বছর তিনেক ধরে রায়হান আর কৌশিকের মাঝখানে পেন্ডুলামের মতন দুলছিল ইলোরা; শেষে রায়হানের দিকে ঝুঁকে গেলে কৌশিকের সঙ্গে ইলোরা সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তার পরপরই পশ্চিমদিকে যাত্রা করে কৌশিক। কলকাতায় তত ভালো লাগেনি এবার। টালীগঞ্জের সৌরভ-সমীররা ঘর-সংসার আর চাকরি নিয়ে ব্যস্ত, কফিহাউজের মুখগুলি সব অপরিচিত। অনেকটা বাধ্য হয়েই দিল্লিগামী ট্রেন ধরেছিল সে; অবশ্য আমীর খসরুর ওপর একটা বই লেখার কথা কৌশিকের; গ্রন্থকীটের পান্থ মুর্শেদ খুব করে ধরেছে; ওদের প্রকাশনীটা নতুন; আসছে বইমেলায় হিট আইটেম চাই। ট্রেনে সারাক্ষণই ঝিমুচ্ছিল সে। সহযাত্রী এক নাইজেরিয়; মাঝবয়েসি ভদ্রলোক দর্শনের অধ্যাপক; সারাক্ষণই বোঝা যায় না এমন ইংরেজিতে সেলফ আর বিয়িংয়ের পার্থক্য বোঝাচ্ছিল।
তারপর দিল্লি স্টেশনে নেমে সস্তা হোটেলের খোঁজ। তারপর রাতদিন পুরনো দিল্লির অলিগলি চষে বেড়িয়ে ইলোরা আর রায়হানের ওপর ক্রোধ নিভিয়ে ফেলা। হলিউডি ছবি দেখার মতো সস্তা আমোদে ডুবে যাওয়া ...তখনই পুরনো দিল্লির একটা সিনেমাহলের সামনে অনেকটা আকস্মিকভাবেই আমানডার সঙ্গে পরিচয় । স্লামডগ মিলিয়নিয়ার দেখে বেরুনোর সময় ভিড়ের মধ্যে আচানক আমানডার হ্যান্ডব্যাগটি ছিনতাই হয়ে যায়। সোনালি চুলের নীলাভ চোখের ফরসা বিদেশিনী মেয়েটি অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল; কৌশিকই ওকে বুঝিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে সাধারণ ডায়েরি করার জন্য নিকটস্থ থানায় নিয়ে যায়। থানায় ব্রিটিশ তরুণি আমানডা ডিক্সনকে যেভাবে তোয়াজ করল তাতে মনে হল ভারতে এখনও ব্রিটিশ শাসন বিদ্যমান। বাংলাদেশি বলে কৌশিককে পছন্দ করেনি অফিসারা, যেন কৌশিক পাকিস্তানি আতঙ্কবাদী । ওসির নাম শিবলাল ইয়াদপ। অল্পের জন্যে লোকটার নাকে ঘুষি মারেনি কৌশিক। আমানডা কে চা অফার করলেও কৌশিককে করেনি। আমানডা অবশ্য চা খেল না। তারপর থানার বাইরে চায়ের দোকানে যখন ওরা দুজনে মুখোমুখি বসল- ততক্ষণে ব্রিটিশ তরুণিটি অনেকখানি ধাতস্থ। মুচকি হেসে বলল, হ্যান্ডব্যাগে টাকা-পয়সা যথেস্ট ছিল না। হেটেলে রেখে গেছি মুভি দেখার আগে।
তুমি যথেস্ট বুদ্ধিমতী আছ। কৌশিক বলল।
আমানডা হাসল। পালটা প্রশ্ন করল। মুভি কেমন লাগল?
মন্দ না। এ আর রাহমান ভালো। কৌশিক বলল।
হ্যাঁ। ভালো। আমানডা মাথা নাড়ে। হাসল। তারপর জিজ্ঞেস করে, আপনি?
আমি কৌশিক আল আমিন। ডাক নাম রাতুল। নিবাস, ঢাকা শহরের কলাবাগান। সাংবাদিকতা করি। শখের ফটোগ্রাফার। ছেলেবেলার স্ট্যাম্পগুলি এখনও যতœ করে রেখেছি। এই আর কী। বলে কৌশিক কাঁধ ঝাঁকাল।
হি হি। আমি আমানডা ডিকসন; লিভারপুল শহরে বল্ডষ্ট্রিটে বাবা মায়ের সঙ্গে থাকি। চার্চ ষ্ট্রিটে পারিবারিক ব্যবসা, মানে জুয়েলারির শপ আছে। কি করব এখনও ঠিক করিনি। জাস্ট স্টাডি শেষ করেছি। ঘুরছি।
একা।
হু।
এই প্রথম আমানডা অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন টের পেল কৌশিক। কী এক ব্যথার চোরাস্রোত নীলাভ চোখের আড়ালে বয়ে চলেছে। কৌশিক কবি: এসব সহজে বুঝতে পারে।
অন্ধকারে ভেসে ওঠে ইলোরার মুখ ...
আমানডা কি হারিয়েছে?
চা স্টল থেকে বেরোতে বেরোতে রাত নটার মতন বাজল। ওরা আর হোটেলে ফিরল না। ঠিক করল, রাতভর ঘুরবে। রাতের পুরাতন দিল্লি। খিদে পেলে কোথাও নান রুটি আর শিশ কাবার খেয়ে নেবে। সাংবাদিক বলায় অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়েছে আমানডা। কাঁধের ঝুলি থেকে কবিতার বই বার করে অটোগ্রাফসহ উপহার দিল। কৌশিকের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘শিলালিপি থেকে পাঠ’ বইটি গত বইমেলায় বেরিয়েছিল। বইটি উপহার পেয়ে আমানডা পুরোপুরি বদলে যায়, কবি কৌশিক যেন অনেকদিনের পরিচিত। পরে জেনেছিল আমানডা সাজিটেরিয়াস। এরা ভীষণ আলাপি হয়, সম্পর্ক দ্রুত গড়ে তুলতে পারে। একটা রেস্টুরেন্টে দহিবড়া খেতে খেতে কৌশিক আমানডাকে রাধাকৃষ্ণের উপখ্যানটি বলে। ইন্ডিয়ান মিথটি নাকি অল্প অল্প জানে আমানডা।
কৌশিক বলল, এসব অল্পই জানা যায়। সবটা জানা যায় না।
আমানডা মাথা নাড়ে।
পরদিন ভোরে ওরা বাসে উঠল।
মথুরা জায়গাটা দিল্লির দক্ষিণ-পুবে। যেতে যেতে অনেক কথা হল বাসে। আমানডার হাতে একটা সুদৃশ্য মটোরোলা মাইলস্টোন। ঢাকায় এখনও এ জিনিস আসেনি। মাঝেমাঝে ফোন আসছে। কার সঙ্গে কথা বলছে ফিসফিস করে। মনে হচ্ছে চাপা গলায় কারও সঙ্গে ঝগড়া করছে। ব্যাপারটা না-দেখার ভান করল কৌশিক। তার বদলে জয়দেবের গীতগোবিন্দের কথা বলল কৌশিক। আমানডা বাংলা শিখবে। কৌশিক ওকে বাংলা শেখাতে রাজী হল। বলল: বল-
আকাশ ছড়িয়ে আছে নীল হয়ে আকাশে আকাশে
আমানডা বলল:
আকাশ ছড়িয়ে আছে নীল হয়ে আকাশে আকাশে
এবং এভাবেই ইলোরার মুখখানি অপসৃত হয়ে যেতে থাকে । তখনও জানেনি ও যে অচিরেই আমেনডাকে হারিয়ে ফেলবে! ‘শিলালিপি থেকে পাঠ’ থেকে ‘যে জন্য’ কবিতাটি অনুবাদ করে আমানডাকে শোনাল কৌশিক।
যে জন্য তোমায় ডাকি
অবেলায়;
শামুক-খুনিদের ভিড়ে মিশে আছো তুমি
দেবতারা তখন থেকে ডাকছেন
চল যাই।
কী এর মানে? আমানডা অবাক।
কৌশিক হাসে। সিগারেটে টান দেয়। ওরা এখন মাঝপথের যাত্রাবিরতিকে ধাবায় বসে চা পুরী খেয়ে নিচ্ছে। কবিতার কি সব মানে বোঝা যায়? পালটা প্রশ্ন করল কৌশিক। আমানডার মুখের ওপর জুলাই মাসের রোদ এসে পড়েছে। বাদামি রঙের ভ্র“ঁ। কুঁচকে আছে। ঘনঘন চোখের পাতা পড়ছে। আপনমনে বলছে: দ্য রিজন আই কল ইউ ইন আ ব্যাড টাইম ...
অবেলায় কি ইন আ ব্যাড টাইম হবে? আসলে কবিতা অনুবাদ অসম্ভব। ভাবল কৌশিক।
মথুরায় বাস স্টপে নেমে প্রথমে চিপ হোটেল খুঁজল ওরা। বেশি খুঁজতে হয়নি। কৌশিক এসব এলাকায় অনেকবার এসেছে। তবে হোটেলে বেশ ভিড়। ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে আমানডা ম্যানেজ করল।
বিকেল আর সন্ধ্যা যমুনার ঘাটে কাটিয়ে অনেক রাতে হোটেলে ফিরে এল ওরা। আমানডা বলে: আমার জ্বর জ্বর লাগছে। কই দেখি! কৌশিক সংস্কারবশত ওর কপালে আর গলায় হাত রাখে... তখনই আমানডা ঢলে পড়ে কৌশিককে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। এমনটা যে হবে কৌশিক জানত। ছাইচাপা এক আগুন থাকে শরীরে । কৌশিককে গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরে আমানডা বলল, তোমাকে আমার ভালো লাগে। আমাকে বিবাহ কর। প্লিজ। আজ বিকেলে যমুনার ঘাটে বসে থাকার সময় আমানডা বলেছিল যে সেও আহত। আমি আর পারছি না। আই নিড সামওয়ান টু লাভ। কৌশিক দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে। দু’জনেই আহত। দু’জনেই আহত মানুষ মথুরায় এসে মিলেছে। অন্ধকারে ফিসফিস করে আমানডা বলে, আমার অতীত নিয়ে কোনও প্রশ্ন করবে না। প্লিজ।
ওকে।
এখন অন্ধকারে আমানডার তলপেটের কাছে হাত রাখে কৌশিক । টানটান মেদশূন্য কোমল জায়গাটি ঈষৎ উষ্ণ। ঈষৎ উষ্ণ আর ভিজে ভিজে। তিরতির করে কাঁপছিল। কেন কাঁপছিল ? আমানডা নগ্ন। ঘুমিয়ে আছে। হাত আর নিচে নামায় না কৌশিক, বরং সরিয়ে নেয়। ঘুমন্ত মেয়ে-শরীরে হাত না-রাখার কী এক অলিখিত সীমারেখা আছে যেন নৈতিকতায়। সে সীমারেখা লঙ্ঘন করা যায় না। হাত সরিয়ে সিগারেট ধরায় কৌশিক। তামাকের ধোঁওয়াও তো ঘুমন্ত মেয়ের ক্ষতি করতে পারে? যদিও আমানডা জাগ্রত অবস্থায় প্রচুর সিগারেট টানে। তা হলে? আমানডার সঙ্গে তার বৈধ সম্পর্ক নেই। আজ রাতেই কেবল গভীর আবেগ বশত আমানডা বলেছে: আমাকে বিবাহ কর। প্লিজ। সিগারেটে টান দেয় কৌশিক; আর-
অন্ধকারে ভেসে ওঠে ইলোরার মুখ
পরদিন দুপুরের দিকে আমানডা বলল, আজ না আমাদের সেই সাধু বাবার কাছে যাওয়ার কথা?
ও হ্যাঁ, চল। কৌশিক বলল।
কাল যমুনা ঘাটে বসে থাকার সময় একজন মাঝবয়েসি সাধুর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। মাথায় বাদামি জট পরা দীর্ঘ চুল, পরনে হলুদ পাঞ্জাবি, লাল রঙের সিল্কের লুঙ্গি।
সাধুর নাম শ্রীকৃষ্ণধন; আগে নাম ছিল বিশ্বনাথন আয়ার। বাড়ি দক্ষিণের ব্যাঙ্গালোরের কৃষ্ণরাজপুর। প্রথম জীবনে সংশয়বাদী ছিল। শ্রীকৃষ্ণকে স্বপ্ন দেখে সাধু হয়েছেন। সাধুর সঙ্গে টুকটাক কথা হল। আমানডাকে ইংরেজিতে বলল, গড হ্যাজ ম্যানেজড দি অ্যামাজিং ফিট অভ বিয়িং ওরশিপড অ্যান্ড ইনভিজিবল অ্যাট দ্য সেইম টাইম। সাধুর অমৃতবচনে আমানডা রীতিমতো ইমপ্রেসড। বাইবেলও নাকি মুখস্ত। কয়েকটি ভার্স শোনাল। আমানডার মুখচোখ থেকে বিস্ময় ঝরে ঝরে পড়ে।
সাধু বাবার আস্তানা শহরের বাইরে। ঠিকানা কালই দিয়েছিল। ওরা বাসে উঠে শহরের বাইরে
চলে আসে। তারপর বাস থেকে নেমে হাঁটতে থাকে। সরু গলি। মন্দির। ষাঁড়। দেওয়ালে আর বাড়ির কার্নিসে বাঁদর। একটা সিনেমাহল। স্লামডগ মিলিয়নিয়ার চলছে। ভিড়। সিনেমাহল ছাড়িয়ে গেলে মাঠ। আমবন। সাদা চুনকাম করা দেওয়াল। সবুজ রঙের দরজা।
এটাই।
হ্যাঁ। ২২/২; নিকুম্ভিলা।
নক করল কৌশিক। খানিক ক্ষণ পর একজন মাঝবয়েসি মহিলা খুলে দিল। ভিতরে সিমেন্টের উঠান। লাল রংকরা টবে গোলাপ ফুলের গাছ। চারদিকেই বারান্দা। টিনসেডের ঘর। এখন শেষ বিকেল। ধূপের গন্ধ পেল কৌশিক। মেঝের ওপর বসে ছিলেন, লাল রঙের মেঝের ওপর নীল রঙের শতরঞ্জি পাতা। তারই ওপর বসেছিলেন সাধু শ্রীকৃষ্ণধন। পরনে ধপধবে সাদা আলখাল্লা।
ও, আপনারা? আসুন। বসুন।
শতরঞ্জির ওপর ওরা বসল। এ ঘরে ধূপের গন্ধ তীব্র। বাঁ দিকে তবলা আর সেতার চোখে পড়ল কৌশিকের। টিনের মগে কী যেন খাচ্ছিলেন সাধু শ্রীকৃষ্ণধন। তার পিছনে সাদা চুনকাম করা দেওয়াল। তাতে বাদামি রঙে লেখা: গড হ্যাজ ম্যানেজড দি অ্যামাজিং ফিট অভ বিয়িং ওরশিপড অ্যান্ড ইনভিজিবল অ্যাট দ্য সেইম টাইম।
বাড়ি চিনতে অসুবিধে হয়নি? সাধু শ্রীকৃষ্ণধন জিজ্ঞেস করলেন।
না।
সাধু শ্রীকৃষ্ণধন অত্যন্ত আন্তরিক কন্ঠে বললেন, এই বাড়ি আসলে আমার পরম পূজনীয় গুরু দাদাহরির। তিনি এখন সুইডেন। ভক্তেরাই নিয়ে গেছে। এখন আমিই থাকছি। আসলে আমি বাস করি অন্যত্র।
দাদাহরি কে?
সে এক বৃহদায়তন চিন্ময় সত্ত্বা। নিরাকারের সাকার রুপ ধারণ করেছেন অপোরাক্ষ অনুভূতির বলে। স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করবেন না। পরমপদ্মের নির্যাস তিনিই লাভ করেছেন মহাগুরুর ভাবকৃপায় রুপমায়াদির বশে তিনিই নিত্য শুভ্র জ্যোতিরুপে উদয় হন ...
কৌশিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার মনে পড়ে অনেক কাল আগে লালা হরদয়াল নামে একজন ভারতীয় লেখক ভারতীয় ধর্মকে বলেছিলেন: শব্দ শব্দ শব্দ।
নিন, চা খান।
সেই হলুদ শাড়ি পরা মাঝবয়েসি মহিলা একটা ট্রেতে দুটো হলুদ রঙের টিনের মগ নিয়ে ঘরে ঢুকল। একটা প্লেটে পাঁপড় ভাজা। পাঁপড় ভাজা খেয়ে আমানডা ভারি প্রশংসা করল। একটু পর বলল, গুরুজী আমি ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ শিখব।
বেশ । শিখবে। তা হলে এবার বল,
পহেলা প্রহর মে সবকোই জাগে
দুসরা প্রহর মে ভোগী;
তিসরা প্রহর মে তস্কর জাগে
চৌঠা প্রহর মে যোগী।
তুলসী দাসের চৌখুপি। কৌশিক কোথাও আগে পড়েছে। আমানডা রিপিট করার চেষ্টা করে
তিসরা প্রহর মে তস্কর জাগে
চৌঠা প্রহর মে যোগী।
সাধু শ্রীকৃষ্ণধন চৌখুপি ব্যাখ্যা করছে। আমানডা মুগ্ধ হয়ে যায়। সাধু শ্রীকৃষ্ণধন এরপর গুনগুন করে গান ধরেন।
তেরে পাস হ্যায় হিরেমতি
মেরে মনমন্দিরমে জ্যোতি
মাত কার দু অভিমান রে বান্দা
ঝুটি তেরি শান রে
মাত কার দু অভিমান
চমৎকার গলা। নাহ্, লোকটার গুণ আছে। আমানডা তো আকর্ষন বোধ করবেই। সেতারও বাজাতে পারেন সম্ভবত। আমানডা বলল, সংটা ট্রান্সলেট করুন গুরুজী । প্লিজ।
সাধু শ্রীকৃষ্ণধন গানটার মানে বলে দিলেন।
কৌশিক টের পায়। আমানডা অভিভূত হয়ে যেতে থাকে। সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে। সাধুবাবা অনেকটা এগিয়ে গেছে। কৌশিকের শূন্য শূন্য বোধ হয়। কৌশিক আমানডাকে বলল, চল এবার ফিরে যাই।
না। আমি যাব না।
যাবে না মানে?
আমার যতদিন ইচ্ছে আমি এখানে থাকব ।
তোমার জিনিসপত্র?
কাল এক সময় যেয়ে নিয়ে আসব।
ওহ্। তা হলে কি আমি চলে যাব?
ভালো না-লাগলে চলে যেতে পার। ভালো লাগলে থাক।
কৌশিক বিষন্ন বোধ করে। উঠে দাঁড়ায়। সাধু শ্রীকৃষ্ণধন সেতার টেনে নিয়েছেন।
ঘরের বাইরে বারান্দায় বেরিয়ে আসে কৌশিক। সন্ধ্যার আকাশে ঝলমলে চাঁদ। মথুরার ওপর ধবল কিরণ ঢেলে দিচ্ছে। সেতারের ঝঙ্কার কানে আসে। সুরটা পরিচিত লাগল। ভারতবর্ষের এই মায়া।
সদর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সেই হলুদ শাড়ি পরা মাঝবয়েসি নারীটি কৌশিককে প্রণাম করে।
এই দৃশ্যটাই অনন্তকাল মনে থাকবে তার।
বাইরে বেরিয়ে আসে সে। একটা সিগারেট ধরায়। তারপর হনহন করে হাঁটতে থাকে। উদ্দেশ্যহীন । এমন কত কত রাত ঢাকার রাস্তায় হেঁটেছে সে। উদ্দেশ্যহীন । আজও অনেক ক্ষণ ধরে হাঁটল। আমানডার মুখটা মাঝেমধ্যে মনের মধ্যে ভেসে উঠছে। আমানডা এক আহত মানুষ। কৌশিকের সঙ্গে শরীরি প্রেমের ঘোর কেটে গেছে। আসলে ওসব ব্রিটিশদের কাছে নতুন কিছু না; আমানডা ইন্ডিয়ায় এসেছে মূলত অতীন্দ্রিয় রহস্যময়তার খোঁজে, তার খোঁজ পেয়ে গেছে আমানডা। এখন ওর দুঃখবোধ ঘোচাতে অন্যরকম আবহ চাই; হাইলি মিস্টিক স্পিরিচুয়াল ফিলিংস ...
জুলাই মাসের পূর্ণিমার রাত।
মথুরা শহরের উপকন্ঠে আজ রাতে জোছনার ঢল নেমেছে।
কে যেন বাঁশি বাজায় দূরে।
ঘোরের মধ্যে হাঁটতে থাকে কৌশিক ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

