচ্ছু জানি না! আমরা কিচ্ছু জানি না! আমরা কিচ্ছু জানি না! আমাদের বাপচাচারা এই সব করেছে! নিজেকে পাকিস্তানি ভাবতে লজ্জ্বা লাগছে আমার! প্লিজ, আপনারা আমাকে ক্ষমা করুন! আমি ক্ষমা চাই! আমি ক্ষমা চাই! আমি ক্ষমা চাই! আমি খুনি না! আমি খুনি না! আমি খুনি না!
আয়োজকরা হিস্টিরিয়াগ্রস্থ মেয়েটিকে সরিয়ে নিয়েছিল। পরে জানা গিয়েছিল তরুণীর নাম সায়মা বানু। পাকিস্তানি ছাত্রী।
ওরা গলিতে নেমে এসেছে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আজান শোনা গেল। নেওয়াজকে একশ ডলার দেবে ভাবল লিলিথ। এত অবশ্য না দিলেও হত। আমেরিকার ইকোনমি ভালো না। তবে বৃদ্ধর মানসিক পরিবর্তন মুগ্ধ করেছে- একজন আনারকলির জন্য এত কিছু। এই সমাধি সৌধ, আনারকলি বাজার। আর আর ...ইস্ট পাকিস্তানে ... ইস্ট পাকিস্তানে কত মেয়েকে খুন করল...তার জন্য? ...তার জন্য?
নেওয়াজের নকিয়াটা বাজল। আকবর। সালে। বহুত হারামী আকবর। ফোনটা এবার অফ করে দিল নেওয়াজ।
একশ ডলারের নোটটা বাড়িয়ে দিল লিলিথ।
নাঃ, আমার কিছু লাগবে না ম্যাম। মাথা নেড়ে বলল নেওয়াজ।
বিস্মিত হওয়ার সময় কই। একটা ট্যাক্সি এসে থেমেছিল। সেটায় উঠে পড়ল লিলিথ। মি:নেওয়াজ কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত। পাকিস্তান সরকার অবশ্য আজও বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চায়নি। এমনকী ক্ষতিপূরণও দেয়নি। পাকিস্তানের সচেতন মানবিক বুদ্ধিজীবিরা সেজন্য লজ্জিত। সায়মা বানু ও আজম নেওয়াজরা। দীর্ঘশ্বাস ফেলল লিলিথ। ট্যাক্সিটা চলতে শুরু করেছে। লিলিথ পেট্রলের পোড়া গন্ধ পেল। আনারকলির জন্য কে ক্ষমা চাইবে? আনারকলিকে নিয়ে আগে যে প্লটটা খসড়া করেছিল লিলিথ সেটি বদলে নতুন প্লট ভাবতে হবে। লেখাটা ১৯৭১ সাল থেকে শুরু করতে হবে। প্রথম অধ্যায়ে আনারকলি নামে এক বাঙালি মেয়ের পারিবারিক জীবন। পরে আনারকলিকে পাকিস্তানি মিলিটারি ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ...খুন করা হয়। তার আগে ... তার আগে। সমান্তরালে দুটি কাহিনী ...। অধ্যায়-২। লাহোর। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দ। ...লাহোরে আসিয়া যুবরাজ সালিম (জাহাঙ্গীর) আনারকলির মুজরা দেখিয়া আনারকলির প্রেমে পড়িল। আনারকলিও সাড়া দিলে তাহারা গোপনে দেখা করিতে লাগিল। যুবরাজ সালিম বিষয়টি তাহার পিতা আকবরকে জানাইল। সুন্দরী আনারকলি লাহোরের বিখ্যাত নর্তকী হইলে কী হইবে- আনারকলি ছিল নিছক দাসী, অভিজাত রক্ত তাহার শিরায় বহিত না। কাজেই বিরক্ত হইয়া বাদশা আকবর বলিলেন, আনারকলির সঙ্গে আর দেখা করিও না। র্যানডম হাউজের উর্ধতন কর্তৃপক্ষ হয়তো আইডিয়া পছন্দ করবে না। তারা চুক্তি বাতিল করতে পারে। করুক। অগ্রিম যা নিয়েছি আমি ফিরিয়ে দেবো। একাত্তরে নিহত মেয়েদের সম্বন্ধে আরও জানতে হবে। হোটেলে ফিরতে হবে। হোটেলে ফিরেই ঢাকার টিকিট কনফার্ম করতে হবে। তারপর লিখবে লক্ষ লক্ষ আনারকলি খুন হয়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে। একজন আনারকলির খুন হয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বপুরুষের হাতে। বাংলাদেশ ওয়ার ক্রিমিনালদের বিচার করতে চায়। ওয়েস্টের এখন আনারকলিদের করুন কাহিনী জানা উচিত।
৩
হাঁটছিল আজম নেওয়াজ। দু’পাশের দোকানগুলোয় আলো জ্বলে উঠেছে। অনেকক্ষণ ধরে আনারকলি বাজারের এমাথা-সেমাথা হাঁটল সে। হাঁটতে হাঁটতে এলোমেলো কত কী যে ভাবল সে। আগে সে শিয়ালকোটে ছিল। তারপর প্রায় দেউলিয়া হয়ে লাহোরযাত্রা। বহুত ধারদেনা হয়ে গিছল শিয়ালকোটে। দশ সাল আগে মৃতা বউয়ের কথাও মনে পড়ল আজম নেওয়াজের । এক ছেলে ছিল গায়েব, দশ সাল। এক মেয়ে আছে। মেয়ের শ্বশুরবাড়ি গুজরানওয়ালা। সেই নুরির কথাও মনে পড়ল। রাত আটটার দিকে খিদে পেল তার । খেল না। রাত দশটার দিকে একবার ঝুপড়িতে ফেরার কথাও ভাবল। নাঃ, থাক। নাসিমন বেওয়া লাথ দিবে। আল্লামা ইকবাল লেনের দাউদ মোহম্মদের বাধা রক্ষিতা নাসিমন বেওয়া । দাউদ মোহম্মদ বৃদ্ধ হলেও তার স্যাঙ্গাতরা খুনখারাপিতে উস্তাদ। আমার খুন খাওয়াই দরকার! আমি কেন সেভেনটি ওয়ানে আর্মির চাকরি ছাড়লাম না? এখন খুনের ভাগীদার হলাম! দশটা কুকুরবেড়াল জড়ো করে মারলেও লোকে বাধা দেয়। আর তখন অত মানুষ মারল। আমি বাধা দিলাম না। আর্মির ট্রাক চালাতাম। নেত্রকোনা। ট্রাকভরতি ডেডবডি। রেললাইনের পাশে কুড়িয়া বিল। ট্রাকে তুলে বধ্যভূমিতে বাঙালিদের নিয়ে যাওয়া। তারপর ... তখন কত মেয়েকে হত্যা করেছে খান সেনারা। আমিও তো যুদ্ধাপরাধী। আমার কি বিচার হবে? তার বুকটা মুচড়ে উঠল। আমিও কি যুদ্ধাপরাধী নই?
প্যান্টের পকেটে দু-হাত ঢুকিয়ে আজম নেওয়াজ হাঁটতে থাকে। ভঙ্গিটা বিধ্বস্ত। করুন।
একটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছে হল তার। থাক। আজম নেওয়াজ আর সিগারেট খাবে না, হিরামন্ডির মুজরাতেও আর যাবে না। বরং, রাস্তায় রাস্তায় হাঁটবে সে। আজ সারারাত আনারকলি বাজারের অলিতেগলিতে হাঁটবে আজম নেওয়াজ। ভিতরে ভিতরে কাঁদবে। ক্ষমা চাইবে। আল্লার কাছে ক্ষমা চাইবে। আনারকলির খুন এর জন্য ক্ষমা চাইবে। বাঙালি মেয়েদের কাছে ক্ষমা চাইবে। ক্ষমা চাইবে আনারকলির কাছে। এই পৃথিবীতে জন্মলাভ করে নিরীহ মেয়েদের কেন মুজরা নাচতে হয়, কেন খুন হতে হয়-এই প্রশ্নটির জবাব আনারকলি বাজারের অলিগলিতে হাঁটতে হাঁটতে বাকিজীবন খুঁজবে আজম নেওয়াজ।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




