এই হল মরক্কোর মানচিত্র। ১৯১৯ সালে মৃরিডার জন্ম এই দেশেই হয়েছিল।

মরক্কো দেশটা আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিমে; আটলানটিক সমুদ্রের পূর্ব তীরে। আজিলাল প্রদেশটি মরক্কোর মধ্যিখানে অবস্থিত । কাছেই বিখ্যাত অ্যাটলাস পাহাড়।

আজিলাল প্রদেশ
যতদূর জানা যায়- এই আজিলাল প্রদেশেরই এক বাজারে পুরুষদের মনোরঞ্জনকারী ছিলেন মৃরিডা নাইট আতিক। মরক্কোয় এখন আরবি ভাষা প্রচলিত থাকলেও এক সময় ওখানে বারবার ভাষার প্রাধান্য ছিল। তো সেই বারবার ভাষারই এক কথ্যরুপ হল: তাচেলহাইট। মৃরিডা এই তাচেলহাইট ভাষাতেই তাঁর গান গেয়ে গেছেন।
হ্যাঁ,মরক্কোর উপরেও চোখ পড়েছিল ইউরোপীয় হায়েনাদের। ১৯০৪ সাল থেকে মরক্কোর রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে ফরসীরা । রাবাত (মরক্কোর রাজধানী) আজিলাল-প্রভৃতি স্থানে গিসগিস করত ফরাসী সৈন্যরা । রেনে ইউলোর্জ ছিলেন তেমনি এক ফরাসী সৈনিক। সম্ভবত তার পোষ্টিং ছিল আজিলাল-এ। আজিলাল এর বাজারে ছিল মৃরিডার ঘর। ইউলোর্জ কামতাড়িত হয়ে গিয়েছিল মৃরিডার ঘরে। মৃরিডা সম্ভবত রতিক্লান্ত ইউলোর্জকে শুনিয়েছিলেন তাঁর তাচেলহাইট ভাষায় লেখা গান। রেনে ইউলোর্জ সৈন্য হলেও ছিলেন স্পর্শকাতর হৃদয়ের অধিকারী। তিনি মৃরিডার গান শুনে মুগ্ধ হলেন। ইউলোর্জ , সম্ভবত, তাচেলহাইট ভাষা জানতেন। তিনি মৃরিডার কবিতা (বা গান) ফরাসী ভাষায় অনুবাদ করেন-প্রকাশও করেন। যে কারণে আমরা আজ মৃরিডার কবিতা পেলাম। নৈলে- কবি মৃরিডা হারিয়ে যেতেন- কেবল আজিলালের গণিকা পরিচয়েই তিনি বেঁচে থাকতেন।
রেনে ইউলোর্জ কে শ্রদ্ধা।
এবং সঙ্গত কারণেই বেশ্যাসক্ত সাম্রাজ্যবাদী সেই সৈন্যকে এই লেখাটি উৎসর্গ করছি।
তো, কারা ছিল মৃরিডার খদ্দের? ফরাসী সৈন্য, স্থানীয় ট্রাক ড্রাইভার ও ব্যবসায়ীরা।
এরা মৃরিডার গান বোঝেনি। বোঝার কথাও না। এরা শুধু মৃরিডার কালো শরীরটির জন্যই মৃরিডার ঘরে গিয়েছিল।
কেমন ছিল কবির জীবন?
যেমন হয়- খুব কষ্ঠের, অপমানের ... খদ্দেররা প্রায়ই মারধোর করত ... নিচের কবিতায় সেই চিত্র ফুটে উঠেছে।
বদ প্রেমিক
নিষ্ঠুর সৈন্য, এখান থেকে চলে যাও ।
তোমার মুখে ঘৃনার ছাপ ফুটে উঠেছে ।
এখন তোমার হাত উঠছে
আমাকে গালাগাল করছ তুমি
আমার কাছে তুমি যা চেয়েছিলে সেসবই তো তুমি পেয়েছ
আর এখন তুমি আমাকে কুকুর বলছ!
আমার শরীর ছুঁয়ে ছেনে তুমি তৃপ্ত
তুমি আমাকে ছিন্নভিন্ন করেছ
লজ্জ্বা করেনি তোমার তখন আমার ঘরে বুনো ষাঁড়েরর মতো আসতে?
আমার এখানে তুমি কি তাশ খেলতে এসেছিলে?
তখন তুমি ছিলে বিনয়ী, তোমার ব্যবহার ছিল ভদ্র।
আমি চেয়েছিলাম বলে তুমি অগ্রিম অর্থ প্রদান করেছিলে
তারপর তোমার চোখ ধীরে ধীরে দেখেছে আমার নগ্নতা
তোমার বন্য আকাঙ্খা ততক্ষণে আমার মুঠোয়
যখন আমি সম্পূর্ন নগ্ন
তখন আমার ইচ্ছে করছিল তোমার আত্মাকে জিজ্ঞেস করতে
আমি তোমার মাকে অভিশাপ দিতে পারতাম
অভিশাপ দিতে পারতাম তোমার বাবা- তোমার পূর্বপুরুষদের
তুমি যে স্বর্গে ভেসে যাবে সেই স্বর্গকেও ...
এখন তুমি শান্ত হয়েছ
তোমার হুঁশ ফিরেছে
উদ্ধত! নিষ্ঠুর! কর্কস!
প্রথমে তুমি আমার অতিথি ছিলে-তারপর হয়েছে দাস!
তুমি কি আমার ঘৃনা টের পাচ্ছ না?
আজ রাতের স্মৃতি আমাকে মনে করিয়ে দেবে তোমায়
আবারও বিজিত হব আমি -তুমিও সমর্পিত হবে
দরজার কাছে রাখবে তোমার অহঙ্কার
তোমাকে দেখে আমি হাসব-হাসব তোমার আকাঙ্খার কথা শুনে
তবে পরের বার তোমাকে দ্বিগুন অর্থ গুনতে হবে
তোমার অহংকার আর আমার অপমানের মূল্য হিসেবে!
এর পর-
তোমার নিষ্ঠুর আলিঙ্গনকে আমি লক্ষ করব না।
নদী যেমন বৃষ্টির ফোঁটাকে লক্ষ করে না।
তখন আমি বলছিলাম যে -কেমন ছিল কেমন ছিল মরক্কোর আজিলাল এর বাজারে মৃরিডা নাইট আতিক-মানে আমাদের আলোচ্য কবির জীবন?
ওপরের কবিতায় খানিক আভাস পাওয়া গেল।
কিন্তু, কবি মৃরিডা নাইট আতিক-এর মনের আরও গভীরে প্রবেশ করা যায় কিনা।
নিচের কবিতায় মৃরিডার ভিতরের অভিমান আর কষ্ট প্রকাশ পেয়েছে। কবিতার নাম 'মৃরিডা।'
মৃরিডা
তারা আমার ছদ্মনাম দিয়েছে মৃরিডা।
মৃরিডা হল-প্রান্তরের চঞ্চল গেছো ব্যাং
আমার তো ওর মতো সোনালি চোখ নেই
নেই সাদা কন্ঠ
সবুজ জামাও নেই ...
কিন্তু, মৃরিডার মতো আমার আছে:‘ডাক’।
যা ভেড়াদের খোঁয়াড় অবধি পৌঁছে যায়
ছড়িয়ে যায় পুরো উপত্যকায়।
পাহাড়ের ওপার থেকেও শোনা যায়।
আমার ডাক-
বিস্ময় ও ইর্ষার উদ্রেক করে।
তারা আমার নাম দিয়েছে: ‘মৃরিডা।’
কারণ, প্রথবার প্রান্তরে যাওয়ার পর
আমি একটি গেছো ব্যাং কোলে নিয়েছিলাম।
ভয়ে আমার হাতে ভীষন ছটফট করছিল ওটা
ওর সাদা গলা ছোঁওয়ালো
আমার শিশু ঠোঁটে
তারপর বালিকা-ঠোঁটে
এভাবেই আমি আর্শীবাদপুষ্ঠ হলাম
পেলাম যাদুময় গান
যে গান গ্রীষ্মের রাতকে দেয় পূর্ণতা ।
কাচের মতন স্বচ্ছ সে গান
কামারের হাপরের মতন তীক্ষ্ম
বৃষ্টির আগে কম্পমান বাতাসের মতন
এই গানের জন্যই
তারা আমাকে বলল মৃরিডা:
এবং যে আমার কাছে আসে
তার হাতের মুঠোয় টের পেয়ে যায় আমার হৃৎপিন্ড
আমি যেমন আমার আঙুলের ডগার নিচে
পাই টের ছুটন্ত ব্যাংয়ের হৃৎপিন্ড
পূর্ণিমার রাতে
সে আমাকে ডাকবে: ‘মৃরিডা’, ‘মৃরিডা’।
মিষ্টি ছদ্মনাম- আমি যা ভালোবাসি
তার জন্য আমি তীক্ষ্ম স্বরে ডাকব
তীক্ষ্ম আর ক্লান্ত
পুরুষের জন্য যা বিস্ময়ের
নারীদের জন্য যা ইর্ষার
এই উপত্যকায় যা পূর্বে শ্রুত হয়নি।
ভাবছিলাম মৃরিডা দেখতে ঠিক কেমন ছিলেন। ইন্টারনেটে শিল্পীর আঁকা মরক্কোর এক নারীর ছবি পেয়ে মনে হল-মৃরিডা নয় তো? অভিমানী কবি মৃরিডা কি দেখতে এমনই ছিলেন?

ফরাসী থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ:
দানিয়েল হালপেরর্ন এবং পলা পালেই। (এঁরা দুজনই বিদগ্ধ মার্কিন কবি)
কবিতাসূত্র:
Willis Barnstone এবং Tony Barnstone সম্পাদিত Literatures of Asia, Africa, and Latin America. (From Antiquity to the Present)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সকাল ১১:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


