মধ্যাহ্ন। গ্রীষ্মকালীন রোদ পড়ে ঝকঝক করছে গাজা শহর । গতকালও শহরটির ওপরের আকাশে মেঘ জমেছিল। আজ আর মেঘ-টেঘ নেই; আজ মেঘশূন্য ঝকঝকে একটি দিন। মেঘহীন একটি দিনে গাজা শহরটি কে ঝলমলে উজ্জ্বল দেখায়। গ্রীষ্মকালীন রোদে ঝকঝক করছে শহরটির দালানকোঠা, দেওয়াল ও ছাদ; জামে মসজিদের সোনালি গম্বুজ, ফুটপাত, ফুটপাত ঘেঁষা দেওয়াল। দেওয়ালে কালো কালিতে আরবিতে লেখা: ‘ইজরাইল নিপাত যাক।’ শ্লোগানটির ঠিক নিচেই মাহমুদ আব্বাসের একটি পোস্টার। পোস্টারটি ছেঁড়া। সম্ভবত হামাস এর কোনও রাগী সদস্য ছিঁড়ে ফেলেছে । কেননা, মাহমুদ আব্বাস এর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নমনীয়। অথচ, আব্বাস শব্দটির অর্থ সিংহ! আরবি শব্দ ‘হামাস’-এর মানে, উদ্দীপনা।
জামে মসজিদের উলটো দিকে আল জাহরা হাসপাতাল। ঝকঝকে কাঁচের চারতলা ভবন। তীব্র সাইরেন বাজিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালের মেইন গেট দিয়ে ঢুকে যায়। আজ সকাল থেকে সাইরেনের কর্কস শব্দে গাজা শহরটি বিপর্যস্ত। আল জাহরা হাসপাতালের পাশে একটি দৈনিক পত্রিকার অফিস। আল আওয়াব। হলুদ রংকরা পুরনো একটি দোতলা দালান। দুটি ভবনের মাঝখানে একটা গলি । গলিমুখে কালো পোশাক ও কালো মুখোশ পরা ক’জনকে দেখা যায়। হামাস । হাতে অটোমেটিক কারবাইন ছাড়াও ওদের কারও কারও কাঁধে রকেট লাঞ্চার। এরা ইজরাইলকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে চায়। কাজটা সহজ নয়। কেননা, পশ্চিমদিকের রাস্তায় ব্যারিকেড। তার ওপাশে ইজরাইলি সৈন্য। সৈন্যদের পিছনে একটি খাকি রঙের মেরকাভা ট্যাঙ্ক; মৃত্যুর আতঙ্ক ছড়িয়ে থেমে আছে।

মেরকাভা ট্যাঙ্ক;
এখন সময়টা মধ্যাহ্ন।
গ্রীষ্মকালীন রোদে গাজা শহরটি ঝকঝক করছে।
বাতাসে বারুদের গন্ধ।
অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের তীক্ষ্ম শব্দ।
৭২ বছর বয়েসী ইসাম হামদি এই মুহূর্তে হাসপাতালের উলটো দিকের জামে মসজিদের সামনে ৯ বছর বয়েসি নাতনী আসমাকে পাজঁকোলা করে দাঁড়িয়ে আছেন; ইজরাইলি সৈন্যরা গলিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা হামাস সদস্যদের লক্ষ করে গুলি ছুঁড়েছিল। গুলি লক্ষভ্রষ্ট হয়ে আসমার কপালে লেগেছে। ছটফট করে ওঠেছিল মেয়েটি। রক্ত গড়াচ্ছে। অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন ইসাম হামদি; তিনি হতভম্বের মতন দাঁড়িয়ে আছেন। ফুটপাতে কালো রঙের বোরখা পরা একটি মহিলা চিৎকার করছে। অ্যাম্বুলেন্সের কর্কস সাইরেন। হামাস সদস্যের ছোঁড়া ফাঁকা গুলির আওয়াজ। বারুদের গন্ধ, দূরে বাব আল খালিলের দিক থেকে ভেসে আসে বিস্ফোরনের শব্দ, ...
এবং এই মুহূর্তে ইসাম হামদি অবিশ্বাসী হয়ে গেলেন ।
একটি বুলেট আটকানোর ক্ষমতা যেহেতু সর্বশক্তিমান আল্লাতালার নেই!
মুমূর্ষ নাতনীকে পাজকোলা করে দাঁড়িয়ে আছেন ৭২ বছর বয়েসী ইসাম হামদি । যেহেতু আসমা গুলিবিদ্ধ! হঠাৎ বৃদ্ধের কী হল-রাস্তায় ব্যারিকেড তুলে দাঁড়িয়ে থাকা ইজরাইলি সৈন্যদের দিকে প্রতি দৌড়ে যেতে থাকেন ... যেখানে সৈন্যদের পিছনে মৃত্যুর আতঙ্ক ছড়িয়ে একটি খাকি রঙের মেরকাভা ট্যাঙ্ক থেমে আছে। সকলই যখন অর্থহীন, তখন আর বেঁচে থেকে কী লাভ। রাস্তায় গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। আসমার রক্ত। বাতাসে বারুদের গন্ধ। ঝকঝকে একটি দিন; গ্রীষ্মকালীন দিন। মহিলার চিৎকার ... অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন ... ফুটপাতের দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা তরমুজ বিক্রেতার চোখে আতঙ্ক ... সবুজ ফিলিস্তিনি পতাকা ... মাহমুদ আব্বাসের ছেঁড়া পোস্টারের পাশে দাঁড়িয়ে সাদা স্কার্ফ পরা মাঝবয়েসি একজন মহিলা কোরান তুলে দেখাচ্ছে ইজরাইলি সৈন্যদের ...যদিও এই মুহূর্তে ইসাম হামদি অবিশ্বাসী হয়ে গেলেন ।
আল আওয়াব পত্রিকার দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন মাহমুদ দারবিশ; চোখ রাস্তার দিকে নিবদ্ধ । ওপাশের রাস্তায় অনেকটা ইয়াসের আরাফাতের মতন দেখতে মাথায় সাদাকালো কেফফিয়ে জড়ানো একজন বৃদ্ধ। বৃদ্ধের পরনে সাদা জোব্বা। জোব্বায় রক্তের ছোপ। পাজকোলা করে একটি বালিকাকে ধরে রেখেছেন। বালিকার সোনালি চুল। মেয়েটি কি মারা গেছে?
মাহমুদ দারবিশ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

মাহমুদ দারবিশ কবি। আল আওয়াব পত্রিকায় নিয়মিত তাঁর কবিতা ছাপা হয়। কখনও গাজায় এলে দৈনিক আল আওয়াব পত্রিকার অফিস আসেন। সম্পাদকের সঙ্গে আড্ডা মারেন। সম্মানী বুঝে নেন।
মাহমুদ দারবিশ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
চোখ রাস্তার দিকে নিবদ্ধ । সোনালি চুলের বালিকাটি সম্ভবত মারা গেছে । জন্মাবধি মাহমুদ দারবিশ এ রকম নির্মম দৃশ্য অনেকবারই দেখেছেন। মাহমুদ দারবিশ এর জন্ম ফিলিস্তিনের গালিলি প্রদেশ । এর পশ্চিমে আল বিরওয়া নামে একটি গ্রাম; সে গ্রামেই ১৩ মার্চ ১৯৪১ সালে মাহমুদ দারবিশ এর জন্ম। বাবার নাম সালিম দারবিশ। ছিলেন মুসলিম ভূস্বামী। মুসলিম বলার কারণ? তৎকালে ফিলিস্তিনের পশ্চিম গালিলি প্রদেশে খ্রিস্টানসহ অন্য অনেক জাতও বাস করত। কবির মায়ের নাম হওরিয়া। কবির মায়ের নাকি তেমন শিক্ষাদীক্ষা ছিল না।

পিতামহের কাছে হাতেখড়ি বালক দারবিশ এর । সে কথা ‘আইডেন্টটিটি কার্ড’ নামে বিশ্ববিখ্যাত কবিতা পাঠে জানা যায়।
আমার পিতামহ ছিলেন চাষী,
নীল রক্তের উচ্চবংশের নন।
বই পড়তে শেখার আগেই
যিনি আমাকে সূর্যের অহংকার শিক্ষা দিয়েছিলেন।
ইজরাইল রাষ্ট্রটি স্বাধীন ফিলিস্তিনের মাটিতে প্রোথিত হলে দারবিশ পরিবারটি চলে আসে লেবানন । ১ বছর পর আবার ফিলিস্তিনের আক্কায় চলে আসে। আক্কা জায়গাটি পূর্বে ফিলিস্তিনের অর্ন্তভূক্ত হলেও বর্তমানে উত্তর ইজরাইলে। জায়গাটির অবস্থান পশ্চিম গালিলি প্রদেশে। ওখানকারই আল বিরওয়া নামে একটি গ্রামে জন্মেছিলেন দারবিশ। এখানকারই একটি জায়গার নাম দেইর আল আসাদ। সেখানেই সেটল করে দারবিশ পরিবার। হাই স্কুলে ভরতি হয় বালক। পিতামহ শেখান সূর্যের অহঙ্কার। দিন যায়। ফিলিস্তিনের আদিবাসীদের ওপর ভূঁইফোড় ইহুদিদের লাঞ্ছনা প্রত্যক্ষ করে কিশোর। কিশোরের কবিতায় সেসব উঠে আসে। কিশোরের বয়স এখন উনিশ। হাইফায় চলে যায় সে। তো, হাইফা কোথায়? উত্তর ইজরাইলের সর্ববৃহৎ নগর হাইফা। নগরটিকে ইজরাইলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন বন্দরনগীরও বলা চলে। যা হোক। কবিতা লেখা চলছিল। ‘ডানাশূন্য চড়ুই’ (আসাফির বিলা আজনিহা) কাব্যগ্রন্থটি ছেপে বার করল তরুণ কবি।
... এখন বহুকাল পরে গাজার বারুদগন্ধী একটি ঝলমলে দিনে রাস্তায় সোনালি চুলের মুমূর্ষ বালিকা আর উদভ্রান্ত বৃদ্ধকে দেখে দারবিশের মনে কতগুলি কথা গুনগুনিয়ে উঠল। মনে মনে লিখলেন-
রাস্তাগুলি আমাদের ঘিরে ধরে
যখন আমরা বিস্ফোরনের ভিতর দিয়ে যেতে থাকি।
তোমার কি মৃত্যুর সঙ্গে জানাশোনা আছে?
অসংখ্য আকাঙ্খাসহ আমি জীবন ভালোবাসি
তুমি কি কোনও মৃতকে চেন?
আমি একজন প্রেমিককে চিনি।
রাস্তায় ব্যারিকেডের সামনে ইজরাইলি সৈন্যদের লক্ষ করে কতগুলি কিশোর পাথর ছুঁড়ছে । সৈন্যরা ফাঁকা আওয়াজ করে। কিশোররা হটে যায় না। ওরা কেউ পিতা হত্যার কেউ-বা মায়ের হত্যার প্রতিশোধ নিতে চায়। গলির মুখ থেকে গুলির শব্দ শোনা গেল। হামাস! ইসাম হামদির সেদিকে লক্ষ নেই। তিনি পাঁজকোলা করে আসমাকে ধরে রেখেছেন । রক্তে ভিজে যাচ্ছেন। আকিফ এর রক্ত। কারিমার রক্ত। তাঁর নিজের রক্ত। ইসাম হামদির একটিই ছেলে ছিল। আকিফ। ব্যবসা করত। বাব আল খালিলের কাছে কার্পেটের দোকান ছিল। গত বছর এই সময় ইজরাইলি সৈন্যদের গুলিতে আকিফ নিহত হয়। ইসাম হামদির পুত্রবধূ কারিমা। রামাল্লার মেয়ে। বিধবা কারিমার একটাই মেয়ে । আসমা। তিন দিন ধরে জ্বরে ভুগছিল আসমা। কাল বিকেলে পাড়ার হাদী ডাক্তার এসে দেখে গেছেন। জ্বর কমেনি। আজ করিমাই বলল, আব্বা, আসমাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সকাল থেকেই শহর উত্তাল। সকাল থেকেই দুপক্ষের গুলি বিনিময়। আসমার ফরসা মুখটি নীল হয়ে যাচ্ছিল। যানবাহন নেই। নিজেই পাঁজকোলা করে অসুস্থ নাতনীকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন ইসাম হামদি। মসজিদের পাশের গলি ছেড়ে রাস্তায় উঠতেই গুলি লাগে। কপালে।
কীভাবে বেঁচে গেলাম আমি!
আসমাকে কোলে নিয়ে ইসাম হামদি ইজরাইলি সৈন্যদের রাস্তায় ব্যারিকেড দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। যেখানে মৃত্যুর শীতল অনুভূতি নিয়ে খাকি রঙের একটি মেরকাভা ট্যাঙ্ক দাঁড়িয়ে... ইসাম হামদি ইজরাইলি সৈন্যদের রাস্তায় ব্যারিকেড দিকে প্রায় দৌড়ে যেতে থাকেন কেননা, কারিমার রাতে ঘুম হয় না। ইসাম হামদি জানেন। মাঝেমাঝে রাতভর কাঁদে কারিমা; কাঁদে যখন ওর শরীরে তৃষ্ণা জাগে; যখন আকিফ-এর সুদর্শন বলিষ্ট শরীরটি মনে পড়ে যায় । কারিমার কান্নার জন্য ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের এক ভোট গ্রহন দায়ী! এসব ভেবে বৃদ্ধ ইসাম হামদিরও রাতে ভালো ঘুম হয় না। হাইফা শহরের কথা মনে পড়ে তার, যেখানে জন্মেছিলেন তিনি । মনে পড়ে মা-বাবা ভাইবোনের মুখ। কে কোথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল! হায়! ৪০ বছর হল জন্ম-শহর হাইফা থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন। বন্দরনগরী হাইফা ভূমধ্যসাগর ঘেঁষে। পূবে নাজারাথ। উত্তরে হ্রদ টাইবেরিয়াস। হাইফা বন্দরে রোজ কতশত জাহাজ ভিড়ত। উড়ত গাঙচিল। গাজা শহরের পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর বলেই গাজা শহরের আকাশেও মাঝেমাঝেই গাঙচিলেরা উড়ে যায় । হায়, তারা তবু হাইফার মতো নয়। সারাদিন হাইফা শহরে ভাসত বিচিত্র এক লোনা গন্ধ; সেই গন্ধ আজও পান ইসাম হামদি। মাঝেমাঝে রাতের ঘুম বরবাদ করে দেয়। ভালো ঘুম হয় না। বাবার মুখটি স্মরণ হয়। ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ইসাম হামদির বাবা আজাম বাদরি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ঠিক ঐ দিনই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ফিলিস্তিনকে ভাগ করা হবে কি না তা নির্ধারণ করার জন্য সদস্য রাষ্ট্রদের মধ্যে ভোটের আয়োজন করে। ফিলিস্তিনে পৃথক রাষ্ট ইহুদিদের দাবী। ভোটের ফলাফল নিয়ে হাইফা শহরের বিরাজ করছিল গভীর উদ্বেগ। হাইফা শহরের কবরখানাটি ছিল ভূমধ্যসাগরের তীরে একটি পাইনবনের ভিতরে; নভেম্বর মাসের শেষ বলেই ভূমধ্যসাগরের শীতার্ত বাতাস দাঁত বসাচ্ছিল শোকার্ত ইসাম হামদির কপালে, চোখে। বাবাকে দাফন করে হু হু করে কাঁদছিল ইসাম হামদি। পাশে চাচা হারিত আল হাসান দাঁড়িয়ে। তিনিও হু হু করে কাঁদছিলেন। কাঁদছিলেন পিতৃব্য আবদুল ওয়ালি। কান্নার সঙ্গে মিশেছিল উদ্বেগ। কেননা, জাতিসংঘ বলছে যে, ফিলিস্তিন ভাগ হলেও বেথেলহেমসহ বৃহত্তর জেরুজালেম থাকবে আর্ন্তজাতিক নিয়ন্ত্রনে। ইহুদি নেতারা মেনে নিয়েছে। ফিলিস্তিনের আরব নেতারা মেনে নেয়নি। যে কারণে ভোটের আয়োজন। স্বাধীন মুসলিম দেশগুলি ফিলিস্তিন ভাগের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে নাকি। গোরস্থান থেকে বেরিয়ে খবর এল: ৩৩ /১৩ ভোটে ফিলিস্তিনকে দ্বিখন্ডিত করার প্রস্তাব পাস হয়ে গেছে। ১০টি দেশ ভোট দেয়নি। সমগ্র ফিলিস্তিনজুড়ে বিক্ষোভ দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে। জলদি বাড়ি ফেরা ভালো। ১৯৪৭ সালের দিকে ফিলিস্তিনে আরব ও ইহুদি ছাড়াও ব্রিটিশরা ছিল । তারাও নিহত হচ্ছে। একদল আরব যুবক ব্রিটিশ সৈন্যদের তাড়া করছিল। রাস্তায় আবদুল ওয়ালি ও হারিত আল হাসান ব্রিটিশদের গুলিতে নিহত হয়।
কীভাবে বেঁচে গেলাম আমি!
পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৪৮ সালে সংঘটিত হয় আরব-ইজরাইল যুদ্ধ। যুদ্ধের পর ক্রমশ ফিলিস্তিন অধিকার করে নিতে থাকে ইজরাইল । ইসাম হামদিদের হাইফা থেকে ট্রাকে তুলে দক্ষিণে গাজা স্ট্রিপের রিফ্যুজি ক্যাম্প ঠেলে দেওয়া হয়। গাজা স্ট্রিপে সর্বমোট ৮টি ক্যাম্প। অন্যতম রাফা ক্যাম্প। কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে শেষ অবধি আশ্রয় জুটল রাফা ক্যাম্পে । সদ্য বিয়ে করেছেন ইসাম হামদি। স্ত্রী আলিমাও হাইফার মেয়ে। তখনও আকিফ হয়নি। রাফা ক্যাম্পের দুঃসহ জীবনে আলিমার সুন্দর মুখটিতে কে যেন কালি লেপে দিয়েছিল। রাফা ক্যাম্পে পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই । পায়খানার সামনে ভোরে উঠে লাইন দিতে হয়। লাইনে দাঁড়িয়ে খিস্তিখেউড় করতে হত আপন জাতভাইকে। তখন খারাপ লাগত। কেননা, নির্বাসিত আশ্রয়কেন্দ্রে স্বজাত্যবন্ধন দৃঢ় হয়ে উঠেছিল। কুকুর বেড়ালের জীবন আশ্রয়কেন্দ্রে- তার ওপর আতঙ্ক। মাঝেমধ্যে ইজরাইলি সৈন্যরা এসে বাছাই করে ফিলিস্তিনি যুবকদের ট্রাকে তুলে নিয়ে যেত জাতিসংঘের কর্মীদের চোখের সামনে । তারা আর ফিরে আসত না। একবার ইসাম হামদিকে ট্রাকে তুলেছিল তারা। আলিমা ট্রাকের পিছন পিছন দৌড়ে আসছিল ... মাঝপথে কি মনে করে নামিয়ে দিয়েছিল। ... জ্ঞান হারিয়েছিল আলিমা... রাস্তার ওপর ঢলে পড়েছিল ... আকিফ তখন পেটে ... রিলিফের জন্য সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকত আলিমা, রাতে ঘুম হত না ...এখন অনেক বছর পর আলিমার পুত্রসন্তানের মৃত্যুর পর কারিমার রাতে ঘুম হয় না। মাঝেমধ্যে রাতভর কাঁদে কারিমা। না, কারিমার মুখ দেখে যায়নি আলিমা । আকিফ এর জন্মের পর আলিমা মারা যায়। ইসাম হামদি আর বিবাহ করেননি। রাফা ক্যাম্পের এক ধাইয়ের দুধ খেয়েছে আকিফ ।
এক বছর হল আকিফ বেঁচে নেই।
ইজরাইলি সৈন্যের গুলিতে নিহত হয়েছিল আকিফ। আজ আকিফ এর মেয়ে আসমা ...
৭২ বছর বয়েসী ইসাম হামদি আজ অবিশ্বাসী হয়ে গেলেন । না, করিমার সামনে দাঁড়ানো যাবে না। জামে মসজিদের উলটো দিকে আল জাহরা হাসপাতাল। হাসপাতালের দিকে না গিয়ে মুমুর্ষ নাতনীকে পাজকোলা করে ইসাম হামদি রাস্তায় ব্যারিকেড তুলে দাঁড়িয়ে থাকা ইজরাইলি সৈন্যদের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন যেখানে সৈন্যদের পিছনে একটি খাকি রঙের মেরকাভা ট্যাঙ্ক মৃত্যুর আতঙ্ক ছড়িয়ে থেমে আছে। হায়েনা! বেজম্মা! আফসোস! ওদের বিরুদ্ধে এই দীর্ঘজীবনে সম্মুখ সমর করা হল না।
এখন ৭২ বছর বয়েসে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হবেন ইসাম হামদি।
আল আওয়াব পত্রিকা অফিসের দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে মাহমুদ দারবিশ দৃশ্যটি দেখছেন। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কবি । তিনি কবি বলেই জানেন- বৃদ্ধটি মৃত বালিকাকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে না গিয়ে কেন রাস্তায় ব্যারিকেড তুলে দাঁড়িয়ে থাকা ইজরাইলি সৈন্যদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
উৎসর্গ: ভাঙ্গন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


