
ক্রিসটিয়ান যোহান হাইনরীশ্ হাইনে। ছিলেন উনিশ শতকের প্রথমার্ধের নিখাদ গীতিকবি; -তাঁর সময়ের প্রতিভাবান সুর রচয়িতারা-যেমন- মেনডেলসন, শুবার্ট, শুমান প্রমূখ তাঁর লেখা গীতিকবিতায় সুর করেছেন ।
হাইনের জন্ম জার্মানির ডুসেলডর্ফ এক ইহুদি পরিবারে ১৭৯৭ সালের ১৩ ডিসেম্বর ।
বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। সে সময়টায় নেপোলিয়নের বাহিনী দ্বারা জার্মানি অধিকৃত ছিল-যাকে বলে ফ্রেঞ্চ অক্যুপেশন। নেপোলিয়নের উদার নীতির জন্যই ইহুদিদের জন্য সৃষ্টি হয়েছিল নতুন নতুন সুযোগ সুবিধা । তা সত্ত্বেও হাইনের বাবার ব্যাবসায় নামল ধস। কী আর করা। হাইনে রওনা হল হ্যামবুর্গ। ওখানে তার এক ধনী চাচার বাড়ি। তো, হাইনের সেই অরোম্যান্টিক ধনী চাচা জীবনে কী করে ভালো করে দাঁড়াতে হয় সে সম্বন্ধে বিস্তর উপদেশ দিলেন। রোম্যান্টিক হাইনে ওসব কানেই তুলল না- কেননা, তার তোলা জলে স্নান সয় না; সে জীবনের কেন্দ্রমূলে হাত দিবে। সে জন্য শিক্ষাও দরকার। কাজেই তরুন হাইনে পড়ার সিদ্ধান্ত নিল। বন, বার্লিন ও গোটিঙজেন (উচ্চারন কি হবে?-সব মিলিয়ে এই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন হাইনে । বিষয় ছিল আইন ও দর্শন । পরে অবশ্য আইন পড়া বাদ দিয়ে ছিলেন। নিরস বিষয় বলে? যা হোক । গোটিঙজেন বিশ্ববিদ্যালয়ে মহান দার্শনিক হেগেল ছিলেন হাইনের শিক্ষক । দুজনই নেপোলিয়নের ভারি ভক্ত ছিলেন।
যা হোক। ১৮২৫ এ পাস করে বেরুলেন হাইনে।
কবিতা তো লিখছিলেনই।
শিল্পসাহিত্যের আকর্ষনে প্যারিস এলেন। ১৮৩১ সালে।
প্যারিসেই হাইনের মৃত্যু ... ১৮৫৬ সালের ১৭ ফেব্র“য়ারি।
২
সম্প্রতি হাইনের একটি কবিতা পড়লাম।
কবিতার নামটি জার্মান (Buch Der Lieder: Lyrisches Intermezzo: ëIch glaub nicht an den Himmelí ) বলে বাংলায় দিতে পারছি না। আর খুব কঠিন নয় বলে বাংলা অনুবাদ আর করলাম না।
কবিতাটির ইংরেজি তর্জমা।
I don’t believe in Heaven,
Whose peace the preacher cites:
I only trust your eyes now,
They’re my heavenly lights.
I don’t believe in God above,
Who gets the preacher’s nod:
I only trust your heart now,
And have no other god.
I don’t believe in Devils,
In hell or hell’s black art:
I only trust your eyes now,
And your devil’s heart.
কবিতার শেষ লাইনটি রীতিমতো চমকে ওঠার মত।
And your devil’s heart.
প্রশংসা করে শেষে শয়তান বলার কি মানে? বললেন স্বর্গে বিশ্বাসকরি না ওসব করে পুরোহিতেরা আমি তোমার চোখে বিশ্বাস করি -ও দুচোখই স্বর্গের আলো। এরপর বললেন ...ঈশ্বরে আমি বিশ্বাস করিনা; ওসব বিশ্বাস করে পুরুতে। কেবলি আমি তোমার হৃদয়ে করি বিশ্বাস আর নেই আমার অন্যশ্বর। এরপর কবিটি বললেন, শয়তানে আমি বিশ্বাস করি না। কিংবা বিশ্বাস করি না নরকের কৃষ্ণকায় কৃত্যে। কেবলি আমি বিশ্বাস করি তোমার দুচোখে। এরপর কবিটি বোমা ফাটিয়ে বললেন-আর তোমার শয়তানসুলভ হৃদয়ে।
কেন বললেন
I only trust your eyes now,
And your devil’s heart.
কেন হাইনে এরকম দুটো লাইন লিখলেন?
ভাবছি আর ভাবছি।
ভাবছি হাইনে ছিলেন উনিশ শতকের প্রথমার্ধের নিখাদ গীতিকবি; -তাঁর সময়ের প্রতিভাবান সুর রচয়িতারা-যেমন- মেনডেলসন, শুবার্ট, শুমান প্রমূখ তাঁর লেখা গীতিকবিতায় সুর করেছেন ।
কিন্তু, এ কেমন গান?
হয়তো তাঁর লেখা সব গান এরকম নয়।
হাইনে কি সমকামী ছিলেন?
জানি না।
তা হলে ধরে নিচ্ছি গানটা কোনও নারীর উদ্দেশ্যে লেখা। যাকে ভালোবাসেন ...অথচ ...সেই মেয়েটির হৃদয়কে বলছেন শয়তান শয়তান। নারীবিদ্বেষ বিরল নয় জীবনে ও সাহিত্যে। বাংলাদেশেও ছলনাময়ী নারীহৃদয় নিয়ে গান হয়েছে -
এক হৃদয়হীনার কাছে হৃদয়ের দাম কি আছে
সে আছে নিজকে নিয়ে ...(সুরকার আলাউদ্দীন আলী)
এ গানে আগাগোড়া অভিমান। বিদ্বেষ নয়। বাংলা গান বলেই। একটি (বাংলা) অল্টারনেটিভ রক গানের দুটি লাইন এরকম-
দুজনকে মনে হয় দু-গ্রহের
তোমার জীবনের স্রোত ভীষন পৃথক ...(ব্যান্ডের নাম: ব্ল্যাক)
এ গানে আগাগোড়া অভিমান। বিদ্বেষ নয়। বাংলা গান বলেই? বা আমরা তো বেলা বোসকে নিয়ে অঞ্জন দত্তের সেই হৃদয়বিদারক গানটির কথা জানি-
চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছ?
প্রেমহীনতার কথাও বাংলা গানে আছে। সুবীর নন্দীর গাওয়া সেই প্যাথেটিক গানটির কথার মনে করি-
হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে / একটি কথাইআমি শুধু জেনেছি আমি
পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই / প্রেম বলে কিছু নেই ...
তবে যে যাইই বলুক। বাঙালীর শেষ কথা সুবীর নন্দীরই একটি গানে প্রকাশ পেয়েছে-
আমার এ দুটি চোখ / পাথর তো নয়
তবে কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়
কখনও নদীর মতো তোমার পথের পানে বয়ে বয়ে যায় ...
এই যে -তোমার পথের পানে বয়ে বয়ে যায় ...এই হল বাঙালি ছেলের মনে কথা। সেখানে অভিমান থাকলেও বিদ্বেষ নেই; বিদ্বেষ থাকতে পারে না।
কিন্তু, হাইনে? ঈশ্বর স্বর্গ সব অস্বীকার করলেন ...তারপর ?
ভাবছি আর ভাবছি।
এত প্রশংসা করে শেষ লাইনে এসে মেয়েটির প্রতি ঘৃনা প্রকাশ কেন করলেন হাইনে?
কে ছিল সেই মেয়েটি?
এখানে হাইনের কবিতার বইটি পাবেন-
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মার্চ, ২০১২ সকাল ৮:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



