somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: সূর্যকেন্দ্রিক নরনারীগন

০৫ ই এপ্রিল, ২০১০ রাত ১০:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এখন শেষ বিকেল। চারিদিকে কনে দেখা রোদ ছড়িয়ে আছে। আকাশের রং ফিরোজা । ফিকে রংয়ের সে আকাশে অনেক পাখির উড়াল। শীত শেষের শালবন মূখর হয়ে উঠছে পাখিদের চিৎকারে আর ঝিঁঝি পোকার ডাকে। শেষ বেলার নরম হলুদ আলো ছড়িয়ে রয়েছে শাল গাছের পাতায় পাতায়।
শালবনের মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা কালচে পিচ রাস্তা। রাস্তার ঠিক পাশে একটি শাল গাছের পাশে কালো রঙের একটা ভোক্সওয়াগেন থেমে। সেই দিকে একবার তাকাল শূন্যতা। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যাগটা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
সূর্য শূন্যতার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ঠিকই শুনতে পায়। সেও এক বিলম্বিত শ্বাসের পতন রোধ করার চেষ্টা করে। শূন্যতা কালো রঙের ভোক্সওয়াগেন-এর দিকে যেতে থাকে । ওর হাঁটার ভঙ্গি ভারি অদ্ভুত। যেন হাঁটছে না, ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে শেষবেলার নরম হলুদ আলোয় ভেসে চলেছে। শূন্যতার মুখচোখে তিক্ততা। সূর্যর ওপর ভীষন রাগ হচ্ছে। সূর্য ওর কোনও কথা শুনছে না। ওর কথা শুনে সূর্য কেবলি হাসে ।
সূর্য শুকনো শালপাতার পায়ের ওপর পা তুলে ওপর শুয়ে থাকে; শুয়ে শুয়ে সিগারেটে সুখ টান দেয়। তারপর সিগারেট ছুঁড়ে ফেলে, সাবধানে,যদি শুকনো পাতায় আগুন ধরে ওঠে। চোখের কোণে শূন্যতার হাঁটার ভঙ্গি দেখে, শূন্যতার জন্য এক ধরনের মায়া অনুভব করে।
সূর্যর চারপাশে বিস্তর শুকনো শাল পাতা। তার ওপর সিগারেটের প্যাকেট, লাইটার, মোবাইল ফোন, কালো রঙের রংচটা একটা ম্যানিব্যাগ। শূন্যতা আজ সাদা রঙের শাড়ি পরেছে, শেষবেলার সোনারোদে ওর শ্যামলা শরীরটি অপূর্ব বিমর্ষ দেখায়। অতিরিক্ত মননশীল বলে এই নারীও সুখি হয়নি।
ফোনটা বেজে উঠল। তুলে নিয়ে দেখল মমিন দুলাভাই। ওর বুকটা ধক করে ওঠে। হ্যালো। কন।
হিরণ? টাকা কি যুগার হইল?
সূর্য বলল, না। টাকা এখনও যুগার হয় নাই। আপনার সঙ্গে রাত্রে দেখা করুম নে। বলে সেটটা অফ করে দিল। তবে উদ্বেগ কাটল না। শিরিন আপাকে অবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি করতে বলেছে ডাক্তার। মমিন দুলাভাইয়ের হাতে অত টাকা নেই যে বউকে হাসপাতালে ভর্তি করাবে। ছাপোষা মানুষ; ...এই সব ভাবনা ভর করলে সূর্যর হাত আপনা আপনি সিগারেটের প্যাকেটের দিকে চলে যায়। রাতে দেখা হলে কি বলবে মমিন দুলাভাইকে ? শূন্যতা শিরিন আপার অসুখের কথা জানে। অপরেশনের সব টাকা দিয়ে চেয়েছে।
সূর্য নেবে না ...
শূন্যতা ভোক্সওয়াগেন স্টার্ট নেয়।
ভটভট শব্দ করে কালো রঙের গুবরে পোকাটা নড়ে ওঠে।
ভারি অদ্ভূত মেয়ে এই শূন্যতা। ওকে টাকা ধার দিতে চায়; আমেরিকা নিয়ে যেতে চায়। সূর্য আমেরিকা যাবে না। ওর জন্ম যমুনাপাড়ের একটি গ্রামে। সেই গ্রামের আকাশে বালক হিরণের শৈশবে একদিন আকাশে মেঘ জমত, বৃষ্টির আগে শীতল হাওয়া বইত ...তারপর বৃষ্টি ঝরত ... হিরণ ভিজে যেত অঝোর বৃষ্টিতে ...যমুনা নামে এক নদীর পাড়ে ...কালো মেঘ জমা এই পলিমাটির দেশে মানবজন্ম পাওয়া যে পরম সৌভাগ্যের বিষয় - সে কথা হিরণ জানত। কেননা সে আশৈশব টের পেয়েছে তার আছে এক স্পর্শকাতর মন, সে মনের মাঝারে লালন করেছে ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ মতো ছড়া, তারপর ‘বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ঐ’ এর মতো কবিতা। যমুনা পাড়ের গ্রামের ছেলে তরুণ হিরণ তারপর গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় পড়তে আসে। কবিদের সঙ্গে মিশে, কবিতা লিখে ছাপিয়েছে ছোট কাগজে। ছদ্মনাম নিয়েছে: ‘সূর্য শ্রমণ’। এখন এ নামেই ওকে সবাই চেনে। কেবল কবি আল মাহমুদ ওর প্রকৃত নাম জানেন... এসব অনেক কাল আগের কথা। বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছে বছর ৬/৭ হল। লেখাপড়াটাও সেভাবে শেষ হল না ...
ভোক্সওয়াগেনটা কিছু দূরে থেমে আছে।
সূর্য সিগারেটের প্যাকেট, লাইটার, মোবাইল আর মানিব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে উঠে পড়ে। না, শূন্যতাকে আর রাগানো ঠিক হবে না। শেষ বেলার রোদ মুছে যাচ্ছে। চারিদিকে ঝিঁঝি আর পাখিদের ঐকতান। আধ-খাওয়া সিগারেট ছুঁড়ে ফেলে দিল শালপাতার ¯ত’পের ওপর -যদি শুকনো পাতায় আগুন ধরে ওঠে!
বহুকাল দাবানল দেখা হয় না ...
সূর্য গাড়িতে উঠে বসে। মনে মনে বলে, এই মেয়ে তুমি আমায় কিনতে পারবে না, আমি বাংলাদেশের ছেলে ...আমার নদী পদ্মা, আমার কবি রবীন্দ্রনাথ, আমার নেতা বঙ্গবন্ধু ...তুমি আমায় কিনতে পারবে না, বরং তুমিই থেকে যাওনা কেন বাংলাদেশে...চল, শান্তিনিকেতন যাই কিংবা কক্সবাজার ... এসব ভাবতে ভাবতে সূর্য সিগারেট ধরায়। শূন্যতা গাড়িতে স্টার্ট নেয়। মুখটা থমথম করছে। সূর্য একটু পরে বলে, তুমি বাংলাদেশে থেকে যেতে পার।
না। পারি না। শূন্যতার স্বরে রুক্ষতা ফুটে ওঠে।
কেন? সূর্য নরম স্বরে জানতে চাইল।
আশ্চর্য! বলে কেন! বাংলাদেশে ...ঢাকা শহরে কত অসুবিধা, দেখছেন না ...কারেন্ট থাকে না, ... রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বেরুলে জ্যাম, মেয়েরা গাড়ি চালালে লোকে তাকায়।
তিন বছর আগে তো এদেশেই ছিলে?
ছিলাম।
তা হলে?
তা হলে কি!
বাংলাদেশে থাকবে না কেন? এবার সূর্যর কন্ঠস্বরে রুক্ষতা ফুটে ওঠে।
আমেরিকা না গেলে বুঝবেন না এদেশে কি সমস্যা! শূন্যতার কন্ঠস্বর চড়ছে।
সূর্য চুপ করে থাকে। ঘাড় ফিরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। শেষ বেলার রোদ এখনও লেপ্টে আছে সারি সারি শালগাছের ডাল-পাতায়। আমেরিকা দেশটা কোথায়? কোথায় সেই সব পেয়েছির দেশ? সে ভাবিত হয়ে পড়ে। একদিন আমেরিকার সমস্ত জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে। তখন? যমুনা পাড়ের গ্রামে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবল সূর্য। কেন যে শহরে এল? শৈশবে ভারি স্পর্শকাতর একটা মন ছিল -তাতে ছড়া/কবিতায় আক্রান্ত হয়েছিল। স্পর্শকাতর মনের মানুষ কৌতূহলী হয়। শহরের কথা শুনেছিল এর-ওর মুখে। শহর দেখার ইচ্ছে ছিল। এখন সে ইচ্ছে মরে গেছে। এখন গ্রামে ফেরার দিনক্ষণ স্থির করা বাকি ... শূন্যতাও স্পর্শকাতর ও কৌতূহলী মনের অধিকারী। ওকে বলা দরকার আমেরিকা স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতা করেছিল; এখন ইরাক তছনছ করছে ...
ফোন বাজল।
মমিন দুলাভাই। সূর্য কেঁপে ওঠে। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা অফ করে দেয়। টেনশন টের পাচ্ছে। শিরিন আপা এখন কি করছে? সাত বছরের সেতু? চার বছরের সিয়াম? কত টাকা লাগবে অপরেশনে? শূন্যতা কি যেন বলছে। ঢাকায় ইন্টারনেট স্পিড স্লো ...যেন নেটের স্পিডই সব ...পলিমাটির এ ব-দ্বীপের আলো-বাতাসের কোনও বিস্ময়কর তাৎপর্য নেই ...হঠাৎই সূর্যর মনে হল ...শূন্যতার কথা বলার স্টাইলের সঙ্গে আবিদের এক্স ওয়াইফ নাজ-এর অনেক মিল আছে। আবিদ সূর্যর এক ঘনিষ্ট বন্ধু, তারই এক্স ওয়াইফ নাজ। শূন্যতা আর নাজ আবার দূর সর্ম্পকের কাজিন।
সূর্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
মোবাইলে মৃদু পিয়ানোর সুর বাজল। মেসেজ। নাজ পাঠিয়েছে। আমি বিদেশ চলে যাচ্ছি; আপনার বন্ধুকে দেখবেন। সূর্য তেমন অবাক হল না । মনে মনে ম্যাসেজের উত্তর দিল:

তুমি ফিরে এসো নাজ
ফুলগুলো সব শুকিয়ে ঝরে যাচ্ছে ...

নাজ সিটিসেল এ চাকরি করত। হঠাৎ কী হল-আবিদের বিরুদ্ধে এটা-ওটা নিয়ে অভিযোগ করতে শুরু করে। শেষ তক সর্ম্পকটা টিকল না। (শূন্যতার সঙ্গে আমি আমেরিকা গেলেও আমাদের ওদেশে খুব ঝগড়া হবে? শেষ পর্যন্ত সম্পর্কটা ভেঙে পড়বে সম্ভবত। অপরিচিত একটা দেশে সেরকম সমস্যায় পড়লে কেমন লাগবে তখন?) ...নাজের সঙ্গে ডির্ভোসের পর আবিদ খুব ভেঙ্গে পড়েছে। সূর্য যতটুকু পারে সান্ত্বনা দেয়-আবিদ ওর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু ; এত বছর পর অন্য অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিলেও আবিদ নেয়নি; আবিদ অবশ্য কবিতা-টবিতা বোঝে না, তাতে ক্ষতি নেই -সে যে সূর্যর পরম বন্ধু-এই তো অনেক। নাজ এর সঙ্গে আবিদের ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর আবিদ আজকাল অত্যন্ত বিমর্ষ থাকে। আবিদের এখন একা থাকাটা অত্যন্ত বিপদজনক। নাজের সঙ্গে সম্পর্কটা কেন যে টিকল না? আবিদ ইদানীং মদ ধরেছে। আগে সিগারেটও খেত না। সূর্য বাধা দেয় না। কখনও সে নিজেই মগ বাজারের ‘ওয়াইন এম্পোরিয়াম’ থেকে রাম কিনে নিয়ে যায়। আবিদ ইনট্রোভার্ট। নাজকে গভীরভাবে ভালোবাসে। মদে যদি শান্তি পায় তো পাক।
আবিদের সঙ্গে শূন্যতার কোথায় যেন মিল আছে।
শূন্যতা বিয়ের পর আমেরিকা চলে গিয়েছিল। তারপর বরের সঙ্গে কী নিয়ে অ্যাডজাস্ট হল না। শূন্যতার এক্স-হাজব্যান্ড জামিল মোর্শেদও ‘শেল’-এ চাকরি করত ... হঠাৎ কী হল-শূন্যতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে থাকে ...তারপর সব জানাজানি হল। তারপর শূন্যতার বাবা জাষ্টিস খানমজলিশ মেয়েকে দেশে চলে আসতে বললেন ... সর্ম্পকটা ছাড়াছাড়ি করে তবেই ফিরে এল দেশে। শূন্যতার বাবার অঢেল পয়সা । ভালো ছেলে দেখে অঅবার বিয়ে করবে; ... এমনই এক সময়ে সূর্যর সঙ্গে শূন্যতার পরিচয় ... আবিদের বাসায়। তখনও নাজ এর সঙ্গে আবিদের ডির্ভোস হয়নি। ...ভারি অদ্ভূত মেয়ে এই শূন্যতা। ওকে টাকা ধার দিতে চায়; আমেরিকা নিয়ে যেতে চায়।
সূর্য আমেরিকা যাবে না।
কেননা, ওর জন্ম যমুনাপাড়ের একটি গ্রামে।
শূন্যতা যখন ওকে মহাখালির মোড়ে নামিয়ে দিয়ে লালমাটিয়ার দিকে চলে গেল তখন রাত ন’টার মতো বাজে । ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি করে বাসে ওঠে। ঘাম, সিগারেটের গন্ধ, পোড়া পেট্রোলের গন্ধ। অল্প অল্প খিদে পাচ্ছে মগবাজার নেমে আবিদের ফ্ল্যাটে যাবে- ওখানেই খেয়ে নেবে।
আজকাল ঘনঘন আবিদের ওখানে যেতে
হচ্ছে।
আবিদ একা।
দরজা খোলাই ছিল। ড্রইংরুমে টিউবলাইট জ্বলছিল। আবিদ লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে সোফায় বসেছিল। টিভি দেখছিল? মনে হয় না। ওর চোখে শূন্যতা। ভয়ানক শুকিয়ে গেছে, চোয়াল দু-পাশে বসে গেছে, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, উশখোখুশকো চুল । টিউব লাইটের আলোয় বিধ্বস্ত লাগছিল ওকে। ভার্সিটি জীবনে ফরসা গোলগাল দেখতে ছিল আবিদুর রহমান বাদশা। টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের এক কৃষক পরিবারের সন্তান - জমি বন্ধক রেখে পড়াশোনা শেষ করেছে। দেখতে ভালো আর ইংরেজিটা কী ভাবে যেন রপ্ত করেছিল- মতিঝিলের বেটার লাইফ ইন্সুরেন্সে চাকরি হয়ে গেল মাষ্টার্স শেষ করার আগেই। তার পর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন রহিম আফরোজে আছে। আজকাল অফিস যাচ্ছে না। চাকরি থাকবে কিনা সন্দেহ। বছর পাঁচেক আগে বিয়ে হল নাজ এর সঙ্গে...কী লাভ হল?
শার্টটা ঘামে ভিজে চপচপ করছে। ওটা খুলে খাবর টেবিলের চেয়ারে রেখে ফ্রিজ খুলে দেখল কী আছে। ডিম, পাউরুটি, এক ফালি তরমুজ, দু-তিনটে সাদা রঙের আইসক্রিমের বক্স। একটা বক্স খুলতেই বিচ্ছিরি গন্ধ বেরুচ্ছে। জিরার সম্ভবত। খিদে মরে গেল।
ঠান্ডা পানির বোতল নিয়ে আবিদের মুখোমুখি বসল।
আবিদ মুখ তুলে তাকাল না। তবে খসখসে গলায় জিজ্ঞেস করল, মৃত্যুর পরে কি আছে রে হিরণ?
সূর্য চমকে উঠল না। আবিদ আজকাল প্রায়ই এ প্রশ্নটা করে। সূর্য শান্তস্বরে বলল, অন্ধকার?
অন্ধকার। আর?
আর?
হ্যাঁ।
এক ঢোক পানি গিলে বলল, আর কিছুই নাই। শুধুই অন্ধকার।
হুমম।
কবিরা নিষ্ঠুর হয়। সূর্যও নিষ্ঠুর। ও জিজ্ঞেস করল, তুই মৃত্যুর কথা ভাবছিস নাকি?
হু।
আবিদের তিন বছরের মেয়ে আছে। সুমাইয়া। সূর্য বলল, সুমাইয়ার কথা একবার ভাববি না?
আবিদ চুপ করে থাকে। মনে মনে হিসেব কষছে। নাজ এর সঙ্গে বিয়েতে ওর বাবা রাজী ছিলেন না। টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের এক কৃষক আবিদের বাবা - ছেলেকে জমি বন্ধক রেখে পড়িয়েছেন। বিয়ের পর আর দেলদুয়ার যায় নি আবিদ। এখন মেয়েটাকেও হারাল।
ও এখন সর্বশ্রান্ত।
নাজ ...নাজ চলে যাচ্ছে অষ্ট্রেলিয়া। খসখসে গলায় বলল আবিদ।
সূর্য চুপ করে থাকে। ও টের পায় আবিদ সুইসাইডের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওর আর করার কিছু নেই ...

ওর পায়ের নিচে নরম পলিমাটি,
ঋনগ্রস্ত কৃষকের শরীরের ভারে ডেবে যাচ্ছে ...
খসে পড়ছে হাতের লগি ...
অসম্ভব ভারী ঠেকছে বৈঠা...
যমুনায় তুফান ...
পশ্চিমের করতোয়ার বাধ ভেঙে গেছে
নবীন ধানের চারার সমূহ সর্বনাশ ...
নিষ্ঠুর প্রকৃতির খেয়ালি আচরনের কাছে
ব-দ্বীপের মানুষ নিরুপায়...
কিছু করা যাচ্ছে না ...

সূর্য রাত এগারোটার দিকে নিচে নেমে আসে।
গলিতে অন্ধকার। সিগারেট ধরায়। আবিদকে দুটো ঘুমের ট্যাবলেট দিয়ে এসেছে। ঘুম হবে সম্ভবত। আজ রাতটা নিশ্চিন্ত। বড় রাস্তায় উঠে আসতেই শূন্যতার ফোন-
আমি শিরিন আপাকে নিয়ে শমরিতায় এসেছি; আপনি কি একবার আসবেন?
আসছি।
সূর্য বিরক্ত হলেও স্বস্তি বোধ করে। মমিন দুলাভাই নার্ভাস টাইপের মানুষ। শিরিন আপার কিছু হয়ে গেলে-মানসিকভাবে ভেঙে পড়বেন। শূন্যতার সিদ্ধান্তকে মনে মনে স্বাগত জানাল। তাছাড়া সূর্য নিরুপায়।
হাসপাতালের দিকে আর গেল না। বরং রাতের শহরের ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে শৈশবে ফিরে যায়। যমুনার পাড়ের একটি গ্রামে শিউলি ভোর, পেয়ারা গাছের ডালপালার ফাঁকে চুঁইয়ে পড়ত রোদ; আর রোদেলা উঠানে শিরিন আপা রঙীন কাগজের পাখার মতন ঘুরছে... কিশোরী বয়সে ভালোবাসত (বড় ভাবীর খালাতো ভাই) মঞ্জু ভাইকে। মঞ্জু ভাইয়ের বাড়ি বাহুলি, মাঝেমাঝে আসত। সবাই মিলে সিনেমা দেখতে যেত, অনেক রাতে পূর্ণিমার আলোয় পাথারের ওপর দিয়ে বাড়ি ফিরে আসত ...সেই মঞ্জু ভাই মালয়েশিয়া চলে যায়। আর ফিরে আসে না। শিরিন আপার লুকিয়ে লুকিয়ে কি কান্না ...আর বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকত শিরিন ...বৃষ্টি ঝরলে উঠানে শিরিন আপা ভিজত... তখন শিরিন আপার ফরসা সুন্দর মুখে দুঃখকষ্টে ছাপ মুছে যেত ...
আহ্, সেসব দিনে বৃষ্টি ঝরত উঠানে, নারকেল পাতায় সরসর সরসর শব্দ উঠত ...
সূর্য আবার সেইসব দিনে ফিরে যেতে চায়।
সূর্য রাতের ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে থাকে ...
সিগারেট টানে ...
আরও কিছুকাল পরে- যখন শীত শেষ হয়ে যায় আর আকাশে ঘনিয়ে ওঠে বৈশাখের মেঘ... শিরিন আপা মারা যায়, মমিন দুলাভাই অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে, শূন্যতা চলে যায়-যেখান থেকে একদিন ও এসেছিল, আবিদ সেচ্ছ্বায় মৃত্যুকে বরণ করে নেয়...
এভাবে সূর্য ভীষণ একা হয়ে যায় ...
অপরিচিত একটা শহর ছেড়ে যমুনা পাড়ের গ্রামের দিকে ফিরে যেতে থাকে ...

আজকাল আকাশভর্তি বর্ষার মেঘ আনাগোনা করে ...
চরাচরজুড়ে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হয় ...
বর্ষার নতুন জলে ভিজতে তার ভারি মধুর লাগে। শোক-তাপ- দুঃখ সব মুছে যায় ...
বৃষ্টিজলে ভিজতে ভিজতে সূর্যর দুঃখকষ্ট সব ফিকে হয়ে আসে ...
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×