somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: জওয়ান

২৫ শে মে, ২০০৯ সকাল ৯:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দূর থেকে র‌্যাবের জিপটা দেখে শহীদুলের বুকটা ধক করে উঠল । সায়েদাবাদে লুকিয়ে থাকার সময়ই সে পীর হাবীবের মুখে ‘অপারেশন রেবেল হান্ট’-এর কথা শুনেছে। পালানোর পথ এখন বন্ধ। এখন বাস থেকে নামতে গেলেই ওরা সন্দেহ করবে- নৈলে বাসষ্ট্যান্ডের ভিড়ে নিমিষে মিশে যাওয়া যেত। তবে, বাঞ্ছারামপুর বাসস্ট্যান্ডে ভিড় তেমন নেই এই মুহূর্তে- মধ্য দুপুর বলেই হয়তো। চারদিকে শেষ এপ্রিলের ঝলমলে রোদ। বাসটা থেমে আছে। যেহেতু র‌্যাবের জিপটা রাস্তার আড়াআড়ি থেমে আছে।
শহীদুলের সামনের সিটেই বসে আছেন চাঁদপুরের নুরুল ইসলাম ভাই। নুরুল ইসলাম ভাই বয়স্ক মানুষ; মুখে পাকা দাড়িও আছে, মাথায় সাদা রঙের কাপড়ের টুপি, পরনে রঙীন পাঞ্জাবি- বিডিআর এ যে চাকরী করে তা বোঝার উপায় নেই। আল্লা আল্লা করতেছেন মনে হয় নুরুল ইসলাম ভাই ।
সামনের দরজা দিয়ে একে একে চারজন র‌্যাব উঠল। পিছনে? পিছনে অবশ্য তাকাল না শহীদুল। তার বুকটা ধড়ফড় করছে। বাসযাত্রীদের মুখের দিকে তীক্ষ্ম চোখে তাকাচ্ছে। একটা শিশু তীক্ষ্মস্বরে কেঁদে উঠল। ঠিক তখনই একজন র‌্যাব শহীদুলের মুখের দিকে তীক্ষ্মদৃষ্টিতে তাকাল। শহীদুলের বুক কেঁপে ওঠে। কী মনে করে র‌্যাবটা মুখটা সরিয়ে নিতেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচল সে।
নুরুল ইসলাম ভাইয়ের কাছে দুজন র‌্যাব থেমেছে। একজন ঝুঁকে কী যেন বলল নুরুল ইসলাম ভাইকে। নুরুল ইসলাম ভাই উঠে দাঁড়াল। শহীদুলের বুকের ভিতরে নিঃশব্দ বজ্রপাত হয়ে যায়। সে টের পায় তার হাত দুটো ভিজে গেছে। বাসের ভিতরে ডিজেলের ঘন গন্ধে তার বমির ভাব হয়। সেই শিশুর কান্না কী কারণে থেমে গেছে।
নুরুল ইসলাম ভাইকে নিয়ে র‌্যাবের ছোট দলটা নেমে গেল।
বাসটা আবার চলতে শুরু করে।
ওপাশের জানলা খোলা। হু হু করে হাওয়া ঢুকছে। শহীদুলের ঘোর লাগে। ভীষণ নিস্তেজ লাগছে। সে সিটে হেলান দিয়ে চোখ বোজে। ওপাশ থেকে কে যেন বলে,বি ডি আর এইটা কী করল বলেন তো? এতগুলা অফিসার মারল।
মারব না? জওয়ানদের বেতন বাড়ায় না। ছুটি দেয় না। নিজেরা কথায় কথায় দেশবিদেশ ঘুরে।
তাই বইলা মাইরা ফেলাব? দেশে আইন নাই?
মারব না? দিনের পর দিন জওয়ানরা তাগো দাবিদাওয়া জানাইছে কর্তৃপক্ষ কাছে। হেরা দাবিদাওয়া কানে তুলে না। মারব না তো কি।
শুনছি আঠার শ বিডিআর নাকি পলাতক?
হ। আপনি ঠিকই শুনছেন। তয় আরও বেশি হইতে পারে।
ডালভাত কর্মসূচীর নামে বিডিআর-এর শাকিল সাহেব নাকি সরকারি তহবিল তছরুফ করছে?
আরে ভাই, আপনে কথাটা যে বললেন-আপনার কাছে প্রমান আছে? আমার ভায়রা ভাই কিশোরগঞ্জের টি এন ও; আমার ভায়রা ভাই শাকিল সাহেবরে চিনে। তার মত ত্যায়াগী লোক নাকি বাংলাদেশে আর নাই।
আসলে আর্মি, আর্মি-আর্মিই দায়ি; ডাক্তার মোহাম্মদ ইউনূস আম্রিকায় গিয়া বললে না- যে কোনও দেশের জন্যই আর্মি খারাপ। পাকিস্থান দেখতেছেন না?
আরে রাখেন আপনের ডাক্তার মোহাম্মদ ইউনূস! তিনি হইলেন সুদখোর মহাজন। সুন্দরবন উজার কইরা দিল।
ভাইজানের বাড়ি কি খুলনা?
না।
তাইলে...



বাসটা নবীনগর উপজেলা সদরের বাসষ্ট্যান্ডে যখন থামল তখন দুপুর প্রায় শেষ। শহীদুল বাস থেকে ধীরে সুস্থ্যে নামল। চারপাশে তাকায়। নাঃ, র‌্যাবের জিপ নাই। নুরুল ইসলাম ভাইয়ের জন্য দুশ্চিন্তা হলেও শহীদুলের খিদে পেয়েছে; সেই সকাল সাতটার দিকে সায়েদাবাদের শাহী মদীনা হোটেলের পরোটা আর ডালভাজি খেয়েছে। বাসষ্ট্যান্ড সংলগ্ন হামিদুরের ভাতের হোটেলের দিকে যেতে থাকে সে । ভাতের হোটেলে ঢুকে পিছনের দিকে বসল। হামিদুর কাউন্টারে বসে ছিল। এই হামিদুরের সঙ্গে সে আর কাজলিয়া হাটের দর্জি আক্তার হোসেন একসঙ্গে পড়েছে স্কুলে। তারপরও হামিদুর তাকে চিনল না। শহীদুলের মাথা কামানো। সেই কামানো মাথায় তালের টুপি। পরনে সায়েদাবাদের হাবীব পীরের কাছ থেকে ধার করা সাদা পাঞ্জাবি। তাকে কওমি মাদরাসার ছাত্রের মতন দেখায়।
শেষ বেলার ঠান্ডা ভাত আর ডাল। তাই ডলে ডলে খেল সে। বমির ভাবটা আছে অল্প। সেই সঙ্গে উদ্বেগ। গলা দিয়ে দলা ভাত নামতেছিল না। পানি খায় শহীদুল। নুরুল ইসলাম ভাইরে কই নিয়া গেল?
নুরুল ইসলাম ভাই শহীদুলকে বিশ্বাস করে। নুরুল ইসলাম ভাইয়ের সাড়ে চার হাজার টাকা শহীদুলের কাছে আছে। সেই টাকায় বিল মিটিয়ে (বিল মিটানোর সময়ও হামিদুর চিনল না) ভাতের দোকান থেকে বেরিয়ে পাশের একতলা মার্কেটে ঢুকল। তারপর দেখেশুনে সাড়ে তিনশ টাকা দিয়ে মালার জন্য একটা আলতারঙের শাড়ি কিনল। আব্বার জন্য কিনল বারো শ টাকা দিয়ে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি; উজানের জন্য হাফপ্যান্ট গেঞ্জি-প্লাসটিকের একটা গাড়ি। তাতে আরও দুই শ পঞ্চাশ টাকা খরচ হয়ে গেল। যাক। বেঁচে থাকলে শহীদুল নুরুল ইসলাম ভাইয়ের টাকা শোধ করে দেবে।
জিনিসগুলি দুটো প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে মার্কেট থেকে বেরিয়ে এসে মোড়ের দিকে হাঁটতে থাকে সে। চারপাশে তাকায়। নাঃ, র‌্যাবের জিপ নাই। রোদ মরে যাচ্ছিল তখন। মোড়ে ভিড়। রাস্তার দুপাশে শশা আর শুঁটকি মাছের স্তূপ। রিকশা আর ভ্যানের জটলা। কাজলিয়ার দিকে একটা ভ্যান যাচ্ছিল। সে উঠে পরে।



শহীদুল যখন কাজলিয়ার শেখ বাড়ি পৌঁছল তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে।
মাসের শেষ বলেই আকাশে চাঁদ ছিল না। উঠানে অন্ধকার। রান্নাঘরে আলো ছিল। সে পা বাড়ায়। মালায় কই? উজানে? উঠান পেরিয়ে শহীদুল দাওয়ায় উঠে আসে। আহ্, কী শান্তি শান্তি। বাড়িতে পা দিলেই শান্তি। শহীদুল আর ডিজেলের গন্ধটা পায় না।
কী করে যেন টের পেল মালা-রান্নাঘর থেকে ছুটে আসে। দাওয়ার ওপর থমকে দাঁড়ায়। তারপর চাপাস্বরে বলে, আপনি আরছেন?
হ। উজানে কই?
ঘুমায়তেছে।
আব্বায়?
আব্বায় বুকে বেথা উঠছে। পুবপাড়ার ছালেম হেমিকের কাছে গেছে মালিশ নিতে ।
অ। নাও ধর। বলে ব্যাগগুলি বাড়িয়ে দিল শহীদুল । তারপর নীচুস্বরে বলল, আমার খবর নেওনের জন্য আইছিল কেউ?
না। কে আইব? বলতে বলতে মালা ব্যাগগুলি নেয়। তারপর বলে, আপনার কী হইছে? টুপি-পাঞ্জাবি পরছেন ক্যান?
উত্তর তৈরিই ছিল। শহীদুল বলে, ফরিদগঞ্জের শানাল পীরবাবার ওরসে গেছিলাম। তার কথা কইছিলাম না তোরে?
হ। মাথা কামাইছেন ক্যান?
কী করুম? খুকশী হইছিল। সত্তরে কইল মাথা চাইছা খইল দিতে। সর। ঘরে যামু।
মালা সরে যেতে যেতে বলে, ভিতর থিকা সত্য কথা না আইলে চুপ কইরা থাকবেন-মিথ্যা কথা কন ক্যান? বলে ব্যাগটা নিয়ে মালা চলে যায় ।
শহীদুল চুপ করে আধোঅন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর স্যান্ডেল খুলে ঘরের ভিতরে ঢোকে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। মাটির মেঝে থেকে কুন্ডলী পাকিয়ে শীত ওর পায়ের পাতা ভেদ করে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে তারপর মাথার ঘিলুকে ঘিরে ফেলে। ঘরের ভিতরে অন্ধকার। মরা মায়ের শাড়ির গন্ধ। বোন শিউলির মেন্দির গন্ধ। জানালার ওপাশে সন্ধ্যার আলো । ধানের গন্ধ । বিছানায় চোখ যায় তার। উজান শুয়ে। ও এগিয়ে যায়। মালা ছুটে এসে শহীদুল পিছন থেকে আটকায়। চাপাস্বরে বলে, না। অখন না। আপনার পোলারে কাল বিয়ানে দেখবেন।
ঘুমন্ত ছেলেকে আদর করতে দেবে না মালা।
শহীদুল দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে। আশ্চর্য! বমির ভাবটা নাই। দ্রুত টুপি আর পাঞ্জাবি খুলে নেয় শহীদুল। মালা লুঙ্গি আর গামছা দিয়ে যায়। পাজামা খুলে লুঙ্গি পরে নেয় শহীদুল। তারপর দ্রুত ঘর থেকে বেড়িয়ে অন্ধকার পুকুর পাড়ে চলে আসে সে। ঝিঁঝির ডাক। কচুরির গন্ধ। আর কেমন যেন বাতাস। তালগাছের গুঁড়ির ঘাটলা । শহীদুল কালো পানিতে নামে; ডুব দেয়। দুই মাস পর এই প্রথম শান্তি পায় সে। হু হু করে কেঁদে ফেলে শহীদুল। পুকুর পাড়ে বাঁশের ঝাঁর। সেখানে আম্মার কবর। শহীদুল হু হু করে কাঁদে।
খেতে বসার আগেই শহীদুলের আব্বা এলেন। বললেন, কী সব হুনছি বাবা।
কইতে পারি না বাজান। আমি তো বর্ডারে ছিলাম।
আব্বার সামনে জীবনে এই প্রথম মিথ্যা বলল শহীদুল।
শহীদুলের আব্বা বললেন, তোমার লগে যোগাযোগ করছিলাম মোবাইলে; পারি নাই।
গন্ডগোল তো। মালারে তো ফোন করছিলাম।
অ। বলতে বলতে কাশীর দমকে কেঁপে ওঠেন শহীদুলের বাবা মফিজ শেখ- মানুষটা বেশ বৃদ্ধ। হাঁপানি আছে। তারপরও সকাল-বিকাল মুদি দোকানে বসে সংসার টানেন। ছেলের আর কী আয়। মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন মফিজ শেখ। সেই কাহিনী জন্মের পর থেকে শুনে আসছে শহীদুল। বাবায় বলে, বিদ্রোহ করলে লাশ ফেলায় দেয়। মুজিব বিদ্রোহ করছিল। তারে বন্দি করল। বাঙালির লাশ ফালায় দিল। বুঝলা, বিদ্রোহ করলে লাশ ফেলায় দেয়। এই নিয়ম।
মফিজ শেখ অত্যন্ত রাজনৈতিক সচেতন-এবং মাওলানা ভাসানীর ভক্ত। ভাসানিরে তিনি মুজিব-জিয়ার চেয়েও বড় নেতা মনে করেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস- মুজিব না -দেশ আসলে স্বাধীন করছেন মাওলানা ভাসানি। দেশের প্রতি অটুট টান। আই এ পাস করার পর চালতা পাড়ার আইনুদ্দীনের সঙ্গে যোগাযোগ করে শহীদুলের মালয়েশিয়া যাওয়া একরকম ঠিকই ছিল-মফিজ শেখ ছেলেরে মালয়েশিয়া যেতে দিলেন না। বললেন, ভিনদেশে যাইয়া কী হইব। দেশের জন্য কিছু কর বাবা। সীমান্তে যা। জান দিয়া দেশের মাটি আগলায় রাখ। বাবার কথায় তালতলির ফকরুল ভাইয়ের সঙ্গে ঢাকা গিয়া বিডিআরে আবেদনপত্র জমা দিল শহীদুল। তার আগেই মালাকে ঘরে এনেছিল শহীদুল। বাঞ্ছারামপুরের মেয়ে মালা।
শহীদুলের খাওয়া শেষ। পুকুর পাড়ে হাত ধুতে যায় সে। ফিরে এলে মালা গামছা এগিয়ে দেয়। তখন থেকেই মালার বমি বমি লাগতেছিল। আজকাল মালা ঠিকমতো খাইতেও পারে না। অভাবের সংসার। তারপরও শহীদুলের কন্যাসন্তান চাই। কন্যা সন্তান না হইলে? মালার কত যে দুশ্চিন্তা। তারপরও আলতারঙের শাড়িটা পরল মালা। মেজবোন লতিফার স্বামী মজনু দুলাভাই সেন্ট কিনে দিসিল। সেই সেন্টও লাগাল ব্লাউজে।
রাত আরও ঘনালে বউকে বুকে টেনে নেয় শহীদুল।
তখন ঝিঁঝির ডাক আরও ঘন হয়ে উঠেছে।



সকাল বেলায় শহীদুলের ঘুম ভাঙ্গল উজানের কান্নায় আর আব্বার কাশীর শব্দে।
ঘরে রোদ আর রোদ। দরজা খোলা। খোলা দরজা দিয়েই দেখল উঠানে র‌্যাব। মুহূর্তেই শহীদুলের শরীরটা জমে যায়। তারা স্টেন উঁচিয়ে ঘরে ঢোকে। খালি লুঙ্গি পরে ছিল শহীদুল-শার্টও পরতে দিল না তাকে।
মফিজ শেখ দাওয়ার ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বললেন, বাবারা, আমার ছেলে অন্যায় করলে তার যেন যথারথ শাস্তি যেন হয়।
ওই খানকির পোলা চুপ কর!
তারপর শহীদুলকে জিপে তুলতে তাদের সময় লাগেনি।
জিপটা স্টার্ট নিয়েছে-ঠিক তখনই দূর থেকেই মালার চিৎকার শুনল শহীদুল। ওর বুকটা ধক করে ওঠে। পূবপাড়ায় ছালেম হেকিমের কাছে আব্বায় বুকের মালিশ নিত। এখন? মালায় একা হইয়া যাইব? শহীদুল ছটফট করে ওঠে।
জিপটা চলতে শুরু করেছে। বুকটা ভীষণ ধড়ফড় করছে। মুখ তুলে ভীষন অবাক হয়ে যায় সে। ওপাশে নূর মোহাম্মদ ভাই বসে। চালতা পাড়ার আইনুদ্দীনের খালাতো ভাই নূর মোহাম্মদ ভাই । মাঝবয়েসী। মুখে দাড়ি। ছোটবেলায় কত চইত মেলায় নিয়া গেছে নূর মোহাম্মদ ভাই । নূর মোহাম্মদ ভাই য়ের মুখটা কঠিন। শহীদুলকে যেন চিনে না।
এখন শক্র হয়ে গেল?
কেন?
শহীদুল চোখ বন্ধ করে।



নুরুল ইসলাম ভাই সঙ্গেই পিলখানা থেকে পালিয়েছিল শহীদুল। নুরুল ইসলাম ভাইয়ের বড় মেয়ের বাড়ি মীরপুরের দক্ষিণ পাইকপাড়া। প্রথমে সেখানেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত হল। তার আগে ৩ নং গেটের কাছে বেলা এগারোটার দিকে নুরুল ইসলাম ভাই ফিসফিস করে শহীদুলকে বললেন, দরকার হইলে না খাইয়া থাকমু। চাকরি ছাইড়া দিমু। তাই বইলা এই ভাবে মানুষ মারা। ডিজি ম্যাডামরে নির্যাতন করছে শুনছি। আল্লা এগো মাপ করব না। তারপর থেকে তারা পালানোর সুযোগ খুঁজছিল। সুযোগ এল। ঐ দিন সন্ধ্যার পর কয়েক ঘন্টার জন্য কী কারণে ইলেকট্রিসিটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই ফাঁকে দেওয়ার টপকে অন্ধকার গলিতে লাফ দিয়ে নামে শহীদুল । তার পাশে তখন নুরুল ইসলাম ভাইও ছিলেন। আরও অন্য অনেকেই ছিল। দেওয়ার টপকানোর আগে ইউনিফরম বদলে ফেলেছিল শহীদুলরা। স্রেফ লুঙ্গি আর গেঞ্জি। কারও কারও পরনে শার্ট কি টিশার্ট। হাজারিবাগের গলি দিয়ে দ্রুত হাঁটছিল তারা। ফাঁকা গলি। দুপাশের বাড়িগুলোয় অন্ধকার। লোড শেডিং অথবা অন্য কোনও কারণে বিদ্যুৎ ছিল না। হাজারিবাগ থেকে রায়ের বাজার;- রায়ের বাজার থেকে মনেশ্বর রোড। তারপর ঝিকাতলা বাসষ্ট্যান্ড। অন্ধকার অন্ধকার রাস্তায় আর্মির ট্রাক, সাঁজোয়া যান। পরিবেশটা কেমন থমথম করছিল। কারফিউ ঘোষনা না-করলেও পরিস্থিতি সেরকমই মনে হচ্ছিল। পাইকপাড়ায় পৌঁছতে পৌঁছতে রাত বারোটা। এ বাড়িতে আগেও এসেছে শহীদুল। নুরুল ইসলাম ভাইয়ের দেশের বাড়ি চাঁদপুরের হাইমচরে। সেখানে তিন কানি জমি বেচে জামাইয়ের হাতে তুলে দিয়েছে। সে ফেলল না। জামাই আক্তার হোসেন কচুয়ার; ইলেকট্রিকের কাজ জানে- লন্ড্রিও আছে মীরপুর দশ নম্বরে। লন্ড্রিটা সাইডব্যবসা। নুরুল ইসলাম ভাইয়ের মেয়ের নাম আসমা। আসমার দুই মেয়ে। দুরুমের বাড়ি। ভিতরের ঘরে ফেব্র“য়ারির বাকি কয়েকটা দিন কাটল। মার্চ মাসটাও কাটল পাইকপাড়ায়। কাজলিয়া হাটের দর্জি আক্তার হোসেনের মোবাইলটা নম্বর মুখস্ত ছিল শহীদুলের। সে আসমার মোবাইল চেয়ে নিয়ে আক্তার হোসেনকে ফোন করে মালারে খবর দিল... আমরা ভালো আছি। আক্তার হোসেন শহীদুলের ছোটবেলার দোস্ত- খবর সে মালারে ঠিকই দিব। আসমাদের প্রতিবেশিরা সবাই জানে আসমার বাপ বিডিআর-এ আছে। কাজেই বেশি দিন পাইকপাড়ায় নিরাপাদ না। এপ্রিলের ৩ তারিখ খুব ভোরে তারা দুজন ভ্যান ভাড়া করে সায়েদাবাদ চলে আসে। নুরুল ইসলাম ভাইয়ের এক বন্ধু থাকে সায়েদাবাদে । নাম হাবীবুর রকমান। ভ্যানে যেতে যেতে নুরুল ইসলাম ভাই বললেন- স্বাধীনতার আগেই হাবীবব্যা ঢাকায় আসছিল। সরদঘাটের কুলীগিরি করত-তারপর আল্লাহ্র নেক নজর পড়ছিল। ক্যামনে জানি পীর হইয়া যায়। এরশাদের সময়ে যাত্রাবাড়ী আর শ্যামপুরের ভক্তদের চাঁদায় উঠল শাহী মদীনা হোটেল। হাবীবুর রকমানের বয়স-শহীদুল যা বুঝল- নুরুল ইসলাম ভাইয়ের মতোই- হাবীবুর রকমানের দেশের বাড়িও হাইমচরে । হাবীবুর রকমান অবশ্য শ্যামপুর আর সায়েদাবাদ এলাকায় পীর হাবীব নামে পরিচিত। সায়েদাবাদে শাহী মদীনা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের দোতলায় পরিবার নিয়ে থাকে । বেশ খানদান দেখেতে পীর হাবীব। ফরসা নাদুসনুদুস চেহারা, মাথায় তালের টুপি, দাড়িতে মেহেন্দি । সবসময় ধবধবে পাঞ্জাবি পরেন। বেশ খাতির করল হাবীব পীর। দোতলায় একটা রুম পরিস্কার করে দিল ওদের জন্য। তারপর তিনবেলা বিরিয়ানি আর বুরহানির ওপর রাখলেন। এরই মধ্যে পীর সাহেবের মোবাইল দিয়ে কাজলিয়া হাটের দর্জি আক্তার হোসেনকে ফোন করে মালাকে আবার খবর দিল শহীদুল -চিন্তার কারণ নাই। ভালো আছি।
এপ্রিল মাসের শেষে হাবীব পীর এসে দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, নুরু।
কও।
খবর পাইছি-পুলিশের ইনফর্মার মদীনার আশেপাশে ঘুরঘুর করতেছে। আমারে আর বিপদে রাইখ না রে ভাই। একবার আমারে ডিবি অফিসে নিয়া পিটাইছিল-নাইনটিন সেভেনটি সিক্সে। আমারে আর বিপদে রাইখ না রে ভাই। রোজ হাশরের দিনে আল্লা যখন বলবেন -ওহে হাবীর হাজী । আমার বান্দা যখন আর্মি মাইরা পলাইয়া তোমার নিকটে আশ্রয় চাহিল -তখন তুমি কি করিয়াছিলে। আল্লা এই কথা জিগাইলে আমি বলব ... আমি বলব হে মহান আল্লাতালা ...আমি এপ্রিল মাসের পঁচিশ দিন তাহাদের গোলাপ পানি, আতর আর বিরিয়ানির ওপর রাখিয়াছি। আমার গোস্তাকি মাফ করুন।
এত কথার কী আচ্ছা, কালই যামু গা। নুরুল ইসলাম ভাই বললেন। এত বয়স হইছে, তোর তামশা যায় না।
এই কথার পর থতমত খেয়ে হাবীব পীর চলে যান।
এখন কী করবেন? শহীদুল জিজ্ঞেস করে।
লও আমার বাইত যাই।
হাইমচর ?
হ। লও। আইজ রাতেই সদরঘাট থন লঞ্চে উঠি।
শহীদুল কী ভেবে বলে, আমার বাড়ি চলেন আগে। পোলাটারে দেখি না।
লও তাইলে।
গতকালই সকাল সকাল সায়েদাবাদ থেকে বাসে উঠল দু’জন। বাঞ্ছারামপুর হয়ে নবীনগরের কাজলিয়া। একসঙ্গে সিটে পাশাপাশি বসেনি যুক্তি করেই। সেই নুরুল ইসলাম ভাই বলে দিল? নাঃ, তা তো সম্ভব না। নুরুল ইসলাম ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় কুড়িগ্রামে; চার বছর আগে। সে সময় কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে দুজনেরই পোস্টিং ছিল। তখন একবার জানা গেল- বিএসএফ’র গুলিতে আইয়ুব আলী (৩০) ও ইসলাম (২৭) নামে দুই বাংলাদেশী সহোদর নিহত হয়েছেন। রাত ৩টার দিকে আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফেরার পথে রৌমারী উপজেলার আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার ১০৭১-৭২-এর মাঝামাঝি বলদানগিরিতে বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা আইয়ুব আলী ও আমিরুল ইসলামকে লক্ষ্য করে গুলি করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়। নিহতরা রৌমারী উপজেলার আলগারচর গ্রামের নূর মোহাম্মদের পুত্র বলে জানা গেছে। ভারতের কালাইরচর ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা তাদের লাশ ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে গেছে। বালিয়ামারী বিডিআর’র কোম্পানি কমান্ডার ঘটনার প্রতিবাদ এবং লাশ ফেরত চেয়ে বিএসএফকে চিঠি দিয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। রাত্রে হঠাৎ দুপক্ষের তুমুল গোলাগুলি আরম্ভ হয়। সে কী ভয়ঙ্কর শব্দ। শহীদুল হতচকিত। সারারাত দুপক্ষের গুলি বিনিময়ের পর ভোরের দিকে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এসেছিল। তারপর থেকেই বুক ধড়ফড় করে শহীদুলের। বড় ডাক্তার দেখাবে সেই টাকা কই-নুরুল ইসলাম ভাইয়ের সঙ্গে ফরিদগঞ্জের এক পীরের কাছে গেছিল গতবছর। ফরিদগঞ্জের শানাল পীর। নুরুল ইসলাম ভাই বলেন, বেশুমার পীর নাকি শানাল শা- প্রতি বছর এপ্রিল মাসের শেষ শুক্কুরবার শানাল পীরের উরছ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। শানাল পীর বেঁচে নেই-তাঁর মেয়ের ঘরের নাতি পীর নেছার আলী রুহে হাককানী মুরিদানের তদবির দেন। তার আগে শানাল শার মাজারে ৩০২ টাকার সিন্নি চড়াতে হয়। একশিশি কৈতক তেল দিলেন পীর নেছার আলী রুহে হাককানী । বুক ধড়ফড় করলে মালিশ করে শহীদুল। কাজ হলে আব্বারেও এক শিশি দিবে ...
সেই নুরুল ইসলাম ভাই বলে দিল? নাঃ, তা তো সম্ভব না।
আর, র‌্যাব শুধু নুরুল ইসলাম ভাইকে ধরল। আমারে ধরল না কেন? এও এক রহস্য। শহীদুল বিভ্রান্ত বোধ করে।
জিপটা সদর রাস্তায় উঠে আসে। হামিদুরের ভাতের হোটেলটা দ্রুত গতিতে পার হয়ে যায়। মালার চিৎকার তখনও কানে ভাসছে।



দুপুরের আগেই র‌্যাবের জিপটা ঢুকল পিলখানার ভিতরে; তারপর একটা ব্যারাকের সামনে থামল । দরজার কাছে সেনাবাহিনীর উর্দি পরা দু-জন সশস্ত্র সেনা । শহীদুল নিস্তেজ বোধ করে। ভীষন ঘেমে গেছে সে। আড়চোখে দেখল ব্যারাকের পাশে মাঠে সার সার তাবু ... সেনাবাহিনীর লোকজন। ব্যস্ত । যেন দেশে যুদ্ধ লাগছে।
চারজন র‌্যাব টেনেহিঁচড়ে ওকে জিপ থেকে নামায়। তারপর প্রায় টানতে টানতে ব্যারাকের ভিতরে নিয়ে যায়। ভিতরে আবছা অন্ধকার আর ঘামের গন্ধ। মেঝের ওপর জওয়ানরা বসে। তার মত অনেকে। লুঙ্গি গেঞ্জি পরা। অনেকেই খালি গা। স্বাস্থ্যবান সব যুবক-এই কিছুদিন আগেও দেশের মাটি আগলে রাখত। এখন দেশদ্রোহী সব ...আব্বার কথাগুলি মনে পড়ল: বিদ্রোহ করলে লাশ ফেলায় দেয়। মুজিব বিদ্রোহ করছিল। তারে বন্দি করল। বাঙালির লাশ ফালায় দিল। বুঝলা, বিদ্রোহ করলে লাশ ফেলায় দেয়। এই নিয়ম।
শহীদুল বসল। চাপাচাপি করেই বসল। জায়গা কোথায়? নুরুল ইসলাম ভাইরে খুঁজল। পেল না। ওপাশে যশোরের শফিকুল। হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে আছে ছেলেটা; পাঁচশো টাকা পায় শফিকুল। আর দেওয়া হবে কি না কে জানে। যশোরের শফিকুলই আগের রাত নয়টার দিকে ওকে একটা লাল পট্টি দিয়ে গিয়েছিল। পট্টিটা পেয়ে শহীদুল অবাক। হুঁশিয়ার থাকিস শহীদ। আমরা বদলা নেব। যশোরের শফিকুল বলেছিল।
কীসের বদলা?
উত্তর না দিয়েই চলে গিয়েছিল শফিকুল।
ব্যারাকে ক’টা দিন কাটল ঘামের গন্ধের ভিতর; বুকে অল্প অল্প ব্যথা নিয়ে।
মে মাসের সাত তারিখ। ভোর। দুজন সশস্ত্র সিপাহি এসে শহীদুলকে ওদের সঙ্গে যেতে বলে। শহীদুল উঠে দাঁড়ায়। দরজা পেরিয়ে করিডর। দুপাশে সার সার ঘর। ফিনাইলের গন্ধ পায় শহীদুল। বুকটা আবার ধড়ফড় করছে। আব্বার মুখটা মনে পড়ে। আব্বায় বলত তোর এমন স্বাস্থ্য বেডা-তুই বিদেশ যাবি ক্যান? দেশের জন্য জান দে। ... সত্যি শহীদুলের স্বাস্থ্যটা দেখার মতন। মিশমিশে রং। টানটান স্বাস্থ্য । বিয়ের রাত্রে মালা কী ভয়। তারপর কথা বলে বলে মালা বলছিল আমি না কইলে আমারে ধরবেন না। তারপর এইসব কথা কোথায় ভাইসা গেল। তারপর এক বছরের মাথায় উজান হল। আব্বায় নাম রাখতে চাইছিল ভাসানী। মালায় দেয় নাই। শখ করে মালা প্রথম পোলার নাম রাখল- উজান। বাঞ্ছারামপুরের এক উজানের কথা জানত শহীদুল-হিন্দু বাড়ির ছেলে ...গলায় ফাঁস দিসিল ...
সিপাহিরা একটা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। একজন দরজার পাল্লা খুলে ধরে। অন্যজন বলে, ভিতরে যাও। শহীদুল ভিতরে ঢোকে। বেশি বড় ঘর না। একটাই দরজা। ওপাশে জানালাগুলি বন্ধ। সিলিং থেকে ইলেকট্রিকের তার ঝুলে আছে । শেষ মাথায় একটা বালব জ্বলে আছে। রুমের মাঝখানে একটা টেবিল। এদিকে একটা টুল। টেবিলের ওধারে চারটা চেয়ার। একটা চেয়ার খালি। তিনটা চেয়ারে বাংলাদেশ সেনাবাহীনির তিন জন সদস্য বসে। টেবিলের ওপর ফাইল।
শেখ শহীদুল ইসলাম? জ্বী , স্যার। বস। শহীদুল টুলে বসল। বসতেই একজন অফিসার চিৎকার করে উঠল, বল, ২৫ তারিখ সকালে কোথায় ছিলি? শহীদুল ভীষণ কেঁপে ওঠে। আমি দরবার হলে ছিলাম স্যার । বল তুই কি জানিস? কারা ছিল বিদ্রোহের পিছনে? শহীদুল কী বলবে? ও কি জানে। ও বলল, আগের দিন রাত্রে শুনলাম জওয়ানরা তাদের দুঃখকষ্টের কথা পরের দিন দরবারে ডিজি সাহেবরে জানাবে। ডিজি সাহেবরে না শুনলে ...ডিজি সাহেবরে না শুনলে কী? শহীদুল কী বলতে যাবে-দরজায় নক করে ঘরে একজন ভদ্রলোক ঢুকলেন। লম্বা। ফরাসা। টাক মাথা, চশমা পরা, নীল রঙের সাফারি স্যুট পরা। কালো ব্রিফকেস। ওটা টেবিলের ওপর রেখে বললেন, সরি লেট হয়ে গেছে। ইটস অল রাইট স্যার।
খালি চেয়ারে বসতে বসতে ভদ্রলোক নরম সুরে জিজ্ঞেস করলেন, শাকিল সাহেবের কোয়ার্টারে গিয়েছিলে তুমি? না স্যার। আমি দরবার হলে ছিলাম। তারপর? তারপরে ...আমি পিছনের দিকে বসছিলাম। সাড়ে নয়টার দিকে মঞ্চের দিক থেকে প্রথমে গোলাগুলির আওয়াজ শুনি। যশোরের শফিকুল দেখি দৌড়ায়। আমি উইঠা তার পিছন পিছন দৌড় দেই। বাইরে আইসা দেখি জওয়ানরা অস্ত্র নিয়া দৌড়রাইয়া এদিকে আসতেছে। এদিকে মানে? দরবার হলের দিকে।
তারপর?
তারপর স্যার ...তারপর ... শহীদুলের শরীর ঘেমে গেছে। গলার কাছে ভীষন পানির তৃষ্ণা। মাথা টলছিল। বুকের বাঁ পাশে বিন্দু বিন্দু ব্যাথা।
হ্যাঁ বল, তারপর।
ডিজি সাহেবরে দেখলাম গাড়ির দিকে দৌড়ায় যাচ্ছেন।
তারপর ?
তারপর গুলির শব্দ স্যার। ডিজি সাহেব মাটিতে পড়ে গেলেন।
কারা গুলি করল?
বলতে পারি না। আমি ...
সত্যি কথা বল! একজন অফিস চিৎকার করে উঠলেন।
আহ্ মেজর শহীদুল। সেই সিভিল ড্রেস পরা ভদ্রলোক মৃদু ধমক দিলেন।
শহীদুল অবাক হয়ে যায়। মেজর স্যারের আমার নামে নাম। আমিও মেজর হইতে পারতাম। র‌্যাব হইতে পারতাম। র‌্যাবের নূর মোহাম্মদ ভাই এখন আমার শক্র হয়ে গেল? কেন?
ডিজি সাহেবরে গুলির করার সময় ডি এ ডি তৌহিদ কই ছিল?
বলতে পারি না স্যার।
বল তারপর? সেই সিভিল ড্রেস পরা ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন।
আমি ঘুইরা দৌড় দিব। তখন দেখি রাস্তায় এ্যাম্বুলেন্স আসতেছে।
এ্যাম্বুলেন্স ?
হ্যাঁ। স্যার এ্যাম্বুলেন্স ?
এ্যাম্বুলেন্সের ভিতরে কী ছিল?
বলতে পারি না সার। সত্য সার। বলতে পারি না। আমি তখন তিন নম্বর গেটের কাছে দৌড়ায় গেলাম। রকেট লাঞ্চার নিয়া বাগেরহাটের মোবারকরা দাঁড়ায় ছিল। আমি যাইতেই আমারে লাল পট্টি দিয়া বলল পরতে।
কারা দিল লাল পট্টি?
গোপালগঞ্জের মজিদ আর শ্যামপুরের ইব্রাহীম। গেটের কাছে টেলিভীষনের লোকজন আসল।
ঘটনা ঘটার আগের দিন রাত্রে ডি এ ডি তৌহিদ সাহেবরে দেখছিলা?
না। স্যার।
আচ্ছা, এইসব কথা বাদ । তুমি কি শাকিল সাহেবের কোয়ার্টারে গেছিলা?
না স্যার। আমি ৩ নম্বর গেইটের কাছে ছিলাম। নুরুল ইসলাম ভাইয়ের খোঁজে সেখানে গেছিলাম ।
কে?
নুরুল ইসলাম ভাই। চাঁদপুরের। ১৮ নম্বর ব্যাটলিয়নের সুবেদার। আমরা আগে একলগে রৌমারী সীমান্তে ছিলাম স্যার।
ও।
শহীদুলের শরীর ঘেমে গেছে। গলার কাছে ভীষন পানির তৃষ্ণা। দূর্বল কন্ঠে বলল, স্যার, আমার হার্টে সমস্যা আছে ...স্যার । আমারে সামান্য পানি দেন।
অফিসাররা তার কথা কানে নিল না। তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন। একজন মুখ তুলে বললেন, আচ্ছা, এর ইনিশিয়াল ইনফো চেক করেন তো।
একজন অফিসার অন্য একটা ফাইল টেনে নেন। ফাইলটা খুলে তারপর বলেন, এই তোমার দেশের বাড়ি কই?
নবীনগর স্যার ... নবীনগরের কাজলিয়া।
বাবার নাম।
মফিজ শেখ স্যার, আমারে একটু পানি দেন স্যার।
কত সালে বিডিআর-এ জয়েন করছ?
স্যার আমার হার্টে সমস্যা আছে ...স্যার ...আমারে ... স্যার, বিডিআরের বেতনে আমার সংসার চলে না ঠিকই-তাই বইলা মানুষ খুন? কী কইরা ভাবলেন ...স্যার আমি মফিজ শেখের পোলা ...স্যার আমার বিদেশ যাওয়া ঠিক ছিল স্যার... আব্বায় বললেন, ভিনদেশে যাইয়া কী হইব। দেশের জন্য কিছু কর বাবা। সীমান্তে যা। জান দিয়া দেশের মাটি আগলায় রাখ। আমার আব্বায় মাওলানা ভাসানীর মুরিদ ছিলেন স্যার ... মাওলানা ভাসানী স্যার ...স্যার, পানি ...









সর্বশেষ এডিট : ০১ লা অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ৮:২২
২২টি মন্তব্য ২২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×