বিদ্রোহী কবি। কেবলি কি বিদ্রোহী কবি? নজরুলের মতো একজন বহুমাত্রিক মানুষ কে কেবল বিদ্রোহী আখ্যা দিয়ে আমরা কী ভীষণ সংকীর্ণ অভিধায় সীমাবদ্ধ করে রেখেছি তাঁকে ! অবশ্যি এতে তেমন দোষও দেওয়া যায় না, কেননা নজরুল এমন এক অগ্নিঝরা সময়ে জন্মেছিলেন যে তাঁর পক্ষে বিদ্রোহী না হয়ে ওঠার উপায় ছিল না... সেই ১৯২১ সালেই গলায় হারমোনিয়াম বেঁধে কুমিল্লা শহরের রাস্তায় রাস্তায় ব্রিটিশবিরোধী গান গেয়েছেন। তবে নজরুলকে শুধুমাত্র বিদ্রোহী কবি আখ্যা দিলে কবির অন্যান্য মহিয়ান দিকগুলি যেন ছায়ায় ঢেকে যায়। যেমন নজরুল যে একজন ‘সন্ত’ও ছিলেন সে কথা জোর দিয়ে বলবার আজ সময় এসেছে ...
আজও নজরুলের সব লেখা আমার পড়া হয়নি। বিষয়টি অবশ্যই অত্যন্ত পরিতাপের। বয়স তো আর কম হল না। তবে মাঝে-মাঝে নজরুল পড়ি বৈ কী। যেমন আজ আকাশ অম্বরের ব্লগে এই অসাধারণ কবিতাটি পুর্নবার পাঠ করে শিউরে উঠলাম।
গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে সব কালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।-
‘পূজারী দুয়ার খোলো,
ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হ’ল!’
পড়তে পড়তে শরীর কেমন কেঁপে উঠল আমার ...
২
নজরুল কে নিয়ে একটি বই আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।
সে বইয়ের নাম ‘নজরুল স্মৃতি’। না, এটি কমরেড মুজাফফর আহমেদের লেখা সেই বিখ্যাত বইটি নয়, নজরুলকে যারা যারা খুব কাছ থেকে দেখেছেন তাদেরই স্মৃতিকথার একটি চমৎকার সঙ্কলন। বহু বছর আগে বইটি আমার হাতে এসেছিল। মনে আছে স্কুল ফাইনালের অবকাশে বইটি মন্ত্রমুগ্ধবৎ পড়েছিলাম। সঙ্কলনটির অনেক লেখাই আজ ভুলে গেছি। কেবল একটি লেখাই মনে আছে, মনে থাকবে চিরদিন, তবে স্মৃতিকথার লেখকের নামটি ভুলে গেছি, এতকাল পরে বইটিও আমার সংগ্রহে আর নেই।
যা হোক। সে লেখায় নজরুলের ‘সাধু’ হৃদয়ের কথাটি প্রকাশ পেয়েছে।
...নজরুল সে সময়টায় থাকতেন কলকাতার একটি মেসে । স্মৃতিকথার লেখক নজরুলের সঙ্গে সেই মেসে থাকতেন। মুসলমান মেস। এক দুপুরে নজরুল মেসে ফিরলেন, সেদিন গরুর গোশত রান্না হয়েছিল গোসল সেরে খেতে বসবেন ... এমন সময় একজন অতিথি এসে উপস্থিত হল। অতিথিটি সেই মেসেরই একজনের পরিচিত, থাকে গ্রামে । ভাত-তরকারি বাড়ন্ত, এখন আবার অতিথির জন্য ভাত-তরকারি রাঁধতে বসবে কে?
দেখা গেল নজরুল ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খেয়ে মেস থেকে বেরিয়ে গেলেন ক্ষুধার্ত অবস্থায়...
এই নজরুলই তো লিখেছিলেন না-
মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।
৩
আরেকটি বিষয়।
নজরুলের সর্বভারতীয় গ্রহনযোগ্যতার কথাও মাঝে-মাঝে ভাবি। বাঙলার যে নজরুল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বিস্ফোরক লেখনী শক্তির মাধ্যমে এত বড় অবদান রাখলেন -কুড়ি শতকে বাংলার বাইরে অর্থাৎ ভারতবর্ষের অন্যত্র কি চোখে তাঁকে দেখা হত। প্রশ্ন এই-নজরুল কেবল বাংলার না ভারতবর্ষেরও?
স¤প্রতি আনন্দবাজার পত্রিকার আর্কাইভের একটি ছবি দেখে আমার উত্তরটি যেন পেয়ে গেলাম। এখানেই বলে রাখি, এই অসাধারণ ছবিটি পেয়েছি ব্লগার দীপান্বিতার সৌজন্যে । ওর প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ।
৯ অগাস্ট ১৯৬৬ সালে কলকাতায় নজরুলের বাড়িতে সন্ত ফতেহ সিং দেখা করছেন নজরুলের সঙ্গে। সন্ত ফতেহ সিংয়ের জন্ম পাঞ্জাবে। তিনি বড় মাপের একজন শিখ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। অবশ্য পাঞ্জাবের সাধারন মানুষের কাছে তিনি কেবলই ‘সন্ত’ ...সন্ত অর্থ সাধু। যাদের হৃদয়ে ক্ষুধার্তের জন্য ক্ষুধার্ত থাকার মানসিক শক্তি থাকে। লক্ষ করুন, ছবিতে সন্তের সম্মানে উঠে দাঁড়িয়েছেন বাকরুদ্ধ চেতনারহিত নজরুল ...আর কি অদ্ভূত সুন্দর নজরুলের ৬৭ বছরের বৃদ্ধ মুখটি ... সন্ত ফতেহ সিংয়ের মুখের দিকে চেয়ে কি যেন ভাবছেন ...
১৯৬৬ সালের ৯ অগাস্ট পাঞ্জাবের এক সন্ত দেখা করলেন বাংলার আরেক সন্ত কবির সঙ্গে!
কবি নজরুল তো সন্তই ...
নিজে ক্ষুধার্ত থেকেও অপরিচিত লোকের দিকে ভাতে থালা ঠেলে দেওয়ার মানসিক শক্তি ছিল যার...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


