আজ সকাল থেকেই লন্ডন শহরের ওপরের হালকা নীল আকাশ থেকে রোদ ঝরছে । সেই নীল আকাশের বুকে ভাসছে শুভ্র মেঘের গুচ্ছ। আজ সকাল থেকেই উজ্জ্বল রোদে ঝলমল করছিল পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস, হোয়াইটচ্যাপেল, ব্রিক লেইন । ব্রিক লেইনের রাস্তার দু’পাশে লাল ইটের নির্বিকার দালানকোঠা, পুরাতন ফুটপাতে লোকজনের চলাচল, থেমে থাকা গাড়ির লাইন-; তবে লন্ডনের বাংলাটাউন নামে খ্যাত এই জায়গায় এই মুহূর্তে তেমন ভিড় নেই । মোবাইল ফোনটা কানে ঠেকিয়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে হাঁটছিল তানিম। ওর ডান পাশে রাস্তার উলটোদিকে সিটি স্পাইস, সেবা তন্দুরী, আলাদিন সুইট সেন্টার আর আলাদিন রেস্টুরেন্ট। তুর্কি মালিকানাধীন ক্লিফটন রেস্টুরেন্টটা আরেকটু সামনে। ওই রেস্টুরেন্টেই মাস তিনেক হল কাজ করছে তানিম । রেস্টুরেন্টের মালিক তুর্কি-নাম আগা আহমেত। ফরসা পঞ্চাশের মতন বয়স লোকটার , ভীষণ সময় সচেতন; তিরিশ বছর আগে লন্ডনে এসে রীতিমতো ব্রিটিশ হয়ে গেছে তুর্কিটি। দ্রুত হাঁটছে তানিম। সময় মত পৌঁছতে না পারলে বকবক করবেন আগা আহমেত । ইউরোপজুড়ে রিসেসন চলছে। এই সময়ে চাকরি হারালে সর্বনাশ। অনেক বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীর চাকরি নেই। কী যে কষ্ট করে পড়ছে তারা। টেলিফোনের অপরপ্রান্তে মা বলছিল, কষ্ট হলে চাকরিটা ছেড়ে দে তানিম।
তানিম আঁতকে ওঠে। বলে, না না। জব ছাড়া যাবে না। লন্ডনে জিনিসপত্রের যা দাম। ঢাকাতেই ভালো ছিলাম মা। এখানে এক
মা বলল, আমি আরও টাকা পাঠাবো? তোর মবিন খালু ডেমরার জমিটা কিনতে চাইছে।
তানিম বলল, না না। ডেমরার জমিটা বিক্রি করো না। তোমাকে টাকা ভাবতে হবে না। আমার যা ইনকাম হচ্ছে তাতে চলে যাবে।
ভালো করে খাওয়াদাওয়া করিস বাবা।
তানিম হাসল। বলল, আরে আমি খাওয়ার জায়গায় চাকরি করি মা। জানই তো আমার রেস্টুরেন্টের মালিক টার্কিশ; এরা খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে অনেক উদার।
ভালো করে পড়িস বাবা। তোর বাবার শখ ছিল বিলেতে ব্যারিষ্টারি পড়বে, হল না। এখন যদি বেহেস্ত থেকে তোকে দেখে শান্তি পায়।
আচ্ছা মা। আমি ভালো করেই পড়ব।
রোজ মায়ে ছেলের এমন সব কথা হয় । অনেক কষ্টে পয়সা বাঁচিয়ে রোজ একবার ঢাকায় ফোন করে তানিম। রোজ একবার মায়ের সঙ্গে কথা বলা চাই। ফোন অফ করে আশেপাশে একবার তাকায় তানিম। দূর থেকে মিসেস মেহনাজ শামসী কে আসতে দেখল তানিম । মাঝ বয়েসী দীর্ঘাঙ্গী মহিলাটি পাকিস্থানি। মিসেস মেহনাজ শামসীর পরনে সালোয়ার কামিজ। ব্রাডি স্ট্রিটে তানিমের প্রতিবেশি মহিলা। বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এই মহিলার ভারি বদনাম আছে। বাঙালিদের ভয়ানক অপছন্দ করেন মিসেস মেহনাজ শামসী । লন্ডন পৌঁছে প্রথম প্রথম তানিম এই বাঙালি বিদ্বেষের ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। পরে বাঙালিদের মুখে শুনে বুঝতে পেরেছে। একাত্তরের যুদ্ধের পর পাকিস্তানের সঙ্গে সর্ম্পক ঠিক আগের মত নেই-তানিম এসব জানে। তানিম অবশ্য মিসেস শামসীকে ঘৃনাও করে না বা শ্রদ্ধাও করে না। আসলে ও এসব নিয়ে তেমন ভাবেও না। ওর আগ্রহের বিষয় অন্য । মিউজিক। ঢাকায় থাকতে একটা ব্যান্ডে ড্রামস বাজাত তানিম। রেগুলার কনসার্ট করত। লন্ডন আসার আগে সে চ্যাপ্টার শেষ করেই এসেছে। মিউজিক আর না-এখন থেকে মন দিয়ে পড়বে। নওরীন অপেক্ষ করছে। পড়াশোনা শেষ করে একটা জব নিয়ে নওরীনকে বিয়ে করবে । তানিমের ভাগ্যে মনে হয় মিউজিকই আছে । লন্ডন এসে ক’জন মিউজিশিয়ানের সঙ্গে পরিচয় হয়। জয়, সুজানা, আরাফাত ও শামস। এরা সবাই ছোট বেলা থেকেই লন্ডনেই বেড়ে উঠেছে । তবে বাংলা গান করে; “শতাব্দী” নামে একটা ব্যান্ড আছে এদের। সুজানা ব্যান্ডের ভোকাল। মেয়েটির গলা চমৎকার। মূলত ফোক ধাঁচের গান করে শতাব্দী। ওরা ড্রামার খুঁজছিল। তানিমকে অফার করলে সে ড্রামস বাজাতে রাজী হয়। সেই থেকে একসঙ্গে কনসার্ট করছে। বাঙালি কমিউনিটিতে শতাব্দী জনপ্রিয় ব্যান্ড। তানিম ও ব্যান্ডের অন্য সদস্যরাও জনপ্রিয়। বিশেষ করে সুজানা। হঠাৎ একটা দৃশ্য দেখে তানিমের ভ্রুঁ কুচঁকে যায়। ও থমকে যায়। মিসেস মেহনাজ শামসীর ঠিক পিছনে তিন চার জন তরুণ। ব্ল্যাক। আফ্রিকা না ওয়েস্ট ইন্ডিজের ঠিক বোঝা গেল না। লন্ডনের অনেক ব্যাপার এখনও বুঝে উঠতে পারেনি তানিম। লন্ডনে ব্ল্যাকরা সাধারনত মাইল এন্ড, স্টেফনি, প্যাডিংটন আর সেন্ট গিলস এ থাকে। ছেলেগুলোর হাঁটার ধরন এবং মুভমেন্ট ভালো লাগল না তানিমের। ও লক্ষ করে, সামান্য পৃথুলা মেহনাজ শামসী একটা ব্যাগ নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছেন; ব্ল্যাক তিনজন হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় এবং একজন মিসেস মেহনাজ শামসীকে অতিক্রম করে যায়। অন্যজন ঠিক পাশে জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢোকায়। তানিম যা বোঝার বুঝে যায়। তানিমের মূল আগ্রহ মিউজিক হলেও ও জানে পৃথিবীর যে কোনও স্থানে নারীর ওপর অ্যাটাক হলে জানবাজী রেখে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। চোখের পলকে দ্রুত দৌড়ে শূন্যে লাফিয়ে পড়ে তারপর তিজনজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তানিম। অতর্কিত আক্রমনে ছেলেগুলো প্রথমে হতভম্ব হয়ে পড়ে। শিকার ফসকে যাচ্ছে বলে ধস্তাধস্তি শুরু করে দেয়। এরপর গুলির ভয়ঙ্কর শব্দে ভীষণ ভাবে কেঁপে ওঠে ব্রিক লেইন। ঢলে পড়ল তানিম । এখুনি পুলিশ আসবে। ছেলেগুলো এদিক ওদিক পালিয়ে যায়।
ফুটপাতের কিনারায় ব্রিক লেইনের লাল দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ফ্যাকাশে ভয়ার্ত মুখটা ঢেকে থরথর করে কাঁপতে থাকেন মিসেস মেহনাজ শামসী ।
ছিনতাইকারীর আক্রমনের সময় একজন বাংলাদেশি ছাত্র জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একজন পাকিস্তানি মহিলাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে; সেই বাংলাদেশি ছাত্রটি এই মুহূর্তে হোয়াইটচ্যাপেল এর রয়েল লন্ডন হাসপাতালে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে - এ ঘটনাটি পূর্ব লন্ডনের দক্ষিণ এশিয় কমিউনিটিতে দারুন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ইতিহাস যে বৈরী তা সকলেই জানে। কাজেই এ ধরনের ঘটনা তো ঘটার কথা না ...
বাংলাদেশি ছাত্রটি কেন তাকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিল এ ব্যাপারে মিসেস মেহনাজ শামসীও নিশ্চিন্ত নন; তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ব্রাডি স্ট্রিটে নিজের ঘরে জায়নামাজ পেতে মেঝেতে ওপর বসে আছেন তিনি। ভারি বিষন্ন বোধ করছেন। ব্রিকলেইন পুলিশ স্টেশনে মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে দেড় ঘন্টা দীর্ঘ জবানবন্দি দিতে হয়েছে। তখন খুব ক্লান্ত লাগছিল। ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ এসেছিল। পুলিশের ধারণা বাঙালি ছেলেটি রুখে না দাঁড়ালে আজ তিনি খুন হতে পারতেন। বাংলাদেশি ছেলেটাকে রক্তাক্ত অবস্থায় হোয়াইটচ্যাপেল রয়েল লন্ডন হাসপাতাল ভর্তি করা হয়েছে। ব্রিকলেইন পুলিশ স্টেশন থেকে হোয়াইটচ্যাপেল যাননি। ঘরে ফিরে এসেছেন। মনে এজন্য এক ধরণের অস্বস্তি জমে উঠছিল। বাঙালিদের অপছন্দ করেন; অথচ এক বাঙালি ছেলে প্রাণ বাঁচাল। বাংলাদেশি ছেলেটা কাছেই থাকে। মাঝেমাঝে দেখেছেন। এড়িয়ে গেছেন। বাংলাদেশিদের পছন্দ করেন না মিসেস মেহনাজ শামসী । কাজেই এড়িয়ে যেতে হয়। আজ এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। ঘরে ফেরার পথে রাস্তায় ব্ল্যাক দেখলেই ভয় হচ্ছিল। ইকোনমিক রিসেসন চলছে, চাকরি-বাকরি নেই, সরকারি বেকার ভাতায় চলে না। লন্ডন শহরে বিশেষ করে টাওয়ার হ্যামলেট বরোয় ক্যারবিয়দের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়দের জীবনযাত্রার মান উন্নত বলেই প্রতিহিংসাবশত মাঝেমধ্যেই ইর্ষাকাতর ক্যারবিয়রা লুঠতরাজের শিকার হয় দক্ষিণ এশিয়রা।
মিসেস মেহনাজ শামসী দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
হ্যাঁ, দক্ষিণ এশিয় হিসেবে তিনিও স্বচ্ছল জীবন যাপন করেন বৈ কী।
১৯৭২ সালে মিসেস মেহনাজ শামসী পাকিস্তানের লাহোর থেকে স্বামীর সঙ্গে বিলেত পাড়ি জমান । তখন শুরুটা আজকের মতো স্বচ্ছল ছিল না। যদিও লাহোরের এক বনেদি পাঞ্জাবি পরিবারে জন্ম মিসেস মেহনাজ শামসীর। ইস্ট পাকিস্তানে পাট শিল্পে কোটি টাকা ইনভেস্ট করেছিলেন মিসেস মেহনাজ শামসীর বাবা ইন্তেখাব জামান। ইষ্ট পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে গেলে কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ রেখে মারা যান ইন্তেখাব জামান। জীবন হয়ে ওঠে অনিশ্চিত। সদ্য বিয়ে হয়েছে মিসেস শামসীর। স্বচ্ছল জীবনের আশায় স্বামী মুস্তাক রেহমান এর হাত ধরে লন্ডন আসতেই হল। জীবন তখন ছিল কঠিন সংগ্রামে ভরা অনিশ্চিত । স্বামী মুস্তাক রেহমান যথেস্ট স্ট্র্যাগল করেছেন। স্বামীর পাশাপাশি তিনি নিজেও স্ট্র্যাগল করেছেন। গত বছর মুস্তাক রেহমান মারা গেছেন। স্ট্রোকে। মেহনাজ শামসীর একটিই ছেলে-জুনায়েদ অস্ট্রেলিয়া থাকে; দুটি মেয়ের একজন থাকে লিভারপুল ও অন্যজন ডাবলিন । ছেলেমেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। হ্যাঁ। মেহনাজ শামসীর জীবন এখন নিঃসঙ্গ হলেও উন্নত। দরিদ্র ইর্ষাকাতর ক্যারবিয়রা তাকে লক্ষবস্তুতে পরিনত করতেই পারে । আজ যদি বাংলাদেশি ছেলেটা আমাকে না-বাঁচাত? শিউরে উঠলেন মিসেস মেহনাজ শামসী।
জায়নামাজে বসে নিজের সঙ্গে অনেক ক্ষণ যুদ্ধ করলেন মিসেস মেহনাজ শামসী। তারপর উঠে দাঁড়ালেন । জায়নামাজ গুছিয়ে রেখে চেয়ারে বসলেন । তারপর টেবিলের ওপর থেকে কলম আর লেখার প্যাডটি টেনে খসখস করে লিখতে থাকেন: প্রিয় তানিম, শুভেচ্ছা নিও। আমার বিশ্বাস আল্লাহ্তালার অসীম রহমতে তুমি অচিরেই সুস্থ্য হয়ে উঠবে। আসলে ভুল আমারই হয়েছিল। আজ আমার ভুল তুমি ভেঙ্গে দিয়েছ। আমার ... আমার খুব খারাপ লাগছে এই ভেবে যে আমি বাঙালিদের ঘৃনা করতাম। কারণ, আমি মনে করতাম বাঙালিরা পাকিস্তানের চেয়ে ইন্ডিয়াকে পছন্দ করে বেশি, ইন্ডিয়ার কথা শুনেই বাঙালিরা পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়েছে। এখন আমি জানি সেভেনটি ওয়ানের যুদ্ধ নিছক গৃহযুদ্ধ (অধিকাংশ পাকিস্তানি যেরকম বিশ্বাস করে ...) ছিল না- ছিল বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধ। আজ আমার চোখ খুলে গিয়েছে। বাঙালিদের দাবীই সত্য ছিল, পশ্চিম পাকিস্তানিরা নানা দিক দিয়ে ইষ্ট পাকিস্তানের বাঙালিদের বঞ্চিত করেছিল। যাক, একাত্তরের যুদ্ধে আমার কয়েকজন নিকট আত্মীয় মারা গেছেন-তারা পাকিস্তানি আর্মিতে ছিল। ষাটের দশকে আমার বাবা ইস্ট পাকিস্তানে অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন ... ইস্ট পাকিস্তান স্বাধীন হলে আমাদের ভীষণ ক্ষতি হয়ে বলে আমি বাঙালিদের ওপর ক্ষেপে ছিলাম। তা ছাড়া পাকিস্তানে সরকারিভাবেই ১৯৭১ সম্বন্ধে ভুল ধারণা দেওয়া হয়। এ কারণে আজও অনেক পাকিস্তানি বাঙালিদের স্বাধিকার সংগ্রাম সম্বন্ধে মিথ্যে ধারণা আঁকড়ে ধরে আছে। যাক। আজ আমি বিশ্বাস করি বাঙালিরা জগতের শ্রেষ্ঠ এক জাতি ; যাদের দৃঢ় অবস্থান ন্যায়বিচার ও মূল্যবোধের পক্ষে। মায়ের প্রতি বাঙালিদের শ্রদ্ধা, গভীর মমতা ও আত্মত্যাগের তুলনা হয় না। বাঙালি চরিত্র সম্বন্ধে এতোদিন আমি ভুল বুঝে ছিলাম; সম্ভব হলে আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি কখনও বাংলাদেশে যাইনি তবে আমি জানি যে তোমাদের ফসলের মাঠ কী রকম সুবিশাল মনোমুগ্ধকর আর সোনালি। জগতের কয়েকটি শ্রেষ্ঠ নদীকে তোমরা করতলগত করে রেখেছ এবং তোমাদের বদ্বীপের সূর্যালোক অদ্ভুত সুন্দর ও উজ্জ্বল। কৃষ্ণকায় বাদামি রঙের মানুষেরা ন্যায়বিচার ও মূল্যবোধের পক্ষে। শুনেছি বাঙালিরা কোন্ এক কবির গান গায়, সম্ভবত টেগোর; তিনিও সত্য সুন্দর ও মহৎ। ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বকোণে আমার জন্ম না হওয়ার জন্য আমার আফসোস হচ্ছে ... মিসেস মেহনাজ শামসী। লেখা শেষ করে কাগজটি ভাঁজ করে একটা বাদামি রঙের ইনভেলাপে ভরে রাখলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ড্রয়ার থেকে ব্যাংয়ের চেকবই বার করলেন। চেকবই আর ইনভেলাপটা ব্যাগে রেখে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে দ্রুত নিচে নেমে এলেন । প্রথমে ব্যাংকে যাবেন তিনি। তারপর হোয়াইটচ্যাপেল এর রয়েল লন্ডন হাসপাতালে।
হোয়াইটচ্যাপেল রয়েল লন্ডন হাসপাতালটি পূর্ব লন্ডনের একটি বিখ্যাত হাসপাতাল। তারই উল্টোদিকের ফুটপাতে এই মুহূর্তে বাংলাদেশি কমিউনিটির নানা বয়েসি লোকজন দাঁড়িয়ে। প্রতেক্যের মুখ বেদনার চিহ্ন; প্রতেক্যের হাতে ফুল। এখনও সন্ধ্যা নামেনি। সন্ধ্যার পর সবার হাতে মোমবাতি জ্বলে উঠবে যদি না ততক্ষণে প্রত্যাশিত সংবাদ না আসে। গম্ভীর ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বাঙালিদের কারও কারও হাতে প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা: “ ফিরে এসো তানিম ”, “জীবন তোমাকে ডাকছে’,“ তুমি আবার ফিরে এসো গানের মঞ্চে।” পূর্ব লন্ডনের বাঙালি কমিউনিটিতে মিউজিশিয়ান হিসেবে পরিচিত তানিম । সে মূলত ড্রাম বাজালেও কী বোর্ড বাজিয়ে চমৎকার গান গাইতে পারে। গেল সপ্তাহে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লেবার পার্টির ক্যান্ডিডেট রৌশনআরা আলীর একটা সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান হয়ে গেল। সে অনুষ্ঠানে বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের “আমি ফুল/ বন্ধু ফুলের ভোমরা ” - এই জমজমাট গানটি গেয়ে উপস্থিত দর্শকশ্রোতার মন জয় করেছে।
ফুটপাতের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে সুজানা। অল্প অল্প কাঁপছে মেয়েটি। এইমাত্র তানিমের মা রওশন আন্টির সঙ্গে ফোন কথা হল। আন্টি ভীষন ভেঙ্গে পড়েছেন। ভেঙ্গে পড়েছে সুজানাও। আজ সন্ধ্যায় বেথনাল গ্রিন-এ কনসার্ট ছিল। কনসার্ট না-হয় বাদ দেওয়া গেল। তানিম ওর ভালো বন্ধু -কী যে অস্থির লাগছে। এই মুহূর্তে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে তানিম ; রওশন আন্টির একটাই ছেলে। রওশন আন্টি বিধবা। এখন কী যে হবে। সুজানার অবিরল চোখের জলে রাস্তার ওপাশের রয়েল লন্ডন হাসপাতালের গম্ভীর দালানটি ঝাপসা দেখায়।
বাংলাদেশিদের মৌন সমাবেশের আশেপাশে কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে। পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটে বাংলাদেশিরা গুরুত্বপূর্ন জাতিগোষ্ঠী। লেবার পার্টির থেকে এবার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রৌশনআরা আলীর এম পি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। পুলিশের নিরাপত্তা সেকারণেই। পথচলতি কয়েকজন কৌতূহলী শ্বেতাঙ্গ এগিয়ে আসে তারপর ঘটনার বিস্তারিত শুনে সমবেদনা প্রকাশ করে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বাংলাদেশি স্টুডেন্টটি মিউজিশিয়ান শুনে তাদের কেউ কেউ মৌন সমাবেশে যোগ দেয়।। মায়ের বয়েসি এক পাকিস্তানি মহিলাকে কৃষ্ণকায় দৃস্কৃতিকারীরা আক্রমন করেছিল। বাংলাদেশি ছেলেটি যে মহৎ হৃদয়ের অধিকারী সে ব্যাপারে সন্দেহ কী।
তামিমকে যারা যারা চেনে কিংবা যারা যারা তানিমক চেনে না-তাদের প্রত্যেকের মুখই বিমর্ষ দেখায় । সমবেদনা জানাতে এমন কী ক্লিফটন রেস্টুরেন্টটা মালিক আগা আহমেত ও এসেছেন। ঐ টার্কিশ ভদ্রলোক বাংলাদেশিদের তিনি আশ্বস্ত করতে এসেছেন। এই রিসেসনের সময় তানিমের জব যাবেই না, বরং প্রয়োজনে টাকাপয়সা লাগলে তাকে যেন জানানো হয়।
হঠাৎই ফুটপাতের ওপর দিয়ে হেঁটে আসা একজন মহিলার ওপর চোখ আটকে যায় সুজানার। মাঝ বয়েসী দীর্ঘাঙ্গী মহিলার পরনে সাদা রঙের সালোয়ার কামিজ। কাঁধ ও মাথা কালো ওড়নায় ঢাকা । দেখেই বোঝা যায় পাকিস্তানি। কেমন যেন চেনা চেনা লাগল মহিলাকে। সুজানার ভ্রুঁ কুঁচকে যায়। ইনিই কি সেই পাকিস্তানি মহিলা- যাকে বাঁচাতে আজ সকালে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েছে তানিম? হতে পারে। মহিলার হাতে ফুলের তোড়া। সুজানার কাছে এসে দাঁড়ালেন মহিলা । খানিকক্ষণ ইতস্থত করে বললেন, আমার নাম মিসেস মেহনাজ শামসী।
জ্বী, বলুন। সুজানার কন্ঠস্বর ভারী শোনালো।
কেমন আছে ছেলেটি?
আপনি কি তানিমের কথা বলছেন?
হ্যাঁ। মহিলা মাথ ঝাঁকাল।
এখনও সেন্স ফেরেনি। শ্বাস টেনে সুজানা বলল।
ওহ্। কোমায়?
হ্যাঁ। সুজানা তীক্ষ্মচোখে মহিলাকে দেখছে । কালো ওরনার ফাকে লালচে চুল, অভিজাত ফরসা মুখে রুক্ষ সৌন্দর্য। সে মুখে চাপা উদ্বেগ। সুজানা টের পেল মিসেস মেহনাজ শামসী কি যেন বলতে ।
ও ... ও আজ আমার জান বাঁচাল ... মিসেস মেহনাজ শামসীর কন্ঠস্ব জড়িয়ে যায়।
সুজানা মাথা নাড়ে। ওর চোখের জলের ধারা তখনও শুকায়নি।
এটা রাখ। বলে সুজানাকে ফুলের তোড়টি দিলেন মিসেস মেহনাজ শামসী । ‘ওহ!’ অস্ফুট শব্দ করে সুজানা ফুলের তোড়াটি নিল। মেহনাজ শামসী বললেন, তুমি কি তানিম কে ব্যাক্তিগত ভাবে চেন?
সুজানা বলল, হ্যাঁ আন্টি। আমরা বন্ধু। আমাদের ব্যান্ড আছে।
ওহ্, ইয়ে ...মানে ... তুমি কি তানিমের মায়ের টেলিফোন নাম্বারটা আমাকে যোগার করে দিতে পার?
হ্যাঁ। আন্টি। রওশন আন্টির নাম্বার আমার কাছে আছে।
রওশন?
সুজানা বলল, রওশন আরা আন্টি তানিমের মা।
ওহ্ ,। রওশন আরা। মিসেস মেহনাজ শামসী মনে মনে বললেন, কী আশ্চর্য! আমার মায়ের নামও তো রৌশনারা! বাঙালি কার যেন নাম রৌশনআরা আলী -এবার যার লেবার পার্টি থেকে এম পি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।
অনেক অনেক দিন পর এই মুহূর্তে নির্ভার লাগছে এই পাকিস্তানি মহিলার ; তার হৃদয়ের ওপর ভুলের বিরাট পাথরটি নেমে যাচ্ছে বলে ...
ততক্ষণে সুজানা জ্যাকেটের পকেট থেকে নকিয়াটা বার করেছে। বলল, এই যে বলছি, আপনি সেভ করে নিন। টেলিফোন নম্বর সেভ করার পর ব্যাগ থেকে একটি বাদামি ইনভেলাপ বার করে সুজানাকে দিয়ে মিসেস মেহনাজ শামসী বললেন, এটা তোমার কাছে রাখ।
কি? সুজানা অবাক।
একটা চেক। ট্রিটমেন্টের অনেক খরচ আছে। তানিমকে দিও।
ওহ্ । সুজানার ভিতরটা কেঁপে ওঠে। মুহূর্তেই ও অনেক কিছু বুঝে নেয়। ও জেনে যায় তানিমের জ্ঞান ফিরবে। তানিম আবার গান গাইবে।
আর একটা চিঠি আছে। তানিম যেন পড়ে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



