somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মোৎসার্ট, মোৎসার্ট...

১৬ ই জুলাই, ২০০৯ দুপুর ১:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ইয়োহানেস ক্রিসসটোমাস উলফগ্যাঙ গোতিলেব মোৎসার্ট। প্রতিভাবান ইউরোপীয় সুরস্রষ্টাদের মধ্যে যাঁর আসন অন্যতম সারিতে - অল্প বয়েসেই যিনি দেখিয়েছেন প্রতিভার বিস্ময়কর ঝলক। যাঁর সময়কালে সারা ইউরোপ নিমগ্ন হয়েছিল যাদুকরী সুরের মূর্চ্ছনায় ...

আমি যে সময়টার কথা বলছি, সেই অস্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়টায় ইউরোপে ইতালিকেন্দ্রিক পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অস্ত যায়নি। কার্যত অস্ট্রিয়া ছিল পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যেরেই অংশ। (নিচে মানচিত্র দেখুন) অস্ট্রিয়ার তদানীন্তন নাম ছিল আর্কবিসহপরিক । আর্কবিসহপরিক ছিল পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অংশ হলেও ছিল কার্যত স্বাধীন।
সেই আর্কবিসহপরিক এরই রাজধানী ছিল সালঝবুর্গ ।



মানচিত্রে সে সময়কার অস্ট্রিয়া ও সালঝবুর্গ

সালঝবুর্গ- এর শহরটির পুরনো অংশে রয়েছে গেটরিডগাসে ( গ্রেইন লেন নামেও পরিচিত)নামে একটি ব্যস্ততম রাস্তা। রাস্তার দুপাশে দোকানপাট। এখানেই ৯ নং বাড়িতে মোৎসার্ট ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি জন্মগ্রহন করেন । মা আনা মারিয়া পারটেল; আনা মারিয়া পারটেল-এর বাবার নাম ছিল ইয়োহানেস ক্রিসসটোমাস উলফগ্যাঙগাস গোতিলেব মোৎসার্ট। বাবার নামেই ছেলের নাম রাখলেন আনা মারিয়া পারটেল। মোৎসার্ট-এর নামের ব্যাপারে আরও মজার একটি ব্যাপার আছে। ইয়োহানেস ক্রাইসসটোমাস নামে এক বিখ্যাত সাধুর জন্ম ২৭ জানুয়ারি। কাজেই, ইয়োহানেস ক্রাইসসটোমাস শব্দ দুটিও যুক্ত হল।



সালঝবুর্গ শহরের গেটরিডগাসে; কখনও ওখানে গেলে ৯নং বাড়িটা খুঁজবেন আশা করি ...

মোৎসার্ট-এর বাবার নাম লেওপোল্ড মোৎসার্ট। লেওপোল্ড মোৎসার্ট ছিলেন সংগীতজ্ঞ -সালঝবুর্গ রাজদরবারের সহকারী কনসার্টমাস্টার; বেহালা বাজাতেন। লেওপোল্ড মোৎসার্ট সংগীতজ্ঞ হলেও ছিলেন বিষয়ী। যাক। মোৎসার্ট-এর পরিবেশে ছিল গান। মোৎসার্ট-এর বড় বোনের নাম ছিল মারিয়া আনা নাননেরল। আনাও ছিল বেহালা ও পিয়ানোয় ব্যাপক প্রতিভাময়ী। মোৎসার্ট-এর ছেলেবেলাতেই ছিল সংগীতের প্রতি টান; আর ছিল স্পর্শকাতর স্নায়ূ । ছেলেবেলায় নাকি ট্রাম্পেটের আওয়াজ শুনে মূর্চ্ছা গিয়েছিল মোৎসার্ট যাক। লোকে বলে-মাত্র ৫ বছর বয়েসেই নাকি ছোট ছোট সুন্দর সুন্দর সুর তৈরি করেছিল মোৎসার্ট।
লেওপোল্ড মোৎসার্ট ঠিকই টের পেলেন তাঁর সন্তানদের শিশুপ্রতিভা। তখন আমি বলেছি
লেওপোল্ড মোৎসার্ট গানবাজনার লোক হলেও ছিলেন বিষয়ী। তাঁর প্রতিভাবান শিশুদের জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্য উঠে পড়ে লাগলেন তিনি।
সময়টা ১৭৬৩ সালের মাঝামাঝি।
মোৎসার্ট- এর বয়স তখন ৬। ছেলেমেয়েকে নিয়ে ট্যুরে বেরুলেন লেওপোল্ড। লন্ডনে গেলেন, গেলেন প্যারিস। মোৎসার্ট আর মারিয়া আনা ওখানকার রাজদরবারে বাজাল ভায়োলিন বাজাল পিয়ানো । বড় বড় ইউরোপীয় শহরে ছেলেমেয়েকে নিয়ে ঘুরে বেড়ালেন লেওপোল্ড।। কত কত মিউজিশিয়ানের সঙ্গে ওদের জানাশোনা হল। রাজকীংয় পরিবারের সামনেও বাজাল আনা ও মোৎসার্ট-বিশেষ করে অস্ট্রিয়ার সাম্রাজ্ঞী তো মুগ্ধ। মুগ্ধ অন্যরাও। এ প্রসঙ্গে মোৎসার্ট-এর জীবনীকার লিখেছেন- Wolfgangus and his sister played piano and violin and were more than successful to tie their audiences to the chairs.
এর পরপরই প্রথম সিরিয়াস কম্পোজিশন করলেন মোৎসার্ট। বয়স ৯ হলে সিম্ফোনি লিখতে আরম্ভ করলেন। ইউরোপময় তার সংগীতের চাহিদা বাড়তে লাগল। ১৭৬৩ সালের ট্যুরের ৯ মাস পর গেলেন ভিয়েনা। যা হোক। সেবার অপেরায় কী কারণে বাজাতে পারেনি।
(বার বার ৯ সংখ্যাটি আসছে কেন? এ কি কাকতালীয়? তখন আমি বলেছি সালঝবুর্গ শহরের গেটরিডগাসে -এর ৯ নং বাড়িতে ২৭ জানুয়ারি ১৭৫৬ সালে মোৎসার্ট জন্মগ্রহন করেন। নিউমারোলজি প্রয়োগ করি। মোৎসার্ট-এর জন্মতারিখ ২৭ জানুয়ারি। ২৭ সংখ্যাটি যোগ করি। ২+৭=৯; কী ব্যাপার? বার বার ৯ সংখ্যাটি ঘুরে ঘুরে আসছে কেন? এবং এই অংশটি এই পোস্টের ফানপোস্ট। )

(আর, লক্ষ করুন, এখন থেকে মোৎসার্ট-এর বড় বোন মারিয়া আনা নাননেরল ইতিহাসের বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে গায়েব হয়ে যাবে। )

ভিয়েনা থেকে ফিরে মোৎসার্ট গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত হল। শুধু ট্যুর করলেই হল! শিখতে হবে না? শেখার কি শেষ আছে? এইসব ভেবে ১৭৭০ অবধি আর কোনও নতুন সফরে বেরুলেন না। পরের ৩ বছর তিনবার ইতালি গেলেন। ওানকার সংগীতপ্রেমিদের দারুণ মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখলেন। ইতালিয় ধারাও গ্রহন করলেন নিজস্ব রচনাশৈলীতে।
১৭৭৪ থেকে ১৭৭৭ সময়কালে মোৎসার্ট প্রিন্স আর্চবিশপের দরবারে কনসার্ট মাস্টার ছিলেন। পিয়ানো ও ভায়োলিন বাজাতেন। আর ম্যাস। ম্যাস হল খ্রিস্টীয় প্রার্থনাসংগীত।
১৭৭৫ সালে গেলেন মিউনিখ। সেখানে পরিচালনা করলেন অপেরা ।
সালঝবুর্গ আসলে ইউরোপের তুলনায় মফস্বল অঞ্চল। ওখানে থাকলে বেশি কিছু হবে না। কাজেই ১৭৭৭ সালে মোৎসার্ট রওনা হলেন মিউনিখ। সঙ্গে মা; তবে ওখানে মনোমত পদ পেলেন না। মনক্ষুন্ন হয়ে প্যারিস গেলেন । জীবন বাঁক নিতে শুরু করল। প্যারিসে মা মারা গেলেন। মনে থাকার কথা- মোৎসার্ট -এর মায়ের নাম আনা মারিয়া পারটেল। আনা মারিয়া পারটেল-এর বাবার নাম ছিল ইয়োহানেস ক্রিসসটোমাস উলফগ্যাঙগাস গোতিলেব মোৎসার্ট। বাবার নামেই ছেলের নাম রাখলেন আনা মারিয়া পারটেল। মোৎসার্ট-এর নামের ব্যাপারে আরও মজার একটি ব্যাপার আছে। ইয়োহানেস ক্রাইসসটোমাস নামে এক বিখ্যাত সাধুর জন্ম ২৭ জানুয়ারি। যাক। মোৎসার্ট দারুন একা হয়ে গেলেন। (কুম্ভরাশির এই হয়-হঠাৎ হঠাৎই দারুন একা হয়ে যায় কুম্ভরা। ২৭ জানুয়ারি জন্ম বলেই মোৎসার্ট কুম্ভ। আমাদের সময়ের এক বিশাল গানপ্রতিভার জন্মও ২৭ জানুয়ারি; কে? অর্ণব। অর্ণব কোথায় আলাদা আমরা জানি। ব্লগার শূন্য আরণ্যকের প্রফাইলের অর্ণবের গানের কথা ... সাধু ইয়োহানেস ক্রাইসসটোমাসও কুম্ভ রাশি। অর্ণব-এর মধ্যেও কেমন একটা সাধু সাধু ভাব আছে না? যা আমার ভালো লাগে ...)
যাক। প্যারিসেও মনের মত পদ পেলেন না মোৎসার্ট । তখন বিষয়ী বাবা বললেন, সালঝবুর্গ ফিরে আয় বাছা। এখানে তোর জন্য বড় পদ ঠিক করেছি।
পরের দু-বছর কাটল রাজদরবার ও গীর্জেয় কনসার্ট করে...সেরেনাদ কম্পোজ করে ...নাটকের জন্য সংগীত সংযোজনা করে। সিম্ফোনি তো লিখছিলেনই।
১৭৮০ তে ডাক পেলেন মিউনিখে অপেরার জন্য ।
এর পর ভিয়েনায়।
রাজদরবার ও গীর্জে এড়িয়েও মোৎসার্ট জনগনের কাছে গিয়ে অর্কেস্ট্রা পরিচালনা করেছেন।
তা জনগন কেমন সাড়া দিত?
মোৎসার্ট -এর মাত্র একটি কম্পোজিশ শুনলেই বোঝা যাবে মোৎসার্ট কেন আজও প্রাতস্মরণীয়?




সিম্ফোনি নং ৪০ ইন জি মাইনর।

আলোইশিয়া ভেবার নামে একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতেন মোৎসার্ট। কী কারণে ওর সঙ্গে মোৎসার্ট এর বিয়ে হয়নি। ১৭৮২ সালে বিয়ে করলেন আলোইশিয়া ভেবার এরই ছোট বোন কনসটানজে ভেবারকে।
যা হোক। কেবল সিম্ফনি নয়-বেহালা আর পিয়ানোর জন্য সোনাটা লিখে দারুন খ্যাতি পেলেন মোৎসার্ট। কোয়ারটেটস (চারটি যন্ত্রের একত্র বাজনা) লিখলেন; লিখে হেইডেনকে উৎসর্গ করলেন। (হেইডেন ছিলেন সেকালের একজন বিখ্যাত কম্পোজার)... হেইডেনকে উৎসর্গ করার কারণ? হেইডেন মোৎসার্ট-এর প্রতিভার প্রশংসা করেছিলেন।
যাই হোক। মোৎসার্ট-এর জীবনীকার লিখছেন: Mozart earned enough to live a comfortable life, but because of his improper management of money and expenses, he was never able to save money for future and always had to borrow from others when was in need of money. (কুম্ভ রাশিই বটে!)
যাই হোক। মোৎসার্ট-এর শেষ জীবন কেটেছে ভিয়েনায়। এই সময় নানা জায়গায় গিয়েছেন। বার্লিন। সেলঝবুর্গ। অপেরা আর কনসার্র্ট করে কেটেছিল জীবনের শেষ দিনগুলি। রিউমেটিক ফিভারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ১৭৯১ সালে ৫ ডিসেম্বর। ভিয়েনায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। কেউ কেউ বলে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয়েছিল মোৎসার্ট-এর ।
কে বিষ দিল?
সেসব আর জানা যাবে না!
আজও অমর হয়ে রয়েছেন মোৎসার্ট-যতটা না তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের জন্য-তারচে বেশি তাঁর সুরের জন্য।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা অক্টোবর, ২০০৯ রাত ৯:১১
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×