
একালের শিল্পীর আঁকা পাণিণি-র কল্পিত চিত্র। পাণিণি ছিলেন প্রাচীন ভারতের সংস্কৃত ভাষার একজন প্রথিতযশা grammarian বা বৈয়াকরণ। পাণিণি সংস্কৃত ভাষার সমন্বিত ব্যাকরণ গ্রন্থ রচনা করেন। সংস্কৃত ছিল তৎকালীন সময়ে ভারতীয় আর্যদের ধর্ম ও সাহিত্যে ধ্রুপদী ভাষা; পাণিণিকে একাধারে সংস্কৃত ভাষার জনক ও প্রতিষ্ঠাতার মর্যাদা দেওয়া হয়। অনেকেই আধুনিক ইউরোপীয় ভাষাবিজ্ঞানের জনক ফার্দিনান্দ সাসুরের ওপর পাণিণির প্রভাব লক্ষ করেছেন; আরেক কীর্তিমান ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কি তাঁর গবেষণায় পাণিণির ঋন সরাসরি স্বীকার করেছেন।
সংস্কৃত ভাষার বর্ণমালা
আমরা যাকে সংস্কৃত ভাষা বলি; সংস্কৃত ভাষায় এর নাম সংস্কৃতা। কোনও প্রাচীন ব্যাকরণে অবশ্য সংস্কৃত (সংস্কৃতা ) নামটি পাওয়া যায়না। শুদ্ধ ভাষার বিশেষণ রুপে সংস্কৃতা শব্দটি প্রথম উল্লেখ পাই রামায়ণে। আর্যরা ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বে ভারতবর্ষের পশ্চিম সীমান্তে প্রবেশ করে। এরপর আর্য ভাষার দুটি রুপ পরিস্ফূট হয়ে ওঠে। ১. প্রাচীন আর্য বা বৈদিক ভাষা; ২. অর্বাচীন আর্য বা সংস্কৃত ভাষা। প্রাচীন বৈয়াকরণ পাণিণি এই দুই ভাষার পার্থক্যকে ছন্দস ও ভাষা নামে অবহিত করেছেন। আরেক পন্ডিত, পতঞ্জলি বলেছেন,‘বৈদিক ও লৌকিক।’ এই বৈদিক ভাষার ব্যাকারণের কোনও প্রাচীন গ্রন্থ পাওয়া যায় না, তাই অনেকে পাণিণিরচিত ‘অষ্ঠাধায়ী নামক ব্যাকারণ গ্রন্থকেই বেদাঙ্গ বা বেদের অঙ্গ রুপে গ্রাহ্য করেন। অধ্যাপক ধীরন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘ পাণিনীয় ব্যাকারণ মানবমনীষার এক অত্যুৎকৃষ্ট নিদর্শন।’ (দ্র: ভূমিকা। সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস।)
এ জাতীয় গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে পাণিণির প্রজ্ঞার ছাপ ও স্বীকৃতি
James Wyatt Cook সম্পাদিত ENCYCLOPEDIA OF ANCIENT LITERATURE লেখা আছে: Th e defi nitive grammarian of classical Sanskrit, Pāniņi composed what is conceivably the most complete grammatical analysis that has ever been made of any language. Before Pāniņi’s description of Sanskrit, that language had existed principally in the mouths of its speakers and, like every language, had been in a continual state of fl ux.The earliest document to survive in Sanskrit’s predecessor language and near relative, the Vedic tongue, is the Rig- Veda . As the Vedic language developed into Sanskrit, and as the hymns comprising the Rig- Veda were compiled and arranged into a liturgy, pressures increased among the Brahmins—the priestly class—to stablilize Sanskrit in a fi xed liturgical form. Pāniņi’s grammar made such a usually desperate hope a reality. Th is is not to say that popularly spoken Sanscrit did not continue to change. It did, and it evolved into the various Indo- Aryan languages of modern northern India. Pāniņi’s grammar, however, established a standard of liturgical speech and writing that the Brahmins could and did enforce for many centuries.(পৃষ্ঠা, ৫৩৩)
পাণিণির সম্মানে ভারত সরকারের প্রবর্তিত ডাকটিকিট।
খ্রিস্টপূর্ব ৭ম শতকেই বৈদিক ভাষার তিনটি পৃথক উপভাষা বা স্তরের উল্লেখ পাওয়া যায়-উদীচ্য (উত্তর-পশ্চিম), প্রাচ্য (পূর্ব) ও মধ্যদেশিয় (মধ্যভূমি)। পাণিণির আমলে অঞ্চলভেদে কথ্য সংস্কৃতির রুপভেদ থাকলেও উদীচ্য বা উত্তর-পশ্চিম ছাঁদটিই ছিল শিষ্ট ভাষা। বিদ্বৎসমাজে ব্যবহৃত উক্ত শিষ্ট ভাষাকে ভিত্তি করে পাণিণি তাঁর ‘অষ্ঠাধায়ী’ নামক ব্যাকারণ গ্রন্থে প্রায় ৪০০০ সূত্রের মাধ্যমে আর্য ভাষার সর্বজনগ্রাহ্য (অর্থাৎ প্রাচ্য, উদিচ্য ও মধ্যদেশিয়) লেখ্য সাধুরুপ নির্ধারণ করলেন। তিনি আর্য ভাষা যে সংস্কার সাধন করলেন, কালক্রমে তাই শিষ্ট (স্টানডার্ড) ভাষারুপে সমাদৃত হল এবং এই পরিমার্যিত ও পরিশোধিত শিষ্ট আর্য ভাষাই সংস্কৃত নামে প্রচলিত।
এ কালের শিল্পীর আঁকা পাণিণির ছবি। মাতৃভাষার ওপর গভীর শ্রদ্ধা ছিল এই পন্ডিতের। জীবনের সহজ সুখে ভেসে না গিয়ে সংযমী জীবন যাপন করে রচেছেন এমন এক গ্রন্থ যা তাঁকে অমর করে রেখেছে।
পন্ডিতবর্গের অনুমান পাণিণির সময়কাল ৭ম-৪র্থ খ্রিস্টপূর্ব। তক্ষশিলার শালাতুর জনপদে এই বিশিষ্ট বৈয়াকরণ-এর জন্ম হয়। তাঁর মায়ের নাম ছিল দাক্ষী। বাবার নাম জানা যায়নি। একটি প্রাচীন শ্লোকে কবিদের প্রশংসায় দাক্ষীপুত্রের নামও উল্লেখিত। পাটলিপুত্রের প্রখ্যাত পন্ডিত বর্ষ ছিলেন পাণিণির শিক্ষাগুরু।
মানচিত্র। ষোড়শ মহাজনপদ। গান্ধার। উদীচ্য (উত্তর-পশ্চিম)
প্রাচীন গান্ধার রাজ্যের প্রধান দুটি শহর পুরুষপুর ও তক্ষশিলা। এখন যেটা পাকিস্তানের উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের রাজধানী পেশওয়ার। পুরুষপুর। পুরুষদের নগর। একদা মৌর্যদের সময়ে গান্ধার রাজ্যের রাজধানী ছিল। প্রতিষ্ঠাতা অযোধ্যার পুস্কর।
তক্ষশিলা। তক্ষশিলার অবস্থান বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাবে; ইসলামাবাদের ৩২ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। শিক্ষাসংস্কৃতিকে প্রাক-খ্রিস্টীয় যুগে অতুলনীয় নগর ছিল তক্ষশিলা। তক্ষশিলাকে যেমন মহিমা দিয়েছেন বৈয়াকরণ পাণিণি তেমনি অতুল প্রজ্ঞার অধিকারী চাণক্য বা কৌটিল্য।
তক্ষশিলার একটি স্থাপত্য। এখানেই এককালে বেঁচে ছিলেন পাণিণি।
‘সংস্কৃত’ শব্দের অর্থ সম্পূর্ন কিংবা নিখুঁত; এ কারণে ভাষাটিকে প্রাচীন ভারতে স্বর্গীয় ভাষাও ভাবা হত। যে কারণেএকে দেবভাষা বলা হত। পাণিণি পবিত্র দেবভাষা ও যোগাযোগের সাধারণ মাধ্যম হিসেবে আর্য ভাষার পার্থক্য তুলে ধরেছেন ‘অষ্ঠাধায়ী’ গ্রন্থে । পাণিণিরচিত ‘অষ্ঠাধায়ী’-র আটটি অধ্যায়; প্রতি অধ্যায়ের চারটি করে ভাগ। এসব অধ্যায়ে সংস্কৃত ব্যাকরণের সূত্র ও সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন। সংস্কৃত ব্যাকরণের ১৭০০টি মূল ধারণা সম্বন্ধে লিখেছেন। যেমন বিশেষ্য, বিশেষন, পদ, ক্রিয়া, কারক, বিভক্তি ইত্যাদি। স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণে শ্রেণিবিভাগ করে দেখিয়েছেন। বাক্যের গঠন, যৌগবিশেষ্য, এমন ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে মনেই হয় না ‘অষ্ঠাধায়ী’ গ্রন্থটি ২৫০০ বছর আগে লেখা।
অষ্ঠাধায়ী গ্রন্থের প্রচ্ছদ
ব্যাকরণের সূত্র ব্যাখ্যা করার সময় অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিক গণিতশাস্ত্রের সূত্রা অনুসরণ করেছেন ; পাণিণি ৪০০০ সূত্রের মাধ্যমে সমগ্র সংস্কৃতভাষাকে পুননির্মান করেছেন। ২৫০০ বছর ধরে যার তেমন পরিবর্তন হয়নি । এ প্রসঙ্গে জনৈক ইউরোপীয় লেখক লিখেছেন: An indirect consequence of Panini's efforts to increase the linguistic facility of Sanskrit soon became apparent in the character of scientific and mathematical literature. This may be brought out by comparing the grammar of Sanskrit with the geometry of Euclid - a particularly apposite comparison since,whereas mathematics grew out of philosophy in ancient Greece, it was ... partly an outcome of linguistic developments in India.
সংস্কৃত ভাষার নিদর্শন
পাণিণি কেবল বিদগ্ধ বৈয়াকরণই ছিলেন না, কবিও ছিলেন। রাজশেখর বসুসহ অনেক ভারতীয় পন্ডিত বৈয়াকরণ ও কবি পাণিণির অভিন্নতা প্রতিপাদন করেছেন।
পাণিণিরচিত একটি প্রেমসিক্ত শ্লোক ও তার বাংলা তর্জমা দিয়ে শেষ করছি।
ঐন্দ্রং ধনুঃ পান্ডুপয়েধরেণ/ শরদ্ দধানার্দ্রনখক্ষতাভম্।
প্রসাদয়ন্তী সকলঙ্কমিন্দুং / তাপং রবেরভ্যধিকং চকার।
শরতের পান্ডুমেঘে ইন্দ্রধনু আঁকা-
নায়িকার স্তনতটে যেন নখলেখা;
প্রসাদ কলঙ্কী চাঁদে শরৎ-প্রিয়ার
জাগালো অধিক তাপ বিরহী -হিয়ার।
তথ্যসূত্র:
ধীরন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়; সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস।
James Wyatt Cook সম্পাদিত ENCYCLOPEDIA OF ANCIENT LITERATURE
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মার্চ, ২০১০ সকাল ৭:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



