somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: ধস

০১ লা জুলাই, ২০১০ বিকাল ৪:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নীলুফার আজ সকালে শান্তিনগর বাজারে গিয়ে দরদাম করে এক কেজি চিংড়ি মাছ কিনলেন। রাফি চিংড়ির মালাইকারী পছন্দ করে, অনেকদিন রাঁধা হয় না, আজ রাঁধবেন। গতকালই নারকেল কুড়ে রেখেছেন। নিজেই পেঁয়াজ আর টমাটো কাটলেন, আজ বুয়া আসেনি; ফ্রিজে অবশ্য আদা-রসুন বাটা ছিল। চিংড়ি পরিস্কার করতে সময় লাগল, কালো শিরাগুলি ফেলে দেওয়ার সময় বিরক্তি লাগে।
মুনিয়া আজ ঘরে ছিল। ও তো কম্পিউটার ছেড়ে রান্নাঘরে আসবে না। একটা প্রাইভেট ইউনিভাসিটিতে পড়ছে মুনিয়া। নীলুফার দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। দিন দিন মেয়েটা কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। ঘরে থাকলে সারাক্ষণ কম্পিউটারের সামনে বসে থাকে, নয়তো টিভি দেখে, নয়তো কানে মোবাইল ঠেকিয়ে কার কার সঙ্গে কথা বলে। তবে রেজাল্ট ভালোই করছে, কখন যে পড়ে মেয়েটা বোঝাই যায় না।
কড়াইয়ে তেল গরম হয়ে ধোঁয়া উঠছে। ২/৪টা গরম মশলা ফেলার সময় কী ভাবে হাতে ফোস্কা পড়ল। মুহূর্তেই নীলুফারের গোলপানা ফরসা মুখটা ব্যথায় বিকৃত হয়ে যায়। মনের পর্দায় তখনও ছেলের মুখটা ভাসছিল । আহ্, কতদিন হয়ে গেল ছেলেকে চিংড়ির মালাইকারী রেঁধে খাওয়ানো হয় না। ছেলে পেট পুরে ভাতের সঙ্গে মাখিয়ে চিংড়ির মালাইকারী খাবে, মায়ের রান্নার তারিফ করবে, গোপন সুখ অনুভব করবেন নীলুফার - জীবনে এইসব বিন্দু বিন্দু সুখ আছে বলেই তো বেঁচে থাকার এত আনন্দ।
রাফি আজ দুপুরের আগে আগেই ফিরল। ততক্ষণে রান্না শেষ। গোছল সেরে এসে খেতে বসল রাফি। গায়ের রং ওর বাবার মতোই- শ্যামলা, বেশ নাদুসনুদুস চশমা পরা মিষ্টি একটা মুখ। কেমন অস্থির-অস্থির ভাব। ভাত মাখতে মাখতে রাফি বলল, মা আমার ল্যাপটপের কি হল?
চিংড়ির মালাইকারী দেখে রাফি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল না দেখে নীলুফার দমে গেলেন। কত কষ্ট করে রাঁধলাম। হাতও পুড়ল। তা ছাড়া সকালের বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছিলেন। ভিজে শাড়ি পরে অনেকক্ষণ থাকতে হয়েছে। দীর্ঘশ্বাস চেপে নীলুফার বললেন, ল্যাপটপের কথা তোর বাবাকে বলেছি। তোর বাবা বলল, ওর তো একটা কম্পিউটার আছে। এখন আবার ল্যাপটপের কী দরকার।
মুহূর্তেই রাফির নরম মুখটা কেমন কঠোর হয়ে উঠল। কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে বলল, উহঃ মা, তুমি বুঝতে পারছ না। আজকাল ঘনঘন কারেন্ট যাচ্ছে। ল্যাপটপ হলে সুবিধা হয়। আজকাল সবাই ইউনিতে ল্যাপটপ নিয়ে যাচ্ছে।
নীলুফার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। রাফির বাবা সরকারি চাকরি করে। সৎ অফিসার হিসেবে সুনাম আছে শরীফুলের। এ জন্য চাপা গর্ব অনুভব করেন নীলুফার। রাফির সহপাঠীদের বাবারা সব কেমন কে জানে? নীলুফারের দেশের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান। মাস কয়েক আগে পৈত্রিক সম্পত্তি ভাগভাঁটোয়ারা করে লাখ দুইয়েক টাকা পেয়েছেন নীফুফার, বিপদ-আপদের জন্য তুলে রেখেছেন, ফিক্সড ডিপোজিট করার কথাও ভাবছেন। সেই টাকা থেকেই এখন ছেলের হাতে ল্যাপটপ কেনার টাকা তুলে দিতে হবে। নীলুফার ছেলেকে বললেন, আচ্ছা, ল্যাপটপ কেনার টাকা তোর বাবা না দিক আমি দেব। কত লাগবে?
ফিফটি। রাফির মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
ফিফটি। ঠিক আছে।
থ্যাঙ্কস মা।
নীলুফার লক্ষ করলেন, রাফি ঠিক খাচ্ছে না। ভাত নাড়ছে কেবল।
কি রে, খাচ্ছিস না যে- রান্না ভালো হয়নি?
না, মা। রান্না ভালো হয়েছে।
তা হলে?
বেইলি রোডে জেমস আর বর্ষর সঙ্গে দেখা। রাওয়া ক্লাবের কনসার্টের কথা বলেছি না তোমাকে?
হ্যাঁ।
সেই কনসার্টের টাকা পেলাম।
ও। রাফি একটা ব্যান্ডে বেজ গিটার বাজায়। মাঝেমাঝে টাকা-পয়সা পায়।
আমি, জেমস আর বর্ষ সুইসে ঢুকে কোক- বার্গার খেলাম।
ও।
নীলুফার আড়চোখে আঙুলের ফোস্কার দিকে তাকালেন। ছেলে খেয়ে আসবে জানলে এত কষ্ট করে রাঁধার কী দরকার ছিল। আজ সকালে শান্তিনগর বাজারে বৃষ্টিতে ভিজতে হল। বাজার করার সময় বৃষ্টি এলে কী যে বিচ্ছিরি অনুভূতি হয় তা ভূক্তভোগী মাত্রই জানে।
রাফি আবার বেরিয়ে গেল।
এ্যাই, এ্যাই, রাফি তুই কই যাচ্ছিস আবার এখন?
প্র্যাকটিস আছে মা।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নীলুফার। রাফি অল্প হলেও মিউজিক করে আয় করে । মাকে কখনও গিফট দিতে মনে থাকে না ওর। অথচ, এ মাসে দু-বার মোবাইল সেট চেঞ্জ করল। মেয়েটাও কেমন দূরে সরে যাচ্ছে। ক’দিন আগে মুনিয়া অদ্ভূত কান্ড করল। বিকেলের দিকে মেয়ের সঙ্গে বসে টিভি দেখছিলেন নীলুফার। হঠাৎই একটা ফোন পেয়ে হুড়মুড় করে নিচে নেমে গেল মুনিয়া । ‘এ্যাই, এ্যাই কই যাচ্ছিস তুই’-বলেও লাভ হয়নি। দ্রুত বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন নীলুফার । নিচে উঁকি দিয়ে দেখলেন একটা নীল রঙের দামি গাড়ি থেমে আছে। মুনিয়া ঝুঁকে কার সঙ্গে কথা বলছে। নীলুফার অবাক। কে গাড়িতে? মুনিয়া ফিরে এলে কত কথা জিজ্ঞেস করলেন নীলুফার।
আমার এক ফ্রেন্ড এসেছিল। মুনিয়া বলল।
ফ্রেন্ড তো ওপরে এল না কেন?
সে বিজি মা।
বিজি?
মুনিয়া চুপ করে থাকল ।



রাত এগারোটার পর বেইলি রোডর অফিসার্স ক্লাবের কাছে এই জায়গাটা ঝিমঝিম করে। ঢাকা শহরের কেন্দ্রে এমন নির্জন রাস্তা বিরল। হঠাৎ হঠাৎ গাড়ির শব্দ ভেসে আসে। তারপর আবার চুপচাপ। তখন নাইট গার্ডের হুইশেলের শব্দ কিংবা কুকুরের ডাক। কিংবা রাস্তা কাঁপিয়ে চলে যায় একটি মালবাহী ট্রাক। বারান্দায় ভাসে ইউক্যালিপটাসের গন্ধের সঙ্গে মিশে ডিজেলের গন্ধ ।
আজকাল অনেক রাত অবধি অন্ধকার বারান্দায় বেতের চেয়ারে নীলুফার স্বামীর পাশে বসে থাকেন। ছেলেমেয়ে দুটি অনেক দূরে সরে গেছে। নীলুফার-শরীফুল দম্পতি এই ফাঁকে আবার কাছাকাছি এসেছে । নীফুফার স্বামীর পাশে বসে বুকে হাত রাখেন ... যেন হাত না রাখলে স্বামীর হৃৎপিন্ডটা ঠিক জায়গায় স্থির থাকবে না, ছিটকে বেরিয়ে যাবে। বছর দুয়েক আগে প্রচন্ড বুকের ব্যথায় অফিসে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন শরীফুল । এই টেস্ট-সেই টেস্ট করার ডাক্তার বাইপাস করাতে বললেন। বাইপাস আর করা হয়ে ওঠেনি। তার কারণ আছে। শরীফুল সৎ অফিসার, অগাধ টাকার যোগান নেই তার। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধানদেনা করে দু লাখ টাকা অব্দি জমিয়েছিলেন। ঠিক তখই মুনিয়া ইন্টামিডিয়েট পাস করে প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়বে বলে কান্নাকাটি শুরু করল। নীলুফার-শরীফুল দম্পতি দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। কেননা, রাফিও প্রাইভেটেই পড়ে। নীলুফার-শরীফুল দম্পতির ইচ্ছে ছিল মেয়ে অর্থনীতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে । মুনিয়া এখন একটা প্রাইভেটে বি বি এ পড়ছে। ওর ভর্তি ও সেমিষ্টার ফি-র জন্য টাকাটা রাখতে হল, বাইপাস আর করা হয়ে ওঠেনি। তখন একবার দেশের জমি বিক্রির কথা ভাবা হয়েছিল। শরীফুল বাধা দিয়েছিলেন। বাতাকান্দির এক নিভৃত গাঁয়ে তার ছেলেবেলা কেটেছে। যে বাড়িতে শরীফুলের জন্ম, সে বাড়িটাকে বাতাকান্দির লোকে বলত ‘মন্ডল বাড়ি’। ছেলেবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর জামালউদ্দীন চাচা মানুষ করেছেন। জামালউদ্দীন চাচা বিরাট হৃদয়ের মানুষ। বড় ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের নিজের ছেলেমেয়ের মতো দেখতেন। জামালউদ্দীন চাচা বিশেষ করে শরীফুলকে ভীষণ আদর করতেন। বর্ষার সময় নৌকায় বসিয়ে জামালউদ্দীন চাচা কই কই নিয়ে যেতেন। ওপরে মেঘকালো বর্ষার আকাশ, নিচে বিলের কালচে পানি, সেই পানিতে শাপলা-শালুক, পাড়ের উচুঁ ডাঙ্গায় ঘাস, একটা বক কি মাছরাঙা পাখি আর গাবগাছ। এই শহরের ইটকাঠ ফুঁড়ে সে গন্ধ এখনও পান শরীফুল ...
নীলুফার বললেন, মুনিয়া আজ ওর মোবাইল হারিয়েছে, কাল দশ হাজার টাকা চেয়েছে। নতুন মোবাইল কিনবে।
এ কথায় শরীফুলের বিষন্ন বোধ করেন। বুকেরওপর স্ত্রীর কবোষ্ণ স্পর্শ টের পান। যেন ওখানটায় হাত না রাখলে এ শহরের একজন বিমর্ষ পুরুষের হৃৎপিন্ডটা ঠিক জায়গায় স্থির থাকবে না, ছিটকে বেরিয়ে যাবে। অন্ধকারে ভেসে ওঠে মুনিয়ার মুখ। মেয়ের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা আর সীমাবদ্ধ সাধ্যের ছিদ্রহীন চক্রের মাঝখানে ছটফট করছেন শরীফুল ইসলাম মন্ডল । শাপলা-শালুকময় বিলের পানির জলজ গন্ধ আর প্রবোধ দেয় না।
বাতাকান্দির জমি এবার বিক্রি না করলেই নয় । নীলুফার ফিসফিস করে বললেন।
অহ্। শরীফুলের কন্ঠ থেকে একটি অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এল। নিচের নির্জন সড়কে একটি ট্রাক চলে যায়। হর্নের তীক্ষ্ম শব্দে চমকে উঠলেন । শরীফুল টের পেলেন ওই ট্রাকের চাকা তার শৈশবের সবুজ গ্রামের ওপর দিয়ে দাঁত বসিয়ে চলে যাচ্ছে। আর অদৃশ্য রাহু গ্রাস করতে আসছে সবকিছু।
নীলুফার ফিসফিস করে বললেন, ফোন করে জামালউদ্দীন চাচা আসতে বল। আমাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে, আমাদের সংসার ধ্বসে যাচ্ছে। বাতাকান্দির জমি এবার বিক্রি না করলেই নয় ।
ঠিক আছে। নিষ্প্রাণ স্বরে বললেন শরীফুল।



রাতে ড্রইংরুমে বসে টিভি দেখছিলেন নীলুফার। ইন্ডিয়ান চ্যানেলের এই হিন্দি সিরিয়ালটা কখনও মিস করেন না তিনি। হিন্দি সিরিয়ালটার মূল থিম নারীর সঙ্কট, টেনশন। তবে সোয়েতা তিওয়ারির প্রতিপক্ষ অসুখ নয় নারী; স্বামীর অফিসের সুন্দরী সেক্রেটারি ...সন্ধ্যার পর থেকে আজ শরীফুলের শরীর খারাপ লাগছিল । ঘরে শুয়ে আছে সে। মাঝেমাঝে ভীষণ টেনশন হয়-কখন কী হয়ে যায়।
রাফি যে গিটারটা বাজায় তাতে ধবধব ধবধব শব্দ হয়। নীলুফার বিরক্ত হলেন। সন্ধ্যার পর একবারও বাবার ঘরে গেল না, এখন আবার গিটার বাজাচ্ছে। উঠে ছেলের ঘরের দরজায় নক করলেন দু-বার। তারপর নব ঘুরিয়ে দরজা খুললেন। ঘরটা অন্ধকার। কেবল টেবিল ল্যাম্প জ্বলে আছে। সিগারেটের গন্ধও পেলেন। এ নিয়ে অনেক চিৎকার চেচাঁমেচি হয়ে গেছে। লাভ হয়নি।
আস্তে রাফি, তোর বাবার শরীর খারাপ। নীলুফার চাপা স্বরে বললেন।
ওহ্, তোমাদের জন্য ঠিক মতো প্র্যাকটিসও করতে পারব না। রাফি চিৎকার করে ওঠে।
নীলুফার দ্রুত দরজা বন্ধ করে দেন। বুকটা ভীষণ কাঁপছে। আজকাল অল্পতেই বুকে তোলপাড় হয়। ড্রইংরুমে এসে বসলেন আবার। সারা শরীরে ঘাম টের পেলেন। ঘরে টিউব লাইট জ্বলে ছিল। হিন্দি সিরিয়ালে মন বসল না।
একটু পর মুনিয়া এসে পাশে বসল। চশমা পরা মুখটায় কেমন ঘোর ঘোর ভাব। চুল সরিয়ে বলল, মা, কাল আমার বার্থ ডে। তোমার মনে আছে?
আছে। মুখে হাসি ফোটাতে চেষ্টা করলেন নীলুফার। বললেন, ভাবছি পায়েস করব। কাল তোর ক’জন ফ্রেন্ড আসবে রে?
মুনিয়া বলল, না মা। কাল কেউ আসছে না।
আসছে না! মানে? নীলুফার অবাক হয়ে গেলেন। মুনিয়া কলেজে পড়ার সময় জন্মদিনে ওর ক্লাসমেটরা আসত। শম্পা, জেসমিন, নীপা। ওরা সব ভিখারুনন্নেছায় মুনিয়ার সঙ্গে পড়ত।
মুনিয়া বলল, এখন আর ঘরে কেউ বার্থ ডে পার্টি করে না। খামাখা ঝামেলা ... বরং বন্ধুদের রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাওয়ায়। আমিও কাল বন্ধুদের নিনফাসে নিয়ে গিয়ে খাওয়াব।
নিনফাস কই রে?
গুলশান।
ও।
মা?
বল।
কাল আমার টাকা লাগবে?
কত? নীলুফার টের পেলেন মাথার দু-পাশের শিরা দপদপ করছে।
তুমি জাস্ট তিন হাজার দিও মা। বাকিটা আমি দিব।
ওহ্ । তিন হাজার!
নীলুফার টের পেলেন। বুকের ভিতরে কে যেন জোরে জোরে হাতুরি পেটাচ্ছে। মাথার চুলের ভিতর ঘাম ছড়িয়ে যায়। পরশু দিন রাফিকে ল্যাপটপ কেনার জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা দিলেন। কী কুলার কিনবে হবে বলে আরও দু হাজার টাকা চেয়ে নিল...বাবার বাড়ির টাকা হু হু করে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ভীষণ অস্থির লাগছে।
ওদিকটায় শব্দ হল। রাফি । ঘর থেকে বেরিয়ে দ্রুত পায়ে মেইন গেটের দিকে চলে যাচ্ছে ।
‘এ্যাই, এ্যাই এত রাতে কই যাচ্ছিস তুই’। ‘এ্যাই, রাফি’! নীলুফার চেঁচিয়ে উঠলেন। তবে চিৎকার করে ডেকে লাভ হল না। একবারও মায়ের দিকে না-ফিরে দরজায় বিকট শব্দে বন্ধ করে বেরিয়ে যায় রাফি।
মুনিয়া বলল, মা, তুমি অত চেঁচিও না। রাফি এখুনি ফিরে আসবে।
তুই ... তুই জানলি কী করে? নীলুফারের ডাঙায় তোলা মাছের মতন খাবি খাওয়া অবস্থা।
ওর সিগারেট শেষ মা। ও সিগারেট কিনতে যাচ্ছে । বলতে বলতে মুনিয়া উঠে দাঁড়াল। অনেক ক্ষণ হল ফেসবুকে লগইন করা হচ্ছে না। বুকের ভিতরে সে জন্য চাপা কষ্ট হচ্ছে। মুনিয়া গত সপ্তাহে আদিত্যদের সঙ্গে বান্দরবান থেকে ঘুরে এল, সেই সব ছবিই আপলোড করেছে ও । বন্ধুরা কে কি কমেন্ট করছে সে সব জানার জন্য ভীষণ অস্থির অস্থির লাগছে ...এই মুহূর্তে ঠিক ওর সামনেই ওর মায়ের অসহায় ফ্যাকাশে বাস্তব মুখটা কী কারণে চোখে পড়ল না ওর ...



জামালউদ্দীন মন্ডল একটা রিকশা নিয়ে দুপুরের আগে আগে সদরঘাটে পৌঁছে গেলেন। তারপর খোঁজ খবর করে বাতাকান্দিগামী লঞ্চে উঠলেন । শরীর ভীষণ দূর্বল ঠেকছে, শরীরে কামড়ে ধরছে রোদ, মন ভীষণ দমে আছে। এই শেষ, ঢাকা শহরে তিনি আর কোনওদিনও আসবেন না । ঢাকা শহরের লোকেরা ভীষণ লোভী হয়। বাতাকান্দির জমি বিক্রির টাকা অন্য কারও হাতে পাঠিয়ে দেবেন শরীফুলের হাতে।
লঞ্চে বেশ ভিড়। দোতলার কেবিনে জায়গা পেলেন না। কেউই সিট ছেড়ে দিল না। বৃদ্ধদের আজকাল বাংলাদেশে কেউই সমীহ করে না। বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়া কী লাভ হইল ...এমন ভাবনায় আক্রান্ত হয়ে কেবিনের বাইরে এসে দাঁড়ালেন জামালউদ্দীন। কালো ব্যাগটা রাখলেন পায়ের কাছে। রেলিংয়ের কাছে রোদ তীব্র । ওপাশে বুড়িগঙ্গার কালো পানি বিচ্ছিরি গন্ধ ছড়াচ্ছে। সেই কালো রঙের পানির ওপরে ভাদ্র মাসের রোদ পড়ে ঝিকমিক করছিল। নদীর পানিতে থুতু ফেললেন জামালউদ্দীন - যা তিনি কখনও করেন না। তার মুখ গম্ভীর দেখায়। এবার ঢাকায় এসে জামালউদ্দীন মন্ডলের বড় ভাইয়ের ছেলে শরীফুলের বাড়িতে গিয়ে দুঃসংবাদ শুনলেন । শরীফুলের বউ নিলুফার অবিলম্বে বাতাকান্দির জমি বিক্রির জন্য চাপ দিল। গোটা আটেক তাল নিয়ে গিয়েছিলেন। তা নিয়ে হাসাহাসি। শরীফুলের বউ নিলুফার বলল, চাচা, আপনি তাল আনতে গেলেন কেন? আজকালকার ছেলেমেয়েরা কি এসব খায়? আপনি মাছ আনতে পারতেন। নিদেন পক্ষে হাঁস-মুরগী। ... আরে, হাঁস-মুরগী আনা কি সহজ কথা। আজকাল আর শরীরে কুলায় না। তিনি বৃদ্ধ হয়েছেন। তা ছাড়া শরীফুলের ছেলেমেয়েরা বৃদ্ধ জামালউদ্দীনকে এড়িয়ে গেছে। এসব কারণেই ঢাকা শহরের ওপর বীতশ্রদ্ধ জামালউদ্দীন । ... এই শেষ, ঢাকা শহরে তিনি আর কোনওদিনও আসবেন না । বড় ভাই, মানে-শরীফুলের আব্বা, কামালউদ্দীন মন্ডলের সঙ্গে সেই পাকিস্তান আমলে ১৯৬৪ সালে প্রথম ঢাকা শহরে এসেছিলেন জামালউদ্দীন। বড় ভাই ইন্তেকাল করেছেন স্বাধীনতার পরপরই। সেই ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা এখন দেশে-বিদেশে আছে, বড় একটা গ্রামে আসে না। বড় ভাইয়ের দশ কানি সম্পত্তি তিনিই দেখাশোনা করে আসছেন, কাগজপত্রও সব তার কাছে। শরীফুলের বউ নীলুফার এখন সেই জমি বিক্রি করতে চাপ দিচ্ছে। নাউজুবিল্লাহ্ । বাপদাদার ভিটেমাটি কেউ বিক্রি করে! মন্ডল বাড়ির ইজ্জত বলে কথা। বাতাকান্দির লোকে কী বলবে। তা ছাড়া জমি দশ কানি আর নাই। নিজের ভাগের জমি ফতুর হয়ে গেছে কবে! তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন জামালউদ্দীন মন্ডল, বড় ছেলে কফিলউদ্দীন ব্যবসার নামে টাকা-পয়সা নষ্ট করল-তখন অনেকটা বাধ্য হয়েই বড় ভাইয়ের জমিতে হাত দিতে হয়েছে । জমি এখন আছে মাত্র তিন কানি। শরীফুল আর শরীফুলের বউ এতকাল খোঁজখবর করেনি। জামালউদ্দীন মন্ডলের ছোট মেয়ে লাইলীর বিয়ে বাকি, বিয়ে এক প্রকার ঠিক, পাত্রপক্ষকে নগদ টাকা দিতে হবে, তা ছাড়া অন্যান্য খরচও আছে, ... মন্ডল বাড়ির ইজ্জত বলে কথা। মেজ মেয়ের জামাই আবদুর রেজ্জাক মালয়েশিয়া যাবে বলে বছর খানেক ধরে টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে ... বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে রোজিনা প্রায় ছয় মাস ধরে বাপের বাড়ি পড়ে আছে। এই শান্ত লক্ষ্মী মেজ মেয়েটি জামালউদ্দীন মন্ডলের বড় প্রিয়।
লঞ্চটা মাত্র ছেড়েছে। হঠাৎই জামালউদ্দীন হৃৎপিন্ডে তীব্র আলোরন টের পেলেন। তিনি রেলিং ধরে সিদে হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করলেন। শরীরটা ভীষণ কাঁপছে। মুখের ওপর খর রোদের ঝাঁক ঝাঁক তীক্ষ্ম তীর এসে পড়েছে, সেই অদৃশ্য বর্শা ফলকের খোঁচায় রক্তে আর ঘামে ভিজে যাচ্ছে সে মুখ, আর মাথার ভিতরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে লক্ষ লক্ষ মৌমাছির গুঞ্জন, বুকের বাঁ পাশে ব্যথা করতে থাকে, সেই সঙ্গে শ্বাসকষ্ট টের পান, দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে যায় ... রোদের রং বদলে কেমন কালচে হয়ে উঠল যেন ...মেরুদন্ডের নিচ থেকে উঠে আসছে গভীর যন্ত্রণার স্রোত ...তারপর বুড়িগঙ্গার কালো পানি থেকে দুটি বিশাল রোমশ কালো হাত ধীরে ধীরে বৃদ্ধকে গ্রাস করতে উঠে আসতে থাকে ...
৩৫টি মন্তব্য ৩৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×