সময়টা খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০। যাযাবর আর্যরা মধ্য এশিয়া থেকে পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশ করছিল । সেই আর্যদেরই অন্য একটি শাখা সিরিয়ায় পৌঁছে। তারপর তারা সেখানে গড়ে তোলে উন্নত এক সভ্যতা; যে সভ্যতার নাম পন্ডিতেরা দিয়েছেন হুরিয়ান সভ্যতা। আরিয়ান (আর্য) থেকে হুরিয়ান। প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর নগরকেন্দ্রি হুরিয়ান সভ্যতা গভীর প্রভাবিত ফেলেছিল । যুদ্ধবিগ্রহে হুরিয়ানরা পারদর্শী তো ছিলই- এমন কী সংগীতের স্বরলিপিও রচনা করেছিল তারা । খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ শতকেই হুরিয়ানসমাজে নারীদের স্বাধীনতা ছিল আশাতীত । স্বামীর সম্পদ ছাড়াও নারীরা শষ্য ভান্ডার, কৃষিজমি- প্রভৃতি স্থাবর সম্পদের অধিকারী হতে পারত। আর্য সভ্যতা বলেই হয়তো হুরিয়ান সাহিত্যে ‘ইন্দ্র’, ‘বরুন’ প্রভৃতি শব্দ পাওয়া গেছে । হুরিয়ানরা নিজেদের রাজ্যকে বলত, Ishuwa; মানে অশ্বভূমি। এখানেও ভারতীয় বৈদিক ভাষার প্রমাণ পাই। যদ্দূর জানা গেছে ২০০০ খ্রিস্টপূর্বে প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যে ঘোড়া আমদানী তারাই করেছিল । ঘোড়ার লালন পালনের যে সব শব্দ ব্যবহার করত সে সব শব্দও ছিল ভারতীয় বৈদিকযুগের ভাষার।
প্রাচীন সিরিয়া
প্রাচীন সিরিয়ার হুরিয়ান সভ্যতা দীর্ঘকাল ছিল, যাকে বলে,‘লস্ট সিভিলাইজেশন’। ইতিহাসের বিস্মৃত অতলেই তলিয়ে যেত হুরিয়ান সভ্যতা যদি ব্রিটিশ আসিরিয়বিদ আর্চিবাল্ড সাইস মিশরের আমআরনা আর্কাইভে একটি চিঠি খুঁজে না পেতেন। মিশরের ধ্বংসপ্রাপ্ত নগর তেল এল আমআরনা,- তারই ঐতিহাসিক নথিপত্র সব সংরক্ষিত ছিল আমআরনা মহাফেজখানায়। সেই মহাফেজখানায় মিশরের অস্টাদশ রাজবংশের একটি অপরিচিত ভাষায় চিঠি পাওয়া গিয়েছে, যদিও প্রাচীন ও মধ্য ব্যাবিলনের শব্দের সঙ্গে সেই ভাষার কিছু সাদৃশ্য তখনই লক্ষ করা গিয়েছিল। যাহোক। সেই চিঠিতে মিটাননি নামে এক রাজ্যের কথা ছিল। পরে ঐ ধরনের ভাষায় লেখা দলিলপত্র নিকট প্রাচ্যের অপরাপর সভ্যতায় আরও পাওয়া যায়। আক্কাদিয় ভাষায় লেখা একটি চিঠিতেও মিটাননি শব্দটি পাওয়া গেলে ঐতিহাসিকগন কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। একটি লেখায় ‘ল্যান্ড অভ হারি’ বাক্যটি পাওয়া যায়। অনুবাদে ভুল হয়েছিল। আসলে ওটা হবে হুরি। হুরিয়ানরা নিজেদের রাজ্যকে বলত ‘ল্যান্ড অভ হুরি’।
সিরিয়া
মিটাননি রাজ্য
যা হোক। ঐতিহাসিকদের সচেষ্ট গবেষনার ফলে ক্রমশ প্রাচীন ইতিহাসের এক অজানা অধ্যায় আলোকিত হয়ে উঠতে থাকে । জানা গেল, প্রাচীন সিরিয়ায় উত্তর-পুব খাবুর নদীর তীরের উর্বর উপত্যকায় ১৫০০-১৩০০ খ্রিস্টপূর্ব নাগাদ হুরিয়ানরা গড়ে তুলেছিল বিস্ময়কর এক নগর সভ্যতা যা পরে মিটাননি রাজ্য নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিল । হুরিয়ান সভ্যতার প্রধান নগর ছিল খাবুর নদীর তীরে উরকেশ ।
খাবুর নদী
উরকেশ
উরকেশ নগরের কথা অনেক কাল আগে থেকেই ইউরোপের লোকে জানত। কেননা, ইউরোপে মধ্যযুগ থেকেই প্রাচীন ভাষার পাঠোদ্ধারের কাজ চলছিল। সবাই ভেবেছিল উরকেশ নগরীটির বাস্তক অস্তিত্ব নেই, ট্রয় নাগরের মতোই কাল্পনিক। যা হোক। উরকেশ নগরটি আবিস্কারের আশায় সিরিয়ার দামেশক শহরের ৬৪০ কিমি উত্তর-পুবে আধুনিক শহর তেল মোযান-এর কাছে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছিল। মজার কথা হল: রহস্য উপন্যাসের লেখিকা আগাথা ক্রিসটি এবং তাঁর স্বামী ব্রিটিশ আর্কিওলজিস্ট ম্যাক্স ম্যালোয়ান রোমাঞ্চকর উরকেশ নগরীর খোঁজে তেল মোযান এ খননকার্য শুরু করেও কি কারণে দুদিন পরই খননকার্য ইস্তফা দিয়েছিলেন!
উরকেশ
লস এঞ্জেলেসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক গিয়োর্গি বুসেলাতি এবং তাঁর স্ত্রী ম্যারিরিন কেলি- বুসেলাতি অবশ্য হাল ছাড়েননি। তারা তেল মোযান-এ আট বছর খননকার্য চালান। ১৯৯৫ সালের ২০ নভেম্বর তারা প্রাচীন সিরিয়ার হুরিয়ানভাষী আর্যঅধ্যুষিত উরকেশ নগর আবিস্কারের ঘোষনা দেন । গিয়োর্গি বুসেলাতি বললেন, সব কিছু বিচারবিশ্লেষন করে আমাদের মনে হচ্ছে যে হুরিয়ানরা ছিল ইন্দো-ইউরোপীয় মানবগোষ্ঠী। এককালে তারা বাস করত কাসপিয়ান সাগরের দক্ষিণে । খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ শতকে বা তারও আগে আর্যরা দক্ষিণ দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাদেরই একদল ইরানে, একদল ভারতবর্ষে এবং একদল গ্রিসে পৌঁছে। এদেরই আরেকদল সিরিয়ায় পৌঁছে গড়ে তোলে মিটাননি সাম্রাজ্য। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ শতকে এসে হুরিয়ানরা উন্নতির শিখরে পৌঁছলেও ওদের ইতিহাস অবশ্য আরও অনেক পুরনো। সব বিচারবিশ্লেষন করে আমাদের মনে হচ্ছে প্রাচীন সিরিয়ায় হুরিয়ানরা এসেছিল ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বে । যা হোক। উত্তর সিরিয়ার খাবুর নদীর তীরে উরকেশ নগরের বিশাল চত্তর, পাথরের সিঁড়ি দেখে আশ্চর্য হতেই হয়। মানবসভ্যতার সবচে পুরনো নগরগুলির মধ্যে উরকেশ একটি।
রথ
প্রাচীন মিটাননি সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে ছিল অভিজাত রথ যোদ্ধাদের শ্রেণি। যাদের বলা হত মারিয়ানু। হুরিয়ানদের রণকৌশল ছিল উন্নতমানের। দ্রুতগামী রথে থাকত দক্ষ ও দুধর্ষ তীরন্দাজ। হুরিয়ানদের জীবন আবর্তিত হত অশ্ব কে কেন্দ্র করে। প্রাচীন ভারতের মতোই শ্রেণিভেদ ছিল সমাজে। বিচারব্যবস্থায় অবশ্য ব্যাবিলনের প্রভাব ছিল। সঠিকভাবে নথিপত্র সংরক্ষণ ও যথাযথ তথ্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হত। হুরিয়ানদের প্রধান ঈশ্বর ছিলেন তেসহুব। তেসহুব ছিলেন জলবায়ূর দেবতা। দেবী হেপা ছিলেন প্রধান ঈশ্বর তেসহুব এর স্ত্রী। ইনিই ছিলেন হুরিয়ানদের মাতৃদেবী।
হুরিয়ানদের মাতৃদেবী।
উরকেশ নগর ধর্মীয়নগর ছিল কি না জানা যায়নি। তবে উপাসনালয় ছিল নিশ্চয়ই। হুরিয়ানদের সিলিনডার আকৃতির সীলমোহরে ডানাওয়ালা পশু কিংবা মিথিয় দৈত্য অঙ্কিত থাকত। এদের তাৎপর্য বোঝা যায়নি। তবে হুরিয়ানদের ধর্ম প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ধর্মকে প্রভাবিত করেছিল।
হুরিয়ান অশ্বারোহী
রথ।
একদল ভারতীয় পন্ডিত বিশ্বাস করেন ভারতীয় সভ্যতা স্থানীয়, এবং আর্য আক্রমন মিথ। ঠিক তেমনি মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের আসিরিয়বিদ পিওটর মিকেলোস্কি হুরিয়ান সভ্যতায় আর্য সংশ্লিস্টার প্রশ্নে দ্বিমত পোষন করেন। তিনি মনে করেন হুরিয়ানরা বাইরে থেকে আসেনি তারা প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যেরই আদিবাসী। তাদের ভাষা সেমিটিক কিংবা ইন্দো-ইউরোপীয় নয়। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, উরকেশ নগরের পরিকল্পিত নগরব্যবস্থা পাথরের কাজ পয়ঃপ্রানালী আর বিশাল জনসংখ্যা কি করে একটি ভ্রাম্যমান যাযাবর জাতির সৃষ্টি হতে পারে?
যা হোক। ইতিহাসে বাকবিতন্ডা থাকবেই।
যাই হোক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ শতকেই মিটাননি রাজ্যটি একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিনত হয়েছিল; হয়ে উঠেছিল মিশর হিট্টি (প্রাচীন সিরিয়ার উত্তরে শক্তিশালী সাম্রাজ্য) ব্যাবিলন ও আসিরিয় সাম্রাজ্যের সমকক্ষ। মিশরিয় অধিবাসীরা হুরিয়ানদের রাজ্যকে বলত নাহারিনা।
যা হোক। অনিবার্য ভাবেই মিটাননি সাম্রাজ্যকে দক্ষিণপুবের আক্কাদ সভ্যতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। দক্ষিণের আক্কাদ সাম্রাজ্যের সম্রাট ছিলেন নারাম সিন। ইনি ছিলেন আককাদ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা প্রথম সারগন-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র। কূটনৈতিক তৎপরতা সেকালেও চলত। নারাম সিন-এর এক কন্যার সঙ্গে উরকেশ রাজার বিবাহের কথা জানা যায়। মিটাননি সাম্রাজ্যের প্রথম উল্লেখযোগ্য রাজার নাম কীর্তি। তার ছেলে রাজা শাহুশতাতার। খ্রিস্টপূর্ব ১৫ শতকে রাজা শাহুশতাতার আশহুর ধ্বংস করেছিলেন। আশহুর প্রাসাদের সোনারুপার তৈরি রাজকীয় দরওয়াজাটি লুঠ করেছিলেন। মিটাননি রাজ্যের উত্তরে ছিল হিট্টি রাজ্য। ওদের নথিপত্র থেকে এ তথ্য পাওয়া গিয়েছে। আশহুর মিটাননি রাজ্যের করদ রাজ্যে পরিনত হয়েছিল।
মিটাননি সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে ছিলেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাজা। রাজা বাস করতেন উরকেশ নগরে। সমাজে রথযোদ্ধা শ্রেণিই ছিল অভিজাত। নগরকেন্দ্রিক আর্য অভিজাত শাসিত সমাজের ধরনটা ছিল অনেকটা সামন্ততান্ত্রিক। খাবুর নদীর উপত্যকার বিশাল বিশাল কৃষিখামারের মালিক ছিল সামন্তপ্রভূরা। তবে জমি বিক্রি কিংবা হস্তান্তর করা যেত না। তৃণভূমিতে পালন করা হত। ঘোড়া । ঘোড়া ছাড়াও পালা হত ভেড়া। যে কারণে উলশিল্প গড়ে উঠেছিল। তাছাড়া হুরিয়ানদের বস্ত্র শিল্পও ছিল উন্নতমানের। তাছাড়া এসব শিল্পে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। রাজকর্মচারীরা উলের পোশাক সংগ্রহ করে ব্যাবিলনে কি মিশরে রপ্তানি করত।
এছাড়া সিরামিক শিল্পের জন্য সেকালে বিখ্যাত ছিল উরকেশ । লালচে রেখা আর ত্রিভূজবিন্দু সমন্বিত সিরামিক পাত্রগুলি ছিল দৃষ্টিনন্দন। ধাতুর কাজেও অসামান্য পারদর্শী ছিলেন হুরিয়ান শিল্পীরা। সুমেরিয়রা তামার কাজের ব্যবহৃত শব্দমালা ( ভোকাবুলারি) নিয়েছিল হুরিয়ানদের কাছ থেকেই। তামা ছিল ঐ অঞ্চলে ব্যবসার অন্যতম উপকরণ। খাবুর নদী উপত্যকাই ছিল তামা শিল্পের কেন্দ্র। রুপাও ছিল। তবে আকাল ছিল স্বর্ণের । মিশরে প্রাপ্ত আমআরনা চিঠিতে জানা যায় সোনা সংগ্রহ করতে হত মিশর থেকে । উরকেশ থেকে ছোট আকারের ব্রোঞ্জের সিংহমূর্তি পাওয়া গেছে। এসব বাস্তববিদ্যা ছাড়াও শিল্পকলায় হুরিয়ানদের প্রভূত অবদান ছিল। আমি আগেই বলেছি মিটাননি রাজ্যেই ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বের বিশ্বের ইতিহাসের প্রথম সংগীতের লিখিত স্বরলিপি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কয়েকজন হুরিয়ান কম্পোজারের নামও পাওয়া গেছে। এরা হলেন উরহিয়া এবং আমমিয়া।
উরকেশ
হুরিয়ান সভ্যতার পতনকাল হিসেবে খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০ শতককে চিহ্নিত করা যায়। খাবুর নদীর উপত্যকাটি আসিরিয় প্রদেশে পরিনত হয়।
উরকেশ
উরকেশ
উরকেশ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


