somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: অন্ধকার পুতুল

২১ শে অক্টোবর, ২০০৯ বিকাল ৩:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সকালবেলায় বিছানায় শুয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলাম। শুক্রবার। দিনটা কেমন মেঘলা, কেমন মন খারাপ করা। হঠাৎ ফোনটা বাজল। খবরের কাগজ ফেলে বালিশের পাশ থেকে এলজিটা তুলে কানে ঠেকিয়ে অন্যমনস্ক স্বরে বললাম, হ্যালো।
হ্যালো। জামিল? রেজওয়ানের বাবার কন্ঠস্বর। আমি অবাক হলাম।
বললাম,জ্বী। বলুন।
একবার সময় করে আমার বাসায় এসো তো বাবা । তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।
আমি সতর্ক ভাবে জিজ্ঞেস করলাম, কিছু হয়েছে চাচা?
আগে এসো তো। তারপরে বলব। বলে বৃদ্ধ আমাকে সাসপেন্সে রেখে ফোন কেটে দিলেন।
বিকেলে যখন রেজওয়ানদের শ্যামলীর রিং রোডের বাড়িতে পৌঁছলাম তখনও দিনের আলো ফুরিয়ে যায়নি। দুপুরের পর মেঘ কেটে ঝরঝরে রোদ উঠেছিল। ছ’ তলা বাড়ি । সিরাজ চাচা অর্থাৎ রেজওয়ানের বাবা তিনতলায় থাকেন। বেল বাজানোর পর এগারো-বারো বছরের শ্যামলা মতন দেখতে একটি মেয়ে দরজা খুলে দিল। আমাকে বসতে বলে মেয়েটি ভিতরে চলে গেল। বসার ঘরে কেউ নেই। আমি কেকের বাক্সটা টেবিলের ওপর রেখে বসলাম। মধ্যবিত্তের ছিমছাম বসার ঘর। বেতের সোফা, লাল কভারের কুশন। পুরনো মডেলের ২১ ইঞ্চি প্যানাসনিক টিভি, তার ওপর দেওয়ালের মাওলানা ভাসানির ছবি। সিরাজ চাচা মাওলানা ভাসানির অন্ধ ভক্ত। মাথার ভিতরে কত কথা যে ঘুরছে আমার। রেজওয়ানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, তখন থেকেই রেজওয়ানদের বাড়িতে আমার যাতায়াত ছিল । রেজওয়ানের মাকে আমি কখনও দেখিনি। উনি মারা গিয়েছিলেন আরও আগে, রেজওয়ান যখন কলেজে পড়ত, তখন। সিরাজ চাচা জনতা ব্যাঙ্কে চাকরি করতেন। ভীষণ দাবা পাগল মানুষ; খেলাটা আমিও ভালোবাসি । দুজনে মুখোমুখি বসে সারাদিন দাবা খেলে কাটিয়ে দিয়েছি। সিরাজ চাচা দারুন মেধাবী দাবারু, কখনও হারাতে পেরেছি বলে মনে পড়ে না।
দরজার কাছে শব্দ হল। গায়ে পরদা জড়িয়ে ছোট্ট একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। রেজওয়ানের মেয়ে পুতুল। এত বড় হয়ে গেছে। প্রায় তিন বছর পর দেখলাম। বছর পাঁচেকের শ্যামলা মিষ্টি চেহারা। কেমন পুতুল পুতুল দেখতে।
এদিকে এসো। বললাম।
না। আসব না। বলে দরজার কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল পুতুল।
বললাম, তোমার নাম আমি জানি।
বল। একটু এগিয়ে এল।
পুতুল।
পুতুল মাথা নাড়ল। মুখচোখে হাসি। আরও একটু এগিয়ে এল।
জিজ্ঞেস করলাম, আঙ্কেল, তুমি এখন কোন্ ক্লাসে পড়?
ওয়ানে । তুমি?
আমিও ওয়ানে পড়ি। বললাম।
পুতুল ফিক করে হেসে ফেলল। বলল, মিথ্যে কথা। বলে ঘুরে ওদিকে চলে যায়।
ওর মা কি নেই ঘরে নেই। রাশিদা একটা মানবাধিকার সংস্থায় চাকরি করে । আজ তো শুক্রবার। নাকি আছে। বেচারি রাশিদা। এই বয়েসেই বিধবা হতে হল। স্বামীর সঙ্গে ঘর করার সুখ কপালে সইল না। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। রাশিদাকে নিয়ে আমার ভাবনা বেশিদূর গড়াল না। খক খক করে কাশতে কাশতে সিরাজ চাচা এলেন। লুঙ্গি আর গেঞ্চি পরে ছিলেন। উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম।
বস বাবা, বস।
আমি বসলাম।
কতদিন পরে দেখলাম সিরাজ চাচাকে। অনেক বুড়িয়ে গেছেন। মাথার সামনের দিকে টাক, পিছনের দিকে ছোট ছোট করে ছাঁটা পাকা চুল, ফরসা মুখে অজস্র কাটাকুটি। কালো ফ্রেমের চশমার লেন্স পুরু। উলটো দিকের সোফায় বসতে বসতে সিরাজ চাচা চিৎকার করে বললেন, রেহানা। রেহানা ।
সেই শ্যামলা মতন মেয়েটি এল। টেবিলের ওপর কেকের বাক্সটা দেখিয়ে সিরাজ চাচা বললেন, এটা ভিতরে নিয়ে যা। আর চা দে।
মেয়েটি কেকের বাক্সটা নিয়ে ভিতরে চলে গেল। সিরাজ চাচা এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বল বাবা আছ কেমন?
আছি একরকম। আপনাদের দোওয়া।
এদিকে একেবারে আসোই না। সিরাজ চাচা অনুযোগের সুরে বললেন।
আমি আর কী বলব । আমি চুপ করে থাকি।
সিরাজ চাচা আপন মনে বললেন, এখন সবাই ব্যস্ত। আগে এমন ছিল না।
কথা সত্য। আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললাম। হঠাৎ চেয়ে দেখি পুতুল পরদার আড়াল থেকে উঁকি দিল। মিটমিট করে হাসছে। ভারি দুষ্ট মেয়ে তো।
তারপর কথায় কথায় সিরাজ চাচা ইঙ্গিতে যা বললেন তা হল এই: তুমি তো সবই জান জামিল। দুদিনের জ্বরে রেজওয়ান আমাদের ছেড়ে চলে গেল। রাশু বিধবা হল। মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে ভারি দুশ্চিন্তায় মধ্যে পড়েছে। আমি ওকে বিয়ে করতে বলছি। এতদিন রাজী হয়নি, এখন মনে হয় বুঝতে পারছে একা একটি মেয়েকে মানুষ করা অত সহজ নয় । আমি আর কদ্দিন ...যাহোক ...তুমি আমার ছেলের মতন ... আর তুমিও তো এখনও বিয়ে করোনি ....
এতক্ষণে সিরাজ চাচার ফোন করার কারণটি বুঝলাম। বিয়ে আমি করিনি ঠিকই। একটা কলেজে পড়াই। একা একা দিন কেটে যাচ্ছে। তবে আমার বিয়ে না-করার পিছনে ছোট একটা বিরহী ইতিহাস আছে। ঢাকা শহরের একটা মেয়ের ওপর আমার অনেক অভিমান অনেক ক্ষোভ জমে ছিল। তবে সেসব ক্ষোভ আর অভিমান ইদানিং ফিকে হয়ে আসছে। রাশিদার জন্য না হলেও অন্তত পুতুলের জন্য হলেও আমার সিরাজ চাচার প্রস্তাবটি নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবা উচিত।
ট্রে হাতে রেহানা ঘরে ঢুকল। ট্রের ওপর চায়ের কাপ ছাড়াও একটা প্লেটে নোনতা বিসকিট্ । আমি ঝুঁকে চায়ের কাপ তুলে নিলাম। বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। অন্ধকার জমে উঠছিল ঘরে। রেহানা ঘর ছেড়ে যাওয়ার আগে টিউব লাইটটা জ্বালিয়ে দিয়ে গেল। আমি চায়ে চুমুক দিলাম।
সন্ধ্যার পর রাশিদা ফিরল। ডোনারদের সঙ্গে কী নাকি মিটিং ছিল। রাশিদাকে অনেক দিন পরে দেখলাম। শুকিয়ে গেছে। আমাকে না খাইয়ে ছাড়ল না। বারবার আড়চোখে দেখছিল। এর মধ্যেই অবশ্য আমার পুতুলের সঙ্গে খাতির হয়ে গেল। আমি কী কার্টুন দেখি জিজ্ঞেস করল। টম অ্যান্ড জেরির কথাই বললাম। ও খুশি হয়ে বলল: ছেরেক (শ্রেক)। আর ওর পড়ার বইগুলোও এনে আমাকে দেখাল। কি কি ছবি এঁকেছে তাও দেখাল।
ও বাড়ি থেকে যখন বেরুলাম তখনও ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছিল। সাড়ে দশটার মতন বাজে। রাস্তায় অনেক ক্ষণ ধরে হাঁটলাম। ভিজলাম। রাস্তার অন্ধকারে রাস্তার আলোয় পুতুলের মুখ দেখলাম। টের পেলাম জীবনে পরিবর্তন আসছে। তাছাড়া রাশিদাকে আমার বরাবরই ভালোই লাগত; রাজশাহীর মেয়ে, শ্যামলা, ছিপছিপে শরীরের নিটোল গড়ন। রেজওয়ানের সঙ্গে ওর বিয়ের পর প্রথম যখন রাশিদাকে দেখেছি তখনই ওকে আমার ভালো লেগেছিল। নারীসঙ্গশূন্য মানুষ আমি, কল্পনায় যেসব নারীকে নগ্ন করতাম, রাশিদার নাম সেই তালিকায় ছিল।
সেদিনের পর থেকে সপ্তাহে অন্তত দু-তিন বার পুতুলের টানে শ্যামলী যাই। রাশিদার সঙ্গেও নিরালায় কথা হল। রাশিদা বলল, সামনে বি.এড পরীক্ষা। পরীক্ষার আগে কিছু ভাববে না। আমিও বললাম, ভালো তো, এত তাড়াহুড়ো করার কি আছে।
আমি থাকি মোহাম্মদপুরে। ইকবাল রোডের একটি চারতলা বাড়ির তিনতলার নিরিবিলি ফ্ল্যাটে। একাই থাকি, যে কারণে পুরো ফ্ল্যাটই অগোছালো হয়ে থাকে। ফ্ল্যাট গোছগাছ করতে শুরু করলাম। যে সব বন্ধুরা এসে আড্ডা মারত, তাদের এড়িয়ে গেলাম। বারান্দায় টবে ফুলের গাছ এনে বসালাম। বাড়িঅলা রং করে দিতে রাজী হল না। নিজেই খরচ করে রং মিস্ত্রি ডেকে রং করালাম। অফ হোয়াইট । বসার ঘরে বসালাম বড় সাইজের একটা অ্যাকুয়ারিয়াম। তোষকের নিচে কতগুলি প্লেবয় ম্যাগাজিন ছিল, সেসব এক জুনিয়ার বন্ধুকে দিয়ে দিলাম। শোওয়ার ঘরে তোষক ফেলে ফ্লোরিং করতাম; আঠারো হাজার টাকায় অটবির একটা ডবল খাট কিনলাম । বসার ঘরের পুরনো বেতের সোফা বেচে দিয়ে গ্রিন রোড থেকে কিনলাম রট আয়রনের ঝকঝকে সোফাসেট । পুতুলের জন্য খেলনা কিনলাম। বেশির ভাগই চাইনিজ পুতুল। নীলক্ষেত থেকে খরগোশ কিনব কিনা ভাবলাম।
রাশিদার সামনে বি.এড পরীক্ষা তো কি- পুতুল আর রাশিদাকে নিয়ে বেড়াতে যাই। এই প্রথম জানলাম ঢাকায় শিশুদের জন্য কত সুন্দর সুন্দর বেড়ানোর জায়গা হয়েছে, এত এত শপিং মল হয়েছে,সেইসব শপিংমলে এত এত শাড়ির দোকান, বাচ্চাদের খেলনার দোকান আছে, এত এত চাইনিজ রেস্তোঁরা হয়েছে। চাইনিজ রেস্তোঁরার আলো আঁধারিতে রাশিদার সুশ্রী মুখটি দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই।
কন্যাপক্ষকে পাত্রপক্ষের ঘরবাড়ি দেখানো দরকার। একদিন শুক্রবার সিরাজ চাচাদের দাওয়াত করলাম। সকাল সকাল ওরা এল। নতুন সাজে সেজে থাকা ফ্ল্যাট দেখে ওদের খুশি মনে হল। রাশিদা কেবল অ্যাকুয়ারিয়ামটা টিভির পাশে না-রেখে বারান্দার দিকে রাখতে বলল। সকালে বাজার করে রেখেছিলাম। রেহানাকে নিয়ে রাশিদা রান্নাঘরে ঢুকল। সর্ষে-ইলিশ রাঁধবে। পুতুলগুলি পুতুলকে দিলাম। ও যে কী খুশি হল। পুতুল নিয়ে খেলতে বসল। ওকে অবশ্য সবগুলি পুতুল দিইনি। পরে দেব বলে কয়েকটা পুতুল লুকিয়ে রেখেছিলাম। ভাগ্যিস। আমি আর সিরাজ চাচা দাবা খেলতে বসলাম। দাবা খেলার এক ফাঁকে সিরাজ চাচা বললেন, জামিল, তুমি বরং শ্যামলীর দিকে বাসা নাও। কাল রাশু বলছিল। রিং রোড থেকে ইকবাল রোড অনেক দূর হয়ে যায়।
নেব। আমি খুশি হয়ে বললাম।
অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি জার্মানি থেকে আমার এক বন্ধু এল । রায়হান। আমি, রেজওয়ান আর রায়হান একসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়তাম । ছাত্র হিসেবে রায়হান ছিল মেধাবী, এম এ পাস করে স্কলারশীপ নিয়ে জার্মানির চলে গেল থিসিস করতে । থিসিস শেষ করে হ্যানোভারে লাইবনিজ ইউনিভারসিটিতে জয়েন করে রায়হান। তারপর আর ফিরে আসেনি। নীপাকে ভালোবাসত রায়হান। নীপা আমাদেরই ক্লাসমেট ছিল । গোপনে ওরা বিয়েও করেছিল । কথাটা আমি আর রেজওয়ান ছাড়া আর কেউই জানত না। রায়হান জার্মানি যাওয়ার পর নীপা কয়েক বছর অপেক্ষ করে। তারপর এক ব্যবসায়ীকে বিয়ে করে নীপা। ওদিকে জার্মানি তে দ্বিতীয়বার বিয়ে করে রায়হান। ওর এক্স ওয়াইফের নাম আডা; লাইবনিজ ইউনিভারসিটির কলিগ ছিল। রায়হান এশিয় বলেই নাকি আডা আগ্রহ দেখিয়েছিল। সব পুরুষই নাকি এক! ওদের সর্ম্পকটা এক বছরও টেকেনি।
রায়হানদের বাড়িটা কলাবাগানে। গেলাম। আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরল। ই মেইলে অবশ্য অনিয়মিত হলেও যোগাযোগ ছিল। ফোনও করত মাঝে মাঝে। তবে চোখের দেখার আবেগই অন্যরকম।
রেজওয়ানের মৃত্যুর কথা রায়হান জানত। জিজ্ঞেস করল, সিরাজ চাচার খবর কী রে।
আছে একরকম।
শ্যামলীর বাড়িতেই তো আছে?
হ্যাঁ।
চল একদিন যাই।
চল।
রায়হান বলল, ও আর ইউরোপীয়ান মেয়ে বিয়ে করবে না। বিয়ে করতেই দেশে এসেছে । পাত্রী দেখছে কি না জিজ্ঞেস করলাম। হ্যাঁ, না-কিছুই বলল না।
রেজওয়ানের বিয়ের আগেই রায়হান জার্মানি চলে গিয়েছিল: রাশিদা বা পুতুলকে দেখেনি। রাশিদাকে দেখে রায়হানের মুখচোখে যে মুগ্ধ বিস্ময় ফুটে উঠল তা আমার চোখ এড়াল না। আটপৌড়ে একটা শাড়ি পরেছিল রাশিদা, লক্ষ করলাম, ভিতরে গিয়ে জলদি শাড়ি বদলে এল। সিরাজ চাচা ও রায়হানকে দেখে ভারি খুশি । বারবার বললেন, জান রাশু, রায়হান কত বড় স্কলার। ওর লেখা বই অক্সফোর্ডে পড়ায়। দাবায় একমাত্র ওর কাছেই হেরেছি। রাশিদার মুখে গভীর শ্রদ্ধার বিনম্র ভাব ফুটে উঠতে দেখলাম। আমার কেমন যেন অস্বস্তি হতে থাকে। ড্রইংরুমে ওরা তিনজন গল্পে ডুবে গেল; যেন আমি ঘরে নেই। অবশ্য পুতুল আমার কোলে বসে ফিসফিস ছিনডেরিলার গল্প শুনতে চাইল। আমি ওকে নিয়ে বারান্দায় এলাম। সবে সন্ধ্যা নামছে। ঝিরঝির বৃষ্টি। গলির ওপাশের বাড়ির আলো। নিচের গলিতে গাড়ির হর্ণ। হঠাৎ আমার মনে হল: ওদের আমার দরকার নেই ... কেবল পুতুল আমার কাছে থাকলেই আমার শান্তি।
শ্যামলী থেকে ফেরার পথে রায়হান জিজ্ঞেস করল, নীপা এখন কোথায় থাকে রে?
মগবাজার।
ওর সঙ্গে আমার কথা আছে। দেখা করিয়ে দিতে পারবি?
দেখি।
দ্যাখ ট্রাই করে।
আমার কাছে নীপার ফোন নম্বরটা ছিল। ফোন করে সব জানালাম। ১৯ তারিখ বিকেলে গ্রিন রোডের একটা কফিশপে ওয়েট করবে বলল। নীপাকে দেখে রীতিমতো চমকে উঠলাম। ফরসা সুন্দর মেয়েটার এ কি হাল হয়েছে। চোখের কোণে কালি। হয়তো ছেলেটাকে সামলাতে সামলাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। নীপার একটাই ছেলে, রাসেল; বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। স্বামী মোটর পার্টসের ব্যবসা করে। রায়হান কে দেখে ক্ষোভ কিংবা আবেগ দেখাল না নীপা। চাপাকন্ঠে জিজ্ঞেস করল, বিয়ের সব কাগজপত্র তোমার কাছে। কি করেছ?
পুড়িয়ে ফেলেছি। কফিতে চুমুক দিয়ে নির্বিকার কন্ঠে রায়হান বলল।
আমার সঙ্গে জার্মানি যাবে নীপা?
না!
ছিঃ। রায়হান এত স্বার্থপর । নীপাকে ফেলে অবলীলায় বিদেশ চলে গেল আর এখন আবার স্বামীসংসার ফেলে নীপাকে ওর সঙ্গে যেতে বলছে। রায়হান বড় স্কলার হতে পারে, ওর বই অক্সফোর্ডে পাঠ্য হতে পারে- তবে এসবই ওর বাইরের পরিচয়। ওর ভিতরটা ভারি নিষ্ঠুর, নিষ্ঠুর আর বিবেকহীন।
রায়হান চুপ করেছিল। নীপাই বলল, রাসেলের বাবার ক্যান্সার। অবশ্য আরলি ষ্টেজ। আর, রাসেলের কথা তো শুনলেই জামিলের মুখে। এদের ফেলে কি করে যাই বল?
আমি চমকে উঠলাম। এ কী জীবন যাপন করছে নীপা। প্রথম বিয়েটা টিকল না, ছেলে অটিস্টিক, স্বামীর ক্যান্সার। অথচ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ওকে মেয়েরা ভীষণ ইর্ষা করত।
কফিশপ থেকে আমরা যখন বেরিয়ে এলাম, তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি ঝরছিল। রাস্তায় অন্ধকার। রাতে শ্যামলীতে খাওয়ার কথা। একটা সি এন জি ডেকে উঠে পড়লাম।
দারুন সেজে ছিল রাশিদা । আমি অবাক। কই আমার জন্য তো ও কখনও এমন করে সাজেনি । ভিতরে ভিতরে আমি কেমন গুটিয়ে গেলাম। আমার কেবলি মনে হতে লাগল: অনিবার্য ভবিতব্য রুখবার ক্ষমতা আমার নেই। আমার প্রতিপক্ষরা অত্যন্ত শক্তিশালী।
ক’দিন পর সিরাজ চাচাই আমাকে ফোন করে যা বলার বললেন। রাশু সম্ভবত অন্যরকম ভাবছে জামিল। তুমি কিছু মনে করো না বাবা। কদিন পর রায়হান জার্মান ফিরে যাচ্ছে। এখানে ফিউচার নেই। মেয়েটারও তো ভবিষ্যৎ আছে ... ইত্যাদি ... ইত্যাদি। আমি চুপ করে থাকি। আমি ফোন রেখে দিই। জীবনের শেষে এসেও বৃদ্ধ কম্প্রোমাইজ
করলেন। কী ভীষণ স্বার্থপর আর প্রতারক এরা! ভাবলাম, থাক, আমি তো একাই ছিলাম। একাই থাকব। তবে বুকের ভিতরে চিনচিনে একটা ব্যথা টের পেলাম। রাশিদার জন্য যতটা না-পুতুলের জন্যই বেশি খারাপ লাগছিল। আসন্ন বিচ্ছেদ কী ভাবে সইব আমি? শহরে শীত আসছে।
রায়হানকে ফোন করলাম। ও ফোন রিসিভ করল না। সব বিবেকহীন,স্বার্থপর ।
ক’দিন পর। পুতুল ফোন করল। (রাশিদাই ফোন করে মেয়েকে ধরিয়ে দিয়েছে।) বলল, কাল আমরা চলে যাচ্ছি।
কোথায় চলে যাচ্ছ?
বিদেশ। তুমি ভালো থেকো।
আমি বললাম, থাকব। তুমিও ভালো থেকো।
পুতুল বলল, আচ্ছা, থাকব।
জিজ্ঞেস করলাম, কাল কখন যাচ্ছ?
বলল, জানি না। আমি প্লেনে করে যাব।
পরের দিন ভোর। বিমানবন্দরে বৃষ্টি। আমি পুতুলকে খুঁজছি। এত ভিড়ের মধ্যে কোথায় খুঁজব।
আর জানি না ওদের ফ্লাইট কখন। আমি ফিরে আসি।
তারপর বর্ষার বাকি দিনগুলো দেখতে দেখতে কী ভাবে ফুরিয়ে গেল। এ শহরের আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে গেল শীতের পদধ্বনি- যা এবার একেবারেই অন্যরকম মনে হল। সারাক্ষণ আমার ভারি নিঃসঙ্গ বোধ হয়। সারাক্ষণ পুতুলের মুখটা ভাসে। নিঃসঙ্গতা কাটাতে, যা কখনও করিনি, সিগারেট ধরলাম। নিঃসঙ্গতা কাটাতে, যা কখনও করিনি, ছাত্রদের ফ্ল্যাটে ডেকে এনে ব্যাচ করে পড়াতে লাগলাম। তারপরেও বুকের ভিতরে শূন্যতার কামড়। নিঃসঙ্গতা কাটাতে, যা কখনও করিনি, আমার এক কলিগকে নিয়ে নোটবই লেখায় হাত দিলাম । বন্ধুদের আবার ডেকে এনে ঘরে আড্ডা বসালাম। কেন যেন আড্ডা ঠিক আগের মতন জমল না। কোনও কোনও দিন বিকেলে নীলক্ষেতের দিকে যাই। পুরনো বই দেখি, কিনি। কিছুই ভালো লাগে না। মনের ভিতরে কেবলি অথই শূন্যতা খেলা করে। অনেক রাতে শূন্য ফ্ল্যাটে ফিরে আসি। রাত ও ফ্ল্যাট কীরকম শুনশান করে। বাইরে শীত আর কুয়াশা। ঘরের ভিতরে শীত, ঘরের ভিতরে অন্ধকার। আমি শীত শীত অন্ধকারে বসে থাকি। একটার পর একটা সিগারেট টানি। অন্ধকারেই আন্দাজে আলমারি খুলে সেই পুতুলগুলি বের করি। অন্ধকারে পুতুলগুলি নিয়ে বসে থাকি। ভাগ্যিস পুতুলকে সব পুতুল দিইনি। আমি পুতুলের সঙ্গে কথা বলি। অন্ধকারেই দরজার কাছে শব্দ হয়। চোখ তুলে দেখি গায়ে পরদা জড়িয়ে ছোট্ট একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। এদিকে এসো। আসব না। তোমার নাম আমি জানি। বল। পুতুল। পুতুল মাথা নাড়ল। একটু এগিয়ে এল মনে হল। জিজ্ঞেস করলাম, আঙ্কেল, তুমি এখন কোন্ ক্লাসে পড়? ওয়ানে । তুমি? আমিও ওয়ানে পড়ি। বললাম। পুতুল ফিক করে হেসে ফেলল। বলল, মিথ্যে কথা। বলে ওপাশে চলে যায়।
আমি অপেক্ষা করি - ও আবার কখন আসে ...সেই অপেক্ষায় থাকি।
আমার দিন কেটে যায় ...



সর্বশেষ এডিট : ২১ শে অক্টোবর, ২০০৯ বিকাল ৪:২৭
৩২টি মন্তব্য ৩১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×