গৌতম বুদ্ধের একজন শিষ্য ছিলেন মৌদগল্যায়ন । পালি ভাষায় অবশ্যি ‘মৌদগল্যায়ন’ শব্দটি উচ্চারিত হয়: ‘মহামো¹ল্লান’ । যা হোক। ইতিহাসে ধর্মের অজুহাতে হত্যাকান্ড নতুন কিছু না, বৌদ্ধযুগের উগ্র বুদ্ধবিরোধীদের হাতে নির্মম ভাবে খুন হয়েছিলেন মৌদগল্যায়ন । এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছিল বুদ্ধের জীবনের একেবারে শেষের দিকে । অনুমান করতে পারি ... প্রিয় শিষ্যের মর্মান্তিক মৃত্যু বুদ্ধকে কাতর করে তুলেছিল । মৌদগল্যায়ন এর মৃত্যুর পটভূমিই এই নিবন্ধের বিষয়বস্তু।
মানচিত্রে প্রাচীন ভারত। প্রাচীন ভারতের মানচিত্র। খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ শতকে প্রাচীন ভারতে ট্রাইবাল সমাজ ভেঙে ১৬টি বৃহদাকার জনপদ বা রাজ্য গড়ে উঠেছিল। বৌদ্ধ সাহিত্যে এদেরকে সম্মিলিতভাবে ‘ষোড়শ মহাজনপদ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ষোড়শ মহাজনপদ- এর মধ্যে অন্যতম ছিল মগধ। মগধের রাজধানী ছিল রাজগৃহ। বর্তমানে বিহারের নালন্দা জেলায় প্রাচীন ওই নগরটির ধ্বংসাবশেষ রয়েছে ।
আমরা জানি যে, বৌদ্ধধর্মের প্রসারের পর পর প্রাচীন ভারতে অনেকগুলি বৌদ্ধ বিহার গড়ে উঠেছিল, যে বিহার ঘিরে বৌদ্ধসংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত ছিল। প্রাচীন মগধের নালন্দায় গড়ে উঠেছিল বৌদ্ধশিক্ষা কেন্দ্র বা বিহার । বর্তমান বিহারের রাজধানী পাটনার ৫৫ মাইল দক্ষিণ পুবে নালন্দায় এই বিশ্ববিদ্যালয় কমপ্লেক্স গড়ে উঠেছিল ।
বিহারের নালন্দা জেলায় অবস্থিত নালন্দা বিদ্যাপীঠের ধ্বংসাবশেষ। ৪২৭ থেকে ১১৯৭ খিস্টাব্দ অবধি এর অগ্রযাত্রা অব্যাহত ছিল।
তৎকালে, অর্থাৎ বৌদ্ধযুগে নালন্দার কাছে ছিল উপতিষ্য নামে একটি গ্রাম। সেই গ্রামে বাস করত উপতিষ্য এবং কৌলিত নামে দুই কিশোর। এরা ছিল পরস্পরের বন্ধু । এরা দুজনেই ছিল ধনবান ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান। তবে তারা অর্থহীন ভোগবিলাসে মত্ত হয়নি বলেই মনে হয়, উপতিষ্য এবং কৌলিত ... এর দু’জনেই ছিল জিজ্ঞাসু, পড়–য়া ও তত্ত্বদর্শী।
এই ডিজিটার যুগেও বিমর্ষ ভাবিত তরুণ-তরুণীর অভাব নেই ...এরা সুন্দর বিশ্বের কামনায় দিশেহারা ...
বর্তমান নালন্দা জেলার মানচিত্র। সে কালের মগধের রাজধানী রাজগৃহ বর্তমানে রাজগীর ।
যা হোক। সে কালে তরুণ-যুবাদের সংসার ত্যাগের প্রথা ছিল। তরুণ বয়েসে উপতিষ্য এবং কৌলিত সংসারের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল; কাজেই তারা সংসার ত্যাগ করল। গৃহত্যাগের আগে তারা বদলে ফেলল নাম । উপতিষ্যর মায়ের নাম ছিল সারী। যে কারণে উপতিষ্য ‘সারীপুত্র’ নাম ধারণ করে। পালি ভাষায় সারীপুত্র শব্দটি উচ্চারিত হয়: ‘সারীপুত্ত।’ পরবর্তীকালে বুদ্ধের অন্যতম শিষ্য হয়ে উঠেছিল সারীপুত্ত। তাঁকেই উদ্দেশ্য করেই বুদ্ধ বলেছিলেন, 'Oh,Sariputra, form is no other than emptiness, emptiness no other than form; form is precisely emptiness, emptiness precisely form.” (Jean Smith সম্পাদিত Radiant Mind) যা হোক। কৌলিত নিল ‘মৌদগল্যায়ন’ নাম । আমি আগেই লিখেছি, মৌদগল্যায়ন শব্দটি পালি ভাষায় উচ্চারিত হয় মহামো¹ল্লান । ‘মৌদগল্যায়ন’ নামের অর্থ অবশ্যি জানতে পারিনি।
সারীপুত্ত ও মৌদগল্যায়ন সংসার ত্যাগ করে উত্তর ভারতে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
রাজগীর (অতীত রাজগৃহ)। প্রাকৃতিক ভাবে সুরক্ষিত ছিল বলেই রাজগৃহ হয়ে উঠেছিল মগধের রাজধানী। উত্তর পশ্চিমে শোন ও গঙ্গা নদীর অবস্থান এবং দক্ষিণ পুবে ছিল পবর্ত শ্রেণি।
বৌদ্ধযুগে মগধ শাসন করতেন সম্রাট বিম্বিসার। এবং বিম্বিসার শব্দটি আমাদের কাছে মোটেও অপরিচিত নয়। কেননা... বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে ...এই বাক্যটি আমাদের অতি পরিচিত। সম্রাট বিম্বিসারের রাজপ্রাসাদটি ছিল মগধের রাজধানী রাজগৃহে।
শিল্পীর চোখে সম্রাট বিম্বিসার । মানুষ হিসেবে সম্রাট বিম্বিসার অত্যন্ত উদার ছিলেন। রাজগৃহ নগরে গৌতম বুদ্ধসহ নানা ধর্মমতের সাধুসন্ন্যাসীরা নিজ নিজ ধর্ম প্রচার করতেন। এদের প্রত্যেকের ধর্মমতের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন সম্রাট বিম্বিসার ।
মগধের রাজধানী রাজগৃহ নগরে যে সব দার্শনিক মত কিংবা ধর্মমত প্রচারিত হত তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল জৈন ধর্ম। জৈন ধর্মটি সুপ্রাচীন কাল থেকেই ভারতবর্ষে প্রচারিত হয়ে আসছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে জৈনধর্মের ২৪তম তীর্থঙ্কর বর্ধমান মহাবীর এই ধর্মটির চূড়ান্ত রূপ দান করেন। জৈন ধর্মের অনুসারীদের বলা হত নিগ্রর্ন্থ কিংবা তীর্থক। রাজগৃহ নগরে জৈন ধর্মের একজন বিখ্যাত তীর্থক সঞ্জয় বাস করতেন । সারিপুত্ত ও মৌদগল্যায়ন ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে রাজগৃহ নগরে এসে উপস্থিত হয়েছিল। তারা তীর্থক সঞ্জয়ের কাছে জৈনধর্মে দীক্ষিত হয়। তবে তারা সন্তুষ্ট হয়নি। এর কারণ জৈনধর্ম না তীর্থক সঞ্জয় কর্তৃক জৈনধর্মের ব্যাখ্যা তা বলতে পারি না। জৈনধর্মে অতিরিক্ত সংযমের কথা বলা হয়, যা অনুসরণ করা কষ্টসাধ্য।
ঠিক ওই সময়ে বুদ্ধ রাজগৃহ নগরে ধর্ম প্রচার করছিলেন।
অশ্বজিত নামে এক বৌদ্ধভিক্ষুর সঙ্গে সারীপুত্রের সাক্ষাৎ হয়। অশ্বজিতের কাছে বুদ্ধের চিন্তাভাবনার কথা শুনে সারীপুত্র বুদ্ধের সম্বন্ধে আগ্রহী হয়ে ওঠে । তখন অশ্বজিত বুদ্ধের সঙ্গে দেখা করার উপদেশে দিল। সারীপুত্র মৌদগল্যায়ন কে বুদ্ধের সঙ্গে দেখা করার কথা ভাবল। বুদ্ধের সঙ্গে দেখা করার জন্য সারিপুত্ত ও মৌদগল্যায়ন তীর্থক সঞ্জয়ের কাছে অনুমতি চাইলঅ তীর্থক সঞ্জয় ক্ষেপে উঠল! বুদ্ধের সর্ম্পকে কটূ কথা বললেন। প্রায়ই এই ঈর্ষাকাতর ধর্মীয় গুরুটি বুদ্ধের বিরুদ্ধে অমূলক কুৎসা রটান ও বুদ্ধের চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করেন এবং যে মিথ্যা অভিযোগ ক্রমশ ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং যার ফলশ্র“তিতে মৌদগল্যায়ন-এর অপমৃত্যু ঘটে। মৌদগল্যায়ন-এর মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ অবশ্য ভিন্ন।
বুদ্ধ। জীবনভর শান্তি ও কল্যাণের বাণী প্রচার করলেও ... অপবাদ ও কুৎসা পিছু ছাড়েনি ...
তীর্থক সঞ্জয় এর সংকীর্ণ মনের পরিচয় পেয়ে সারিপুত্ত ও মৌদগল্যায়ন বিস্মিত ও ব্যথিত হয়। ধর্মগুরু এত সংকীর্ণমনা হয়! তারা অবিলম্বে তীর্থক সঞ্জয় কে উপেক্ষা করে বুদ্ধের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। বুদ্ধের ব্যক্তিমায়া ছিল প্রবল, বাচন ভঙ্গি ছিল মনোরম, কথায় ছিল যুক্তি, মনোভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। যে কারণে সারিপুত্ত ও মৌদগল্যায়ন হৃদয়ে ভক্তি অনুভব করে। এবং কাল বিলম্ব না-করে বুদ্ধের কাছে দীক্ষা নেয়। উচ্চারণ করে ...আমি বুদ্ধের শরণ নিলাম, আমি ধর্মের শরণ নিলাম, আমি সংঘের শরণ নিলাম ...
বুদ্ধের ব্যক্তিমায়া ছিল বড় তীব্র। আজও তাঁর মৃত্যুর ২৫০০ বছর পরও তিনি বিশ্বজড়ে জাতিধর্মবর্ণনির্বিশেষে মানুষের মনে শ্রদ্ধার আসনে আসীন। তাঁর বাণী এতই মহৎ আর মানবিক যে স্বয়ং আইনস্টাইন একবার বলতে বাধ্য হয়েছন, আমি ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামাই না ... তবে কখনও কোনও ধর্ম গ্রহন করার কথা ভাবলে বৌদ্ধধর্মের কথাই ভাবব। বুদ্ধ নারীর প্রতি অত্যন্ত সহানভূতিশীল ছিলেন, তাঁর জীবদ্দশায় গৃহস্থ বধূরা তো বটেই -বৌদ্ধসাহিত্য থেকে জানা যায়, বৌদ্ধযুগের গণিকারা অবধি প্রত্যহ প্রভাতে বুদ্ধকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করত।
অল্প সময়ের মধ্যে সারীপুত্রের বাগ্মীতা ও মৌদগল্যায়ন এর কর্মদক্ষতা বুদ্ধকে সন্তুষ্ট করে। মৌদগল্যায়ন এর সাংগঠনিক গুলাবলী বৌদ্ধধর্মকে দিকে দিকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে এবং এই কারণেই বুদ্ধবিরোধীদের টার্গেট পরিনত হন মৌদগল্যায়ন ।
বুদ্ধের দর্শন অত্যন্ত মানবিক। সমস্ত রকম হিংসাবিদ্বেষসহ প্রাণী হত্যার বিরোধী ছিলেন বুদ্ধ। সেকালে বৈদিক ব্রাহ্মণরা ব্রহ্মার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পশুযজ্ঞের আয়োজন করত। বুদ্ধের কাছে যজ্ঞ ও ব্রহ্মার সন্তুষ্টির ব্যাপারটিই ছিল একাধারে কুসংস্কার ও নির্মমতা। তিনি যজ্ঞের পশুবলির তীব্র বিরোধীতা করেছিলেন। ফলে ব্রাহ্মণরা বুদ্ধ ও বুদ্ধের অনুসারীদের ওপর ভয়নাক ক্রোধান্বিত হয়ে পড়েছিল। উগ্র ব্রাহ্মণদের কয়েকজন মৌদগল্যায়ন কে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা আঁটে। কারণ, মৌদগল্যায়ন এর সাংগঠনিক গুলাবলী বৌদ্ধধর্মকে দিকে দিকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করছিল।
প্রাচীন ভারতের প্রাত্যহিক জীবনে গরুর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ন। গোসম্পদ রক্ষার্থে বুদ্ধের পাশে সেকালের ব্যবসায়ীরা এগিয়ে এসেছিল। এর কারণ ছিল। ব্রহ্মার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে বৈদিক ব্রাহ্মণরা যে পশুযজ্ঞের আয়োজন করত তাতে গোসঙ্কট দেখা দিয়েছিল। এ লেখার সূচনায় বৌদ্ধযুগের ষোড়শ মহাজনপদের কথা বলেছি। প্রাচীন ভারতের আর্ন্তঃবানিজ্যে গো-শটক এর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ন। হাজার হাজার গো-শকট অর্থাৎ গরুর গাড়ি নিয়ে স্বার্থবাহ বণিকের দল এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে বানিজ্যের উদ্দেশে পাড়ি জমাত। অনিবার্য কারণে বাণিজ্যের স¤প্রসারণ হয়েছিল, আরও গোসম্পদ প্রয়োজন হয়ে পড়েছি। বুদ্ধ পশুযজ্ঞের বিরোধী ছিলেন বলেই বুদ্ধের পাশে সে কালের ব্যবসায়ীরা এসে দাঁড়িয়েছিল। এই তত্ত্বের প্রবক্তা প্রখ্যাত পাঞ্জাবী ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার। অনেক মাকর্সবাদী ঐতিহাসিকও তত্ত্বটির সমর্থন করেন। যেমন ডি.ডি কোসাম্বী প্রমূখ। সে যাই হোক। বণিক-শ্রেষ্ঠীরা বুদ্ধের ধর্মের সমর্থন করলেও তারা মৌদগল্যায়ন এর হত্যাকান্ড রোধ করতে পারেনি।
তখন বুদ্ধের ঊনআশি বছর। বৌদ্ধসংঘের ভিক্ষুদের মধ্যে নানা রকম অবনতি দেখা দিয়েছে। আট বছর আগে কারাগারে মৃত্যুর হয়েছে উদারপন্থী সম্রাট বিম্মিসারের। মগধের সম্রাট এখন বিম্মিসারের পুত্র অজাতশত্র“ ; কট্টর লোক তিনি ... গঙ্গার উত্তরে কয়েকটি ট্রাইবাল রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আয়োজন করছেন। ওই সময়ে সারীপুত্র মারা গেলেন। বুদ্ধের হৃদয় ভেঙে যায়।
কার্তিকী অমাবস্যায় নিহত হলেন মৌদগল্যায়ন।
বুদ্ধের হৃদয় ভেঙে যায়।
জঙ্গি ব্রাহ্মণদের কয়েকজন মৌদগল্যায়ন কে পুড়িয়ে হত্যা করেছিল!
এই নির্মম ঘটনার এক বছর পর আশি বছর বয়েসে বুদ্ধ মহাপরিনির্বান লাভ করেন।
তথ্য নির্দেশ:
১. করুণা দত্ত: মৌদগল্যায়ন
২. শ্রী শান্তিকুসুম দাশ গুপ্ত : বুদ্ধ ও বৌদ্ধধর্ম এবং প্রাচীন বৌদ্ধসমাজ
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুন, ২০১০ দুপুর ২:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


