
এই মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে চলছে নিদারুন অর্থনৈতিক মন্দা। দেশে দেশে বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ডাউনসাইজ অর্থাৎ কর্মী ছাঁটাই চলছে। সে হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি এখনও সেরকম পর্যায়ে না গেলেও রপ্তানীনির্ভর প্রতিষ্ঠানে আশঙ্কা রয়েছে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের । এইরকম সম্ভাবনার মুখে এদেশেরই পোশাক শিল্পের সঙ্গে জড়িত আমার পরিচিত এক যুবকের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অনুমান করে বিমর্ষ বোধ করছি।
মাসুম; আমার এক ছোট ভাই- বেশ ক’বছর ধরে একটা বায়িং হাউজে আছে; ভারি পরিশ্রম করে ছেলেটা-ফ্ল্যাটে ফিরতে ফিরতে প্রায়ই রাত হয়ে যায়- এ নিয়ে ওর বউয়ের অনেক অনুযোগ। আমাকে সময় দেয় না। ১৬ ডিসেম্বর সেজেগুজে বসে আছি-ওমা, অফিস থেকে ফোন এল। আর, সঙ্গে সঙ্গে আমার বরের দৌড় যদি দেখতেন।
কী করব? মাসুম কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে-শিপমেন্ট আর শিপমেন্ট ...বলে সিগারেটে টান দেয়। ভারি ব্যস্ত সে-তারপরও সময় পেলে আমার ঘরে আসে-সিগারেট টানে-ক্লান্ত বিধ্বস্ত মুখ; এক সময় গান গাইত; এখন ওসব গেছে! সংসার চালাতে হিমসিম খাচ্ছে -একটা মেয়ে হয়েছে; চৌদ্দ মাস বয়েস। মাসুম ওর বড় ভাইয়ের সঙ্গে থাকে। নইলে সে যে বেতন পায় তাতে বাড়ি ভাড়া দিয়ে এ শহরে থাকাই যে সম্ভব না; ঢাকায় তো আর নিজস্ব বাড়ি নেই-ক’জনের থাকে। ওর ভাইটাও ভারি ভালো মানুষ, ভাবীটাও যেন মাটি দিয়ে গড়া। মাসুমের নতুন বউ- অ্যাডজাস্ট করে নিচ্ছে জয়েন্ট ফ্যামিলিতে। তবে কয়েকমাস আগে মাসুমকে ওর বউ বলল-গরমে বাচ্চাটার সাঙ্ঘাতিক কষ্ট হচ্ছে- ঘরে একটা এসি লাগাও।
মাসুম কিছুটা অবাক হয়ে বলল, ফ্যান আছে, একুশ তলার উপরে ফ্ল্যাট ...
ভাবীদের ঘরে এসি আছে। ভাবীদের বাচ্চার তো আর কষ্ট হয় না ... মাসুমের বউয়ের কন্ঠস্বর ভারি হয়ে উঠতে থাকে।
যা হোক। হাতে টাকা না-থাকলেও মাসুম তার বউয়ের বায়না কোনওভাবেই এড়িয়ে যেতে পারল না। লোনটোন করে কোনওমতে ঘরে একটা হাইয়ার স্পিট এসি বসালো। ইলেকট্রিক বিলও বাড়ল। ওদিকে বেতন বাড়ছে না। গাধার খাটুনি। খালি বলে: চাকরি ছেড়ে দেব। চাকরি ছেড়ে দেব। চাকরি আর ছাড়া হয় না।
ওর কন্ঠে তিক্তটা ঠিকই টের পাই আমি। আমার ঘরে এসে বসে থাকে। চুপচাপ সিগারেটে টান দেয়। বলে-সিলেটে একটা সুন্দর জায়গা আছে। যাব।
এই কথাটা প্রায়ই বলে মাসুম। আমি সতর্কভাবে জিজ্ঞেস করি- একা?
হ্যাঁ। একা।
তো, সিলেটের সেই সুন্দর জায়গায় মাসুমের আর যাওয়া হয় না। শিপমেন্ট আর শিপমেন্ট ...
আমি জিজ্ঞেস করি-বউ আলাদা হতে চায়?
না। এখনও এ দিক থেকে ভালো আছি।
মিথ্যে কথা। এ যুগে কে জয়েন্ট ফ্যামিলিতে থাকতে চায়। বিয়ের আগে হয়তো বলেছিল-কয়েকটা মাস ...
খবরের কাগজজুড়ে কেবলি বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা আর বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা । তার কিছু নেতিবাচক প্রভাব এরই মধ্যে দেশিয় অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। যেমন-চামড়া শিল্পে। গেলবার কুরবানী ঈদের সময় দেখলাম পাড়ার পোলাপানের মুখ কালো- ট্যানারিতে চামড়া বিক্রি করে নাকি লাভ হয়নি। ট্যানারিঅলারা বলে-বিদেশ থন অডার নাই-বেশি দাম দিমু কেমতে?
তাই তো। অর্থনীতিবিদদের ধারণা- বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অচিরেই বাংলাদেশের পোশাক শিল্পেও ব্যাপক ধস নামতে পারে। অনেক শিপমেন্ট ক্যানসেল হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সঙ্গে জড়িত লক্ষ লক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী তাতে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
মাসুমের শ্যামলা মুখটা মনে পড়ল।
চোখের সামনে কি দেখব একটা ধস? মাসুমের ধস? অনেক কষ্টে মাসুম বায়িং হাউজে জবটা পেয়েছে-মাসে তিরিশ হাজার টাকার বিনিময়ে বন্দিত্ব বরণ করেছে; সেই বেতনের উপর নির্ভর করে বিয়ে করেছে-একটা মেয়েও হয়েছে। মাসুমের বউয়ের একটাই অনুযোগ -ও এত ব্যস্ত - আমাকে সময় দেয় না। দুটো ঈদে খালি ছুটি পায়। এইই।
বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে মাসুমের বউয়ের কোনওরুপ ধারণা আছে কিনা বলতে পারছি না। থাকার কথা নয়। মনে মনে বলি: মাসুমের এই ব্যস্ততাটুকু থাক- বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা আরও তীব্র হয়ে উঠলে মাসুমের চাকরিটা নাও থাকতে পারে। তখন ওর অখন্ড অবসর ... তখন তো ওর বিরুদ্ধে আর এই অভিযোগ থাকবে না।
তখন?
আমি কি চোখের সামনে একটা ধস দেখতে যাচ্ছি?
মাসুমের ধস?
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১২:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



