somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হিট্টি সভ্যতা

০৯ ই আগস্ট, ২০০৯ বিকাল ৩:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ইতিহাস পড়তে গেলে প্রায়ই Hittites শব্দটা পাই। তো, কি এর মানে? হিট্টি একটা জাতি বা সভ্যতার নাম। তো, কারা হিট্টি?



আনাতোলিয়া

তুরস্ক দেশটা ইউরোপ ও এশিয়ায় ছড়ানো। তুরস্কের এশিয় অংশই আনাতোলিয়া নামে পরিচিত। হিট্টিরা যিশুর জন্মের ২০০০ বছর আগে সেই আনাতোলিয়াতেই গড়ে তুলেছিল এক অতুলনীয় সভ্যতা। হিট্টিদের সভ্যতাকে অতুলনীয় কেন বললাম? কারণ, ওরাই সভ্যতায় প্রথম ন্যায়বিচার চালু করেছিল; ব্যবহার করতে শিখিয়েছিল লোহা!



হিট্টি প্রতীক (লোহার কাজ)

হিট্টিরা কথা বলত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায়। তবে ওরা কোত্থেকে আনাতোলিয়ায় এসেছিল-সেসব ইতিহাস অনেক চেস্টা করেও আজ অবধি জানা যায়নি।



হিট্টি সভ্যতার চিহ্ন



হিট্টি সাম্রাজ্য



হিট্টিদের দেবতা অথবা রাজা

হিট্টি শব্দটা হিব্রু ভাষার বাইবেলে আছে। ওল্ড টেস্টামেন্টে শব্দটার অর্থ অবশ্য ‘হিটটিম’। ওখানে বলা হয়েছে হিটটিমরা -‘হেত এর সন্তান।’ কেনান এর সন্তান ছিলেন হেত । আমরা জানি হিব্রুভাষীরা প্রাচীন কেনান প্রদেশে বাস করত। হযরত ইব্রাহীম মেসোপটেমিয়ার উর (বা উরুক) নগর থেকেই তো ঈশ্বরের নির্দেশে কেনান দেশে গিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে তা হলে কি দাঁড়াল?



ঘোড়া।

সময়টা যিশুর জন্মের ১৯০০ বছর আগে। সে সময় হিট্টি আনাতোলিয়ায় প্রবেশ করে। তো সেই সময় আনাতোলিয়ায় যে সব জাতি বাস করত তারা কথা বলত অ-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায়। হিট্টিরা তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রাস করে নেয়।



আনাতোলিয়ার মানচিত্রে কায়সেরি

হিট্টিরা প্রথম বসতি গড়ে তুলেছিল নেসা। জায়গাটা বর্তমানে আনাতোলিয়ার কায়সেরিতে। এরপর হাট্টুসাস - এ সাম্রাজ্য স্থাপন করে।
হিট্টিদের প্রথম দিককার প্রভাবশালী সম্রাট ছিলেন লাবরানা। সময়কাল ১৬৮০ থেকে ১৬৫০ খ্রিস্টপূর্ব। তাঁর সময়ে হিট্টিদের রাজধানী হাট্টুসাস। সম্রাট লাবরানা সমগ্র আনাতোলিয়া জয় করেন; এবং তাঁর বংশধরেরা উত্তর সিরিয়া দখল করার পর ব্যাবিলন আক্রমন করে (১৫৯৫)



সাপপিলুলিউমা

সাপপিলুলিউমা ছিলেন হিট্টিদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট। তাঁর সময়কাল: ১৩৮০/১৩৪৬ খ্রিস্টপূর্ব। সম্রাট সাপপিলুলিউমা বিদেশি আক্রমন ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন। কেবল তাই নয়। তিনি উত্তর মেসোপটেমিয়া ও সিরিয়া জয় করেছিলেন। এভাবে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলে হিট্টিরা হয়ে উঠেছিল মিশর, ব্যাবিলন ও আসেরিয়ার সমকক্ষ। যে সাম্রাজ্য সম্রাট সাপপিলুলিউমার মৃত্যুর পরও টিকে ছিল। অবশ্য নিরন্তর যুদ্ধ করে করে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ ও চর্তুদশ শতকে এজিয়ান অবধি ছড়িয়ে ছিল হিট্টি সাম্রাজ্য। পুবে আর্মেনিয়া, দক্ষিণপুবে মেসোপটেমিয়ার উধ্বাংশ আর দক্ষিণে এখনকার সিরিয়া ও লেবানন।



হিট্টি সাম্রাজ্য

হিট্টি সভ্যতা আলোচনা প্রসঙ্গে প্রাচীন মিশরের প্রসঙ্গ অনিবার্য। হিট্টিদের উন্নতির শীর্ষে প্রাচীন মিশরের সম্রাট ছিলেন চতুর্থ আমোনহাটপ। সম্রাট চতুর্থ আমোনহাটপ এরই অন্য নাম সম্রাট আখেনাতন। এভাবে না চেনা না গেলে বলি: সম্রাট আখেনাতন ছিলেন সুন্দরী নেফারতিতির স্বামী। যা হোক। মিশর এর সঙ্গে হিট্টিদের সংঘর্ষ হয়ে ওঠে অনিবার্য। সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। সংগঠিত হয় খাদেসের যুদ্ধ। (১৩১৫/১২৯৬) তখন মিশরের সম্রাট ২য় রামেসিস ।




খাদেস




খাদেসের যুদ্ধ।



খাদেসের যুদ্ধে রথ এর ব্যবহার ছিল উল্লেখ করার মত। খাদেসের যুদ্ধের পর রামেসেস নিজেকে জয়ী মনে করলেও হিট্টিরাই সিরিয়া নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। পরে অবশ্য মিশরের সাথে হিট্টিদের সন্ধি হয় ।



হিট্টি রথ। এ কালের শিল্পীর চোখে

হিট্টি সভ্যতার পতন হয় ১২০০ খ্রিস্টপূর্বে। মিশরীয় লেখনিতে হিট্টিদের পতনের কারণ বলা হয়েছে: সমুদ্রমানুষ এর আগ্রাসন। তো, কারা এই সমুদ্রমানুষ?



হিট্টিদের নিয়ে তৈরি কোনও ছবির বিজ্ঞাপনচিত্র

হিট্টিদের সমাজে রাজাই ছিলেন পুরোহিত, সামরিক সেনাপতি ও প্রধান বিচারক। প্রথম প্রথম রাজার উপদেষ্টা পরিষদও ছিল। পরে উপদেষ্টা পরিষদ বিলুপ্ত করা হয়। প্রাদেশিক শাসকরা ছিল রাজার প্রতিনিধি। সীমান্তের বাইরের রাজ্যগুলি ছিল করদ। সন্ধিচুক্তি করত তারা।



আনাতোলিয়ায় হিট্টি ধ্বংসাবশেষ

মানবসভ্যতায় সহনশীল বিচারব্যবস্থাই হিট্টিদের বিশিষ্ট অবদান। অবশ্য তাতে ব্যাবিলনের প্রভাব ছিল। তবে, ব্যবলনীয় রুক্ষ বিচারব্যবস্থার তুলনায় হিট্টি বিচারব্যবস্থা যথেস্ট নমনীয় ছিল । অপরাধীর মৃত্যুদন্ড কি শরীর বিক্ষত করার চল ছিলই না- যা ছিল ওই সময়কার অন্যান্য সভ্যতার স্বাভাবিক আইন। হিট্টিদের বিচারব্যস্থা ছিল ক্ষতিপূরণের ওপর ভিত্তি করে প্রতিশোধের ওপর নয়। চৌর্যবৃত্তির দন্ড হল চুরি করা দ্রব্যাদি ফিরিয়ে দেওয়া। ক্ষতিপূরণ নগদ অর্থেও দেওয়া যেত।



হিট্টিসমাজের ভিত্তি ছিল কৃষিকাজ। কি কি চাষ করত হিট্টিরা? এই ধরেন গম ও বার্লি। পালত ভেড়া- ষাঁড়-গরু ও বলদ। হিট্টিদের আরেকটি বিশিষ্ট দিক হচ্ছে পাহাড় চূর্ণ করা! তার মানে, সেই ৪/৫ হাজার বছর আগেই তারা খনিজ আকরিকের খোঁজে পাহাড়ে খনি কেটেছে। উত্তোলন করেছে তামা, সীসা, রুপা ও লোহা। কাজেই ধাতুবিদ্যায় তৎকালীন অন্যান্য সভ্যতার চেয়ে অগ্রসর ছিল তারা। হিট্টিরাই সম্ভবত সভ্যতায় প্রথম লোহার ব্যবহার করে।



হিট্টিরা ছিল বহু দেবতায় বিশ্বাসী। ওদের ধর্মচর্চা মৌলিক ছিল না। হিট্টিদের ধর্মবিশ্বাসে সুমের, ব্যাবিলন, আসুর সভ্যতার প্রভাব ছিল। তারা অন্যদের মতই প্রচুর দেবদেবীর মূর্তি গড়েছিল। হিট্টিদের অন্যতম দেবদেবী ছিল ঝড়ের দেবতা ও সূর্যদেবী।

সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা অক্টোবর, ২০০৯ বিকাল ৫:১৭
১৮টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×