হানিবল (খ্রিস্টপূর্ব ২৪৭-১৮৩) : প্রাচীন কার্থেজিয় বীর: যার সামরিক কলাকৌশল আর উদ্ভাবনী শক্তি আজও সমর বিশেষজ্ঞদের বিস্ময়ের সৃষ্টি করে, যার আগ্রাসী রোম অভিযান আজও ইউরোপের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। রণহস্তি নিয়ে স্পেন থেকে যাত্রা করে আল্পস্ পর্বতমালা পেরিয়ে হানিবলের রোম অভিযান ( খ্রিস্টপূর্ব ২১৮-২১১) বিশ্বেরর সামরিক ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়। যাই হোক, রোমের বিরাগ ভাজন হয়ে শেষরক্ষা হয়নি তাঁর -হানিবলকে বিষ খেতে হয়েছিল ...
ভূমধ্যসাগরের পূর্বতীরের এখন যে জায়গাটি সিরিয়া ও লেবানন - খ্রিস্টপূর্ব সময়ে সেখানেই গড়ে উঠেছিল এক অভূতপূর্ব সমৃদ্ধশালী সভ্যতা-ফিনিসিয় সভ্যতা। প্রচীনকালের অন্যতম সভ্যতা ছিল ফিনিসিয় সভ্যতা। কেবল ভূমধ্যসাগরের পূর্বতীরই নয়-উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনেও ফিনিশিয় উপনিবেশ ছিল। তার মধ্যে কার্থেজ অন্যতম। প্রাচীন কার্থেজ নগরের অবস্থান ছিল বর্তমান তিউনিশিয়ার রাজধানী তিউনিস-এর কাছে। কথিত আছে, কার্থেজ নগরীটি পত্তন করেছিলেন ডিডো। ডিডো ছিলেন কার্থেজের এক রাণী। নবম শতাব্দীর শেষে ফিনিশিয় বানিজ্যকুঠি হিসেবে প্রথম কার্থেজ গড়ে উঠেছিল। কার্থেজের দুটি বন্দর ছিল। আর ছিল খাল। পাহাড়।ও পাহাড়ের ওপর দূর্গ।
প্রাচীন মানচিত্রে কার্থেজের অবস্থান
কার্থেজ নগর
খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতকে রোম তার সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটাচ্ছিল। সমৃদ্ধশালী নগর কার্থেজ রোমের ইর্ষার কারণ হয়ে পড়েছিল। কার্থেজিয় জনগনের ছিল রোমের প্রতি ভীতি ও ঘৃনা। হানিবল ছিলেন কার্থেজের বীর সেনাপতি। তাঁরও ছিল রোমের প্রতি অশেষ ঘৃণা।
হানিবলের বাবার নাম হামিল কার বার্কা। হানিবলের অন্য দু ভাইয়ের নাম হাসদ্রুবাল ও মিগো। হাসদ্রুবাল দ্যা ফেয়ার ছিলেন হানিবলের ভগ্নিপতি। এরা সবাই কার্থেজিয় অভিজাত পরিবারের সদস্য ।
কার্থেজ নগর
কার্থেজ নগর; শিল্পীর কল্পনায় ...
হানিবল এর বয়স তখন ৯। কার্থেজের কর্তৃপক্ষেরে নির্দেশে হানিবলের বাবা সেনাপতি হামিল কার বার্কা স্পেন অভিযান শুরু হয় করেন। সেনাপতি হামিল কার বার্কার যোগ্য নেতৃত্বে সমগ্র আইবেরিয় উপদ্বীপটি (হানিবল ইউরোপের দক্ষিণপশ্চিম উপদ্বীপ। স্পেন ও পতুর্গালের মধ্যে বিভক্ত। একত্রে বলা হয় জিবরালটার। ) কার্থেজের নিয়ন্ত্রনে চলে আসে। হানিবল এর বয়স যখন ২৫। কথিত আছে, স্পেনের বার্সেলোনা শহরটি ভিত্তিও হামিল কার বার্কা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ২২৮ খ্রিস্টপূর্বে এক অবরোধের সময় হামিল কার বার্কা পানিতে ডুবে মারা যান।
হামিল কার বার্কার মৃত্যুর পর স্পেন অভিযানের নেতৃত্ব গ্রহন করেন হানিবল-এর ভগ্নিপতি হাসদ্রুবাল দ্যা ফেয়ার। যা হয়। ২২১ খ্রিস্টপূর্ব। হাসদ্রুবাল শক্রপক্ষে বিক্ষিপ্ত তীরের আঘাতে হাসদ্রুবাল দ্যা ফেয়ার নিহত হন।
কার্থেজিও সৈন্যরা হানিবলকে সেনাপতি নির্বাচিত করে।
এর মাত্র ২ বছরের মধ্যে হানিবল সমগ্র স্পেন অধিকার করেন। স্পেনের সাগানটাম নগরটি ছিল রোমান শাসিত। নগরটি প্রায় ১৮ মাস অবরোধ করে হানিবল অধিকার করে নেন। রোম এতে ক্রোধে ফেটে পড়ে । হানিবলকে আত্মসমর্পরন করতে বলে। হানিবল হেসে উড়িয়ে দিলেন। রোম যুদ্ধ ঘোষনা করে। এটিই ইউরোপের ইতিহাসে ২য় পিউনিক যুদ্ধ নামে পরিচিত। যুদ্ধের নাম পিউনিক হওয়ার কারণ? রোমানরা কার্থেজিওকে বলত পিউনি। পিউনিক যুদ্ধ মানে পিউনিদের সঙ্গে যুদ্ধ।
প্রথম পিউনিক যুদ্ধের সময়কাল ছিল ২৬৪-২৪১ খ্রিস্টপূর্ব। সে যুদ্ধের মূলে ছিল রোম ও কার্থেজের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিরোধ। সে সময়টায় সিসিলি দ্বীপের অংশ বিশেষ ছিল কার্থেজের দখলে। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগে রোম সিসিলিতে সৈন্য পাঠায়; উদ্দেশ্য কার্থেজিয় নিয়ন্ত্রণকে অকার্যকর করা। সিসিলিতে কার্থেজিয় বাহিনীর প্রধান ছিলেন হানিবলের বাবা হামিল কার বার্কা। অসাধারণ যোদ্ধা ছিলেন। তিনি অমিত বিক্রমে সিসিলির মারসালা থেকে রোমান সৈন্যদের বিতাড়িত করেন। ২৫৬ খ্রিস্টপূর্বে রোমান সেনাপতি মারকাস আটিলিউয়াস রেগুলাস উত্তর আফ্রিকায় রোমান সৈন্যবাহিনীর একটি শিবির স্থাপন। পরের বছরই কার্থেজ ঐ শিবিরটি ধ্বংস করে। পরের ১৩ বছর ধরে সিসিলিকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ২৪১ খ্রিস্টপূর্বে রোমানরা নৌযুদ্ধে বিজয়ী হয় । সিসিলিতে রোমের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়। সার্ডিনিয়া ও কর্সিকা-এই দ্বীপ দুটি ছিল কার্থেজের। দ্বীপদুটিও রোমের হস্তগত হয়।
হানিবল ছেলেবেলায় শুনেছেন এসব পরাজয়ের করুণ কাহিনী।
প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সে মরিয়া হয়ে উঠেছিল।
এর আগে রোমের সঙ্গে কার্থেজের যুদ্ধগুলি ছিল প্রধানত নৌযুদ্ধ। নৌযুদ্ধে রোমানদের শক্তি অসীম।
হানিবল স্থলযুদ্ধের পরিকল্পনা করেন। তিনি আল্পস পবর্তমালা পেরিয়ে রোম সাম্রাজ্য আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেন।
হানিবলের যাত্রাপথ
২১৮ খ্রিস্টপূর্ব। হানিবলের নেতৃত্বে স্পেন থেকে কার্থেজবাহিনীর যাত্রা হল শুরু। কার্থেজিয় বাহিনীতে ছিল প্রায় ৪০,০০০ সৈন্য । পদাতিক সৈন্য ছাড়াও ছিল রণহস্তি। হাতিরা মালামাল বহন করছিল । পরে অবশ্য হাতি যুদ্ধেও অবতীর্ণ হয়।
তুষার ঝড় ভূমিধ্বস উপেক্ষা করে মাত্র ১৫ দিনে হানিবল পিরানিজ পবর্তমালা এবং রোহণ নদী পার হলেন। । প্রাকৃতিক দুযোগ ছাড়াও কার্থেজিয় বাহিনীর ওপর ছিল বিক্ষুব্দ পাহাড়ি গোত্রের চোরাগোপ্তা আক্রমন। বিপদশঙ্কুল যাত্রাপথে ১৫ হাজার কার্থেজিয় সৈন্য মারা গেল। অবশ্য ইনসুব্রি নামে উত্তর ইতালির একটি বন্ধুভাবাপন্ন গোত্র হানিবলকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করে। বিনিময়ে হানিবল টাওরিনি গোত্র দমন করলেন। কেননা, টাওরিনি গোত্র ছিল ইনসুব্রিদের শক্র । টাওরিনি গোত্র ছাড়াও অন্যান্য গোত্রর বশ্যতা আদায় করেন হানিবল ।
২১৮ খ্রিস্টপূর্ব। প্রথমবারের মতো রোমানদের মুখোমুখি হলেন হানিবল। তিসিনাস ও ট্রিবিয়ায় দুটি যুদ্ধ সংঘটিত হল। রোমানদের অধিনায়ক ছিলেন স্কিপিও আফ্রিকানুস দ্য এ্যালডার। তাঁর বাহিনীকে হানিবল নিশ্চিহ্ন করলেও স্কিপিও আফ্রিকানুস দ্য এ্যালডার প্রাণে বেঁচে যান। এরা দুজন উত্তর আফ্রিকার জামায় আবার মুখোমুখি হয়েছিল।
যাক। পরের বছর ট্রাসিমেন হ্রদ -এর কাছে রোমান কনসাল গাইউস ফ্লামিনিউসকে হানিবল পরাজিত করেন। এই জয়ের পর হানিবল রোমের আপুলিয়া প্রদেশে প্রবেশ করে দখল করে নেন। এরপর ক্যাম্পানিয়া অঞ্চলটি তছনছ করেন।
হানিবলকে রোধ করার জন্য এবার রোমান জেনারেল কুইনটাস ফাবিয়াস ম্যাক্সিমাস ভেররুকোসাস কুন্টটাটোরকে পাঠানো হল। রোমানরা এবার সতর্ক হয়েই সমর পরিকল্পনা নিয়েছিল; যেমন বড় কোনও যুদ্ধে কার্থেজের মুখোমুখি না হওয়া। এভাবে কার্থেজ বাহিনীকে ঠেকিয়ে রাখতে পেরেছিলেন রোমান জেনারেল কুইনটাস ফাবিয়াস ম্যাক্সিমাস ভেররুকোসাস কুন্টটাটোর । রোমানরাও এই সুযোগে হারানো শক্তি পুনুরুদ্ধার করে নিয়েছিল।
যা হোক। হানিবল শীতকালটি কাটান ইতালির জেরোনটিয়াম এ। ২১৬ খিস্টপূর্বের বসন্তে দক্ষিণ-পূর্ব ইতালির ওফানটো নদীর তীরে কান-এ রোমান সেনাপতি লুসিয়াস অ্যামেলিউস পাউলাস-এর নেতৃত্বে প্রায় ৫০,০০০ রোমান সৈন্য সমাবেশ করে। এক তুমুল যুদ্ধের পর হানিবলের নেতৃত্বে কার্থেজিয় বাহিনী
রোমানদের পরাজিত করেন। রোমান সেনাপতি লুসিয়াস অ্যামেলিউস পাউলাস নিহত হন। আরেক সেনাপতি -গাইয়য়ুস টেরেনটিনাস ভাররো পালিয়ে যান। কান যুদ্ধে মাত্র ৬০০০ কার্থেজিয় সৈন্য মারা যান।
কান যুদ্ধে পর রোম অভিযানের চরিত্র বদলে যায়। হানিবলের সমরাস্ত্র ও রসদের দরকার হলেও কার্থেজিয় সরকার সেসব সরবরাহ করতে অস্বীকার করে। নগর অবরোধ করার বিশেষ অস্ত্রও হানিবলের হাতে তেমন ছিল না-যে কারণে তিনি নেয়াপলিস (বর্তমান নেপলস) নগরের দিকে অগ্রসর হলেও নগরটি অবরোধ করতে ব্যর্থ হয়; শুধু তাই না, হানিবল সমৃদ্ধশালী কাপুয়া নগরটিও অবরোধ করতে ব্যর্থ হন। এক রকম দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের মধ্যে ২১৫ খ্রিস্টপূর্বর শীতকাল কাটল।
২১১ খ্রিস্টপূর্ব। রোম দখল করার উদ্যেগ নেন হানিবল । তা সম্ভব হয়নি। অবশ্য কাপুয়া নগরটি অবরোধ করে এবার সফল হন। হানিবলকে স্থানীয় গোত্রগুলি সহায়তা করেছিল। চার বছরের অনির্ধারিত যুদ্ধের শেষে হানিবল এবার ভাইকে সাহায্য করার জন্য আহবান করলেন। হাসদ্রুবাল স্পেন থেকে রসদ ও যুদ্ধের সরঞ্জাম নিয়ে যাত্রা করে। রোমান কনসাল গাইয়ূস ক্লাউদিয়াস নিরো মেটাউরো নদীর ধারে কার্থেজিও বাহিনীকে পরাজিত করে হাসদ্রুবাল কে হত্যা করে।
২০২ খ্রিস্টপূর্ব । ১৫ বছর ধরে চলমান ২য় পিউনিক যুদ্ধে কার্থেজের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ওদিকে রোমান জেনালের স্কিপিও আফ্রিকানুস দ্য এ্যালডার কার্থেজ আক্রমনের পরিকল্পনা আঁটছিল। হানিবল ইতালি থেকে ফিরে আসার পর উত্তর আফ্রিকার জামায় দুজন মুখোমুখি হল আবার। হানিবল এবার সম্পূর্ন পর্যদুস্ত হয়। কার্থেজের পতন হয় রোমের কাছে। ২য় পিউনিক যুদ্ধ শেষ হয়।
যা হোক। ২০১ খ্রিস্টপূর্বে রোমের সঙ্গে কার্থেজের শান্তি স্থাপন হয়। চুক্তির শর্তাদি হানিবলই ঠিক করে দিয়েছিলেন। হানিবল আর রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়বেন না। তাঁকে কার্থেজের ম্যাজিস্ট্রেট নিযক্ত করা হয়। প্রশাসনিক জীবনে হানিবল কার্থেজিয় সংবিধান সংশোধন করেন, সরকারি দূনীর্তি দূর করেন, নগরের অর্থনীতিকে চাঙা করে তোলেন। রোমানরা এসব ভালো চোখে দেখেনি। তারা হানিবলের বিরুদ্ধে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ করে। রোমানরা হানিবলকে কার্থেজ ত্যাগ করতে বাধ্য করে।
মানচিত্রে সিরিয়া ও বিথিনিয়া
সে সময় সিরিয়ার সম্রাট ছিলেন ৩য় অ্যান্টিওকাস। হানিবল তার কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করেন তারপর সিরিয়ার সম্রাট ছিলেন ৩য় অ্যান্টিওকাসকে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্ররোচিত করেন । যুদ্ধে ৩য় অ্যান্টিওকাস পরাজিত হন। হানিবলকে তিনি রোমানদের কাছে সমপর্ন করবেন- এই মর্মে চুক্তিও হয়। কিন্তু, হানিবল প্রথমে ক্রিটদ্বীপ ও পরে বিথিনিয়ায় পালিয়ে যান। প্রাচীন বিথিনিয়া ছিল বর্তমান তুরস্কে। বিথিনিয়া রাজা ছিলেন ২য় প্র“সিয়াস । বিথিনিয়া পৌঁছে রোমানরা হানিবলকে আত্বসমর্পন করতে বললে হানিবল আত্বসমর্পন না করে বরং বিষ পান করে আত্মহত্যা করেন।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


