থেলমা কাল চলে যাচ্ছে । সাজিদ বলল।
আন্দালিব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তখন অল্প অল্প করে সন্ধ্যার গুমোট অন্ধকার ঢুকছিল ঘরে । জানালার ওপাশে বাড়িগুলির গায়ে লেগে থাকা রোদের ম্লান রং মুছে যাচ্ছিল। আর ফিরোজা রঙের আকাশে শেষবেলার রং বদলে যাচ্ছিল দ্রুত। সন্ধ্যার মুখের শীতল বাতাসের স্পর্শের আশায় ছাদের ওপর সারাদিনের বৃষ্টিহীন গরমে সেদ্ধ হওয়া মেয়েদের আর বালকদের জটলা।
সাজিদ আর আন্দালিব কার্পেটের ওপর পা-ছড়িয়ে বসে আছে।
মুখোমুখি ।
সাজিদের হাতে সিগারেট। বিকেল থেকে ঘনঘন সিগারেট টানছে ও। এ্যাশট্রে উপচে পড়েছে। ফিল্টারে আগুন ধরে গেছে, কটূ গন্ধ ছড়াচ্ছে। আন্দালিব পাশে ঠান্ডা পানির একটা বোতল। কিছুক্ষণ আগে ফ্রিজ থেকে বের করে এনেছে ও। দ্রুত এ্যাশট্রের ওপর পানি ঢালল। তাতে আগুন নিভল ঠিকই - তবে বাজে গন্ধটা আরও ঘন হয়ে উঠল।
ব্যাপরটা যেন খেয়ালই করল না সাজিদ। ওর পরনে কালো জিনস আর সাদা রঙের টি-শার্ট। টি-শার্টের ওপর গোলাপী রঙে ‘ফেয়ারওয়েল’ কথাটা লেখা। ‘ফেয়ারওয়েল’ কথাটা কি মারাত্মক! ওর মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চুল উশকো-খুশকো। আজ যেন সাজিদের চৌকোণ শ্যামল মুখটা বড় বেশি বিমর্ষ দেখাচ্ছে। সিগারেটে টান দিয়ে এক মুখ ধোঁওয়া ছেড়ে বলল, মায়ের কাছ থেকে আমি এ রকম কঠিন সিদ্ধান্ত আশা করিনি রে আন্দালিব ।
আন্দালিব মাথা নাড়ে। তারপর চুপ করে থাকে। সাজিদের মা রওনক আন্টির অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত ওকেও ব্যথিত করেছে। অথচ রওনক আন্টি অত্যন্ত উদার মনের মানুষ, ছেলেবেলা থেকেই রওনক আন্টি আন্দালিব-এর আদর্শ। ছেলেবেলায় আন্দালিব রওনক আন্টির কাছ থেকেই রবীন্দ্রসংগীতের হাতেখড়ি নিয়েছে ।
আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে
নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী স্বত্বে?
আন্দালিব আর সাজিদ তো পাশাপাশি বাড়িতে একই পাড়ায় বড় হয়েছে । একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরি, রাস্তার মুখে আলপনা আঁকা, ২২ শে শ্রাবণ, ১১ ই জ্যৈষ্ঠ, পহেলা বৈশাখ, বন্যার্তদের জন্য ত্রাণের বন্দোবস্ত - ছেলেবেলা থেকে কোনওবারই বাদ যায়নি...সবই হয়েছে রওনক আন্টির নেতৃত্বে। রওনক আন্টির সর্বাঙ্গে সারাক্ষণ কেমন এক সমাহিত ভাব, কেমন এক অর্ন্তগত আত্মশক্তিতে বলীয়ান। যা ঠিক ব্যাখ্যা করা যায় না। কোথাও কোনও অন্যায় হলে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন, কখনও-বা প্রেসক্লাবের সামনে অনশন। কারও-বা ব্যাক্তিগত শোকে অনিবার্য সেই রাবীন্দ্রিক উপদেশ ‘এই আগুনের পরশমনি ছোঁওয়াও প্রাণে, এ জীবন ধন্য কর দহন দানে।’ অথচ ... অথচ রওনক আন্টি ছেলের জন্য একটা মার্কিন মেয়েকে গ্রহন করতে নারাজ। এর কি কারণ? থেলমা ব্রুক আমেরিকান। আমেরিকান ব্ল্যাক। তাই? অথচ ... অথচ রওনক আন্টি অত্যন্ত উদার ও মানবিক মূলমন্ত্রে বিশ্বাস করেন। আন্দালিব এর আজও মনে পড়ে ছেলেবেলায় রওনক আন্টি গভীর তন্ময় হয়ে সুললিত কন্ঠে আবৃত্তি করতেন:
অন্তর মম বিকশিত করো
অন্তরতর হে।
নির্মল করো, উজ্জ্বল করো,
সুন্দর কর হে।
জাগ্রত করো, উদ্যত করো,
নির্ভয় করো হে।
মঙ্গল করো, নিরলস নিঃসংশয় করো হে।
অন্তর মম বিকশিত করো,
অন্তরতর হে।
যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে,
মুক্ত করো হে বন্ধ,
সঞ্চার করো সকল মর্মে
শান্ত তোমার ছন্দ।
চরণপদ্মে মম চিত নিঃস্পন্দিত করো হে,
নন্দিত করো, নন্দিত করো,
নন্দিত করো হে।
অন্তর মম বিকশিত করো
অন্তরতর হে।
আবৃত্তি শেষ করে রওনক আন্টি অনেক ক্ষণ চোখ বুজে থাকতেন। তারপর চোখ খুলে বলতেন, কবিগুরু এই কবিতাটি কোথায় বসে রচনা করেছেন?
শিলাইদহ। সাজিদের বোন লাবণী বলত।
সময়কাল?
২৭ অগ্রাহায়ণ ১৩১৪। হয়তো আন্দালিব কিংবা অন্যকেউ বলত।
এটি কোন্ কাব্যগ্রন্থের কবিতা?
গীতাঞ্জলি । আন্দালিব এর বোন শম্পা বলত।
রচনা সংখ্যা?
৫।
এমনই গভীরভাবে রওনক আন্টি ওদের রবীন্দ্রনাথের জগতে প্রবেশ করাত।
বুয়েটে পড়ছে আন্দালিব । সাজিদের মতো বাইরে পড়তে যেতে পারেনি। এ নিয়ে আক্ষেপও নেই ওর। যা হোক। আজও রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের সমাজজীবনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলে সে বিশ্বাস করে। আজও বাংলাদেশের কোথাও কোনও অন্যায় হলে ...ধরা যাক ....উগ্র জাতীয়তাবাদীরা নওগাঁ কি বান্দরবানের আদিবাসী গ্রাম পুড়িয়ে দিল ... বুয়েটের ক্যান্টিনে বসে হুঙ্কার ছাড়ে আন্দালিব:
যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে,
মুক্ত করো হে বন্ধ ...
রওনক আন্টি প্রণোদনায় এ পাড়ার কিশোর-কিশোরীরা এই মহত্তম শ্লোগান নিয়েই বেড়ে উঠেছে । আন্দালিব-সাজিদরা, শম্পা-সঞ্চিতারা। এবং অন্যান্যরা। রওনক আন্টির কারণেই এ পাড়ার পরিস্থিতি ঢাকা শহরের অন্যান্য পড়ার মতো নয়। যেমন, এ পাড়ায় ইভটিজিং নেই, বরং দেওয়াল পত্রিকা বেরয়, নিয়মিত খেলাঘরের আসর বসে। এ পাড়ার নিজস্ব ফুটবল-ক্রিকেট ও হকি টিমও রয়েছে।
তাহলে?
সাজিদের পছন্দের মেয়ে থেলমা ব্র“ক আমেরিকান। আমেরিকান ব্ল্যাক। কৃষ্ণকায়। তাই রওনক আন্টি ছেলের বউ হিসেবে গ্রহন করতে পারছেন না?
আন্দালিব হতাশ বোধ করে। এক অভিন্ন পৃথিবীর স্বপ্নে বিভোর ও । যে পৃথিবীর মূলমন্ত্র - যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ। আন্দালিব অস্বস্তি বোধ করে। সাজিদের মুখের দিকে তাকায়। সাজিদের মুখ ধোঁওয়ায় ঢাকা পড়েছে। তবে বোঝা যায় বিমর্ষ সাজিদ এর কপালে ঘামের স্রোত বইছে। এইসব জুনের দিনগুলো পুড়ে যাচ্ছে, পুড়ে যাচ্ছে শহর ঢাকা। পুড়ে যাচ্ছে নাগরিক আশা-ভরসা। এরই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাজিদের দুঃখকষ্ট। থেলমার জন্য ওর অনিবার্য বিরহ-দূরত্ব।
হঠাৎই আন্দালিব এর মনে পড়ল ... সাজিদ যখন আমেরিকা থাকতে প্রথম ই-মেইলে থেলমা সম্পর্কে বলেছিল...আমার সঙ্গে একটি মার্কিন মেয়ের পরিচয় হয়েছে। ওর নাম, থেলমা, থেলমা ব্রুক । জানিসই তো গত সামারে নেভাদার রেনো শহরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ওখানেই একটা বারে আমি থেলমাকে এক বৃষ্টিশূন্য দিনে প্রথম দেখি । কৃষ্ণবর্ণের দীর্ঘ শরীর, কোঁকড়া চুল, মিষ্টি মুখে টলটলে চোখ । মুহূতেই আমি ওর নাম দিলাম:‘কৃষ্ণকলি।’ সময়টা গ্রীষ্ম কাল। বেশ ক’দিন ধরে নেভাদায় বৃষ্টি হচ্ছে না। থেলমা গিটার বাজিয়ে গান করছিল। বৃষ্টির গান। থেলমা গাইছিল:
Summer rain
Whispers me to sleep
And wakes me up again
Sometimes I swear I hear her call my name
To wash away the pain
My summer rain
ঠান্ডা বিয়ার খেতে খেতে থেলমার গান শুনে আমার মনে হল যেন সত্যিই আজ বৃষ্টি নামবে। সত্যিই তাইই হল। সন্ধ্যের মুখে বৃষ্টি নামল। আমরা সবাই বারের বাইরে শিশুদের মতো ছুটে গেলাম। তারপর রাস্তার ওপরই ভিজতে শুরু করলাম নেভাদার বিখ্যাত বৃষ্টির ভিতর । তুই তো জানিস ...সে সময় আমার আফরোজার সঙ্গে ব্রেকআপ হয়ে গেছে। বৃষ্টির ভিতর ভিজতে ভিজতে আমি আর আফরোজার কথা ভাবছিলাম না, প্রাণপন অন্য কাউকে চাইছিলাম ... আমি থেলমার হাত ধরার কথা ভাবছিলাম। অঝোর বৃষ্টির ভিতরেই কী করে যেন থেলমা আমার চোখের ভাষা বুঝতে পেরেছিল ঠিকই। বৃষ্টির শব্দের ভিতরই আমার চোখে মুগ্ধতা ওই কৃষ্ণকায় মেয়েটি ঠিকই দেখে ফেলেছিল। ...তারপর বৃষ্টি থামল। আমরা বারে ফিরে এলাম। আস্তে আস্তে জানলাম থেলমাদের বাড়ি নেভাদার রেনো শহরের উপকন্ঠে। থেলমার মা স্কুলটিচার। মিসেস ব্রুক বিধবা। আর থেলমা মিউজিক নিয়ে পড়ছে। মিসেস ব্র“ক আমার নাম শুনে মৃদু হাসলেন শুধু। আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। কেননা তিনি জানেন, এ পৃথিবীটা অনেক বড়, আর তাতে নানা রঙের মানুষের বসবাস। যাক। আমার তখন ঘোর ঘোর অবস্থা। কার জন্য ভালোবাসা কোথায় যে অপেক্ষা করে থাকে। আশ্চর্য! উনিশ বছর বয়সী একটা মেয়ে কি না আমার জন্যই অপেক্ষা করেছিল। প্রেম এমন? আমি বাংলাদেশি বাঙালি। বাংলাদেশের একটা মুসলিম পরিবারে আমার জন্ম। আর কৃষ্ণকলিরা আমেরিকান। আমেরিকান ব্ল্যাক। খ্রিস্টান। রবীন্দ্রনাথও তো সত্তর বছর বয়েসে আর্জেন্টাইন এক নারীর প্রেমে পড়েছিলেন। কী যেন নাম ... যা হোক। ভালোবাসার প্রাথমিক ঘোর কাটলে আমি আর থেলমা বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে বসলাম। আমাদের দু-জনের দূরত্ব যে অনেক বেশি। ও আমার দেশটা দেখতে যাবে বলল ...
সাজিদের ই-মেইলের কথাগুলি মনে করতে করতে আন্দালিব বোতল তুলে গলায় ঠান্ডা পানি ঢালল। তারপর ঝুঁকে সিগারেটের প্যাকেট তুলে সিগারেট ধরাল।
সাজিদ বলল, থেলমা বাংলাদেশ যতটুকু দেখেছে ভালো লেগেছে বলল। মা ওর সঙ্গে খুবই ভালো আচরন করেছে। আমার বোনরাও ...জানিস তো গত সপ্তাহে আমরা টাঙ্গাইলের নাগরপুর গেলাম দাদুর বাড়ি।
আন্দালিব মাথা নাড়ল।
নানার বাড়িতেও ‘কৃষ্ণকলি’কে ঘিরে অনেক প্রশ্ন। কে এই মেয়ে? দেখতে এমন কেন? পোশাক-আশাক দেখে তো বড়লোকই মনে হয়-তাহলে গায়ের রং এত কালো কেন? আমেরিকান? কিন্তু তাহলে গায়ের রং এমন কালো কেন? হয়তো আরও প্রশ্ন উঠেছিল। সব আমার কানে আসেনি। থেলমার বিরুদ্ধে আমার বোনদের অভিযোগ ... থেলমার ইংরেজি নাকি বোঝা যায় না। থেলমা ইচ্ছে করেই নাকি পেঁচিয়ে কথা বলে। উন্নাসিক। মার্কিন দেশের মেয়ে তো। ধনীর দেমাগ। ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ ব্যর্থ বুঝলি আন্দালিব।
হুম।
গত পরশু আসল কথা তুলল থেলমা। বাস্তববাদী স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড মেয়ে তো। ইসলাম ধর্মে কনভার্ট হতে থেলমার আপত্তি নেই । মাকে জানাল। তারপরও মা রাজী না। আশ্চর্য! আমার ব্যাপারে থেলমার মা মিসেস জেনিফার ব্রুক যতটা উদারতা দেখাতে পারলেন । আর আমার মা পারল না। মিসেস জেনিফার ব্রুক -এর কাছে আমার মা হেরে গেল। অথচ ... অথচ, পশ্চিম বাংলার একটি আবৃত্তি সংগঠন মাকে রবীন্দ্রভাব প্রসারের জন্য এবার বিদ্যাসাগর পুরস্কার দিল।
আশ্চর্য!
হ্যাঁ। আর মা কি বলল জানিস?
কি?
নাগরপুর থেকে তোর বাবা ইলেকশনে দাঁড়াবে ভাবছে। এমন সময় এসব ...এলাকায় তোর বাবার একটা ইমেজ আছে না? ইলেকশনে অনেক টাকা খরচ হবে। হেরে গেলে? তখন?
ওহ্ ।
বাবা কাল বললেন, তোর আর বিদেশ পড়ে লাভ নেই রে সাদিজ। তুই বরং দেশেই পড়ালেখা শেষ কর।
ওহ্ । আন্দালিব জানে, এই ইচ্ছেটা মোশারফ আঙ্কেলের নয়, রওনক আন্টির। ওর মনে হল বাড়িটা একবার কেঁপে উঠল। অনেক অনেক বছর আগে মহাদেশগুলি একসঙ্গে ছিল। তারপর বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আন্দালিব জানে, নানা কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মনগুলি আর জোরা লাগবে না। বিশ্ব বিভেদের বেড়াজাল সমুন্নত রেখেই শুকিয়ে মরে যাবে।
সাজিদ বলল, মা আরও বলল, মেয়েটা তোর দাদার বাড়িতে গিয়ে গিটার বাজিয়ে জোরে জোরে চিৎকার করে গান গাইল। না গাইলে কি এমন হত? জানিসই তো ওরা কত কনজারভেটিভ। তুই ও ঢাকা থেকে গিটার নিয়ে গেলি।
আন্দালিব দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রওনক আন্টি ভীষন ব্যাক্তিত্বসম্পন্না মহিলা। শ্বশুরবাড়িতেও বিস্তর প্রভাব। ইচ্ছে করলেই থেলমার পক্ষে দাঁড়াতে পারতেন রওনক আন্টি, দাঁড়ালেন না। আন্দালিব দীর্ঘশ্বাস ফেলে চাপাস্বরে বলল, আন্টির সৌন্দর্যবোধ তীব্র । এই তীব্র সৌন্দর্যবোধ দূরত্ব সৃষ্টি করল কি না কে জানে । থেলমা ব্রুক ...তোর কৃষ্ণকলি আমেরিকান ব্ল্যাক।
হু। সাজিদ মাথা নাড়ল। দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সিগারেটে টান দিল।
তোর কৃষ্ণকলির গায়ের রং ব্ল্যাক হলেও ভারি মিস্টি দেখতে কিন্তু। আন্দালিব বলল।
সাজিদ বলল, কৃষ্ণকলিকে আমি যেভাবে দেখি সেভাবে তো আর কারও পক্ষে ওকে দেখা সম্ভব না।
তা ঠিক।
রবীন্দ্রনাথের চোখে কৃষ্ণকলি যেমন।
হুম। বুঝেছি। আন্দালিব বলল।
ঘরে এখন অন্ধকার জমতে শুরু করেছে। সেই ঘনায়মান অন্ধকারে সিগারেটের ঘন গন্ধ ছড়িয়ে আছে। জানালার বাইরে পোড়াটে এ শহরটার তাপদাহ থমকে আছে। কখনও-কখনও এ ঘরেও বিনা অনুমতিতে ঢুকে পড়ছে। জানালার বাইরে পুড়ে যাচ্ছে একটা শহরের জুনের সন্ধ্যা। ক’দিন হল আকাশে মেঘ নেই, বৃষ্টি নেই .. কোথাও কোনও ধরনের শুভেচ্ছা নেই, শুভ সংবাদ নেই ...
এই রকম দুঃসময়ে একমাত্র ছেলের প্রাণ দ্বগ্ধ করছেন রওনক আন্টি । অথচ রওনক আন্টি কত শত মানুষের প্রাণে আশার সঞ্চার করেছেন এই গান গেয়ে-
নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়, খুলে যাবে এই দ্বার
জানি জানি তোর বন্ধনডোর ছিঁড়ে যাবে বারে বার॥
খনে খনে তুই হারায়ে আপনা সুপ্তিনিশীথ করিস যাপনা
বারে বারে তোরে ফিরে পেতে হবে বিশ্বের অধিকার॥
আন্দালিব জিগ্যেস করল, কৃষ্ণকলি, মানে থেলমা কাল চলে যাচ্ছে বললি?
হ্যাঁ।
কখন ফ্লাইট ওর?
কাল সকালে। সাজিদের কন্ঠস্বরে বিষন্নতা স্পষ্ট।
আন্দালিব বলল, তাহলে তো তোকে কাল অনেক ভোরে উঠতে হবে।
না।
কেন?
আমি এয়ারপোর্টে যাবো না। সাজিদ বলল।
কেন? আন্দালিব অবাক হয়ে যায়।
কাল ভোরবেলা এ শহরে বৃষ্টি নামবে। কৃষ্ণকলি বাংলাদেশের বৃষ্টিতে ভিজতে চেয়েছিল ...
সাজিদের কথায় আন্দালিব অসম্ভব বিষন্ন বোধ করে। আন্দালিব সাজিদের দীর্ঘদিনের বন্ধু। আন্দালিব জানে কাল ভোরে ঠিকই বৃষ্টি হবে। ... ঠান্ডা বিয়ার খেতে খেতে থেলমার গান শুনে আমার মনে হল যেন সত্যিই আজ বৃষ্টি নামবে। সত্যিই তাইই হল। সন্ধ্যের মুখে বৃষ্টি নামল। আমরা সবাই বারের বাইরে শিশুদের মতো ছুটে গেলাম। তারপর রাস্তার ওপরই ভিজতে শুরু করলাম নেভাদার বিখ্যাত বৃষ্টির ভিতর ...
আহ্ ।
রওনক আন্টি এত সংকীর্ণ কেন?
পবিত্র একটা প্রেমকে খুন করতে পারলেন?
অথচ ... অথচ ... রওনক আন্টিকে সবাই আদর্শবাদী ও পরিশীলিত নারী বলেই চেনে। বিটিভিতে পুরনো দিনের গানের আসর উপস্থনা করেন, রওনক আন্টির বাচনভঙ্গি অত্যন্ত সুন্দর। সুন্দর এবং শুদ্ধ। ফরসা ঢলোঢলো মুখ। কপালে লাল রঙের বড় টিপ। তিরিশ বছর ধরে ধ্যান করছেন, বিয়ের পর মাছ-মাংস ছেড়ে দিয়েছেন; নিরামিষ খান। রবীন্দ্রনাথের গান তো গানই। বছর কয়েক আগে রওনক আন্টি একবার আন্দালিব কে বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথকে আজও পুরোটা বুঝতে পারিনি রে আন্দালিব । মাত্তর চল্লিশ ভাগ চিনেছি, আর তাতেই আমি পাগলপারা, বুঝলি। আমার মনে হয় না কেউ ওই বুড়োকে ষাট ভাগ বুঝেছে। আমার খুব ইচ্ছে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিয়ে শান্তিনিকেতন চলে যাব। কবিগুরুকে একশ ভাগ বোঝার চেষ্টা করব। তারপর পাগল হয়ে গেলে যাব। বলে গান ধরলেন,
মধুর তোমার শেষ যে না পাই ...
রওনক আন্টি আরও বলতেন, বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। পৃথিবীতে এমন কোথায় আছে বল্ তো? আমরা কি কখনও বলেছি যে আমাদের তেরো পার্বণে এ আসতে পারবে না, ও আসতে পারবে না ...
সাজিদের কথাটা এখনও কানে বাজছে ...মিসেস জেনিফার ব্রুক -এর কাছে আমার মা হেরে গেল।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুন, ২০১০ দুপুর ১:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


